বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্কুলে শিশুদের কেন বাগান করা শেখানো হয়
স্কুলে ইংরেজিতে শখ নিয়ে প্যারাগ্রাফ লিখতে দিলে কমবেশি সবাই বাগান করা নিয়েই লেখে। কারণ, এই বিষয়ে অনেক কিছু সহজে লেখা যায়। সেখান থেকে অনেকের কাছে বাগান করা শুধু পরীক্ষার টপিক। আবার কারও কাছে এটি বাস্তবেও শখের বিষয়। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের নানা দেশে বাগান করা স্কুলের মূল কারিকুলামের অংশ। নিউজিল্যান্ড, জার্মানি, আমেরিকা সবখানেই এখন শিশুরা হাতে–কলমে শিখছে কীভাবে বীজ রোপণ করতে হয়। কিন্তু কেন হঠাৎ সারা বিশ্বের স্কুলগুলো এমন উদ্যোগ নিচ্ছে? শুধু কি সবজি ফলানো, নাকি এর চেয়েও বড় কোনো কারণের জন্য বাগান করা শেখানো হচ্ছে শিশুদের?
নিউজিল্যান্ড, জার্মানি, আমেরিকা ও জাপানসহ বেশ কিছু দেশ তাদের স্কুলের কারিকুলামে বাগান করা যুক্ত করার আগে এটি নিয়ে গবেষণা চালায়। সেই গবেষণায় দেখা গেছে, হাতে–কলমে শিক্ষা বা প্র্যাকটিক্যাল লার্নিং কেবল পড়া বা মুখস্থ করার চেয়ে অনেক বেশি উপযোগী। এই গবেষণার ফল দেখেই নিউজিল্যান্ডের স্কুলগুলোতে ‘গার্ডেন টু টেবিল’ এবং ‘ওকে’র মতো বিশেষ কর্মসূচি চালু করা হয়। এর মাধ্যমে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখন কেবল খাদ্য উৎপাদন করে এমন না, বরং এর মাধ্যমে দয়ালু হওয়া ও সহানুভূতি বৃদ্ধি করতে শিখছে সেই শিক্ষার্থীরা। তারা আরও শিখছে খাবার কোথা থেকে আসে, কীভাবে টেকসই জীবনযাপন করা যায় এবং দলবদ্ধভাবে কীভাবে কাজ করতে হয়।
এই স্কুলের বাগানগুলোতে যখন অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন হয়, তখন তা নষ্ট না করে স্থানীয় উদ্ধারকেন্দ্র বা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে দান করা হয়। এই কাজে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানান, এই উদ্যোগ বাচ্চাদের একটি অবিশ্বাস্য শিক্ষা দেয়। তা হলো, একটি ছোট্ট বীজের ক্ষমতা এতটাই বেশি যে তা কেবল মানুষের পেট ভরায় না বরং এটি সমগ্র গ্রহকেও পুষ্ট করতে পারে। গত এক দশক ধরে শুধু নিউজিল্যান্ড নয়, জর্জিয়ায় রাজ্যজুড়েও স্কুলের বাগানগুলোর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। একসময় এই বাগানগুলোকে নিছক খাদ্য উৎপাদন শেখানোর উপায় হিসেবে ভাবা হলেও এখন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এই বাগানগুলো এখন শ্রেণিকক্ষের মূল্যবান পাঠ্যক্রমে পরিণত হয়েছে, যার ব্যবহার এখন আর কিছু বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং পাঠ্যক্রমের প্রায় প্রতিটি অংশেই এদের কাজে লাগানো হচ্ছে।
আসলে সারা বিশ্বের স্কুলগুলো কাজটি করছে শুধু সবজি ফলানোর জন্য নয়। এর পেছনে রয়েছে ভবিষ্যতের জন্য অনেক বড় উদ্দেশ্য। জলবায়ু পরিবর্তন বা খাদ্যের অভাবের মতো সমস্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি শিশুরা যেন খাবারের আসল মূল্য বুঝতে পারে, সেটাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। হাতে–কলমে বাগান করার ফলে শিশুরা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে কাজ করার সুযোগ পায়, বুঝতে পারে খাবার তৈরিতে কতটা পরিশ্রম লাগে। ফলে তারা খাবারের অপচয় কম করে এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে আগ্রহী হয়। এ ছাড়া স্মার্টফোন বা স্ক্রিন থেকে দূরে রেখে মানসিক শান্তি ও জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানোর জন্যই এই সবুজ ক্লাসরুমের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বাগান করার বিষয়টি এখন আর কেবল একটি পড়ার বিষয় নেই। বরং এসব দেশে এটি মূলত একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এর গুরুত্ব এত বেড়েছে যে স্কাউট প্রোগ্রামেও বাগান করা নিয়ে বিশেষ ব্যাজ চালু আছে। যে শিশুরা সফলভাবে নিজে বাগান করে ফসল ফলিয়ে দেখাতে পারে, তাদেরই এই বিশেষ ব্যাজটি দেওয়া হয়।
বাংলাদেশেও শিক্ষার্থীদের কৃষিকাজের গুরুত্ব জানাতে শাইখ সিরাজের উপস্থাপনায় প্রচারিত হয় জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ফিরে চল মাটির টানে’। সেখানে তিনি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে–কলমে মাঠে কাজ করার সুযোগ দেন। যা থেকে শিক্ষার্থীরা মাটির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনের বাস্তব জ্ঞান লাভ করে। আমাদের দেশে যেহেতু স্কুলে এখনো বাগান করা যুক্ত হয়নি, সেহেতু আমরা শখ থেকেই এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারি। তুমিও যদি বাগান করে থাকো, তাহলে তোমার অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের চিঠি বা ই–মেইলের মাধ্যমে জানাতে পারো।