চোখের চামড়া

অলংকরণ: তনি সুভংকর

স্থান: কীর্তিমারী সদর থানার ইন্সপেক্টরের কামরা।

কাল: বিকেলবেলা।

পাত্র: ইন্সপেক্টর রইস আর তার সোর্স কামাল। রইস পুরোনো মেহগনির টেবিলটার ওপারে চেয়ারে বসা আর কামাল দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। দুজনেরই এটা চিরাচরিত ভঙ্গি, তোমরা কখনো কীর্তিমারী জেলা শহরে হাজির হলে ওদের এভাবেই পাবে।

রইস লম্বা-চওড়া বিশালবপু লোক, ঠোঁটের ওপরে জাঁদরেল গোঁফটা তাকে মানিয়ে গেছে। এই মুহূর্তে ভুরু কুঁচকে আঙুল মটকাচ্ছে সে। কামাল শুকনা-পাতলা একহারা গড়নের, কাপড়চোপড় পুরোনো, কিন্তু পরিষ্কার। মাথায় এলোমেলো চুলের বোঝা। কেবল ঝকঝকে ক্ষুরধার চোখ দুটো দেখলেই বোঝা যায়, নিম্নবিত্ত এই লোক আর সবার মতো নয়। পুলিশের সোর্স বা সাহায্যকারী হিসেবে ‘টিকটিকি’ নামে পরিচিত কামাল এরই মধ্যে অনেকগুলো জটিল রহস্যের সমাধান করে ফেলেছে।

রইসের মেজাজ ভালো নেই, গভীর চিন্তায় মগ্ন সে। এটা বুঝেই চুপ করে আছে কামাল। তবে রইস যখন তার দিকে তাকাল, সেই চাউনিতে একটু কিন্তু-কিন্তু ভাব আবিষ্কার করে কামাল সামান্য অবাক হলো বটে।

‘কামাল, দেখ, তোর অতীত নিয়ে আমি খুব একটা ঘাঁটতে চাই না, সেটা তুই জানিস,’ ভূমিকা শুরু করল রইস, ‘কিন্তু এবারে একটু নাড়াচাড়া দিতে হবে।’

বস কিসের কথা বলছে, কামালের তা ভালোই জানা আছে। প্রসঙ্গটা তার জন্য সুখের নয়, কিন্তু বিনা কারণে নিশ্চয়ই রইস এটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে না। কিছু না বলে চুপচাপ তাকিয়ে রইল সে, কান খাড়া।

‘তুই তো একসময়...বর্ডারে স্মাগলিংয়ের খোঁজ রাখতি।’ রইস বলেই ফেলল, ‘এখনো নিশ্চয়ই তোর চেনাজানা অনেক লোক সেটা করে। তোকে ওই দিকটা নিয়ে একটু খবর বের করতে হবে আরকি।’

কথা সত্য। পুলিশের বেশির ভাগ সোর্সই কোনো না কোনোভাবে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল বা আছে। কামাল একসময় সেটাই করত, যেটার বিষয়ে জানতে চাইছে রইস। অবশ্য বহু দিন হলো ওই জগৎ ছেড়ে এসেছে ও। কিন্তু তাই বলে যোগাযোগগুলো তো আর মরে যায়নি, আর সেটার কথাই বলছে ইন্সপেক্টর রইস।

‘চোরাচালান খুব বেড়ে গেছে।’ রইস যা বলল, সেটা কীর্তিমারীতে নতুন কোনো বাক্য নয়। সীমান্তবর্তী জেলা কীর্তিমারী, স্মাগলিং আছে এবং থাকবে। কামাল, যে কীর্তিমারীর সবার হাঁড়ির খবর রাখে, তাকেও এ কথা এমনি এমনি বলার কোনো মানে হয় না। পরের কথায় অবশ্য বিষয়টা খানিক খোলাসা করল রইস, ‘এমনিতে সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নাই। কাস্টমস আর স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামাক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এবারে শুধু শাড়ি-ওষুধ-চিনি আসছে না। এবারে পণ্যের মান আরেক ধাপ উন্নত করেছে ওরা। বিপুল পরিমাণে মাদক পাঠাতে শুরু করেছে। আমরা যত দূর জানতে পেরেছি, কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী ডার্ক ব্যাট আছে এর পেছনে। জানিস তো, তার পরিচয় এখনো অজানা।’

কথা সত্য। পুলিশের বেশির ভাগ সোর্সই কোনো না কোনোভাবে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল বা আছে। কামাল একসময় সেটাই করত, যেটার বিষয়ে জানতে চাইছে রইস।

মাথা ওপর-নিচ করল কামাল। এটাও তার জানা। বেশ কিছুদিন হলো শহরের ভেতরেই ব্যস্ত সে রইসের সঙ্গে, বর্ডারের দিকে যাওয়া হচ্ছে না, কিন্তু বাজারে এই নতুন উৎপাত ওর চোখ এড়ায়নি। কামাল নিজে অন্ধকার জগতের খুব কাছাকাছি থাকে বলে জানে, বাজারে কোনো নেশার চালান বেড়ে গেলে কী কী পরিবর্তন দেখা যায়। সেসব লক্ষণ কিছুদিন হলো খুব চোখে পড়ছিল তার, কিন্তু সময়ের অভাবে মনোযোগ দিতে পারেনি বিষয়টাতে।

আরও পড়ুন

‘তোকে তো কিছু বলতে হবে না, তুই সব জানিস। তবু বলছি, সীমান্তের ওপার থেকে ড্রাগ পাঠানো আসলে কঠিন কিছু না। দুই দেশের মাঝখানে সীমান্ত বিরাট। সব জায়গায় পাহারা দেবার মতো যথেষ্ট সীমান্তরক্ষী নেই। অনেক জায়গায় শুধু কাঁটাতারের ওপর ভরসায় থাকতে হয়। সেটা যে কাজ করছে না, তা পরিষ্কার। কিন্তু ড্রাগস দেশের ভেতরে আনার পরে ওদের কাজ কঠিন হয়ে যায়। বর্ডার থেকে কীর্তিমারী শহরে আনতে হয়, অনেকটা রাস্তা। যানবাহন লাগে, কোনো লোককে সঙ্গে করে আনতে হয়। আবার সেই রাস্তায় জায়গায় জায়গায় পুলিশ-বিজিবির চেকপোস্ট। তবু কীভাবে যেন ড্রাগস চলে আসছে এই শহরে। জমা হচ্ছে কোথায়, তা–ও জানা যাচ্ছে না।’

মাথা ওপর–নিচ করল কামাল। ‘স্যার, ওদের আসল ধান্ধা হইল কীর্তিমারী থাকিয়া অন্যান্য শহরে ড্রাগস পাচার করা। কীর্তিমারীত্ আর কতজনের কাছে বেচাইবে? রংপুর, বগুড়া, ঢাকা এখান থাকিয়া একই রাস্তার ওপর। কোনোমতে পাঠে দিবার পারলে টাকায় টাকা।’

‘তুই যা বললি সবই জানি এবং এগুলোই করে চলেছে ড্রাগস ব্যবসায়ীরা। তা যা–ই হোক, তোকে যে জন্য ডেকেছি, বলি। তুই একটু খোঁজ করবি, কে কে আছে পাচারের পেছনে।’

কামালের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কোনো পয়েন্টের সবচেয়ে দরকারি দিকেই চট করে চোখ চলে যায় তার। ‘স্যার, ড্রাগস যে কীর্তিমারীত্ ঢুকতেছে, ওইটা কীভাবে জানা যাইতেছে?’

‘দুই–এক জায়গায় ধরা পড়েছে বর্ডার থেকে শহরে ঢোকার সময়। চালানের আকার দেখে মনে হয়েছে, প্রায়ই এ রকম চালান আসে আমাদের শহরে। সম্ভাব্য পরিমাণটা বিপুল।’ রইস বলল।

পরের প্রশ্নটা করার সময় কামালের চোখ যেভাবে ঝিকমিক করে উঠল, তাতে বোঝা গেল প্রথম প্রশ্নটা কেবল ভূমিকা ছিল। ‘কীর্তিমারী শহর থাকি বাইর হওয়ার সময় কোনো ড্রাগস আটকা পড়ছে?’

ভুরু সামান্য কুঁচকে গেল রইসের। প্রশ্নটা করার কারণ বুঝতে পারছে না। ‘না তো। তেমন কোনো বড় চালান ধরা পড়েনি। আগে যেমন ছোটখাটো এক–দুইটা ধরা পড়ত, তেমন আরকি।’

‘স্যার, ড্রাগস কি তাইলে ঠিকই যাইতেছে ঢাকা–রংপুরত্, আমরা ধরবার পারতিছি না?’

‘হতে পারে। বর্ডার থেকে শহরে ঢোকার রাস্তায় যে রকম কড়াকড়ি, শহর থেকে বের হবার রাস্তায় ততটা নেই।’

‘আমার মনে হয়, আমরা ভুল জায়গাত দেখতেছি, স্যার,’ জ্বলজ্বলে চোখে বলল কামাল। ‘ড্রাগস শহরত ঢুকতেছে কিন্তু বাইর হইতেছে না। তার মানে ওরা কোথাও জমাইতেছে ওইটা। হয়তো একসাথে বড় চালানে পাচার করি দেবে দেশের ভেতরত।’

‘বর্ডারে ওদের ঠেকানো কঠিন হবে,’ মাথা দুলিয়ে বলল রইস। ‘কিন্তু ড্রাগের মজুতটা ধরতে পারলে পুরো চক্রটাকে অচল করা যাবে। কামাল, কাজে লেগে যা।’

সেটা অবশ্য কামালকে না বললেও চলত। রুম থেকে বিদায় নেওয়ার আগে অনেকটা আনমনে বলল ও, ‘সবার আগত বাইর করা লাগবে, ওরা নিজেগো মধ্যত্ যোগাযোগ করে কেমন করি।’

***

পরের আট-দশ দিন সারা কীর্তিমারীতে টইটই করে ঘুরে কাটাল কামাল।

শেষ দুই দিন ধরে শহরের নবাবগঞ্জ বাজারের দিকে বেশি ঘুরতে দেখা যাচ্ছে কামালকে। শহরের পুরোনো এই অংশটা ঘিঞ্জি দোকানপাটে ভর্তি। বেশির ভাগ পাইকারি দোকান আর লাগোয়া গুদাম। মুদিদোকান, স্টেশনারি, প্লাস্টিকের জিনিস, কসমেটিকস, কাপড়—সবকিছুর দোকান আর গুদাম আছে।

শহরের অসংখ্য মানুষকে চেনে কামাল, বহু জায়গায় তার যাতায়াত। অনেকে তাকে সন্দেহের চোখে দেখে পুলিশের সোর্স বা ‘টিকটিকি’ হিসেবে, আবার অনেকেই পছন্দ করে তার পরোপকারী, দিলখোলা স্বভাবের জন্য।

প্রথম দিন কামাল কেবল অলস ঘুরে বেড়িয়েছে নবাবগঞ্জ বাজারের গোলকধাঁধার মতো অলিগলিতে। গরমের দিন, ভ্যাপসা গরমে প্রাণ আইঢাই করা ছাড়া আর কোনো লাভ হয়নি ওর। যারা ওর কাজ সম্পর্কে জানে, তাদের সন্দেহমেশানো নজরও খুব একটা সুখকর নয়। কামাল তাই বোধ হয় অনেকটা হাল ছেড়ে দিয়েই আজ দুপুরের দিকে বসল ওর এক পরিচিত ছুটা কাপড়ের ব্যবসায়ীর পাইকারি দোকানে। ‘মায়ের দোয়া ক্লথ স্টোর’।

আরও পড়ুন

দোকানের মালিক ইদরিস মিয়ার বয়স পঞ্চাশের মতো। শ্যামলা, বেঁটেখাটো চেহারা। গোঁফওয়ালা চেহারাটা সব সময় হাসিখুশি। বেশ খাতির করেই ওকে বসাল দোকানে। ‘কামাল ভাই, ঘামি গেছেন একেবারে। বসেন, বাতাস খান।’

কামাল দোকানের ভেতরে ঢুকে একটা টুলে বসতে বসতে বলল, ‘হ্যাঁ রে ভাই, একটা কাজতই আসছি। তবে কোনো লাভ হইতেছে না। চলি যাব।’

‘পরে যাইয়েন। আগে ঠান্ডা কিছু খিলাই। ওই হৃদয়, একটা কোক নিয়া আয়।’

হৃদয় নামের শুকনো লিকলিকে কিন্তু ধারালো চেহারার ছেলেটা এতক্ষণ ফোনে রিল দেখায় ব্যস্ত ছিল। এবার তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ফোন পকেটে ঢুকিয়ে মাথার ফেড চুলের কাটে হাত বুলিয়ে হাঁটা দিল মালিকের আদেশ তলব করতে।

এবারে কৌতূহলী চোখে কামালের দিকে তাকাল ইদরিস মিয়া। গোঁফের নিচে একটা চওড়া হাসি মুখে। নিচু কণ্ঠে প্রশ্ন করল, ‘হে হে, কামাল ভাই, কোনো কাজে আসছেন নাকি?’

কামালও গলা নামিয়ে ফেলল। ‘হ্যাঁ ভাই। একটা লোককে খুঁজতেছি একটু।’

‘কন তো, কী রকম লোক?’ আগ্রহী মনে হলো ইদরিস মিয়াকে, ‘অনেক রাইত পর্যন্ত তো দোকানতই থাকি, অনেক মানুষক আসা–যাওয়া করতে দেখি।’

‘লোকটার চেহারা...বিশেষ কিছু বলার মতন না। ওই জন্যই ওকে খুঁজি পাওয়া কঠিন। লম্বায় ধরেন সাড়ে পাঁচ ফুট হইবে, শ্যামলা চেহারা, মুখ শেভ করা, মাথার চুল ছোট।’ কামাল বলল।

ইদরিস মাথা নেড়ে বলল, ‘অনেক মানুষই তো এমন চেহারার হইতে পারে। আর কিছু কবার পান?’

‘খাড়ান, মনে করি দেখি...ও হ্যাঁ, লোকটার চিপ ছোট। মানে মাথার জুলফি। কানের ওপরই শেষ হয়া গেছে।’

দুটো জিনিস দেখে কামাল নিশ্চিত হলো এ-ই সেই লোক : এক, লোকটার খাটো জুলফি। দুই, ব্যস্ততার ভান করে সে এদিক–ওদিক ঘুরছে বটে, কিন্তু আসলে কোনো কিছু কিনছে না। কারও সঙ্গে কথা বলছে না।

এবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল ইদরিস মিয়ার চোখ। ‘কন কী? এই রকম একটা লোক তো দেখছি মনে হয়।’

‘তাই নাকি? কী করতেছিল?’ কামাল নড়েচড়ে বসল টুলে।

‘কিছু না। ওই যে কইলাম, লোকটার চেহারা বিশেষ কিছু না। কিন্তু কয়েক দিন ধরিয়া তাকে নবাবগঞ্জ বাজারে আসা–যাওয়া করতে দেখতিছি। প্রথমে ওইভাবে খেয়াল করি নাই। কিন্তু পরে মনে হইছে, লোকটাক্ একটু সন্দেহ লাগে।’

‘সন্দেহ লাগে ক্যান?’

‘প্রথমে মনে করছিলাম, কিছু কিনতে আসে। কিন্তু বাজারত্ ঢোকার সময়ও হাতে কিছু থাকে না, বাইর হওয়ার সময়ও না। আর খালি চাইরপাশে দেখতে দেখতে যায়।’ ইদরিস মিয়া জানায়।

কামাল কিন্তু বলল, ‘অনেক কামেই তো মানুষ এই বাজারত্ আসতে পারে। ধরেন, সে আসলে কোনো জিনিসের এজেন্ট। কসমেটিকের, মুদিদোকানের। তারা দেখতে আসে, কোন্ দোকানে কী নাই, কোন্ দোকানে কী জিনিস সাপ্লাই দেওয়া লাগবে।’

‘তাইলে একদিন আসবে তালিকা করতে, আরেক দিন আসবে জিনিসপত্র নিয়া। কিন্তু তাকে তো আমি প্রতিদিন দেখতেছি খালি হাতে আসতে, যাইতে।’ ইদরিস মিয়া নাকচ করে দেয় কামালের যুক্তি।

‘তাই তো!’ কামালের ভ্রু কুঁচকে গেছে। ‘আচ্ছা, লোকটাকে কারও সাথে কথা কইতে দেখেন?’

‘কথা কইতে ঠিক দেখি নাই, কিন্তু একদিন জানি মনে হইল, ওই যে ওই দোকানের লোকটাকে চোখ দিয়া জানি ইশারা করল।’

‘ওই যে ওই দোকানটা?’

‘না,’ গলা নিচু করে বলল ইদরিস মিয়া। ‘আমার পাশেরটা। সবুজ সাইনবোর্ড।’

‘ও, পাইকারি মুদিদোকান? আটা, ময়দা, সুজি বেচে। ওই লোকটাকে চেনেন?’

‘না ভাই। সেইভাবে কথা হয় নাই। লোকটা কারও সাথে কথা কয় না, মুখ গোমড়া করি রাখে। নতুন দোকান, দেড়–দুই মাস হইল আসছে। আগে অন্য জিনিসের দোকান ছিল অন্য আরেকজনের।’ ইদরিস জানায়।

আরও কিছু প্রশ্ন করত হয়তো কামাল, কিন্তু ততক্ষণে হৃদয় নামের ছেলেটা চলে এসেছে। হাতে একটা প্লাস্টিকের কোমল পানীয়র বোতল।

ইদরিস আর কামাল ওই লোকটা বা দোকানের প্রসঙ্গে আর কোনো আলোচনা করল না হৃদয়ের সামনে। বোতল খুলে কোক ভাগাভাগি করে খেল ওরা তিনজন।

আরও পড়ুন

খালি বোতলটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল কামাল। ‘ইদরিস ভাই, আজকে উঠি তাইলে।’

‘আসিয়েন ভাই, কথা বললে ভালো লাগে।’ ইদরিস মিয়া সদা হাসিমুখে বলল।

‘আপনার দোকানের একটা ছবি তুলব ভাই,’ কামাল তার দিকে তাকিয়ে বলল। চোখে একটা অদ্ভুত ভাব তার। ‘কত রকম কাপড় সাজায় রাখছেন, দেখলে ভালো লাগে।’

ইদরিস মিয়া হাঁ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ‘ভাই?’ বোকার মতো প্রশ্ন করল সে।

‘দোকানের ছবি তুলব, বড় করিয়া। আশপাশের দোকানেরও ছবি আসবে।’ কামাল এবার চোখ টিপ দিয়ে বলল।

এবারে হাসি দেখা গেল ইদরিস মিয়ার মুখে। চালাক লোক, বুঝে গেছে। আসলে ইদরিসের দোকানের ছবি তোলার ভাণ করে পাশের সন্দেহজনক দোকানের ছবি তুলবে কামাল।

‘তোলেন ভাই, তোলেন,’ উৎসাহের সঙ্গে বলল সে। ‘কোনো সমস্যা নাই।’

কামাল বেরিয়ে এল দোকান থেকে। পকেট থেকে তার সস্তা স্মার্টফোনটা বের করতে করতে আড়চোখে দেখল, ইদরিস মিয়ার পাশের লাল সাইনবোর্ডওয়ালা আটা, ময়দার দোকানি লোকটা তীক্ষ্ণ চোখে দেখছে তাকে।

সহজ ভঙ্গিতে ইদরিস মিয়ার ছুট কাপড়ের দোকানের দিকে ক্যামেরা তাক করল কামাল। সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, ‘দারুণ দোকান সাজাইছেন, ইদরিস ভাই। বাইরে বাটিকের কাপড়গুলা টানায় রাখছেন, আহা কী রং!’

দ্রুত বেশ কয়েকটা ছবি তুলতে তুলতে কামাল খেয়াল করল, পাশের দোকানের লোকটা হঠাৎ যেন দোকানের পেছন দিকে কী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বা ব্যস্ত হওয়ার ভান করছে।

মুচকি হাসল কামাল। সম্ভবত মুখ লুকানোর চেষ্টা করছে লোকটা। সমস্যা নেই, ওর যা দরকার ছিল, পেয়ে গেছে। ইদরিসের কাছ থেকে আরেকবার বিদায় নিয়ে হাঁটা ধরল সে।

নবাবগঞ্জ বাজারের অলিগলিতে হাঁটা ধরল কামাল। গুড়ের দোকান, কসমেটিকসের দোকান, প্লাস্টিকের জিনিসের দোকান, সস্তা গয়নার দোকান। নানান জিনিসের গন্ধ আর ভ্যাপসা গরমে গুমোট হয়ে আছে বাতাস। খুব একটা কোনো দিকে তাকাচ্ছে না কামাল, কেবল মানুষজনের মুখের ওপর ঘুরছে ওর চোখ।

মিনিট পনেরো পরে, একটা পাইকারি চা-পাতার দোকানের সামনে পেয়ে গেল ও লোকটাকে।

ইদরিস মিয়া ভালোই বর্ণনা করেছে তার চেহারা। একহারা গড়ন লোকটার, লম্বাও না খাটোও না, কালোও না ফরসাও না। ক্লিন শেভ চেহারা ভাবলেশহীন।

দুটো জিনিস দেখে কামাল নিশ্চিত হলো এ-ই সেই লোক : এক, লোকটার খাটো জুলফি। দুই, ব্যস্ততার ভান করে সে এদিক–ওদিক ঘুরছে বটে, কিন্তু আসলে কোনো কিছু কিনছে না। কারও সঙ্গে কথা বলছে না।

কামালের দিকে সরাসরি তাকায়নি সে, কিন্তু কীভাবে যেন টের পেয়ে গেছে ওর উপস্থিতি। আস্তে করে দিক পরিবর্তন করল সে, ঢুকে গেল পাশের একটা গলিতে।

কামালও পা চালাল। ওই তো, নাতিদীর্ঘ গলিটার ও-মাথায় আরেকটা বাঁক নিচ্ছে সে। কামালও তার গতিপথ অনুসরণ করল দশ সেকেন্ড পরে।

বাজারের লোকজনের ভিড় এড়িয়ে হাঁটছে দুজনই। লোকটা কোথাও গিয়ে দুদণ্ড থামার সুযোগ পাচ্ছে না, কামাল আস্তে করে চলে আসছে দৃশ্যপটে।

এই তাড়াহুড়ার মধ্যেও পকেট থেকে ফোন বের করে তাতে কী যেন দেখতে শুরু করেছে কামাল। একবার তাকাচ্ছে ফোনের দিকে, আরেকবার লোকটার দিকে। স্ক্রিনের ওপর দ্রুত চলছে তার আঙুল।

একটু পরে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল তার মুখে। সন্তুষ্টির হাসি।

সন্দেহজনক লোকটা ততক্ষণে একটা গলির মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। হাঁপাচ্ছে অল্প অল্প। এখনো অবশ্য সরাসরি তাকাচ্ছে না কামালের দিকে। ফোনটা পকেটে রেখে তার দিকে এগিয়ে গেল কামাল।

‘এই যে ভাই, শুনুন,’ কাছে গিয়ে ডাকল কামাল।

আড়ষ্ট ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়াল লোকটা।

***

মায়ের দোয়া ক্লথ স্টোরে বসে বসে ঝিমাচ্ছিল ইদরিস মিয়া। হঠাৎ খেয়াল করল, কামাল ফিরে আসছে তার দোকানের দিকে। মুখে হাসি।

‘কামাল ভাই!’ ইদরিস মিয়ার কণ্ঠে দ্বিধা। ‘আবার আইলেন যে? কিছু ফেলি গেছেন নাকি?’

‘না ভাই,’ কামাল বলল। ‘একটা জিনিস শুনবার আসছি আপনার কাছে।’

‘অ্যাঁ...বলেন?’

‘এই দোকানের সব কাপড় আপনার তো?’

‘হে হে, দোকান যেহেতু আমার, কাপড়ও তো আমারই হবে। কেন ভাই?’

‘বলতিছি,’ কামাল বলল। ‘এর আগে কন, কাপড়টা তো আপনিই এইভাবে মেলি দিয়া রাখছেন দোকানের সামনে? এই ফুটকিওয়ালা বাটিকের কাজ করা কাপড়টা?’

এবারে গম্ভীর হয়ে উঠতে শুরু করেছে ইদরিসের চেহারা। ‘আপনি কী কইতে চাইতেছেন ভাই?’

‘কন না ভাই,’ নরম সুরে বলল কামাল, ‘কাপড়টা আপনিই থুইছেন কি না?’

‘হ্যাঁ, রাখছি। তাতে কী?’ ইদরিসের ভুরু কুঁচকে গেছে এবারে।

‘শেষ প্রশ্ন, ভাই। কাপড়টার রং কী?’

কামাল তাকিয়ে আছে কাপড়টার দিকে। তাতে লাল সাদা ফুটকি দিয়ে বেশ বড় একটা ডিজাইন করা। ইদরিস কোনো কথা খুঁজে পেল না যেন। কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে তার, আর সেটা কেবল গরমের জন্য নয়।

‘কাপড়ের রং আপনি দেখতে পারতেছেন না?’ অবশেষে বলল সে। এবারে রেগে গেছে সত্যি সত্যি। জলদগম্ভীর স্বর। কামালের এই উদ্ভট আচরণের কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছে না বেচারা।

‘আমি পারতেছি,’ শান্ত গলায় বলল কামাল। ‘কিন্তু আপনি পারতেছেন না। কারণ, আপনি চোখে কোনো রং দেখতে পারেন না। আরও ভালো করি বললে, আপনি বর্ণান্ধ। কালার-ব্লাইন্ড। শব্দটা আমার এক ডাক্তার বন্ধুর থাকি শিখছি।’

ইদরিস মিয়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কামাল যোগ করল, ‘কীভাবে বুঝছি? আপনার পাশের দোকানটার রং বলার সময় আপনি ভুল করছিলেন। সাইনবোর্ডের রং লাল, আপনি বলছেন সবুজ। দুইটা উল্টা রং। এত বড় ভুল সে-ই করতে পারে, যে আসলে কালার–ব্লাইন্ড।’

‘আমি কালার–ব্লাইন্ড হইতে পারি ভাই, তাতে কী আসে–যায়?’ ঠান্ডা গলায় বলল ইদরিস।

‘কিছু আসত–যাইত না ভাই, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আপনার কাজ। আপনি রং দেখতে পান না, কিন্তু করেন রঙিন ছিট কাপড়ের ব্যবসা। তাও মানলাম। কিন্তু আপনার দোকানের আশপাশে কিছু সন্দেহজনক কাজকর্ম দেখা গেছে। কিছু দেখছে পুলিশের সাদাপোশাকের লোক, কিছু দেখছি আমি।’ কামাল খানিকটা ফ্যাকাশে হেসে বলল।

আরও পড়ুন
‘এখন কথা হচ্ছে, আপনি সংকেতটা দেন কীভাবে? থানায় অনেকে অনেক চিন্তা করছে। বের করতে পারে নাই। কিন্তু আমি প্রথম দিন আপনার দোকানটার ওপর চোখ রাখতে আসিয়াই একটা জিনিস দেখলাম। সন্দেহ হইল।

‘আপনি তো আজব লোক ভাই!’ তাজ্জব হয়ে গেছে যেন ইদরিস মিয়া। ‘কইলাম তো, আমার পাশের দোকানে কোনো সন্দেহজনক জিনিস হইতেছে। ওই যে একটা লোক আসে, মোচ আর খাটো চিপওয়ালা, তার সাথে ওই সবুজ সাইনবোর্ডওয়ালা মিলিয়া...’

‘সবুজ না, লাল সাইনবোর্ড।’ ভুল শুধরে দিল কামাল। ‘ওই দোকানদারের কোনো দোষ নাই। ওই সন্দেহজনক লোকটারও না।’

‘আপনি কেমনে বুঝলেন?’ তেড়িয়া হয়ে বলল ইদরিস মিয়া। প্রতি মুহূর্তে আরও রেগে যাচ্ছে সে, আরও বেশি বিভ্রান্তি ভর করছে তার চেহারায়।

‘কারণ ওই লোকটাক্ নিয়া আসছি আমি।’ কামালের কথা বলারই অপেক্ষা কেবল, দোকানের সামনে উদয় হলো একটা লোক। সেই সন্দেহভাজন, যাকে একটু আগে অনুসরণ করছিল কামাল!

‘আপনারা...আপনারা সবাই মিলিয়া আমার সাথে ষড়যন্ত্র করতেছেন!’ ইদরিস মিয়া আতঙ্কমাখা গলায় বলল। ‘মানুষ বলে...এভাবে মানুষের বাড়ি বা দোকানত্ নেশার জিনিস রাখিয়া গ্রেপ্তার করে পুলিশ, আপনারা সেটাই করতেছেন। কামাল ভাই, আপনাক্ ভালো ভাবছিলাম...’

‘ওই কথা তো আমিও কইতে পারি, ইদরিস ভাই। আমি ভাবছিলাম আপনি সৎ ব্যবসায়ী, আসলে আপনি ড্রাগস চোরাচালানকারীর সহযোগী। আপনার দোকানের আশপাশে ঘুরি বেড়ায় তারা। আর সেটা খুঁজি বের করছেন এই ভাই।’

‘এএসআই সানোয়ার, কীর্তিমারী সদর থানা,’ নিজের পরিচয় দিল লোকটা। বলতেই যা দেরি, ঝেড়ে দৌড় মারল হৃদয়। চিতার ক্ষিপ্রতায় খপ করে তার শার্ট ধরে মাঝপথে আটকে ফেলল ঝানু পুলিশ সদস্য সানোয়ার।

‘নবাবগঞ্জ বাজারের ওপর চোখ রাখতে গিয়া একদিন সন্দেহ হয় ওনার,’ যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে বলল কামাল। ‘কিছু লোক আপনার দোকানের সামনে আসে, আস্তে করে ছবি তুলি নিয়ে চলি যায়। কেন? যারা ছবি তোলে তারা সবাই চিহ্নিত ড্রাগস ব্যবসায়ী বা তাদের চ্যালা। তারা আপনার সাথে সামনাসামনি কথা কয় না, আপনার ফোন রেকর্ড চেক করিয়া দেখা গেছে তারা ফোনও দেয় না। তাইলে আপনার সাথে এদের যোগাযোগটা কী?’

অবস্থা বেগতিক বুঝে মুখ কালো করে চুপ হয়ে আছে ইদরিস মিয়া।

‘সানোয়ার ভাইয়ের থাকিয়া জিনিসটা শুনি আমি। তারপর নিজে আসিয়া জিনিসটা দেখার সিদ্ধান্ত নিই। দুই দিন সামনাসামনি চোখ রাখি আড়াল থাকিয়া, বুঝি যে কী হইতেছে। তারপর আপনার সামনে আসলাম, আপনার বানানো কথাগুলা শুনলাম। দুইটা নিরপরাধ লোককে ফাঁসানোর চেষ্টা করলেন আপনি।’

‘আপনি প্রমাণ ছাড়া কথা কইতেছেন কামাল ভাই।’ আঙুল উঁচিয়ে বলল ইদরিস। ‘আপনি কইতে চাইতেছেন আমি ড্রাগস ব্যবসায়ীদের সাহায্য করি। আপনাক্ প্রমাণ দেওয়া লাগবে আমি কেমন করিয়া সেইটা করি, নাইলে আপনার নামে আমি মানহানির মামলা করব।’

‘শুধু সাহায্য না, আপনি তাদের তথ্য দেন। ড্রাগস মজুতের ব্যবস্থা করে দেন। কত চালান, কবে আসবে, কোন গোডাউনে রাখবেন, সেগুলা সংকেতের মাধ্যমে তাদেরকে জানান। মাদক ব্যবসায়ীরা সেটা দেখি যায়। তারপর সেইমতো কাজ করে। তাদের সাথে আপনার সরাসরি কথা হয় না, তাই আপনাক্ এত দিন সন্দেহ করে নাই কেউ।

‘এখন কথা হচ্ছে, আপনি সংকেতটা দেন কীভাবে? থানায় অনেকে অনেক চিন্তা করছে। বের করতে পারে নাই। কিন্তু আমি প্রথম দিন আপনার দোকানটার ওপর চোখ রাখতে আসিয়াই একটা জিনিস দেখলাম। সন্দেহ হইল। তারপর আমার এক ডাক্তার বন্ধুর সাথে কথা বললাম, কীর্তিমারী মেডিকেল কলেজের। তারপর বাকিটা পানির মতো সহজ। আজকে কেবল আসছি আপনাকে হাতেনাতে ধরতে।’

‘আমার দোকানে কিছু নাই! কোনো মাদক না, কিছু না! আপনি হাতেনাতে ধরবেন মানে?’ বলে উঠল ইদরিস মিয়া। দোকানের চারপাশে উৎসুক জনতার ভিড় জমে উঠছে ততক্ষণে। সমর্থনের আশায় তাদের দিকে তাকাল সে।

‘আছে আছে, আর সেটাই এখন দেখাবে কামাল।’ ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আসতে আসতে বলল ইন্সপেক্টর রইস। কখন যেন উদয় হয়েছে সে-ও।

‘মনে আছে, বারবার আপনাক্ জিজ্ঞাসা করতেছিলাম, দোকানের বাইরে রংচঙা কাপড়গুলা আপনিই টাঙাইছিলেন কি না?’ ফোন বের করে কী যেন টিপতে টিপতে বলল কামাল।

‘হ-হ্যাঁ,’ বলল ইদরিস। হঠাৎ করে আত্মবিশ্বাস কমে গেছে তার।

‘আপনার পাশের দোকানের ছবি তোলার ভান করছি তখন আমি। আসলে আপনার দোকানেরই ছবি তুলতেছিলাম,’ কামাল বলল। ফোনের স্ক্রিন দেখাল সে। দোকানের সামনের দিকে টাঙানো একটা ফুটকিওয়ালা বাটিকের ডিজাইনের কাপড়ের ছবি তুলেছে সে জুম করে।

‘আমি জিনিসটা আন্দাজ করছিলাম, আমার ডাক্তার বন্ধু আনিস বাকিটা পরিষ্কার করি দেন। আপনি কালার–ব্লাইন্ড। রং চোখে দেখেন না। এই রোগটা ধরার একটা পরীক্ষা আছে।’ ফোনের স্ক্রিন দেখাল সে সবাইকে। একটা অদ্ভুত জিনিস দেখা যাচ্ছে সেখানে। গোল করে সাজানো অনেকগুলো রঙিন ফুটকি। ইদরিসের মুখের সামনে তুলে ধরল সে ফোনটা। ‘কী দেখতেছেন?’

‘কী আর, উল্টাপাল্টা কয়েকটা রং!’ ঝাঁঝের সঙ্গে বলল ইদরিস। ‘এসব আবার কী রকমের ফাইজলামি?’

জবাব না দিয়ে আটক হৃদয়ের কাছে এগিয়ে গেল কামাল। ‘বল তো বাবা, কী দেখতিছিস?’

বিহ্বল হৃদয়ের মুখে কোনো কথা ফুটল না প্রথমে। তারপর ভালো করে ছবিটার দিকে তাকাল সে। ‘কিছু না, হাবিজাবি রং...দাঁড়ান দাঁড়ান,’ অবাক কণ্ঠে বলল সে, ‘ভালোমতো দেখলে রংগুলার ভেতরে কিছু একটা লেখা আছে দেখা যাইতেছে। একটা ইংরেজি ৭।’

‘এটার নাম ইশিহারা টেস্ট,’ সবার দিকে তাকিয়ে বলল কামাল। ‘একজন জাপানি ডাক্তারের নামে নাম। চট করিয়া বর্ণান্ধতা ধরা যায় এটার মাধ্যমে। আবার দেখেন,’ আবার ফোনে কী যেন টিপল সে দ্রুত, ‘উল্টা একটা টেস্টও আছে। রিভার্স ইশিহারা টেস্ট।’ ফোনে এবার আগের মতোই রঙের ফুটকি, কিন্তু খুব ভালো করে দেখেও কোনো সংখ্যা বা অক্ষর বের করতে পারল না কেউ।

কেবল ইদরিস গম্ভীর গলায় বলল, ‘একটা ৩ লেখা।’

‘এইটা শুধু কালার–ব্লাইন্ডরাই দেখতে পায়,’ বলল কামাল। ‘ঠিক ওই টাঙানো কাপড়টার মতো। ওটার ডিজাইনটা ইদরিস ভাই-ই বানাইছেন নিজে। দেখেন, আমার ফোনে কাপড়ের ছবিটা। কোনো কিছু বোঝা যাচ্ছে না, তাই না? এবার ছবিটা সাদাকালো করতেছি।’ ছবিটার ওপর একটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফিল্টার দিল কামাল।

কী আশ্চর্য! সঙ্গে সঙ্গে যেন লাফ দিয়ে ফুটে বেরোলো একটা লেখা, ‘১১টা। H# 32/5, M PARA’

সবাই হাঁ হয়ে গেছে। কামাল লাজুকের মতো হেসে বলল, ‘মুন্সিপাড়ার ৩২/৫ নম্বর বাড়িতে রাইত ১১টায় যাইতে কইছে। ওনার চ্যালারা আসিয়া ছবি তুলি নিয়া যাইত। ছবি ফিল্টার করিয়া লেখাটা বাইর করত। ইদরিস মিয়ার সাথে কথা না কয়াও এভাবে বুঝত, ড্রাগস কই মজুত করা লাগবে।’

ইদরিস মিয়াকে হাতকড়া পরানো হচ্ছে তখন। উপস্থিত এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বললেন, ‘সবই বুঝলাম। কিন্তু ইদরিস মিয়ার মাথায় এত সূক্ষ্ম বুদ্ধি এল কীভাবে? সাধারণ এক কাপড় ব্যবসায়ী এত কিছু জানে?’

‘ঠিক বলেছেন, সাধারণ কারও এত কিছু জানার কথা না। কিন্তু সে তো সাধারণ কেউ না, সে এই মাদক চক্রের মাথা—কিংবদন্তি ডার্ক ব্যাট। বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি আছে তার। এত বছর পালিয়ে থাকার পর আজকে ধরা পড়ল কামালের বুদ্ধিতে!’

আরও পড়ুন