কাজী শাহনূর হোসেনের গল্প—অন্য ভুবন
শেষ পর্ব
ক্যাবিনেটের দেয়ালটা কেমন যেন স্প্রিংয়ের মতো ঠেকছে। চোখ মেলতেই দেখি যেন গলে যাচ্ছে ওটা।
সাত
‘কী রে, পিপন!’ একটি অতি চেনা কণ্ঠ বলে উঠল।
‘দীপন!’ বললেন দীপনের বাবা। ‘ওহ্, খোদা বাঁচিয়েছেন!’
‘দীপন!’ বললাম আমি। ‘তুমি কি নিজে থেকেই ফিরে আসছিলে?’
ওকে কেমন জানি অপ্রস্তুত দেখাল।
‘বাসার জন্য আমার খুব মন কেমন করছিল,’ জানাল ও। ‘তোমার বাবা খুব ভালোমানুষ, পিপন। সত্যিই খুবই ভালোমানুষ। কিন্তু উনি তো আর আমার বাবা নন। আর এটা আমার পৃথিবীও নয়। আমি আমার বাবাকে ছাড়া থাকব কীভাবে? তা ছাড়া বুঝতে পারছিলাম তোমার মনের অবস্থাও ঠিক আমার মতোই। আঢাকা যদিও ঢাকার মতোই দারুণ একটা শহর আর আমার বাবাও অসাধারণ একজন মানুষ!’
মেডিসিন ক্যাবিনেটের ওপাশে উদয় হয়েছে আমার বাবা।
‘বাবা!’ আনন্দে চিৎকার ছাড়লাম।
‘কী রে, বাপ,’ বলল আমার বাবা। এবার সে দীপনের বাবার দিকে ফিরে চাইল। ‘আরে, শাহেদ না!’ আন্তরিক কণ্ঠে বলে উঠল। ‘কত দিন পর দেখা!’
‘কেমন আছ, রাশেদ?’ দীপনের বাবা উজ্জ্বল হেসে বললেন আমার বাবাকে।
মেডিসিন ক্যাবিনেটের দুপাশ থেকে হাত মেলাল দুজনে।
‘তোমরা একজন আরেকজনকে চেনো নাকি?’ অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করলাম আমি।
‘হ্যাঁ, তোমাদের বয়সে একবার দেখা হয়েছিল আমাদের,’ বললেন শাহেদ আঙ্কেল। ‘তবে সেবার মেডিসিন ক্যাবিনেট নয়, একটা কাঠের আলমারির ভেতর দিয়ে।’
‘হ্যাঁ,’ সায় জানাল আমার বাবা। ‘আমার এক জোড়া মোজা হারিয়ে গিয়েছিল। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সমান্তরাল দুনিয়ায় যে চলে গেছে, কল্পনাও করতে পারিনি।’
‘হুম, সেটা ছিল জব্বর এক উদ্বোধনী দিন,’ খোশমেজাজে বললেন শাহেদ আঙ্কেল। ‘দারুণ মজা হয়েছিল সেবার। তোমার বাবা তো ভেবেছিল আমি বুঝি আলমারিতেই থাকি।’
এবার আমার বাবা আর শাহেদ আঙ্কেল হাসিতে ফেটে পড়লেন।
‘সরি, তোমাদের একটু বাধা দিতে হচ্ছে,’ এ সময় বলে উঠলাম আমি। ‘খুবই মজার কাণ্ড বটে। তবে এখন কিন্তু ৭:৫৬ বাজে।’
‘হ্যাঁ, ঠিক, ঠিক!’ সচকিত কণ্ঠে বললেন শাহেদ আঙ্কেল। ক্যাবিনেট ভেদ করে দীপনের দিকে চাইলেন। ‘তুই কি এখনো আগমনীর খেলা দেখতে যেতে চাস, বাপ?’
‘সে আর বলতে!’ বলল দীপন, উৎসাহে টগবগ করছে।
‘তাহলে দাঁড়া, তোকে টেনে তুলি,’ বললেন শাহেদ আঙ্কেল।
তো দীপন গুড়ি মেরে ফিরে গেল ওর ভুবনে। আর আমি ফিরলাম নিজেরটায়।
‘আমাকে মাফ করে দিয়ো, পিপন,’ বলল দীপন। ‘কাজটা করা আমার একদমই উচিত হয়নি।’
‘কথা সত্যি,’ বললাম। ‘তবে আমি তোমাকে মন থেকে মাফ করে দিয়েছি।’
ক্যাবিনেটের দুপাশেই এখন উবারের হর্নের শব্দ।
‘বিদায়, দীপন, বিদায় আঙ্কেল। ভালো থাকবেন আপনারা,’ বললাম।
‘তোমরাও ভালো থেকো। আবার কখনো হয়তো দেখা হবে,’ বলল দীপন।
‘হয়তো পরের উদ্বোধনের দিন,’ বললাম।
‘হ্যাঁ,’ বলল দীপন।
এবার পকেট হাতড়ে কিছু একটা বের করল ও। ক্যাবিনেটের ভেতর দিয়ে বাড়িয়ে দিল ওটা আমার দিকে। সেই হারানো রিটেইনারটা!
‘ও, তার মানে তুমিই আমার রিটেইনারটা লোপাট করেছিলে?’ জবাব চাইলাম।
বোকার মতো মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানাল ও।
‘কিন্তু জিনিসটা রাখতে পারিনি,’ বলল।
‘কারণ, কাজটা অনুচিত।’
‘হ্যাঁ,’ বলল ও। ‘তা ছাড়া ওটা আমার মুখে ফিটও করেনি।’
এবার আচমকাই আমাদের ড্রয়িংরুমের দেয়ালঘড়িটায় ঘণ্টা বাজতে শুরু করল।
আটটা বাজে।
আমরা পরস্পরকে হাত নেড়ে বিদায় জানালাম। তারপর, দীপন আর শাহেদ আঙ্কেলের বদলে, টুথপেস্ট, টুথব্রাশ আর ডিয়োডোরেন্ট রাখা তাকগুলো দেখতে পেলাম। মেডিসিন ক্যাবিনেটটির পেছনভাগে জোরে চাপ দিলাম। পাগলের মতো কত–কী কল্পনা করলাম। কিন্তু কিছুই ঘটল না।
তো এভাবেই আমি সমান্তরাল জগৎটি আবিষ্কার করি। আর যখনই মেডিসিন ক্যাবিনেট খুলি, সব সময় দীপন আর শাহেদ আঙ্কেলের কথা মনে পড়ে। ওদেরকে আমি আসলে একরকম মিসই করি। কী অদ্ভুত না? ওরা এত কাছে, অথচ তবু কত দূরে!
পরেরবার যখন দীপনের সঙ্গে দেখা হবে, তখন হয়তো আমার নিজেরই একটা ছেলে থাকবে। আজব! ওকে তখন দেখতে কেমন দেখাবে কে জানে। আচ্ছা, ওকে যদি দেখতে হুবহু আমার মতো লাগে, তাহলে দারুণ হয় না? সবকিছু এক রকম, শুধু একটা জিনিস বাদে: আশা করি ওকে তখন আর রিটেইনার পরতে হবে না!
বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে