ডিউক জনের গল্প—কে

অলংকরণ: তনি সুভংকর

আরও আগে আসা উচিত ছিল ওর, ভাবল নিঝুম। জ্যাকেটের পকেট থেকে হাত বের করে ঘষতে লাগল একসঙ্গে।

গোটা এলাকাটিকে গিলে নিয়েছে রাত। পরিত্যক্ত পাঁচতলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি জীবন্মৃতের মতো দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধারে, বয়স আর রোদবৃষ্টি ছোপ ছোপ দাগ ফেলেছে কংক্রিটের গায়ে। রাস্তা থেকে অন্ধকার গহ্বর বলে মনে হয় পাঁচতলার জানালাগুলো।

ওটার উল্টো দিকের দালানটির দিকে তাকাল এবার নিঝুম। ‘জে কে অ্যাসোসিয়েটস, লিগ্যাল কনসাল্ট্যান্টস’ নামটি এখনো হৃতগৌরবের সঙ্গে ঝুলে আছে রংচটা সাইনবোর্ডে। চট্টগ্রাম শহরের পুরোনো এলাকায় গাদাগাদি করে থাকা আর দশটি দোকান-অফিসের মতোই কোনোমতে টিকে আছে চেম্বারটি। আর এখানেই সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করে ওর বান্ধবী লামিয়া।

পরিত্যক্ত ভবনটির দিকে দৃষ্টি দিল আবার নিঝুম।

সামনের প্রবেশপথটি প্লাইউড আর মরচে ধরা টিন দিয়ে আটকে রাখা, কিন্তু কোনো বাধা নয় এটি। খান কয়েক জোরালো লাথিতেই ঠাস করে ফেটে গেল কাঠ। ধ্বংসের এই আওয়াজ আর অনুভূতি রীতিমতো তৃপ্তি দিল নিঝুমকে।

আরও পড়ুন

কয়েক হপ্তা ধরেই বিষয়টি নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করে চলেছে লামিয়া। অফিসের জানালা দিয়ে কী দেখছে মেয়েটি, সেই কাহিনি কপচাতে কপচাতে কান একেবারে ঝালাপালা করে দিচ্ছে নিঝুমের। সেই ক্ষোভই সে মেটাল অস্থায়ী দরজাটির ওপর।

ভেতরে পা দিতেই ধুলোর মেঘ সৃষ্টি হলো বাতাসে। সর্বত্র মাকড়সার জাল ঝুলে আছে পর্দার মতো। অন্ধকারে কোথাও একটা খসখস শব্দ। ইঁদুরই হবে! হাতের পিঠ দিয়ে নাক মুছে নিঝুম চারপাশে তাকাল।

পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ফাঁকা পড়ে আছে বাড়িটি। মেরামত করার চেয়ে নতুন করে তৈরি করাই সস্তা হবে বলে ধারণা লামিয়ার। কিন্তু কোনো ডেভেলপার বোধ হয় আগ্রহ দেখায়নি। এ শহরে ফ্ল্যাট বেশি, ক্রেতা কম বলেই হয়তো। সে জন্যই হয়তো একপর্যায়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে ভবনটির মালিক, ফেলে রেখেছে এভাবেই।

ভাঙা টাইলস, কাচের টুকরোটাকরা আর ঝুরঝুরে প্লাস্টার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সিঁড়িময়। প্রতিটি পদক্ষেপেই মশমশ শব্দ হচ্ছে স্যান্ডেলের নিচে। প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে পায়ের আওয়াজ, যেন সংগত করছে ভারী শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে।

সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচায় ধাক্কা মারছে বলে মনে হলো নিঝুমের। তলা গুনতে গুনতে মনে মনে আওড়াতে লাগল ও লামিয়ার কথাগুলো।

‘আমার টেবিলের একদম সামনেই জানালাটা। সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকে লোকটা, তাকিয়ে থাকে আমার দিকে!’

আজকের পর আর থাকবে না।

আরও পড়ুন

মুঠো শক্ত করল নিঝুম। লোকটি কে বা কী, তাতে কিচ্ছু এসে যায় না ওর। উপযুক্ত শিক্ষা দেবে সে ব্যাটাকে। ভয় দেখিয়ে যদি কাজ না হয়, তো অন্য ব্যবস্থা দেখতে হবে তখন।

পঞ্চম তলায় উঠে লম্বা একটা করিডরে এসে পড়ল নিঝুম। অর্ধেক রুমেরই দরজা নেই এখানে। গা গুলিয়ে উঠছে প্রস্রাবের দুর্গন্ধ আর বোঁটকা, পচা গন্ধে।

কোনার দিকেই হবে নির্দিষ্ট জায়গাটি। ওখান থেকেই লামিয়ার জানালাটা দেখা যায় সরাসরি।

নাক টানল নিঝুম। এরপর আবার হাঁটতে শুরু করল কামরাগুলোয় নজর বোলাতে বোলাতে।

কোনো কোনো কামরায় দু–একটি আসবাব রয়েছে এখনো, স্যাঁতসেঁতে হয়ে ফুলে গেছে সেগুলো, ঝাঁঝরা করে দিয়েছে পোকায় খেয়ে। ফ্লোরজুড়ে ইঁদুরের বিষ্ঠা। একটা ঘরে পাওয়া গেল মনুষ্যবাসের চিহ্ন—প্লাস্টিকের মগ আর ম্যাট্রেস। ধুলোময়লার পরিমাণ বলছে, ইদানীংকার ঘটনা নয় এটি।

শেষের আগের রুমটায় এসে থমকে গেল নিঝুম।

একা নয় সে!

দীর্ঘ, একহারা একটি অবয়ব দাঁড়িয়ে জানালার সামনে। স্ট্রিটলাইটের আলোর বিপরীতে ছায়ামূর্তি হয়ে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। স্থির একদম।

ধড়াস করে উঠল নিঝুমের বুকটা। ফুসফুস ভরল ও গভীর শ্বাস নিয়ে। এমনভাবে দুই হাত রাখল দরজার ফ্রেমে, বেরোনোর রাস্তা আটকে দিচ্ছে যেন।

‘অ্যাই মিয়া!’ চেঁচিয়ে উঠল রাতের নীরবতা ভেঙে।

উত্তর নেই।

একটুও নড়ল না মূর্তিটি। শ্বাস নিচ্ছে বলেও তো মনে হচ্ছে না!

এই অস্বাভাবিক স্থবিরতা অস্বস্তি সৃষ্টি করল নিঝুমের পাকস্থলীতে। কিছুক্ষণ লক্ষ করার পর সন্তর্পণে পা রাখল সে ঘরের ভেতর।

…অপেক্ষা করল।

…এগোল আরেকটু।

আর তাতেই পরিষ্কার হয়ে গেল সবকিছু।

আরও পড়ুন

স্নায়ুর ওপর থেকে চাপ সরে যেতেই ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল নিঝুম। নীরব রাত্রিতে বিজাতীয় শোনাল হাসির প্রতিধ্বনি।

মানুষ নয়, ম্যানিকিন ওটা!

ঠান্ডা প্লাস্টিক স্পর্শ করল কাছে গিয়ে। এ জিনিস এখানে কেন? কী কাজ হতো আগে এই জায়গায়?

‘শাআলা!’ বলল সে কপট রাগের সঙ্গে, ‘তুই-ই তাহলে এত দিন উত্ত্যক্ত করছিলি আমার বান্ধবীকে?’

সেলফোনে ছবি তুলে পাঠিয়ে দিল লামিয়াকে। মেসেজে লিখল:

তোমার জানালার উল্টো দিকের ‘লোক’টাকে পাকড়াও করেছি। আস্ত এক ডামি ওটা।

মুচকি হেসে ফিরল এবার জানালার দিকে। রাস্তার ওপারের অফিসের নামটা স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে না বটে, তবে বান্ধবীর টেবিলে রাখা ছোট ক্যাকটাসটা চোখে পড়ছে নিঝুমের। ভাবল, কেউ হয়তো মজা করে রেখে গেছে প্লাস্টিকের পুতুলটা। নাকি অন্য সব বাতিল জিনিসের মতো এটিও এভাবে পড়ে আছে এখানে?

রিপ্লাই মেসেজ আসায় কেঁপে উঠল ফোনটা।

‘সর্বনাশ! গেছ নাকি ওখানে?’

উত্তর দেওয়ার আগেই মেসেজ এল আরেকটা।

‘জায়গাটা নিরাপদ নয়।’

এবং তারপর এল—

‘ডামিও না ওটা। একভাবে দাঁড়িয়ে থাকে না সব সময়। মাঝেমধ্যে হাঁটেও।’

ভুরু কুঁচকে গেল নিঝুমের।

আর তক্ষুনি একটা হাত এসে পড়ল ওর কাঁধে!

আরও পড়ুন