ঘরের ভেতরে রাখার জন্য এই পাঁচটি গাছের কথা ভাবতে পারো
বাড়ি থেকে বের হলে ধুলা আর দূষণের চাপে নিশ্বাস নিতেই কষ্ট হয়। ট্রাফিক জ্যামে বসে কালো ধোঁয়ার মাঝে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো যেন নগরবাসীর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। বাড়িতে ফিরেও পুরোপুরি মুক্তি মেলে না—চারপাশের বাতাসেই যেন লুকিয়ে থাকে বিষাক্ত ধূলিকণা। এখন ঢাকা শহরের প্রতিটি কোণে ধুলা, ময়লা আর ধোঁয়ার আধিপত্য। বিভাগীয় শহরগুলোর অবস্থাও যে খুব একটা ভালো, তা নয়। আমাদের ধূসর শহরে গাছের সংখ্যা দিন দিন কমছে। নতুন বিল্ডিং, রাস্তাঘাট আর বসতি গড়তে কেটে ফেলা হচ্ছে পুরোনো গাছ। আজ শহরের ভেতরে সবুজের ছোঁয়া পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু আমাদের কি গাছের সান্নিধ্য একেবারেই হারিয়ে ফেলতে হবে? ছোট ছোট ফাঁকা জায়গায়, বারান্দায় বা ঘরের কোণেও এমন কিছু গাছ রাখা যায়, যেগুলো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে এবং আমাদের মলিন জীবনে এনে দেয় সতেজতার ছোঁয়া। চলো, এমন পাঁচটি ইনডোর গাছের খোঁজ করি, যারা আমাদের জীবনে একটু হলেও সবুজের স্নিগ্ধতা ফিরিয়ে আনতে পারে।
১. পিস লিলি, কম আলোতেও মানিয়ে নিতে পারে যে ফুল গাছ
পিস লিলি নাম শুনে হয়তো তোমার লিলি ফুলের কথা মনে হয়েছে। কিন্তু আসলে এই ফুল লিলি প্রজাতির নয়। আকৃতি ও রঙে লিলির মতো হওয়ায় এ গাছের নাম পিস লিলি রাখা হয়েছে। শুভ্র সাদা ফুল আর চকচকে সবুজ পাতার এই গাছ শুধু ঘর সাজানোর জন্যই নয়, বাতাস পরিশোধনেও কার্যকর। আমাদের চোখে অদৃশ্য বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস, যেমন ফরমালডিহাইড ও বেনজিন শুষে নিয়ে বাতাসকে বিশুদ্ধ রাখতে সাহায্য করে পিস লিলি। বাসা, অফিস বা যেকোনো ইনডোর জায়গায় এই গাছ অনায়াসে মানিয়ে নিতে পারে। স্ট্যান্ডার্ড পিস লিলি সাধারণত ১ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়, তবে এর ছোট ও বড় জাতও রয়েছে। পিস লিলির আরেকটি ভালো দিক হলো, এই গাছের বেশি আলো প্রয়োজন হয় না। তবে অতিরিক্ত পানি বা একেবারে কম পানি—দুটোই গাছটির জন্য ক্ষতিকর। তাই টবের মাটি শুকিয়ে এলে তবেই এই গাছে পানি দেওয়া উচিত। যদি তুমি কম পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা, সুন্দর ও কার্যকর কোনো ইনডোর গাছ খুঁজে থাকো, তবে পিস লিলি গাছটি থাকতে পারে তোমার পছন্দের তালিকায়।
২. রাবারগাছ, যে গাছ ইনডোর কিংবা আউটডোর—দুই জায়গাতেই চ্যাম্পিয়ন
রাবার গাছ শুনলেই অনেকের মাথায় আসে ১০-১৫ ফুট লম্বা বিশাল বিশাল গাছের ছবি। তোমরা কেউ কেউ হয়তো রাবারবাগান ঘুরেও দেখেছ। প্রকৃতিতে দানবীয় আকৃতি ধারণ করতে পারা রাবারগাছ ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবেও জনপ্রিয়। এই গাছ বাতাস থেকে ফরমালডিহাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস শুষে নিয়ে বাতাস শুদ্ধ করতে সাহায্য করে। গাঢ় সবুজ পাতা সমৃদ্ধ রাবারগাছের দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সুনাম রয়েছে। রাবারগাছ সাধারণত সূর্যের আলোতে ভালোভাবে বেড়ে ওঠে, তবে কম আলোতেও এটি বেঁচে থাকতে পারে। আবার একদম অন্ধকারে এই গাছ টিকে থাকতে পারে না। রাবারগাছের যত্ন নেওয়া সহজ, সপ্তাহে একবার পানি দিলেই যথেষ্ট। তবে এই গাছ অতিরিক্ত পানি পছন্দ করে না। যত্ন নিলে ইনডোর পরিবেশে রাবারগাছ ৩ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত বড় হতে পারে। তুমি চাইলে গাছটিকে ছেঁটে ছোট রাখতেও পারবে। যদি কেউ সহজে বড় হয় এবং বাতাস বিশুদ্ধ করতে পারে—এমন গাছ খোঁজে, তবে একটি রাবারগাছ তার জন্য একদম ‘পারফেক্ট’ হবে।
৩. কাস্ট আয়রন প্ল্যান্ট, লোহার মতোই সহনশীল গাছ
কাস্ট আয়রন প্ল্যান্টের নামের মধ্যেই আছে এর বিশেষত্ব—এই গাছ লোহার মতোই সহনশীল। ভালো যত্ন পেলে একটি কাস্ট আয়রন প্ল্যান্ট ১০০ বছরের বেশি বাঁচতে পারে! কম আলো, কম পানি বা কম যত্ন—সবকিছুতেই মানিয়ে নিতে পারে এই গাছ। শুধু টিকে থাকাতেই নয়, বাতাস বিশুদ্ধ করাতেও বেশ পারদর্শী কাস্ট আয়রন প্ল্যান্ট। এটি বাতাস থেকে কার্বন মনোক্সাইড ও অ্যামোনিয়ার মতো ক্ষতিকর গ্যাস শুষে নিতে পারে। কাস্ট আয়রন প্ল্যান্টের মোমের মতো চকচকে পাতা ধুলাবালু প্রতিরোধ করতে পারে, তাই গাছটি সহজেই পরিষ্কার থাকে। প্রায় কোনো আলো ছাড়াই গাছটি বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু বেশি পানি এই গাছের জন্য ক্ষতিকর। তাই টবের মাটি একেবারে শুকিয়ে গেলে তবেই পানি দেওয়া লাগে। কাস্ট আয়রন গাছের বৃদ্ধি বেশ ধীরগতিতে হয়। সারা বছর খুব বেশি হলে দু-তিনটি নতুন পাতা গজায়। সম্পূর্ণ আকারে এটি ২-৩ ফুট লম্বা হয় এবং কিছুটা ছড়ানো প্রকৃতির হওয়ায় প্রায় একই পরিমাণ জায়গাজুড়ে থাকে। এই গাছ অবহেলায়ও দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। তাই যারা একদম নির্ঝঞ্ঝাট কোনো গাছ খুঁজছে, তারা চাইলেই একটি কাস্ট আয়রন প্ল্যান্ট বেছে নিতে পারে।
৪. স্নেক প্ল্যান্ট, যে গাছ রাতে অক্সিজেন উৎপন্ন করে
ছবি: ভিন্ন ভিন্ন জাতের তিনটি স্নেক প্ল্যান্ট, আইস্টক
সাধারণত গাছ দিনের বেলা বাতাস থেকে কার্বন ডাই–অক্সাইড শোষণ করে এবং সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে অক্সিজেন উৎপন্ন করে। কিন্তু রাতে তারা ঠিক উল্টোটা করে—শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং বাতাসে কার্বন ডাই–অক্সাইড ছাড়ে। তবে স্নেক প্ল্যান্ট ব্যতিক্রম। এই গাছ দিনের বেলায় শ্বাসপ্রশ্বাস করে, আর রাতে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে অক্সিজেন ছাড়ে। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি শোবার ঘরে রাখার জন্য আদর্শ। কারণ, এই গাছ সারা রাত ঘরের বাতাসে অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে। শুধু তা–ই নয়, স্নেক প্ল্যান্ট বাতাস থেকে ফরমালডিহাইড, বেনজিন ও জাইলিনের মতো ক্ষতিকর গ্যাস শুষে নিতেও সক্ষম। এই গাছ অত্যন্ত সহনশীল—১০-১৫ দিন পরপর পানি দিলেই চলে। তা ছাড়া একেবারে অন্ধকারে না রাখা হলে এটি প্রায় যেকোনো পরিবেশেই মানিয়ে নিতে পারে। ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে স্নেক প্ল্যান্ট সাধারণত ১ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত বাড়ে। তবে বাইরে লাগানো হলে এর কিছু জাত ৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ধীরগতিতে বাড়ার কারণে এটি ছোট জায়গাতেও সহজেই মানিয়ে নেয়। কিন্তু একটা গাছকে এভাবে ‘স্নেক’ নাম দেওয়া হয়েছে কেন? এর কারণ স্নেক প্ল্যান্টের পাতার আকৃতি। সরু, লম্বাটে ও খাড়া এই পাতাগুলোর গায়ে এমন এক ধরনের নকশা থাকে, যা দেখতে অনেকটা সাপের চামড়ার মতো লাগে। সেই কারণেই একে স্নেক প্ল্যান্ট বলা হয়। যদি ঘরের কোণে সুন্দর ও কার্যকর একটি গাছ রাখতে চাও, তাহলে স্নেক প্ল্যান্টের যেকোনো জাত নিজের সুবিধামতো বেছে নিতে পারো।
৫. অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারী, একই গাছের হরেক রকম রূপ
অ্যালোভেরাগাছের নাম শুনেছ নিশ্চয়ই। এর একটি সুন্দর বাংলা নামও আছে—ঘৃতকুমারী। এই একটি গাছের যে কত গুণ আছে! অ্যালোভেরা যেমন প্রসাধনী হিসেবে জনপ্রিয়, তেমনি এর জেলি–জাতীয় রস কাটা-পোড়ার ওপর ওষুধের মতো কাজ করে। তবে এর উপকারিতা এখানেই শেষ নয়, অ্যালোভেরা ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবেও দারুণ। কারণ, এই গাছ বাতাস পরিশোধনে ভূমিকা রাখে। এটি বাতাস থেকে কার্বন মনোক্সাইড ও অ্যামোনিয়ার মতো ক্ষতিকর গ্যাস শুষে নিতে পারে। অ্যালোভেরার নতুন চারা খুব সহজেই জন্ম নেয়। তাই এটি দ্রুত ছড়িয়েও পড়তে পারে। সাধারণত এর পুরু, রসালো পাতাগুলো পাতলা কাঁটাযুক্ত এবং সবুজ রঙের হয়ে থাকে। কিছু জাতের অ্যালোভেরার নির্যাস দিয়ে শরবত বানিয়ে খাওয়াও যায়। এর শরবত হজমশক্তি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে সাবধান! সব জাতের অ্যালোভেরা খাওয়ার উপযোগী নয়। তাই কোনো অ্যালোভেরা খাওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া জরুরি। সূর্যের আলোতে অ্যালোভেরাগাছ ভালোভাবে বেড়ে ওঠে, তবে এটি কম আলোতেও টিকে থাকতে পারে। পানি দেওয়ার ক্ষেত্রেও ঝামেলা কম—সাধারণত এই গাছে সপ্তাহে একবার পানি দিলেই যথেষ্ট। তুমি যদি সহজেই অ্যালোভেরার সব উপকারিতা পেতে চাও, তবে নিজের কাছে একটি অ্যালোভেরাগাছ রাখাতেই পারো।
শেষ কথা
তোমরা নিশ্চয়ই টের পাচ্ছ, দিনে দিনে তাপমাত্রা আর গরম বেড়েই চলেছে। এই অসহ্য গরম মূলত জলবায়ু পরিবর্তনেরই ফল। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করতে সারা বিশ্বের মানুষকে একত্র হয়ে উদ্যোগ নিতে হবে, এটা যেমন ঠিক, তেমনি আমাদের ব্যক্তিগতভাবেও সচেতন হতে হবে। সেই সচেতনতারই একটি সহজ ধাপ হতে পারে গাছ লাগানো এবং গাছের যত্ন নেওয়া। তাই বাইরে গাছ লাগানোর পাশাপাশি আমরা চাইলে নিজেদের ঘরে এমন কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট রাখতে পারি। এতে যেমন আমাদের চারপাশে একটু সবুজের ছোঁয়া আসবে, তেমনি গাছের পরিচর্যায় আমাদের আগ্রহও বাড়বে। হয়তো এভাবেই একদিন আমরা গাছ লাগানোকে শুধু শখ নয়, বরং দায়িত্ব হিসেবেও গ্রহণ করব।