নিয়াজ মেহেদীর গল্প—তৃতীয় তাস

অলংকরণ: এস এম রাকিব

শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনটি বাঁশি বাজিয়ে রওনা দিতেই হাঁপ ছাড়ল মাহবুব। একে তো বহুদিন পর পাওয়া ছুটি, তার ওপর পলিশ করা দ্বিতীয় শ্রেণির কামরায় সে একা। মাঝেমধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নিজেকে রাজা ভাবার সুযোগ আসে। মাহবুবের মনে হলো, আজ তেমনই একটা দিন।

পুলিশের চাকরিতে ছুটি বলেকয়ে আসে না। যদিওবা আসে, ভয় হয়, এই বুঝি কর্মস্থলে একটা দুর্ঘটনা ঘটবে। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো কোনো ঘটনায় কর্তৃপক্ষের মুখ আমসির মতো শুকিয়ে যাবে। খাঁড়ার ঘা পড়বে বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা ছুটির দরখাস্তখানার ওপর। গুছিয়ে রাখা বাক্সপেটরা গোছানোই থেকে যাবে। গাঁটের পয়সা খরচ করে কেনা ট্রেনের টিকিটটি ফিরিয়ে দেওয়ার ফুরসতটুকুও মিলবে না। ন্যাপথলিনের গন্ধমাখা উর্দি পরে অতঃপর নেমে পড়তে হবে ডিউটিতে।

এর আগে দুবার ছুটি বাতিল হয়েছিল মাহবুবের। এবার ছুটি হলেও আগেভাগে বাড়িতে কিছু জানায়নি সে। ঠিক করেছে, একেবারে বিনা বাক্যে গিয়ে হাজির হবে বাড়িতে। অগ্রিম খবর দিলে মা-বাবার মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। মফস্‌সল শহরের বন্ধুরা প্রতীক্ষায় দিন গুনতে থাকে। ছোট কাজিনরা পুলিশি জীবনের খুঁটিনাটি জানার জন্য মনে মনে প্রশ্ন সাজাতে থাকে। সেই সঙ্গে অপেক্ষায় থাকে নাজমা। তার বাগ্‌দত্তা। নাজমার জন্যই ইদানীং বুকটা বেশি পোড়ে মাহবুবের। কত দিন হলো তাদের দেখা হয় না!

শ্রাবণ মাসের দিন। বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে শেষ রাত থেকে। সকাল আটটা বাজলেও বৃষ্টির বিরাম নেই। খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ছিটকে ভেতরে আসছে। মেঘের ফাঁকে বিজলির লুকোচুরি দেখে মাহবুব আপনমনে গুনগুন করে উঠল, ‘শ্রাবণের গগনের গায় বিদ্যুৎ চমকিয়া যায়...।’

সে মুহূর্তে ট্রেনের গতি কমে গেল। বাষ্পীয় ইঞ্জিন প্রাণপণে কয়লাপোড়া ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে থমকে দাঁড়াল স্টেশনে। মাহবুবের স্বস্তি চুরমার করে দিয়ে কামরায় ঢুকে পড়ল এক দম্পতি। বছর চল্লিশের এক ভদ্রলোক, সঙ্গে তার ঘোমটা টানা স্ত্রী ও পাঁচ-ছয় বছর বয়সী শিশুপুত্র। ভদ্রলোকের চেহারা ও চোখের দৃষ্টির চাঞ্চল্য মাহবুবের চোখ এড়াল না। সে ব্যাগ থেকে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা সদ্য প্রকাশিত গোয়েন্দা উপন্যাস বের করে পড়তে শুরু করল।

এখানেই শেষ নয়। ট্রেন চলতে শুরু করেছে, এমন সময় ভেজানো দরজা খুলে একে একে প্রবেশ করল দুই মাড়োয়ারি ব্যক্তি। একজন বেশ গোলগাল, বয়স পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন হবে। অন্যজন নিতান্তই কিশোর। ঠোঁটের ওপর হালকা গোঁফের রেখা উঠতে শুরু করেছে। দুজনের পরনেই পাঞ্জাবি-ধুতি ও পাম্প শু। মাথার ওপর স্যুটকেস রেখে তারা স্টিলের বাক্স খুলে পান বের করে চিবোতে লাগল। মুহূর্তেই জর্দার গন্ধে ম–ম করে উঠল কামরাটি।

মাহবুব কিছুতেই বইয়ে মনোযোগ দিতে পারল না। সে ইতিমধ্যে জানালার কাছে সরে বসেছে। তার বেঞ্চে ঘন হয়ে বসেছে দুই মাড়োয়ারি পুরুষ। টেবিলের অপর পাশে বসেছে সেই দম্পতি। বৃষ্টির ফোঁটা শরীরে পড়ছে বলে মাহবুবের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ব্যোমকেশ বক্সী নামের এক গোয়েন্দার কার্যকলাপ তার মগজে ঠিক জুত হয়ে বসছে না। সে ভ্রু কুঁচকে বইয়ের পাতার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

‘মশাই কি ঢাকায় যাচ্ছেন?’ মাঝবয়সী বাঙালি লোকটি তার দিকে লক্ষ করে থাকবে। সে–ই কথা বলল।

আরও পড়ুন

মাহবুব বই বন্ধ করে লোকটার দিকে তাকাল। লোকটার চোখেমুখে গুলতানি মারার ইচ্ছা সদর্প চকচক করছে। তার মাথার চুল নিখুঁতভাবে ব্যাকব্রাশ করা। ঠোঁটের ওপর অভিনেতা ক্লার্ক গেবলের মতো চিকন গোঁফ। বাদবাকি মুখ কামানো। বাদামি রঙের শার্ট ও নীল দিয়ে ধোয়া সাদা ধুতি পরেছে লোকটা। হাতে সোনালি রিস্টওয়াচ। চোখে নেতাজি সুভাষ বোসের মতো গোল রিমওয়ালা চশমা।

‘গোয়ালন্দে যাচ্ছি। সেখান থেকে ট্রেন বদলে রংপুরে,’ বলেই বই খুলে পড়ার ভান করল মাহবুব। কথা আর বাড়াতে চায় না। বছর পাঁচেক পুলিশে চাকরি করে একটা বাক্য ভালোভাবে রপ্ত করেছে সে, ‘জেলের বন্ধু আর রেলের বন্ধু, কোনো বন্ধু নয়।’

কী করেন?’ প্রশ্নটা করেই কানাই বুঝল, মাহবুব উত্তর দিতে আগ্রহী নয়। সে একটা শিস কেটে বলল, ‘কোই বাত নেহি, মানুষের জীবনে গোপনীয়তার দরকার আছে।’

জেলে কোনো দিন থাকা না হলেও রেলের বন্ধুদের ঢের জানা আছে মাহবুবের। ঠগ-জোচ্চরে ভরপুর হয়ে গেছে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে। কাউকে বিশ্বাস করার জো নেই। অথচ এককালে ট্রেনের যাত্রীরা কত আন্তরিক ছিল। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে রেলভ্রমণের সময় সে নিজে দেখেছে মানুষের আন্তরিকতা। কামরাভর্তি মানুষকে খাবারের ভাগ না দিয়ে কেউ টিফিনবাটি খোলার কথা চিন্তাও করত না। মানুষও নির্দ্বিধায় সহযাত্রীর দেওয়া খাবার খেত। অথচ এখন কেউ সাধলেও মানুষ খাবার মুখে তুলবে না। ওতে কি আর খাবার আছে? মেশানো আছে কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ কি ধুতরার বিষ। মুখে দিলেই চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসবে। হুঁশ ফিরে আসার আগেই হাওয়া হয়ে যাবে স্যুটকেস ও গাঁটের পয়সা।

লোকটা আর কথা বাড়াল না। মাহবুবের মনের ভাব বোধ হয় বুঝে ফেলেছে। সে স্ত্রীর দিকে ফিরে ইশারা ভাষায় আলাপ করতে শুরু করল। লোকটা তো কথা বলতে পারে। তবে কি তার স্ত্রী বোবা? নাকি বোবা আর কালা দুটোই? ছেলেটাও এখন পর্যন্ত টুঁ শব্দ করেনি। তবে কি ছেলেটাও বাক্‌প্রতিবন্ধী?

মাহবুব কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। মুখের দিকে তার ঘন ঘন দৃষ্টিপাত চতুর লোকটার দৃষ্টি এড়াল না। সে মোলায়েম হাসি হেসে বলল, ‘আপনি দেখছি বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছেন। খানিকটা সরে বসুন না। ব্যবসা করতে এসে ওরা বাংলা মুলুকটাকে গিলে ফেলেছে, ইংরেজের ট্রেনটাও ওদের কেনা নাকি? হাত-পা ছড়িয়ে বসুন তো।’

লোকটার কথা শুনে মাহবুবের কান লাল হয়ে গেল। মাঝবয়সী মাড়োয়ারি লোকটার মুখ হাঁ হয়ে গেছে। তিনি এতক্ষণ পান চিবোচ্ছিলেন। এখন আর চিবোচ্ছেন না। তাঁর চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠেছে। কিছু বলতে যাবেন, এমন সময় কিশোরটি হাত চেপে ধরে পরিষ্কার বাংলায় বলল, ‘বাদ দাও, বাবা।’

মাড়োয়ারি লোকটা আধহাতমতো জায়গা রেখে সরে বসল। মাহবুব কিন্তু সরল না। সে জানালার পাশে গাঁট হয়ে বসে উদাস দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির প্রতাপ ম্লান হতে শুরু করেছে। তবে একেবারে থেমে যায়নি। জবুথবু গ্রামগুলো পাশ কাটিয়ে ট্রেনটা একটানা ছুটে চলছে। এখন ধান চাষের মৌসুম। চাষিরা বৃষ্টির মধ্যেই লাঙলচষা জমিতে আমন ধানের চারা রোপণ করছে। দ্বিতীয় শ্রেণির কামরার আরামে বসে গ্রামের দৃশ্য দেখতে মাহবুবের বেশ লাগছিল। এমন সময় লোকটা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘মশাইয়ের তাসের অভ্যাস আছে নাকি? এই সব ম্যাড়মেড়ে ট্রেন জার্নিতে বসে থাকতে একদম ভালো লাগে না। আসুন, কিছুক্ষণ তাস খেলে সময় কাটাই।’

আরও পড়ুন

মাহবুব একবার এই লোক, আরেকবার মাড়োয়ারি দুজনের দিকে তাকাল। লোকটার চোখে যতটুকু আগ্রহ, অন্য দুজনের চোখে ততটুকুই অনাগ্রহ। তারা দুজন চোখ বুজে আছে। বয়স্ক লোকটি হাতজোড় করে বোধ হয় কিছু একটা আবৃত্তি করছে বিড়বিড় করে।

মাহবুব ওদের দিকে ইশারা করে বলল, ‘দুজনে কি আর তাস খেলা জমে? ওনারা খেললে হয়তো ব্রিজ খেলা যেত। নয়তো টোয়েন্টি নাইন।’

লালবাজারের পুলিশ ক্লাবে সন্ধ্যার পর ব্রিজ খেলতে খেলতে হিসাব-নিকাশে বেশ চৌকস হয়ে উঠেছে মাহবুব। তাস খেলার সুযোগ এলে তার জন্য হাত গুটিয়ে বসে থাকা কঠিন।

লোকটা একটা অদ্ভুত শব্দ করে বলল, ‘আরে মশাই, দুজনে খেলা যায় না, কে বলল? ওসব সাহেবদের ছেলেমানুষি খেলা কে খেলতে যাচ্ছে? তার চেয়ে আসুন আমরা কিছু সাহসের খেলা খেলি। খেলবেন?’

মাহবুব লোকটার দিকে তাকিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘জুয়া?’

‘আরে ধ্যাত, জুয়া নয়। ভাগ্যের পরীক্ষা।’ এই ছাতাপড়া বৃষ্টিতে ভিজে ইঞ্জিনের গতি কেমন ধীর হয়েছে লক্ষ করেছেন? গোয়ালন্দে পৌঁছাতে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে। সে জন্যই বলছি, আসুন, সময় কাটানোর জন্য একটা সহজ খেলা খেলি। তিন তাস। পিওর ভাগ্যের খেলা। আপনার ইচ্ছা হলে পয়সা দিয়ে খেলবেন। না হলে খেলবেন না। কেউ জোর করবে না।’

মাহবুব আরেকটু হলেই লোকটার টুঁটি চেপে ধরত। দারোগাকে জুয়া খেলার প্রস্তাব? এত বড় সাহস! লোকটার ছেলেটা তার মুখের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিল। তার দৃষ্টি দেখে মাহবুবের মায়া হলো। সে মুখ খোলার আগেই দেখল, লোকটা এক বান্ডিল কার্ড নিয়ে শাফল করতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণ আঙুলের কারিকুরি দেখিয়ে দুটো জোকার ও একটি রুইতনের টেক্কা বের করে মাহবুবের হাতে দিয়ে বলল, ‘ভালো করে দেখুন, কার্ডে কোনো চিহ্নটিহ্ন দেওয়া আছে কি না।’

মাহবুব ভালো করে তাসগুলো পরীক্ষা করে দেখল। না, দিব্যি স্বাভাবিক তিনটি তাস। লোকটার হাতে তাসগুলো ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘না। কোনো টেম্পারিং করা আছে বলে মনে হচ্ছে না।’

লোকটা তাসগুলো ফেরত নিয়ে বিগলিত ভঙ্গিতে বলল, ‘এই দেখুন, আপনাকে আমার পরিচয় দেওয়া হয়নি। আমার নাম কানাইলাল দাস। পেশায় ট্রাভেলিং সেলসম্যান। আপনার নাম কী মশাই?’

‘আমার নাম মাহবুব উদ্দিন,’ ছোট করে জবাব দিল সে।

‘কী করেন?’ প্রশ্নটা করেই কানাই বুঝল, মাহবুব উত্তর দিতে আগ্রহী নয়। সে একটা শিস কেটে বলল, ‘কোই বাত নেহি, মানুষের জীবনে গোপনীয়তার দরকার আছে।’ বাঁ হাতে দুই জোকার ও ডান হাতে টেক্কাটি দেখিয়ে সে বলল, ‘নিয়মকানুন আপনি নিশ্চয়ই জানেন। তারপরও একবার বলছি। তিনটি তাসের মধ্য থেকে টেক্কাটি বের করতে হবে। মিলে গেলে যত টাকা ধরবেন, পয়সা ডাবল হয়ে যাবে। না মিললে কিছু পাবেন না। এ খেলায় ঝুঁকি আছে, রিটার্নও আছে। শুরু করব কি?’

মাহবুব তিন তাস নামের ধাপ্পাবাজির সঙ্গে খুব ভালোভাবে পরিচিত। দারোগার পরিচয় দিলে লোকটা বোধ হয় এই খেলার প্রসঙ্গই তুলত না। কিছুটা কৌতূহল থেকে আর কিছুটা লোকটাকে বাজিয়ে দেখার ইচ্ছা থেকে সে বলল, ‘আপনি কার্ড বাঁটুন।’

কানাই টেবিলে তিনটা কার্ড রেখে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে মাহবুবকে দেখাল। তার হাতের গতি ধীর। দুই জোকারের থেকে রুইতনের টেক্কাটিকে অবলীলায় আলাদা করা যাচ্ছে। শেষবারের মতো শাফল করে কানাই ক্লান্ত গলায় বলল, ‘এই যে, খুঁজে বের করুন টেক্কা।’

আরও পড়ুন

মাহবুব টেক্কাটিকে দুই জোকারের মাঝখানে দেখেছে। সে চট করে আঙুল দিয়ে তাসটি দেখাল। সঙ্গে সঙ্গে কানাই হাত তুলে বলল, ‘আহ-হা, খালি হাতে হবে না, মশাই। পয়সা ছাড়ুন। সিকি হলে সিকি, আধুলি হলে আধুলি, তবে টাকা হলে সবচেয়ে ভালো হয়।’

বুকপকেট থেকে সম্রাট পঞ্চম জর্জের ছবিওয়ালা একটা এক টাকার নোট বের করে মাঝখানের তাসটির ওপর ধরল মাহবুব। তার চোখ বলছে, ওটাই সেই টেক্কা। ওদিকে মন বলছে, ওটা টেক্কা নয়। দুই পাশের দুই কার্ডের কোনো একটিতে টেক্কাটিকে চালান করে দিয়েছে চতুর কানাই। পয়সা জেতা মাহবুবের উদ্দেশ্য নয়। সে চাইছে জুয়াচোরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাকে কোণঠাসা করতে। জারিজুরি ফাঁস হয়ে গেলে তবেই লোকটার টুঁটি চেপে ধরা যাবে। আপাতত সময় কাটাতে লোকটার পাতা ফাঁদে পা দিলে ক্ষতি নেই।

মাহবুব ভেবেছিল, সে হেরে যাবে। কিন্তু ঘটল ঠিক উল্টো ঘটনা। চিন্তিত মুখে মাঝখানের তাসটি ওলটাল কানাই। মাহবুবের অনুমান সম্পূর্ণ ঠিক। এই তো সেই রুইতনের টেক্কা। পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা টাকা বের করে মাহবুবের দিকে এগিয়ে দিল কানাই। তার মুখ শুকিয়ে গেছে। অপরাধীর মতো মুখ করে সে বলল, ‘আপনার দৃষ্টি দেখছি দিব্যি ঝকঝকে। তিস্তা নদীর বোরেলি মাছের অনেক সুনাম শুনেছি। নিশ্চয়ই মাছ খেয়ে চোখের জ্যোতি বাড়িয়েছেন, তা–ই না?’

মাহবুব জবাব দিল না। কানাইয়ের বাড়িয়ে দেওয়া নোটটি হাতের মুঠোয় পুরে মুচকি হাসল। কানাই কিছুক্ষণ থমথমে মুখে মাহবুবের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘ব্যাপার না। আরেক দান খেলবেন নাকি মশাই? আমাদেরও একটু জেতার সুযোগ করে দিন। নাকি?’

লোকটা জিব কামড়ে ধরে বলল, ‘রাম রাম, আমাকে মাফ করে দেবেন। ব্যবসা ছাড়া অন্যের পকেটে হাত দেওয়া আমাদের নিষেধ আছে। জুয়াখেলা তো আপনাদের ভাষায় এক্কেবারে হারাম।

সহযাত্রী মাড়োয়ারি দুজন এতক্ষণ ঘুমে ঢুলছিল। কানাইয়ের সঙ্গে মাহবুবের কথোপকথন শুনে তারা জেগে উঠেছে। চোখ দুটো টেবিলের ওপর স্থির। তাস তিনটিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছে।

কানাই আবার তাস বাঁটতে শুরু করল। তার আঙুলের গতি আগের চেয়ে জোরদার। চোখে উদ্বেগের চিহ্ন মরে আসা রোদের মতো ম্লান হয়ে লেগে আছে। সে টেবিলে ছড়ানো তাস তিনটিকে অনেকবার অনেকভাবে স্থানান্তর করল। তবে মাহবুবের মনে হলো, এবারে কানাই বড় ভুল করেছে। রুইতনের টেক্কাটি একবার দেখিয়ে ডান দিকে ফেলেছে। তারপর জোকার দুটিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নানা কায়দায় একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে নিয়ে গেছে। বাঁ পাশে একলা পথিকের মতো স্থির হয়ে আছে টেক্কাটি।

অনেকবার কারিকুরি করে কানাই যেন ক্লান্ত হয়ে উঠল। সে বলল, ‘হ্যাঁ, এইবার পয়সা ধরুন।’

মাহবুব তৎক্ষণাৎ সর্ববাঁয়ের তাসটিতে দুই টাকা ধরল। কানাই যেন হতাশায় নুয়ে পড়ল। সে একবার মাহবুবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি নিশ্চিত মাহবুব সাহেব? হেরে গেলে কিন্তু দুই টাকা হারাবেন। আরেকবার ভেবে দেখবেন?’

মাহবুবের অত ভাবাভাবির দরকার ছিল না। সে বলল, ‘আপনি তাস ওলটান। আমার মনে হয় ওটাই টেক্কা।’

কানাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাঁয়ের তাসটি ওলটাল। রুইতনের টেক্কা। সে আড়চোখে একবার স্ত্রীর দিকে তাকাল। ভদ্রমহিলা মূর্তির মতো স্থির হয়ে বসে আছেন। থুতনি পর্যন্ত ঘোমটায় ঢাকা বলে মহিলার মুখের ভাব বোঝা যাচ্ছে না। তবে স্বামীর পরাজয় দেখে নিশ্চয়ই খুশি হননি। পকেট থেকে আরও দুটো টাকা বের করে মাহবুবের দিকে বাড়িয়ে দিল কানাই।

তারপর বেশ খানিকটা সময় কেটে গেল নীরবতায়। কানাই আনমনে তাসগুলো নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করল। শেষ পর্যন্ত সেই নীরবতা ভাঙল। বলল, ‘আরেক দান খেলবেন নাকি, মাহবুব সাহেব?’

কানাইয়ের গলায় একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আঁচ। দুবারের পরাজয় সে যেন কোনোভাবেই মানতে পারছে না। মাহবুব মুচকি হেসে একবার কাঁধ ঝাঁকাতেই কানাইয়ের ছেলেটা প্রথমবারের মতো কথা বলল, ‘বাবা, আমার খুব হিসি পেয়েছে। হিসি করিয়ে দাও।’

কানাই ক্ষমা চেয়ে ছেলেকে নিয়ে উঠে গেল। সে চলে যেতেই মাড়োয়ারি লোকটা গলা খাঁকারি দিয়ে উঠল। মাহবুবের হাত ছুঁয়ে গলা খাদে নামিয়ে বলল, ‘আপনি আগুন নিয়ে খেলছেন, মিয়া সাহেব। আমি লোকটার খেলা আগাগোড়া লক্ষ করেছি। সে ইচ্ছা করে হেরেছে। সে চাইছে, আপনি টাকার অঙ্ক বাড়ান। যেই আপনি বাড়াবেন, অমনি লোকটা হাত সাফাই করে টেক্কাটিকে হাপিস করে দেবে। আপনার পুরো টাকাটাই জলে যাবে।’

মাহবুব হেসে বলল, ‘আমি বড় দানে যাব না। ওনার কাছে যা জিতেছি, সেটাই বারবার ধরব। সময় কাটানোর জন্য খেলছি। পয়সা জেতা আমার উদ্দেশ্য নয়।’

আরও পড়ুন

মাড়োয়ারি লোকটার চোখ যেন কপালে উঠে গেল। সে বন্ধুর মতো এগিয়ে এসে বলল, ‘টাকা হচ্ছে সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। জেতার সুযোগ পেলে কেন জিতবেন না? তা ছাড়া লোকটা সাক্ষাৎ ঠগ। ওকে একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার।’

‘কীভাবে শিক্ষা দেবেন?’

‘এইভাবে,’ বলে লোকটা টেবিল থেকে টেক্কাটি তুলে নিল। একটা কোণ খানিকটা দুমড়ে দিয়ে সে তাসটি আবার টেবিলের ওপর রাখল। কানাইকে জব্দ করা যাবে বলে লোকটার মুখে ঝিকমিক করে উঠল প্রাণখোলা হাসি। সে বলল, ‘এইবারে টেক্কা চিনতে আপনার তেমন কষ্ট হবে না। ওই কোনা দোমড়ানো তাসটিতে পয়সা ধরবেন। মুহূর্তে পয়সা ডাবল হয়ে যাবে।’

মাহবুব কৌতূহল নিয়ে লোকটার কীর্তি দেখছিল। সে একবার কানাইয়ের স্ত্রীর দিকে আড়চোখে তাকাল। মাড়োয়ারি লোকটার দিকে ফিরে বলল, ‘আপনি কেন টাকা ধরছেন না? এবারে আপনিও খেলবেন, চলুন।’

লোকটা জিব কামড়ে ধরে বলল, ‘রাম রাম, আমাকে মাফ করে দেবেন। ব্যবসা ছাড়া অন্যের পকেটে হাত দেওয়া আমাদের নিষেধ আছে। জুয়াখেলা তো আপনাদের ভাষায় এক্কেবারে হারাম। না না, মিয়া সাহেব, আপনি খেলুন। আমি খেলব না।’

লোকটার কথা শেষ হওয়ামাত্র দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল কানাই ও তার ছেলেটি। মাহবুব উদ্বেগের সঙ্গে তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভেবেছিল, কানাই ফেরামাত্র তার স্ত্রী এতক্ষণ যা যা ঘটল, সব বলে দেবে। অমনি কানাই চোখ রাঙিয়ে তার দিকে তেড়ে আসবে। কিন্তু সেটা ঘটল না। মহিলা আগের মতোই স্থির বসে রইল। খোলা জানালা দিয়ে আসা বাতাসে তার ঘোমটা নড়ছে। তা বাদে মহিলা একেবারে স্ট্যাচু।

বিরতির জন্য মাফ চেয়ে কানাই আবার তাস বাঁটতে শুরু করল। মাহবুব ভেবেছিল, কানাই বুঝি তাসের কোনা দোমড়ানোর ব্যাপারটি ধরে ফেলবে। কিন্তু সেটাও ঘটল না। টেক্কাটির কোনা যে নিখুঁত হাতে দুমড়ে দেওয়া, সেটা কানাইয়ের চোখেই পড়ল না। সে কিছুক্ষণ তাসগুলো শাফল করে টেবিলে রাখল। তাস তিনটিকে এদিক-ওদিকে ঘুরিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল, ‘আমাকে পরের স্টেশনে নেমে যেতে হবে, মাহবুব সাহেব। হারি–জিতি, এবারই শেষ। আর খেলার সুযোগ হবে না। আপনি বিবেচনা করে দান ধরুন।’

মাহবুবের চোখের সামনে কোনা দোমড়ানো টেক্কাটি জ্বলজ্বল করছে। তার মনে অপরাধবোধ। এভাবে খেললে কানাইয়ের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে। একটা কাঁটা যেন তার বুকে অনবরত বিঁধছে। এমন সময় মাড়োয়ারি ভদ্রলোকটি তার কানে কানে বলল, ‘এটাই সুযোগ মোটা টাকা জেতার। হেলায় হারাবেন না।’

লোকটার কথা শুনে মাহবুব একবার মাথা নাড়ল। তাস খেলতে বসে একটু-আধটু চুরি সবাই করে। এটা খেলারই অংশ। সে পকেট থেকে পাঁচটি দশ টাকার নোট বের করে ঠিক মাঝখানের তাসটিতে ধরল।

কানাই একবার মাহবুব, আরেকবার মাড়োয়ারি পিতা-পুত্রের দিকে তাকিয়ে তাসটি ওলটাল। টেক্কা নয়! জোকার। মাহবুবের বুকটা একবার ধক করে উঠল। মাসে সে সত্তর টাকা বেতন পায়। তার সিংহভাগই ধরেছিল এবারে। কিছুটা লোভে পড়ে, কিছুটা খেলার উত্তেজনায় আর কিছুটা মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীর প্ররোচনায়। পুরোটাই জলে গেল।

কিন্তু, এটা কী করে সম্ভব? তাসটির কোনা দিব্যি দোমড়ানো। সঙ্গে সঙ্গে কানাইকে নির্দেশ দিল মাহবুব, ‘অন্য তাস দুটো ওলটান। ও দুটোতে কী আছে, আমি দেখতে চাই।’

কানাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে তাস দুটো উল্টে দেখাল। একটি জোকার, অন্যটি সেই রুইতনের টেক্কা।

টেবিল থেকে টেক্কাটি ছোঁ মেরে তুলে নিল মাহবুব। দিব্যি অটুট তার চারদিক। লেশমাত্র দোমড়ানোর চিহ্ন নেই। সে হাঁ হয়ে একবার কানাই, আরেকবার মাড়োয়ারি লোকটির দিকে তাকাল। এ কী করে সম্ভব! টেক্কার চিহ্ন জোকারে গেল কেমন করে। এ কি চতুর কানাইয়ের হাত সাফাই? নাকি এর পেছনে আছে মাড়োয়ারি লোকটির চালাকি? বৃষ্টিভেজা ঠান্ডা বাতাসেও মাহবুবের কপাল ফোঁটা ফোঁটা ঘামে ভিজে উঠল।

আরও পড়ুন

কানাইয়ের চোখেমুখে চাপা আনন্দ ঝিলিক দিয়ে উঠছে। সে মাহবুবের কষ্টে অর্জন করা পঞ্চাশ টাকা পকেটে পুরতে পুরতে বলল, ‘তিন তাস ভাগ্যের খেলা। দুবার আপনি জিতেছেন। এবারে ভাগ্যদেবী আমার দিকে মুখ ফিরে তাকিয়েছেন। তাই আমার কপালে শিকে ছিঁড়েছে। মন খারাপ করবেন না।’

ট্রেনের গতি ততক্ষণে ধীর হয়ে এসেছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন কাশতে কাশতে স্টেশনে থামল। কানাই ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে নেমে গেল। ছোট স্টেশন বলে ট্রেন বেশিক্ষণ দাঁড়াল না। গার্ডের ঘন ঘন বাঁশি সংকেত দিল, ট্রেন আবার ছেড়ে যাবে। লোহার প্রকাণ্ড চাকাগুলো আবারও ঘুরতে শুরু করেছে, এমন সময় মাড়োয়ারি লোক দুটো প্রায় ঝড়ের বেগে ট্রেন থেকে নেমে গেল। অতগুলো টাকা হারিয়ে মাহবুব বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। তার মাথা ভালোভাবে কাজ করার আগেই লোক দুটো প্রায় লাফিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়ল।

লোক দুটো বেরিয়ে যেতেই মাহবুবের তন্দ্রা কাটল। সে হইহই করে উঠল। তার চিৎকার শুনে পাশের কামরা থেকে ইংরেজ গার্ড ছুটে এল। অপ্রস্তুত মাহবুব লক্ষ করল, কানাইয়ের পরিবার ও মাড়োয়ারি লোক দুটো একসঙ্গে হাসতে হাসতে স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

গার্ড বারবার চিৎকার করার কারণ জানতে চাইলেও মাহবুব চুপ করে রইল। তাকে বেহেড মাতাল মনে করে গার্ড বিরক্ত হয়ে ফিরে গেল। হতবিহ্বল হয়ে সিটে বসে পড়ল মাহবুব। অনেক আগুনে পুড়ে নাকি দারোগা হতে হয়। এখনো তার পুড়তে বাকি আছে। আজকের ঘটনাই তার বড় প্রমাণ।

আরও পড়ুন