দাঁত কেন হাড়ের মর্যাদা পায় না

দাঁতের যত্ন বেশি বেশি নেওয়া প্রয়োজন

দাঁত ও হাড়ের মধ্যে মিল

হুট করে দেখলে দাঁত আর হাড়কে আলাদা করা কঠিন। দুটিই শক্ত, সাদা, ক্যালসিয়ামে ভরপুর। এক্স–রের ছবিতে দেখলেও মনে হতে পারে, দাঁত বুঝি হাড়েরই আরেক রূপ। কিন্তু বিজ্ঞান মনে করে, এই মিলটা শুধু চোখের দেখাতে। ভেতরে দাঁত আর হাড় একেবারেই আলাদা। গঠনটা যেমন আলাদা, কাজেকর্মেও তুমি দুটিকে মেলাতে পারবে না। এমনকি শরীরে হাড় জীবন্ত থাকে, দাঁত না।

দাঁত ও হাড়ের সবচেয়ে বড় মিল হলো দুটিই খনিজে তৈরি শক্ত টিস্যু। ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ফ্লুরাইড ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজ উপাদান মিলে এগুলো স্ফটিকের মতো শক্ত গঠন তৈরি করে। এই কারণে শরীরের অন্য টিস্যুর তুলনায় দাঁত ও হাড় এত শক্ত। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ইউসিএলএর ডেন্টাল স্কুলের অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. এডমন্ড হিউলেট বলেছেন, ‘দুটিই মিনারালাইজড টিস্যু। কিন্তু এরপর এদের আর কোনো মিল নেই।’

কাজের বেলায় পার্থক্য

দাঁত আর হাড়ের আসল পার্থক্য শুরু হয় কাজের বেলায়। দাঁতের প্রধান কাজ খাবার চিবিয়ে ভাঙা, যেন সহজে হজম করা যায়। দাঁত হাড় চিবিয়ে গুঁড়ো করে ফেলতে পারে। পাশাপাশি কথা বলার সময় শব্দ উচ্চারণেও দাঁতের ভূমিকা আছে। খাবার চিবিয়ে ভেঙে ফেলার কারণে দাঁতকে ধরা হয় পরিপাকতন্ত্রের অংশ। অন্যদিকে হাড়ের কাজ একেবারেই আলাদা। হাড় আমাদের শরীরের কাঠামো তৈরি করে, পেশিকে ধরে রাখার জায়গা দেয়, হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে সুরক্ষা দেয়। শুধু তাই না, হাড়ের ভেতরে তৈরি হয় লাল ও সাদা রক্তকণিকা। যেগুলো শরীরের সবখানে অক্সিজেন পরিবহন ও রোগ প্রতিরোধে খুব জরুরি। চোয়ালের হাড় অবশ্য দাঁতকে সাহায্য করে। জায়গামতো ধরে রাখে। চিবানোর কাজে সহায়তা করে। কিন্তু ওরা একসঙ্গে কাজ করলেও ধরনে একেবারে আলাদা।

আরও পড়ুন

দুটির গঠন যেভাবে আলাদা

হাড়ের বাইরের দিকে থাকে পাতলা কিন্তু শক্ত একটি আবরণ
মিডজার্নি

কাজ আলাদা হলে গঠনও আলাদা হওয়ার কথা। দাঁতের সবচেয়ে বাইরের স্তর এনামেল। এটি শরীরের সবচেয়ে শক্ত পদার্থ, কারণ এখানে ক্যালসিয়াম ও ফসফেটের স্ফটিক এত ঘনভাবে সাজানো থাকে যে সহজে ক্ষয় হয় না। এনামেলের নিচে থাকে ডেন্টিন, যা একটু নরম হলেও বেশ শক্ত বলা যায়। ডেন্টিন দাঁতের মূল কাঠামো তৈরি করে এবং এর ভেতরে থাকে সূক্ষ্ম নালি। যেখানে স্নায়ু ও রক্তনালি থাকে। একেবারে ভেতরের অংশটি হলো পাল্প। জেলির মতো নরম টিস্যু। যেখানে স্নায়ু ও রক্তনালি দাঁতকে পুষ্টি জোগায় এবং অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে।

হাড়ের গঠন আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। হাড়ের বাইরের দিকে থাকে পাতলা কিন্তু শক্ত একটি আবরণ। নাম পেরিওস্টিয়াম। এখানেই থাকে রক্তনালি ও স্নায়ু, যা হাড়ের বৃদ্ধি ও ক্ষত সেরে ওঠার জন্য জরুরি। এর নিচে থাকে কমপ্যাক্ট বোন। হাড়ের ঘন ও মজবুত স্তর। আর ভেতরে থাকে ক্যানসেলাস বা স্পঞ্জি বোন, যেখানে অসংখ্য ছোট ফাঁকফোকর থাকে। এই অংশেই থাকে বোনম্যারো। এখানে নতুন রক্তকণিকা তৈরি হয়।

আরও পড়ুন

একটি জীবিত, অন্যটি মৃত

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, হাড় জীবিত, দাঁত নয়। হাড়ের ভেতর ও বাইরের অংশজুড়ে থাকে রক্তনালি, স্নায়ু এবং জীবিত কোষ। দাঁত গঠিত হয় গর্ভাবস্থায় ও শৈশবে। এতে সাহায্য করে বিশেষ দুই কোষ, অ্যামেলোব্লাস্ট ও ওডোন্টোব্লাস্ট। এই কোষ এনামেল ও ডেন্টিন তৈরি করে। কাজ শেষ হলে এই কোষগুলো মারা যায়। তাই একবার দাঁতের এনামেল বা ডেন্টিন ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর নতুন করে ঠিক হয় না। দাঁতের ভেতরের পাল্প জীবন্ত হলেও বাইরের এই শক্ত স্তরগুলো পুনর্গঠিত হতে পারে না।

হাড়ের ক্ষেত্রে ঘটনাটা একেবারেই বিপরীত। হাড় সব সময় নতুন করে তৈরি হতে থাকে। এতে থাকে অস্টিওব্লাস্ট ও অস্টিওক্লাস্ট নামের কোষ। একটি নতুন হাড় তৈরি করে, অন্যটি পুরোনো হাড় ভেঙে ফেলে। এই অবিরাম কাজের কারণেই হাড় ভাঙলে সেরে ওঠে। শরীরের ওপর চাপ বা কাজের ধরন বদলালে হাড়ও ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয়। মজার ব্যাপার হলো, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রায় পুরো কঙ্কালটা প্রায় প্রতি ১০ বছরে একবারে বদলে যায়।

তাই হাড়ের যত্নের তুলনায় আমাদের দাঁতের যত্ন আরও বেশি নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, হাড় জীবিত। দাঁত একবার নষ্ট হলে আর ফিরে আসে না। দেখতে দুটির মধ্যে যত মিলই থাকুক না কেন।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন