আয়ারল্যান্ডের যে গ্রামে স্মার্টফোন ছাড়া শিশুরা বড় হচ্ছে

আজকাল শিশুদের হাতে স্মার্টফোন থাকাটা খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের গ্রেস্টোনস নামের একটি ছোট শহরের চিত্র একদম আলাদা। সেখানকার শিশুরা স্মার্টফোন ছাড়াই তাদের শৈশব কাটাচ্ছে। শুনতে অবাক মনে হলেও এই শহরের অভিভাবক ও শিক্ষকেরা মিলে শিশুদের জন্য এক বিশেষ পরিবেশ তৈরি করেছেন।

ছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

১২ বছর বয়সী বোডি ম্যাঙ্গান গিসলার মনে করে, স্মার্টফোন বেশ দরকারি একটি যন্ত্র। সে পুরোনো মুদ্রা সংগ্রহ করতে পছন্দ করে। কোনো বিশেষ মুদ্রার দাম কত বা সেটি কী ধাতু দিয়ে তৈরি, তা জানার জন্য সে মাঝেমধ্যে তার মায়ের ফোন ব্যবহার করে তথ্য খুঁজে নেয়।

সাধারণত এই বয়সের ছেলেমেয়েরা নিজের জন্য আলাদা ফোন চায়। কিন্তু বোডি তেমন নয়। সে দীর্ঘজীবী হতে চায় ও সুস্থ থাকতে চায়। বোডির ভয় হলো, স্মার্টফোন তার এই লক্ষ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সে মনে করে, ফোনে একবার গেম ডাউনলোড করলে সে হয়তো সারাক্ষণ গেম খেলবে ও অন্য সব কাজে মনোযোগ হারাবে।

বোডির বন্ধু চার্লি হেসও একই কথা মনে করে। সেও মুদ্রা সংগ্রহ করতে পছন্দ করে। চার্লি চায় ১৫ বা ১৬ বছর বয়সের আগে নিজের স্মার্টফোন না নিতে। তার মতে, ফোনের চেয়েও ভালো অনেক কাজ করার আছে।

আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরের দক্ষিণে উপকূলীয় এলাকা গ্রেস্টোনসের শিশুরা একটু অন্য রকম। ২০২৩ সালে সেখানকার অভিভাবক, স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা মিলে একটি বিশেষ উদ্যোগ নেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, ছোট শিশুদের হাতে স্মার্টফোন বা কোনো স্মার্ট যন্ত্র দেবেন না। কর্মশালা ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁরা শিশুদের ওপর প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছেন।

আরও পড়ুন

তিন বছর পার হলেও গ্রেস্টোনসের বাসিন্দারা দাবি করেন না যে তাঁরা সব সমস্যা দূর করে ফেলেছেন। তবে তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে পেরেছেন। কোনো একটি শিশুর স্মার্টফোনে আসক্তি একা দূর করা সম্ভব নয়। যখন পুরো শহর মিলে এই চেষ্টা করে, তখন শিশুরা আর এই অজুহাত দিতে পারে না যে ‘সবারই তো ফোন আছে, আমার কেন নেই?’

আইরিশ সংসদের সদস্য ও চার সন্তানের মা জেনিফার হুইটমোর বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি একটি সম্মিলিত সমস্যা। তাই সবাই মিলে একসঙ্গে এর মোকাবিলা করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

১২ বছর বয়সী বোডি ম্যাঙ্গান গিসলার মনে করে, স্মার্টফোন বেশ দরকারি একটি যন্ত্র। সে পুরোনো মুদ্রা সংগ্রহ করতে পছন্দ করে
ছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

‘ইট টেকস আ ভিলেজ’ নামের এই আন্দোলনটি ২২ হাজার বাসিন্দার ছোট শহর গ্রেস্টোনসের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়েছে। আয়ারল্যান্ডে গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যাপলের মতো বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের প্রধান অফিস থাকা সত্ত্বেও সেখানকার শিশুদের স্মার্টফোনে আসক্তি কমানোর এই চেষ্টা সবার নজর কেড়েছে। দেশটিতে সাধারণত শিশুরা ৯ বছর বয়সেই প্রথম স্মার্টফোন পায়। এই উদ্যোগটি স্থানীয় দোকানদার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের মনেও বেশ সাড়া ফেলেছে।

গ্রেস্টোনসের এই সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ডেইজি গ্রিনওয়েল নামের একজন নারী ব্রিটেনে স্মার্টফোন ফ্রি চাইল্ডহুড বা স্মার্টফোনমুক্ত শৈশব নামের একটি সংগঠন তৈরি করেন। তিনি মনে করেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজের এই সংস্কৃতি পরিবর্তন করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

আয়ারল্যান্ডের বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী সাইমন হ্যারিস নিজেও এই প্রকল্পটির শুরুতে সাহায্য করেছিলেন। তিনি গ্রেস্টোনস শহরের একজন অভিভাবক। সম্প্রতি এক পোস্টে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এটি একধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা কোনোভাবেই চলতে দেওয়া যায় না।

গ্রেস্টোনসের এই সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ডেইজি গ্রিনওয়েল নামের একজন নারী ব্রিটেনে স্মার্টফোন ফ্রি চাইল্ডহুড বা স্মার্টফোনমুক্ত শৈশব নামের একটি সংগঠন তৈরি করেন
ছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

সেন্ট প্যাট্রিকস ন্যাশনাল স্কুলের প্রধান শিক্ষক র‍্যাচেল হার্পার এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি মনে করেন, শিশুদের প্রযুক্তির দুনিয়ায় হুট করে ডুব না দিয়ে বরং ধীরে ধীরে এর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় দেওয়া উচিত।

কোভিড লকডাউনের পর শিশুরা যখন স্কুলে ফিরল, তখন থেকেই ইট টেকস আ ভিলেজ নামের এই উদ্যোগের চিন্তা শুরু হয়। মিসেস হার্পার লক্ষ করেন, অনেক শিশু স্কুলে আসতে চাইত না বা কান্নাকাটি করত। অন্য শিক্ষকেরাও দেখেন যে শিশুরা রাতে ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে না, ক্যালরি মাপার অ্যাপ নিয়ে ব্যস্ত থাকছে বা ইন্টারনেটের কোনো মেসেজ নিয়ে চিন্তিত থাকায় ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছে না।

টেম্পল ক্যারিগ স্কুলের শিক্ষক ইওগান ক্লিয়ারি এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা ইন্টারনেটে মারামারি বা মানুষের ওপর নির্যাতনের দৃশ্য দেখে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। প্রায় ৮০০ জন অভিভাবকের ওপর চালানো একটি জরিপে দেখা যায়, অর্ধেকের বেশি শিশু সব সময় দুশ্চিন্তায় ভোগে ও তাদের মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন। এসব দেখেই শহর কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

আরও পড়ুন

রস ম্যাকপারল্যান্ড নামের একজন স্থানীয় বাসিন্দা এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন। তিনি ‘গ্রেস্টোনস টাউন টিম’–এর সাহায্য নেন, যারা সাধারণত উৎসবের আয়োজন করে। প্রকল্পের শুরুতে একটি বড় সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে আয়ারল্যান্ডের তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।

দুই সপ্তাহ পর এলাকার আটটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকেরা মিলে অভিভাবকদের কাছে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে অনুরোধ করা হয়, শিশুরা যেন ১২ বছর বয়সে হাইস্কুলে যাওয়ার আগে তাদের হাতে স্মার্টফোন দেওয়া না হয়। প্রায় ৭০ শতাংশ অভিভাবক এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে স্বাক্ষর করেন। এভাবেই পুরো শহর শিশুদের সুন্দর শৈশব ফিরিয়ে দিতে একজোট হয়। গ্রেস্টোনস শহরটি এই ধরনের উদ্যোগের জন্য উপযুক্ত ছিল। এখানে খেলার মাঠ ও ইয়ুথ ক্যাফের মতো জায়গা আছে, যেখানে কিশোর-কিশোরীরা একে অপরের সঙ্গে সরাসরি আড্ডা দিতে পারে।

দেশটিতে সাধারণত শিশুরা ৯ বছর বয়সেই প্রথম স্মার্টফোন পায়
ছবি: ফোন লকার

২০২৫ সালের একটি জরিপ অনুসারে, ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী অনেক আইরিশ শিশু অনলাইনে ক্ষতিকর বিষয়বস্তু বা ভয়ের সম্মুখীন হয়েছে। ৬৩ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তারা অনলাইনে কী করছে, তা তাদের বাবা-মা জানেন না। এ সমস্যা দূর করতে গ্রেস্টোনসে বিভিন্ন কর্মশালা, পডকাস্ট ও ফোনমুক্ত বিচ পার্টির আয়োজন করা হয়। এর ফলে অভিভাবকদের ওপর সন্তানদের স্মার্টফোন কিনে দেওয়ার চাপ কমে গেছে। শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, শিশুরা এখন ক্লাসে আগের চেয়ে বেশি মনোযোগী ও তারা বাইরে খেলাধুলা ও সামাজিক কাজে বেশি সময় দিচ্ছে।

আন্দোলনটি এখন ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য নিনা কারবেরি গ্রেস্টোনসের এই মডেলে মুগ্ধ হয়ে এটি পুরো ইউরোপে চালুর পরিকল্পনা করছেন।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন