আমি অনির্বাণ সান্যাল। মেডিসিনের ডাক্তার। দেশের বাড়ি বরিশাল। ওখানকার শের–ই–বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করে বছর কয়েক ওখানেই ডাক্তারি করেছি। তারপর সুযোগ পেয়ে চলে এসেছি লন্ডনে। অনেক দিন হলো লন্ডনে আছি। এখনো বিয়েথা করিনি। এখানে প্র্যাকটিস বেশ ভালো জমে গেছে। তবে কাজের বাইরে আমার সবচেয়ে আগ্রহ অপরাধ ও অপরাধীদের ব্যাপারে। তাই বলে আমি কিন্তু গোয়েন্দা নই। অবশ্য মাঝেমধ্যে দু–একটা ক্রিমিনাল কেস এমনভাবে সমাধান করে দিই, চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় পুলিশের। আসলে এটা সম্ভব হয় ড. থর্নডাইকের সাহায্যে। আমি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনিও মেডিসিনের ডাক্তার। তবে গোয়েন্দা হিসেবেও বিখ্যাত। বিজ্ঞানেও অগাধ জ্ঞান তাঁর। মেডিসিন ও বিজ্ঞান দুটি বিষয়ই ভালো জানেন বলে অপরাধ তদন্ত করা সহজ হয়ে ওঠে তাঁর পক্ষে। বিজ্ঞানের সাহায্যে অপরাধীদের শনাক্ত করার দক্ষতা তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে। ড. থর্নডাইকের বন্ধু হিসেবে প্রায়ই তাঁর সঙ্গে নানা তদন্তে থাকার সুযোগ পাই আমি। এমন একজন মানুষের বন্ধু হতে পেরে আমি গর্বিত। গর্ব অনুভব করি তাঁর অসাধাণ প্রতিভার কথা ভেবে। ড. থর্নডাইক কীভাবে বুদ্ধি খাটিয়ে ক্যামডেন কিলারকে ধরে ফেললেন, আজ সে গল্পই শোনাব।
ক্যামডেন কিলারের আসল নাম কেউ জানে না। নৃশংস এই খুনি ছয় মাসে চারটি খুন করেছে। প্রথম খুনটা করেছে ক্যামডেনে। তারপরই তার নাম হয়ে গেছে ক্যামডেন কিলার। সর্বশেষ খুনটা ঘটিয়েছে ব্লুমসবারিতে। এরপর তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন আদালত।
থর্নডাইক আর আমি একদিন ব্লুমসবারির রাস্তায় হাঁটছি। ‘লন্ডনের এই অংশটা আমার একসময় কত প্রিয় ছিল!’ বললেন থর্নডাইক। ‘ছাত্রাবস্থায় এদিকে থাকতাম আমি। বিভিন্ন দেশের মানুষজনের বাস ছিল ব্লুমসবারিতে। কেউ ভাড়া থাকত, কারও নিজের বাড়ি ছিল। কত বিচিত্র লোকজন! ভারতীয়, আফ্রিকান, জাপানি। তবে বেশির ভাগ ছিল ভারতীয়।’
ঠিক তখন দেখলাম এক ভারতীয় ছুটে আসছে আমাদের দিকে। লোকটা সুবেশী, তবে মাথায় হ্যাট নেই। ছুটতে ছুটতে মাঝেমধ্যে থেমে পড়ল সে, উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে নেমপ্লেটগুলো দেখছে। আমাদের সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘এদিকে ডাক্তার কোথায় পাব জানেন?’
‘আমি একজন ডাক্তার।’ বললেন থর্নডাইক।
‘ওহ্, প্লিজ আমার সঙ্গে আসুন। আমার ভাই...মারা যাচ্ছে বেচারা!’
পাশের গলিতে লোকটার বাড়ি। যেতে যেতে নিজের কথা বলল সে। তবে ঠিকমতো কথা বলতে পারছিল না, জড়িয়ে যাচ্ছিল কথা। কাঁপছিল। খুব শক পেয়েছে বোঝা যায়।
‘আমি বৈরামজি,’ জানাল লোকটা। ‘ভাইয়ের বাসায় ঢুকে দেখি, সিটিং রুমের মেঝের ওপর পড়ে আছে সে। হাঁপাচ্ছে। যেন শ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। নাম ধরে ডাকলাম। জবাব দিল না। তাড়াতাড়ি চলুন, প্লিজ।’
বেচারার বোধ হয় হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, ভাবলাম আমি। হয়তো গিয়ে দেখব টেঁসে গেছে।
লোকটাকে দেখে মনে হলো, যা ধারণা করেছিলাম, তা–ই ঘটেছে। শুয়ে আছে। মুখ হাঁ করে শ্বাস করছে। চোখ খোলা। বুকের ওপর মাথা রাখলাম হার্টবিট পরীক্ষা করার জন্য। খুবই ক্ষীণ হার্টবিট, ক্ষীণতর হয়ে আসছে প্রতি সেকেন্ডে। তারপর এক সময় থেমে গেল। সিধা হলাম আমি।
‘মরে গেছে,’ বললাম আমি। ‘হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।’
‘না,’ বললেন থর্নডাইক। ঝুঁকে লোকটার ডান কানে হাত বোলালেন, তারপর মেলে দেখলেন। আঙুলগুলো রক্তাক্ত। লাশটার মাথায় আলতো ভঙ্গিতে হাত বোলালেন তিনি।
‘মাথায় শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে,’ বললেন থর্নডাইক। ‘খুন হয়েছেন উনি।’
শুনে খুবই অবাক হলাম। বৈরামজিকে মনে হলো অজ্ঞান হয়ে যাবে। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে থর্নডাইকের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেল সে।
‘আপনি বাড়িতে ঢোকার সময় আর কেউ ছিল এখানে?’ জিজ্ঞেস করলেন থর্নডাইক।
‘কেউ ছিল না। শুধু বাড়িওয়ালি নিচতলায় তার ফ্ল্যাটে ছিল। টিভি দেখছিল সম্ভবত। ওপরে আসার সময় টিভির শব্দ পেয়েছি।’
‘ওনাকে একটু আসতে বলুন।’
কিন্তু বাড়িওয়ালি কোনো তথ্য দিতে পারলেন না। তিনি তাঁর ছোট ছেলেকে নিয়ে টিভিতে খেলা দেখছিলেন। তিনি কিছু শোনেননি।
‘আপনার ভাইয়ের সঙ্গে কারও দেখা করার কথা ছিল আজ বিকেলে?’
‘হ্যাঁ, এক ক্রেতার আসার কথা ছিল একটা রুবি নিয়ে দরদাম করার জন্য। আমার ভাই রুবি বিক্রি করার কথা বলেছিল।’
‘ক্রেতাটা কে?’
‘দুঃখিত। জানি না আমি। তার কথা বলেনি আমার ভাই।’
‘রুবির ব্যাপারটা কী?’
‘বার্মা থেকে রুবিটা নিয়ে এসেছিল আমার ভাই। অত বড় পাথর জীবনে দেখিনি আমি। অনেক দাম। দেখেই বুঝতে পেরেছি। ঘাড়ের সঙ্গে ঝোলানো চামড়ার একটা থলেতে রুবিটা সব সময় রাখত আমার ভাই।’ লাশ পরীক্ষা করে দেখল সে। ‘ওটা নেই!’ চেঁচিয়ে উঠল সে। ‘রুবিটা নেই!’
আমরা খুঁজতে শুরু করলাম। লাশের কাছ থেকে কিছু দূরে, মেঝের ওপর পেয়ে গেলাম থলেটা। তবে খালি ওটা। টেবিলের ওপর দেখলাম একটা হ্যাট।
‘কার হ্যাট ওটা?’ জিজ্ঞেস করল বৈরামজি।
‘আপনার ভাইয়ের না?’
হ্যাটটা হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখল সে। বলল, ‘ভাইয়ের হ্যাটের সঙ্গে অনেক মিল আছে। তবে এটা তার নয়। কারণ, তার হ্যাট আর আমার হ্যাট একই রকম। ভাইয়ের হ্যাটে সাদা সিল্কের লাইনিং ছিল, চুড়োয় ছিল একটা লেদার ব্যান্ড। তাতে সোনালি অক্ষরে নামের আদ্যক্ষর দুটো খোদাই করা। কিন্তু এ হ্যাটে সিল্কের কোনো লাইনিং নেই, নেই আদ্যক্ষর। এটা আমার ভাইয়ের হ্যাট নয়।’
বৈরামজি একটা ব্রাশ নিয়ে এল। থর্নডাইক একটা খবরের কাগজের ওপর হ্যাটটা রেখে ব্রাশ দিয়ে ওটা ঝাড়লেন। কাগজে বেশ ধুলা পড়ল।
‘তাহলে হ্যাটটি নিশ্চয়ই খুনেটার,’ মন্তব্য করলাম আমি। থর্নডাইক লাশের মাথায় হ্যাটটা পরিয়ে দিলেন। ওটা ঠিকঠাকমতো বসে গেল।
‘হা!’ বলে উঠলেন তিনি। ‘কী ঘটেছে বুঝতে পারছি আমি। যে লোক আপনার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, সে নিজের হ্যাটটা টেবিলে, আপনার ভাইয়ের হ্যাটের পাশে রেখে দেয়। তারপর দুজন বসে রুবি নিয়ে আলোচনা শুরু করে। আলোচনা মোড় নেয় ঝগড়ায়, তারপর শুরু হয়ে যায় হাতাহাতি। মারামারির সময় দর্শনার্থীর হ্যাটটা ছিটকে পড়ে যায় টেবিল থেকে। লড়াইটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি, কারণ লোকটা অস্ত্র হাতে তৈরি হয়েই এসেছিল, এটা নিশ্চিত। তারপর আপনার ভাই যখন মেঝেতে শুয়ে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তখন খুনিটা রুবি নিয়ে চম্পট দিয়েছে। তাড়াহুড়াতে সে টেবিলের ওপর যে হ্যাটটা পেয়েছে, ওটাই নিয়ে গেছে। অবশ্য সন্দেহের অবকাশও ছিল না। কারণ, হ্যাটটা তার মাথায় ঠিকঠাক বসে গিয়েছিল।’
থর্নডাইক হ্যাটটা উল্টেপাল্টে দেখলেন। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘অনির্বাণ, বাড়িওয়ালির ছেলেটাকে পুলিশ ডাকতে পাঠিয়ে দাও। এই ফাঁকে হ্যাটটা ভালোমতো একবার পরীক্ষা করে দেখি। মন বলছে, এটা থেকেই গুরুত্বপূর্ণ কোনো সূত্র পেয়ে যাব। মি. বৈরামজি, ছোট, শক্ত ব্রাশ দিতে পারবেন?’
বৈরামজি একটা ব্রাশ নিয়ে এল। থর্নডাইক একটা খবরের কাগজের ওপর হ্যাটটা রেখে ব্রাশ দিয়ে ওটা ঝাড়লেন। কাগজে বেশ ধুলা পড়ল। জিনিসটা একটা খামে পুরে ওপরে লিখলেন, ‘হ্যাটের বাইরে থেকে পাওয়া জিনিস।’
তারপর হ্যাটের ভেতরটা পরীক্ষা করলেন। লেদার ব্যান্ডের নিচে কতগুলো কাগজের টুকরা পাওয়া গেল, হ্যাটটা টাইটভাবে মাথায় বসানোর জন্য ওগুলো ঢোকানো হয়েছে। বেশির ভাগ খবরের কাগজ থেকে টুকরা করা। থর্নডাইক মনোযাগ দিয়ে টুকরাগুলো দেখলেন। একটি কাগজে গ্যাস হিটার আর ফার্নেসের দামের তালিকা, আরেকটিতে একটি লিস্টের অংশবিশেষ, ওজন লেখা আছে আউন্স আর পেনিওয়েটের। জুয়েলাররা দামি ধাতব, বিশেষ করে সোনা মাপার কাজে এই ওজন ব্যবহার করে। একটা খামের ছেঁড়া অংশও পাওয়া গেল, ঠিকানাসহ। তবে লেখাটা দুর্বোধ্য, পড়া যায় না।
কিছুক্ষণ পরে, থর্নডাইক জিনিসগুলো সাবধানে আবার হ্যাটের মধ্যে রেখে দিলেন।
এমন সময় দরজায় সজোরে কড়া নাড়ল কেউ। ভেতরে ঢুকল এক পুলিশ অফিসার, পিছু পিছু বাড়িওয়ালি এবং তাঁর ছেলে।
বৈরামজি আমাদেরকে যা বলেছে, তা–ই পুনরাবৃত্তি করল পুলিশকে। ব্যাপারটা কীভাবে ঘটেছে, ব্যাখ্যা করলাম আমরা পুলিশের কাছে। তারপর নিজেদের নাম–ঠিকানা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
‘তেমন কিছু ক্লু মিলেছে কি?’ হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করলাম থর্নডাইককে।
চিন্তিত দেখাল তাঁকে। ‘গত ছয় মাসে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে মোট তিনটি। সব কটি অপকর্ম হয়তো একজনই ঘটিয়েছে, পুলিশ যার নাম দিয়েছে “ক্যামডেন কিলার”। পুলিশের কাছে ক্লু থাকার কথা, অন্তত ফিঙ্গারপ্রিন্ট তো থাকবেই। ওটাই আমার দরকার। অবশ্য আমরা যে হ্যাটটা খুঁজছি, সেটাও ওদের অনেক সাহায্য করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।’
‘কীভাবে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘ওই হ্যাট দিয়ে লোকটার মাথার সাইজ জানা যাবে বড়জোর। তাতে কি খুব বেশি কাজ হবে? লাখ লাখ মানুষ ওই সাইজের হ্যাট পরে। হ্যাটটা কি কাজে আসবে?’
‘হ্যাটের ভেতরের জিনিসগুলোর কথা ভুলে যেয়ো না,’ বললেন থর্নডাইক। তারপর চুপ মেরে গেলেন। আমি তাঁকে আর বিরক্ত করলাম না। চলে এলাম বাড়িতে। নিজেরও অনেক কাজ পড়ে আছে।
কাজটাজ সেরে চললাম থর্নডাইকের বাড়িতে, কী করছেন দেখতে। খুব দ্রুত কাজ করেন তিনি। আর খুনখারাবির ক্ষেত্রে দেখেছি কেসের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নেন না। তাঁর স্টাডি কাম ল্যাবরেটরিতে ঢুকে দেখি, তিনি মাইক্রোস্কোপে একটা গ্লাস টেস্টটিউব পরীক্ষা করছেন। টিউবটা নোংরা, ময়লা একটা তরলে বোঝাই। টেবিলে বইয়ের স্তূপ। বেশ কিছু পোস্ট অফিস ডিরেক্টরি চোখে পড়ল। লন্ডনের সব ব্যবসায়ীর নাম–ঠিকানা আছে ওতে।
‘হ্যাটের ধুলো পরীক্ষা করেছেন?’ জানতে চাইলাম। থর্নডাইক আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও বয়সে বড় বলে তাঁকে ‘আপনি’ সম্বোধন করি। ‘কিছু পেলেন?’
‘তেমন কিছু নয়। বোসো। কী পেয়েছি বলছি। হ্যাটে ভেতরের চুলগুলো হালকা বাদামি। টাক পড়া লোকের চুল। আর হ্যাটে বাইরের ধুলাতে পেয়েছি সিসা এবং ভস্ম—অস্থি ভস্ম, সম্ভবত।’
‘সিসা? লোকটা পেইন্টার?’
‘হতে পারে। তবে মনে হয় না পেইন্টার।’
হঠাৎ দরজায় জোরে কড়া নাড়ল কে যেন। ভেতরে ঢুকল লম্বা সুগঠিত শরীরের এক লোক। নাক ভাঙা, তবে সুদর্শনই বলা চলে তাঁকে। নিজের পরিচয় দিলেন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সুপারিনটেনডেন্ট মিলার বলে।
‘বৈরামজির কেসের ভার আমাকে দেওয়া হয়েছে,’ বললেন তিনি। ‘আমি কিছুদিন ক্যামডেন কিলারের কেসটা নিয়ে কাজ করেছি। আমাদের ধারণা বৈরামজির ভাইকে সে-ই খুন করেছে। আপনাদের কাছে এসেছি হ্যাট থেকে কোনো তথ্য পেলেন কি না জানতে—বৈরামজি বললেন আপনারাও এটা নিয়ে অনুসন্ধান করছেন। হ্যাটে ভিতর-বাহির সবই পরীক্ষা করে দেখেছি। কিন্তু কোনো ক্লু পাইনি। আপনারা কিছু পেয়েছেন কি না জানালে খুশি হব।’
‘কোনো তথ্য পেলে আপনাকে অবশ্যই জানাব।’ প্রতিশ্রুতি দিলেন থর্নডাইক। ‘আপনাদের কাছে ক্যামডেন কিলারের ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে?’
‘জি। দ্বিতীয় খুনের পর আঙুলের ছাপ জোগাড় করতে পেরেছি আমি। ফিঙ্গারপ্রিন্টটা সঙ্গেই আছে। এই যে’, আঙুলের ছাপের ফটোগ্রাফ দিল সে আমাদেরকে। ‘তবে ছবিগুলো তেমন কাজে আসবে বলে মনে হয় না,’ বলে চলল মিলার। ‘রেখাটেখাগুলো প্রায় চেনাই যায় না। হাতের তালুর দু–এক জায়গার চামড়া নেই। মনে হয় শক্ত ধাতব কিছু নিয়ে কাজ করতে গিয়ে লোকটা তালুর চামড়া খুইয়ে বসেছে।’
থর্নডাইক ফিঙ্গারপ্রিন্টে চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘ঠিকই বলেছেন আপনি। তবে ছাপগুলো অস্পষ্ট হলেও এতে আমার কাজ চলে যাবে।’
‘খুনটা কেন হলো বলতে পারবেন?’ জানতে চাইল পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট। ‘আপনার ধারণা সম্পর্কে জানতে চাইছি।’
‘এখনো নির্দিষ্ট কিছু বলা মুশকিল।’ জবাব দিলেন থর্নডাইক। ‘হতে পারে খুনি রুবির লোভেই খুন করেছে। তবে ভাবছি, ৫১, ক্লিফোর্ডস ইনের লোকজনের সঙ্গে কথা বলব কি না। ওখানকার কেউ হয়তো এ তদন্তের ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারবে। আপনি যদি আসতে চান...’
‘ওহ্, অবশ্যই যাব। কখন যাবেন?’
‘কাল তিনটার দিকে? সময় হবে?’
‘হবে। আমি তিনটার মধ্যে পৌঁছে যাব ওখানে।’
মিলার চলে যাওয়ার পর থর্নডাইক দুটি চিঠি লিখলেন। আমি বসে বসে ভাবতে লাগলাম, থর্নডাইক খামের ওপর ‘N’ অক্ষরটা দেখে ক্লিফোর্ডস ইনের কথা বললেন কেন? ক্লিফোর্ডস ইনের সঙ্গে খুনির কী সম্পর্ক? জায়গাটা ভালোই চিনি। ওটা সরাইখানা বা হোটেল নয়, পুরোনো একটা দালান। দালানে অসংখ্য অফিস, ফ্ল্যাট আর স্টুডিও। ক্লিফোর্ডস ইনের সাথে অপরাধের কী সম্পর্ক?
চিঠির ব্যাপারে থর্নডাইক আমাকে কিছু বললেন না দেখে আমিও কোনো প্রশ্ন করলাম না। লক্ষ করলাম, তিনি দুটি খামে মি. এফ আর ক্রেসন নামে এক মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার এবং মি. হাইলি নামে এক ধাতুবিদের ঠিকানা লিখলেন। ব্যাপারটা আমাকে আরও অবাক করে তুলল।
‘ব্যস,’ অবশেষে বললেন থর্নডাইক, ‘চিঠি দুটি পোস্ট অফিসে ফেলে ফেরার পথে ক্লিফোর্ডস ইনে একবার ঢুঁ মেরে আসব। যাবে নাকি আমার সঙ্গে?’
‘অবশ্যই যাব,’ বললাম আমি।
চিঠি ডাকে ফেলে আমরা চলে এলাম ৫১, ক্লিফোর্ডস ইন।
‘এখানেই সেই খুনিটা থাকে?’ জিজ্ঞেস করলাম থর্নডাইককে।
‘ঠিক বলতে পারব না, হয়তো,’ বললেন তিনি।
মেইন এনট্রান্সে একটা নোটিশ ঝোলানো: ঘর এবং অফিস ভাড়া দেওয়া হবে।
থর্নডাইক ভেতরে ঢুকে বোর্ডে টাঙানো ভাড়াটেদের তালিকার ওপর চোখ বোলাতে লাগলেন। নিচতলায় নাম দেখলাম, ‘বার্টন অ্যান্ড ফিল্ডিং, হাই-ক্লাস ফটোগ্রাফার’। এক তলায় ‘এফ আর ক্যারিংটন’-এর নাম লেখা সাদা অক্ষরে। বোঝা যায়, সদ্য লেখা হয়েছে।
‘এ লোক বেশি দিন হয়নি এখানে উঠেছে,’ বললেন থর্নডাইক। ‘দ্যাখো, কালিটা ঝকঝক করছে।’ দোতলার ভাড়াটের নাম ‘বার্ট অ্যান্ড হাইলি, ধাতুবিদ’। এ নাম দুটির অক্ষরগুলো ফ্যাকাশে, প্রায় চল্টা ওঠা। ‘বার্ট’ নামটির নিচে একজোড়া লাল দাগ। ‘বার্ট চলে গেছে দেখছি,’ বললেন থর্নডাইক। শুধু হাইলি একা তার ব্যবসা চালাচ্ছে। তবে ও এখানে থাকে নাকি জায়গাটা ওয়ার্কশপ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে, বুঝতে পারছি না। আর মি. ক্যারিংটনের পরিচয় জানাও দরকার। ঠিক আছে। কাল আবার আসব।’
পরদিন সকালে উত্তেজনা নিয়ে ঘুম ভাঙল আমার। কী ঘটতে যাচ্ছে আজ? থর্নডাইক কি আবার অসাধারণ একটা কাজ দেখাতে পারবেন? সম্ভব হবে এত দ্রুত অপরাধীদের খুঁজে বের করা? থর্নডাইকের বাড়িতে তাড়াতাড়ি চলে এলাম। তখনো নাশতা সারেননি তিনি।
‘ঘটনার শেষ দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছ, তাই না?’ বললেন তিনি। ‘আজকের প্রোগ্রাম হলো প্রথমে মি. ফ্রাঙ্ক গ্রেসনের অফিসে যাব। উনি একজন মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার। আমার ভালো বন্ধু। জানেন, আমি আসছি। আমার জন্য উত্কৃষ্ট কিছু পাথর নিয়ে অপেক্ষা করবেন গ্রেসন।’
‘পাথর!’ অবাক হলাম আমি। ‘পাথর দিয়ে কী হবে?’
‘ধীরে বন্ধু ধীরে। সময়ে সবই জানতে পারবে।’
গ্রেসনের অফিসে গেলাম আমরা। নেই তিনি। তাঁর ক্লার্ক থর্নডাইককে ভারী একটা ব্যাগ দিল। উঁকি দিয়ে দেখলাম, ভেতরে নানা সাইজের, নানা রঙের পাথর। একটা পাথরের গায়ে উজ্জ্বল হলুদ দাগ। থর্নডাইককে দেখাতে তিনি বললেন, ‘এ পাথরটাই আমার দরকার।’ ওটা পকেটে রেখে দিলেন তিনি। তারপর ক্লার্ককে ধন্যবাদ দিয়ে পা বাড়ালেন দরজার দিকে। ‘মি. গ্রেসন বলেছেন, পাথরগুলো ফেরত না দিলেও চলবে,’ পেছন থেকে বলল ক্লার্ক। ‘ওগুলো তাঁর আর লাগবে না।’
মূল্যহীন কতগুলো পাথর থর্নডাইকের কী কাজে লাগবে, বুঝতে পারলাম না। তবে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করতেও সাহস হলো না।
কাঁটায় কাঁটায় তিনটায় আমরা ক্লিফোর্ডস ইনে পৌঁছালাম। সুপারিনটেনডেন্ট মিলারও যথাসময়ে হাজির। বেল টিপতেই রোগা চেহারার কেয়ারটেকার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল, সন্ত্রস্ত ভঙ্গি। যেন কিসের ভয়ে সব সময় সিঁটিয়ে আছে। ‘শুভ বিকেল,’ অমায়িক গলায় বললেন থর্নডাইক, ‘আমরা ঘর খুঁজছি। নোটিশ দেখলাম, ঘর ভাড়া দেওয়া হবে।’ তিনি লোকটার হাতে কিছু বকশিশ গুঁজে দিলেন (থর্নডাইক সব সময় বড় অঙ্কের বকশিশ দিয়ে থাকেন)। উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখ। ‘ঘরগুলো সম্পর্কে কিছু তথ্য দিলে খুশি হব।’ কথা শেষ করলেন গোয়েন্দা প্রবর।
‘৫ এবং ১২ নম্বর ঘর দুটি এ মুহূর্তে খালি আছে, স্যার।’ জানাল কেয়ারটেকার। ‘তবে খুব ছোট। আর আলো–বাতাস ঢোকে না। এ ছাড়া ৫১ নম্বর ঘরটাও খালি আছে। ওটা আপনারা নিতে পারেন, স্যার। ওটাতে মি. ক্যারিংটন ভাড়া থাকতেন। হঠাৎ চলে যেতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর কাছ থেকে সদ্য একটি চিঠি পেয়েছি। বলেছেন, ঘর ছেড়ে দিয়েছেন।’ পকেটে হাত ঢোকাল কেয়ারটেকার। ‘চিঠিটা যে কোথায় রাখলাম! ওহ্, এই তো পেয়েছি।’ সে চিঠিটা দেখাল আমাদের। ওতে লেখা:
বাল্টিক শিপিং কোং লিমিটেড
এস এস গোটেনবার্গ
জুলাই ৩১
প্রিয় মহাশয়,
বিশেষ কারণে হঠাৎ করে আমাকে আপনার ৫১ নম্বর ঘরটি ছেড়ে দিতে হচ্ছে। চলে যাওয়ার কথা আগে জানাতে না পারার জন্য আমি দুঃখিত। চিঠির সঙ্গে পুরো মাসের ভাড়ার একটি চেক সংযুক্ত করে দেওয়া হলো। সেই সঙ্গে ঘরের চাবিও।
আপনার বিশ্বস্ত
টি ডব্লিউ ক্যারিংটন
‘আপনি ভাগ্যবান বলে ঘর পেয়ে যাচ্ছেন,’ বলল কেয়ারটেকার। ‘খুব ভালো ঘরগুলোর ওটা একটা—প্রচুর আলো-বাতাস আর নীরব। আপনার প্রতিবেশীরাও ভদ্র, শান্ত। অফিস শেষে কাউকে নিচতলায় পাবেন না। ওপরতলায় বার্ট এবং হাইলিরা থাকতেন। তবে বার্ট চলে গেছেন আর হাইলির ব্যবসাপত্তর এখন তেমন চলছে বলে মনে হয় না।’
‘একবার ৫১ নম্বর ঘরটি দেখতে পারি?’ জিজ্ঞেস করলেন থর্নডাইক।
‘অবশ্যই, স্যার। এই নিন, চাবি।’
দরজা খুললেন থর্নডাইক। ঢুকলাম সিটিংরুমে। অল্প কয়েকটি আসবাব। একটি টেবিল, দুটি চেয়ার। বেডরুমে একটি খাট, তাতে বেডকভার নেই। বেডরুমেও একটি টেবিল আর একটি চেয়ার।
‘পাখি উড়ে গেছে,’ বললাম আমি।
‘তবে হ্যাটটা ফেলে গেছে,’ বলল সুপারিনটেনডেন্ট মিলার, টেবিলের ওপর থেকে কালো, নরম একটি হ্যাট তুলল।
‘সুন্দর হ্যাট।’ হ্যাটের ভেতরে চোখ বোলাল সে, চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে, এটা সেই হ্যাট!’
আমরা দোতলায় উঠে এলাম। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, থর্নডাইক দরজায় কড়া না নেড়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন চুপচাপ, গ্যাসের মিটার পরীক্ষা করে দেখছেন, সম্প্রতি কতটা গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে।
‘হা!’ উত্তেজিত হয়ে উঠল মিলার। ‘এবার আর ও আমার হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে না। গাটলবার্গ নিউক্যাসলে যাবে। আমি ওখানে জাহাজ থামিয়ে রাখার ব্যবস্থা করব। নিজে ওকে গ্রেপ্তার করব। এখনই যেতে হবে আমাকে। একদম সময় হাতে নেই, মি. থর্নডাইক। সাহায্য করার জন্য অনেক ধন্যবাদ।’ বলে তড়িঘড়ি চলে গেল মিলার। আমরা অনুরোধ করা সত্ত্বেও থাকল না।
‘মানুষটার বড্ড তাড়াহুড়ো,’ বললেন থর্নডাইক। ‘ক্যারিংটনের ব্যাপারে আরও খোঁজখবর নেওয়ার দরকার ছিল তাঁর। আমার ধারণা, দোতলায় হাইলি ওই লোক সম্পর্কে খোঁজখবর রাখে। ওপরে গিয়ে দেখি, আমার অনুমান সত্য কি না। ভালো কথা, কাল রাতে আমি তাকে চিঠিতে নিজের পরিচয় দিয়েছি ‘উইলিয়াম পোলটন’ বলে। কাজেই তুমি আমাকে ‘উইলিয়াম’ ডাকবে।’ হাসলেন তিনি। ‘আর তোমার নাম, যদি জিজ্ঞেস করে, বলবে ‘জন স্টিভেনসন’। এই হাইলিকে দিয়ে আমার পাথরগুলো পরীক্ষা করাব।’
‘এ জন্যই আপনার পাথরগুলো দরকার হয়ে পড়েছিল—উইলিয়াম,’ বললাম আমি।
‘হ্যাঁ, জন।’
আমরা দোতলায় উঠে এলাম। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, থর্নডাইক দরজায় কড়া না নেড়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন চুপচাপ, গ্যাসের মিটার পরীক্ষা করে দেখছেন, সম্প্রতি কতটা গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে। গ্যাসের মিটার চেক করে সন্তুষ্ট মনে হলো তাঁকে, এবার নক করলেন।
বেঁটেখাটো, বলিষ্ঠ গড়নের এক লোক খুলে দিল দরজা। পরনে ল্যাবরেটরির কর্মীদের মতো সাদা কোট।
‘গুড আফটারনুন,’ বললেন থর্নডাইক, হাত বাড়িয়ে দিলেন। লোকটা হ্যান্ডশেক করল তাঁর সাথে। লোকটার হাতের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন থর্নডাইক, নজর এড়াল না আমার। ‘আমার চিঠি পেয়েছেন?’
‘জি। তবে আমি হাইলি নই। হাইলি ছুটি কাটাতে বাইরে গেছে। হপ্তাখানেক পর ফিরবে। আমি তার কাজগুলো করে দিচ্ছি। আমার নাম শেরউড। চিঠিতে পাথরের কথা বলেছিলেন। এনেছেন দেখছি। পরীক্ষা করে দেখব?’
থর্নডাইক টেবিলের ওপর খালি করলেন পাথরের থলেটা। নানা সাইজের পাথর। শেরউড ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পাথর পরীক্ষা করতে লাগল। থর্নডাইক এই ফাঁকে নজর বুলিয়ে নিলেন ঘরে। তিনটি ফার্নেস দৃষ্টি আকর্ষণ করল তাঁর। দুটি ছোট, বাকিটা প্রকাণ্ড। শেলফের দিকে তাকালেন তিনি। অনেকগুলো ছোট, সাদা পট শেলফে—অস্থিভস্ম দিয়ে তৈরি। এই বস্তু ধাতুবিদদের কাজে লাগে। একটা মেশিনও আছে পট তৈরি করার। বড় একটা বাক্স দেখলাম গুঁড়া করা অস্থিভস্মে বোঝাই। তবে জিনিসটি অস্বাভাবিক মোটা মনে হলো। থর্নডাইক বাক্সে হাত ঢুকিয়ে জিনিসটা পরীক্ষা করে দেখলেন। তারপর ধীরে ধীরে হাত বের করে রুমাল দিয়ে পরিষ্কার করলেন। শেরউড মুখ তুলে চাইল, ‘চিঠিতে যা বলেছিলেন, ঠিক সে জিনিসই দেখতে পাচ্ছি, মি. পোলটন,’ বলল সে। ‘খুব কম সোনা আছে এর মধ্যে।’
‘এটার কী অবস্থা বলুন তো?’ হলদে দাগওয়ালা পাথরটা পকেট থেকে বের করে দেখালেন থর্নডাইক।
‘হা!’ বলল শেরউড। ‘এটাকে বাকিগুলোর চেয়ে ভালো মনে হচ্ছে। আমার ধারণা, এটার মধ্যে সোনার পরিমাণ বেশি।’
কথাটা শুনে খুবই অবাক হলাম আমি। কোনো ধাতুবিশেষজ্ঞ এ কথা বলবে, ভাবতেই পারিনি। কারণ, একটা স্কুলছাত্রও বলতে পারবে, পাথরটার মধ্যে সোনার লেশমাত্র নেই, সোনার মতো ফুটকিগুলো একধরনের আয়রন।
শেরউড পাথরখণ্ডটা নিয়ে জানালার ধারে গেল। ওখানে আলো বেশি। আর থর্নডাইক দাঁড়ালেন শেলফের সামনে, পটগুলো ভালো করে দেখার জন্য। একটা পট হাতে তুলে নিয়েছেন তিনি, ঠিক সে সময় ঘুরে দাঁড়াল শেরউড। থর্নডাইকের হাতে পট দেখে মুখটা মরার মতো সাদা হয়ে গেল তার।
‘রেখে দিন ওটা! এখনই রেখে দিন বলছি।’ গর্জে উঠল সে।
থর্নডাইক শেলফে রাখার ভান করে হাত থেকে পটটা ফেলে দিলেন পাথুরে মেঝেতে। ভেঙে চুরমার হয়ে গেল ওটা। হাঁটু গেড়ে বসলেন তিনি, পটের ভাঙা একটা অংশ হাতে নিয়ে সোজা হলেন। হাত বাড়িয়ে দেখালেন ওটা। একটা দাঁত।
এক সেকেন্ড কেউ নড়াচড়া করল না, কথাও বলল না। তারপর শেরউড ঝট করে পকেট থেকে পিস্তল বের করল। গুলি করার আগেই থর্নডাইক ওকে লক্ষ্য করে বড় একটা পট ছুড়ে মারলেন। তার পরপর প্রচণ্ড এক ঘুষিতে লোকটাকে শুইয়ে ফেললেন মেঝেতে। আমি পিস্তলটা কুড়িয়ে নিলাম মেঝে থেকে। থর্নডাইক শেরউডকে চেপে ধরে রইলেন।
‘রশি নিয়ে এসো,’ চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। ‘ব্যাটাকে বাঁধতে হবে।’
একটা বাক্সে কিছু রশি পেয়ে ওটা দিয়ে পা জোড়া কষে বেঁধে ফেললাম শেরউডকে। এখন আর বাছাধনকে পালাতে হবে না।
‘হাত জোড়াও বেঁধে ফেলো,’ বললেন থর্নডাইক। ‘ওর পকেটে কী আছে দেখি।’
লোকটাকে উপুড় করে শোয়ালাম। হাত বাঁধছি, সেই ফাঁকে থর্নডাইক ওর পকেট হাতড়াতে লাগলেন।
‘হা!’ চেঁচালেন তিনি, ‘এই জিনিসটাই আমরা খুঁজছিলাম।’ সাদা কাগজে মোড়ানো জিনিসটা বন্ধনমুক্ত করতেই বেরিয়ে এল বেশ বড় আর সুন্দর একটি রুবি।
‘পিস্তলটা আমাকে দাও,’ বললেন থর্নডাইক। ‘আমি ওকে পাহারা দিচ্ছি। তুমি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে ফোন করো। পারলে মিলারকে খবর দাও, সে যেন নিউক্যাসলে না যায়। তাকে এখানে আসতে বলো। লোকটা ভালো। অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার সম্মানটা ওকে দিতে চাই। এ ব্যাটার পেছনে বহুদিন ধরে সে লেগে আছে।’
এসব ফ্যাক্ট থেকে বুঝে নিলাম, কোথায় এবং কাকে খুঁজতে হবে আমার। ক্লিফোর্ডস ইনে কাজ করে এ রকম একজন ধাতুবিদের সন্ধান পেতে হবে আমাকে। পোস্ট অফিস ডিরেক্টরি ঘেঁটে সে রকম পেয়েও গেলাম একজন।
মিলারকে পেয়ে গেলাম ফোনে। সঙ্গে সঙ্গে চলে এল সে। অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল।
সেই সন্ধ্যায় থর্নডাইকের ফ্ল্যাটে বসে আমি আর মিলার শুনলাম কীভাবে তিনি ক্যামডেন কিলারকে ধরতে পারলেন।
‘প্রথম ক্লু ছিল,’ শুরু করলেন তিনি, ‘ছেঁড়া কাগজবোঝাই হ্যাটটি। ওটার ভেতর একটা খাম ছিল ঠিকানাসহ। ওতে একটা জায়গার ঠিকানা ছিল। যার শেষের অক্ষরটা ছিল “N”, লন্ডন ওয়েস্ট সেন্ট্রালের কোনো জায়গা। কিন্তু ওয়েস্ট সেন্ট্রালে এমন কী জায়গা আছে, যার নাম শেষ হয় “N” দিয়ে? এটা কোনো “রোড” “স্ট্রিট” বা “স্কয়ার” হতে পারে না। হতে পারে ইন (INN) বা সরাইখানা। আর ওয়েস্ট সেন্ট্রালে একটিমাত্র ইন আছে—ক্লিফোর্ডস ইন। কাজে ওই ঠিকানাই হবে, ধরে নিলাম আমি।
‘এরপর কাগজে লেখা ওজনের ব্যাপারটা। ওতে লেখা ছিল—3-0 5dW. F1-9/2-0. “DW”. মানে পেনিওয়েট। আর এ ওজন ব্যবহার করা হয় গয়না এবং দামি ধাতু পরিমাপের কাজে। বিশেষ করে সোনা। F1 সম্ভবত ফ্লোর বা “ফ্লোর সুইপিং”! জুয়েলারের ওয়ার্কশপের মেঝের ধুলাতে কিছু না কিছু গোল্ড ডাস্ট বা স্বর্ণধূলি পাওয়া যাবেই। আর এটা পাঠানো হয় ধাতুবিদের কাছে। সে স্বর্ণ থেকে ধুলা আলাদা করে জুয়েলারের কাছে আবার ফেরত পাঠিয়ে দেয়। প্রথম ফিগারটা ছিল—3-05dW. এ দিয়ে ধুলাতে পাওয়া সোনার পরিমাণটা বোঝা যায়।
‘এ থেকে আমি এই সিদ্ধান্তে এলাম, অপরাধের সঙ্গে কোনো ধাতুবিদ জড়িত। আর ব্যাপারটা নিয়ে নিশ্চিত হয়ে গেলাম, সিসা আর অস্থিভস্ম পেয়ে। এ দুটি জিনিস ধাতুবিদেরাই ব্যবহার করেন। জিনিস দুটি আমি পেয়েছিলাম হ্যাটের বাইরের অংশ থেকে।
‘এ ছাড়া ধাতব গলাতে ধাতুবিদের ফার্নেস দরকার হবে। হ্যাটের ভেতরে ফার্নেসের একটা মূল্যতালিকাও ছিল, ভুলে যাননি নিশ্চয়।
‘এসব ফ্যাক্ট থেকে বুঝে নিলাম, কোথায় এবং কাকে খুঁজতে হবে আমার। ক্লিফোর্ডস ইনে কাজ করে এ রকম একজন ধাতুবিদের সন্ধান পেতে হবে আমাকে। পোস্ট অফিস ডিরেক্টরি ঘেঁটে সে রকম পেয়েও গেলাম একজন। দেখলাম, ক্লিফোর্ডস ইনে এ রকম ধাতুবিদই কাজ করে, সে মি. হাইলি।’
‘কিন্তু আমরা হ্যাটটি হাইলির ঘরে নয়, পেয়েছি ক্যারিংটনের ঘরে। সেই হ্যাট, যেটি খুনি নিয়ে গিয়েছিল।’ বললাম আমি।
‘হ্যাঁ,’ বললেন থর্নডাইক। ‘এটা হলো গল্পের দ্বিতীয় অধ্যায়। খুনি হাইলির ঘরে নিচতলায় বাস করত ক্যারিংটন নাম নিয়ে। ওই চিঠি ছিল তার একটি কৌশল। সে সবাইকে, এমনকি পুলিশকেও ধোঁকা দিতে চেয়েছে—সে সুইডেন যাচ্ছে সুইডিশ জাহাজে। কিন্তু যায়নি। সে ওপরতলায়, হাইলির ঘরে উঠে গেছে। এবার আসুন হ্যাটের প্রশ্নে। ওই হ্যাট একজন ধাতুবিদের, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ওটা হাইলির হ্যাট। কিন্তু হাইলি কোথায় গেল?’
কেউ কিছু বললাম না। এ প্রশ্নের জবাব আমাদের জানা থাকলে তো!
‘হাইলির দরজায় নক করার আগে গ্যাসমিটার চেক করে দেখেছি আমি,’ বলে চললেন থর্নডাইক। ‘আর তাতেই হাইলি বেচারার পরিণতি সম্পর্কে আমার আশঙ্কা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে। প্রচুর গ্যাস পোড়ানো হয়েছে সম্প্রতি—ফার্নেসে একটা শরীর ভস্মীভূত করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। আর ওখানেই হাইলির জীবনাবসান ঘটেছে। দরজা খুলে দিয়েছিল শেরউড নামধারী লোকটা। তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার সময় তার হাত ভালোভাবে লক্ষ করে দেখি, তার একধরনের চর্মরোগ আছে—আর ঠিক এ রকম রোগের চিহ্ন দেখেছি মিলার, আমাকে যার ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়েছিলেন, তার ছবিতে।’
‘ক্যামডেন কিলার!’ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
‘হ্যাঁ। শেরউড হাইলিকে খুন করে হাইলির ফার্নেসেই তাকে পুড়িয়ে ফেলেছে। প্রকাণ্ড ওই ফার্নেসে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, শুধু হাড় আর দাঁত ছাড়া। হাড় দিয়ে অস্থিভস্ম তৈরি করা হয়েছে, যা ধাতুবিদদের কাজে লাগে। আমি হাইলির হাড়ের অস্থিভস্মও দেখেছি একটা বাক্সে, যেটা আমার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকেছিল। তারপর দাঁতটা আবিষ্কার করি।’
‘লোকটা দাঁত দেখেই বুঝতে পেরেছিল,’ বললাম আমি। ‘যে সে শেষ।’
‘হ্যাঁ,’ সায় দেন থর্নডাইক। ‘ওই দাঁতই ক্যামডেন কিলারের সর্বনাশ ঘনিয়ে এনেছিল।’
এর পর থেকে প্রতিবছরের আগস্টের ২ তারিখ আমি আর থর্নডাইক বৈরামজির কাছ থেকে অত্যন্ত উত্কৃষ্ট মানের সিগার পেতে থাকলাম ‘শুভেচ্ছা নিদর্শন’ হিসেবে।
আগস্টের ২ তারিখ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল তার ভাইয়ের হত্যাকারীকে। আর চারজন মানুষকে হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়ে যায় কুখ্যাত খুনি ক্যামডেন কিলারের, সে কথা শুরুতেই বলেছি।
(বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে)