মিসিং ফুটবল

অলংকরণ: এস এম রাকিব

স্পুটনিক ফুটবল ক্লাবের ফুটবল গায়েব। অথচ পরশু মানে সামনের সোমবারে নজরুল অ্যাভিনিউ ক্লাবের সঙ্গে ঠাকুরপাড়া স্পুটনিক ক্লাবের ফুটবল ম্যাচ। রীতিমতো ক্রেস্ট দেওয়া হবে। এই সময় কিনা ফুটবল গায়েব। কী করা। স্পুটনিক ফুটবল ক্লাবের সবাই বিশেষ চিন্তিত। ক্যাপ্টেন সজলের তো মাথা গরম হয়ে গেছে। কারণ, দুই ক্লাবের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, সেটা হচ্ছে ফুটবল দেবে স্পুটনিক ফুটবল ক্লাব আর ক্রেস্ট বানাবে নজরুল অ্যাভিনিউ ক্লাব। ওরা ১০০০ টাকা খরচ করে দারুণ একটা ক্রেস্ট বানিয়েছে। আর এই সময় কিনা ফুটবল গায়েব। এখন কী করা। স্কুলের মাঠে মিটিং বসেছে। সজল কেশে গলা পরিষ্কার করে বলল,

‘আমার মনে হয় ...’ বলে থেমে গেল।

‘কী মনে হয়?’

‘মানে আমি বলতে চাচ্ছিলাম, গগনকে জানানো দরকার।’

‘কোন গগন?’

‘আরে গোয়েন্দা গগন। আমার মনে হয়, ও ঠিক ফুটবল খুঁজে বের করে ফেলবে।’

‘আরে ধুর ধুর। রুবেল উঠে দাঁড়ায়। ‘ওই সব গোয়েন্দা ফোয়েন্দা দিয়ে হবে না। এটা জিনের কাজ। আমার বাসার বুয়ার ওপর মাঝে মাঝে জিন ভর করে। তখন এটা সেটা গায়েব করে দেয়। গতবার একটা পানির জগ গায়েব করেছে। এবার ফুটবলটা। ওটা আর পাওয়া যাবে না।’

ফুটবলটা রুবেলের কাছে ছিল। সে একটু ঘাউরা টাইপ। চাঁদা দিয়ে ফুটবল কেনার সময় সে দশ টাকা বেশি দিয়েছিল বলে ক্লাবের নিয়ম ভঙ্গ করে ফুটবলটা তার কাছে রাখে, অথচ ফুটবলটা থাকার কথা ক্যাপ্টেনের কাছে। দেখতে বেশ বড়সড় রুবেল আবার ওদের ক্লাবের গোলি। গোলি হিসেবেও বেশ ভালোই খেলে। তবে ওই যে, সে বেশ একটু ঘাউরা টাইপের বলে কেউ তাকে অত ঘাঁটায় না।

‘তোদের বুয়াকে জিনে ধরলে কী করে?’ নাসির জানতে চায়।

‘জিন যখন ধরে বুয়া প্রথমে কাঁপতে থাকে, তারপর উল্টে পড়ে যায়।’

‘তারপর?’

আরও পড়ুন

‘তারপর আস্তে আস্তে ওপরের দিকে ভেসে উঠতে থাকে...শূন্যে...’

‘বলিস কী? তোরা ভয় পাস না?’

‘বাসার সবাই পায়, আমি পাই না।’ ঠোঁট উল্টে মাথা নাড়ে রুবেল।

সজল বেশ বুঝতে পারছে রুবেল চাপা মারা শুরু করেছে। চাপা মারায় সে ওস্তাদ। সে দলের গোলি, কাল বাদে পরশু ম্যাচ আর তার কোনো বিকার নেই। সে বলছে জিন ফুটবল গায়েব করে দিয়েছে। কই, আগে তো এই জিনের গপ্পো কেউ শোনেনি।

‘আচ্ছা, জিন ফুটবল দিয়ে কী করবে?’ রাতুল প্রশ্ন করে বসে।

‘আরে, ফুটবলের ভেতর কী আছে?’ বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ে রুবেল।

‘বাতাস।’

‘আরে, বাতাসে কী থাকে...অক্সিজেন হাইড্রোজেন নাইট্রোজেন আর ফ্রাইড্রোজেন।’

‘ফ্রাইড্রোজেনটা আবার কী?’

‘ওটাই তো ওদের লাগে।’ সজলের মাথা গরম হয়ে গেল যেন। রীতিমতো চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই রুবেল! তুই কোথায় যাচ্ছিলি যা তো...প্লিজ।’

শেষ পর্যন্ত স্পুটনিক ফুটবল ক্লাবের ক্যাপ্টেন সজল গিয়ে হাজির হলো গগনের বাসায়।

‘গগন?’

‘কিরে, তোদের না আজ ফুটবল ম্যাচ।’

‘আজকে না কালকে। তবে একটা সমস্যা হয়েছে।’

‘কী সমস্যা?’

সজল সব খুলে বলল। রুবেলের কাছে ফুটবলটা ছিল; রুবেলের দাবি, জিন ফুটবল গায়েব করে দিয়েছে। কারণ, ফুটবলের ভেতর ফ্রাইড্রোজেন থাকে...সবই বলল।’ গগন হো হো করে হাসল।

‘হাসিস না গগন। অবস্থা খুব খারাপ। আজকের মধ্যে ফুটবল না পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।’

‘আমি কী করব?’

‘কেন, তুই গোয়েন্দা, তুই ফুটবলটা খুঁজে বের করবি...’

‘উফ...ফুটবল খুঁজে বের করা গোয়েন্দার কাজ? দেখ সজল, আমি মনে হয় গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দিচ্ছি...’

‘কেন?’

আরও পড়ুন

‘আর কেন? সবাই অদ্ভুত অদ্ভুত বিষয় নিয়ে আসে। সেদিন পাশের বাসার বেবী আপা আসল তার নেইল কাটারটা খুঁজে পাচ্ছে না। ওটা খুঁজে দিতে হবে। আরে বাবা, একটা কিনে ফেললেই হয়, তা না আমাকে খুঁজে দিতে হবে। কারণ, আমি নাকি গোয়েন্দা। শেষ পর্যন্ত নেইল কাটারটা কোথায় পেয়েছে জানিস?’

‘কোথায়?’

‘বাদ দে...তোরা একটা কাজ কর।’

‘কী কাজ?’

‘একটা নতুন ফুটবল কিনে ফেল।’

‘আরে কী বলিস। ফুটবলের দাম জানিস? আর আজকাল কেউ ক্লাবের চাঁদাই দেয় না। আর ফুটবলের জন্য টাকা দেবে? প্লিজ গগন।’

সজলের জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত গগন রাজি হলো।

‘তাহলে চল।’

‘কোথায়?’

‘আর কোথায়! রুবেলের বাসায়।’

‘রুবেলের বাসায় গিয়ে দেখে, রুবেল ওদের বাসার বাইরের বড় বারান্দায় দুই হাতে দুটো টেবিল টেনিস ব্যাট নিয়ে একটা পিংপং বল লোফালুফি করছে। গগন খেয়াল করল, টেবিল টেনিস ব্যাট আর বল সবই নতুন, মানে সদ্য কেনা হয়েছে। ওদের দেখে রুবেলের ভ্রু কুঁচকে গেল।

‘তোরা?’

‘ইয়ে রুবেল, গগন তোদের বুয়ার সঙ্গে একটু কথা বলবে...ওই ফুটবলের ব্যাপারে।’

‘না না, ওসব হবে না। বুয়া আজ কাজে ব্যস্ত। বাসায় মেহমান আসবে।’

‘টেনিস ব্যাট কবে কিনলি?’ গগন প্রশ্ন করল।

‘তা দিয়ে তোর কী দরকার?’

‘না, যেদিন ফুটবলটা জিন নিয়ে গেল, সেদিনই টেবিল টেনিস ব্যাট–বল কিনলি, তাই একটু সন্দেহ হচ্ছে?’

‘কী সন্দেহ?’

‘ফুটবলটা বেচে এসব কিনলি কি না?’

‘কি-ক্কি?’ রুবেল ব্যাট–বল ফেলে ছুটে এসে গগনের কলার চেপে ধরে। রুবেলের গায়ে ভালো শক্তি আছে। দম আটকে আসে গগনের। তারপরও কোনোমতে বলে, ‘আচ্ছা রুবেল, পিংপং বলের ভেতরেও কি তোর ওই ফ্রাইড্রোজেন গ্যাস আছে?’

আরও পড়ুন

হঠাৎ কী হলো, রুবেল গগনের কলার ছেড়ে দিয়ে ছুটে বাসায় ঢুকে গেল। বারান্দায় তার নতুন টেবিল টেনিস ব্যাট আর বল পড়ে রইল।

গগন সজলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চল যাই।’

‘কিন্তু ফুটবল?’

‘আজকের মধ্যেই পেয়ে যাবি মনে হয়।’

‘সত্যি?’

‘দেখি...’

সত্যি সত্যিই সজল ফুটবলটা পেল সন্ধ্যায়, রুবেলই দিয়ে গেছে এবং বলেছে, জিন নাকি ফেরত দিয়ে গেছে কোনো কারণে। তবে সে আর স্পুটনিক ফুটবল ক্লাবে নেই, এটাও জানিয়ে গেছে। পরদিন যথাসময়ে ফুটবল ম্যাচ শুরু হলো। কিন্তু সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখল, রুবেল নজরুল অ্যাভিনিউ ক্লাবের জার্সি পরে ওদের গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে আছে। আর ঠাকুরপাড়ার স্পুটনিক ফুটবল ক্লাবের গোলপোস্ট শূন্য। কে গোলি হবে এখন? এই শেষ মুহূর্তে? মাঠের পাশে দর্শকসারিতে গগনকে বসে থাকতে দেখা গেল। সে–ও খেলা দেখতে এসেছে। আফটার অল তাদের পাড়ার খেলা। গগন খেয়াল করল, স্পুটনিক ফুটবল ক্লাবের প্রায় সব প্লেয়ার তার দিকে তাকিয়ে আছে। তারা কি আশা করছে এখন সে গোলি হবে? গোয়েন্দা থেকে ফুটবল ক্লাবের গোলি?.. ধুত!

আরও পড়ুন