কাগজের অসাধারণ শিল্প অরিগ্যামি
একটা সাধারণ কাগজ দিয়ে তুমি কী কী বানাতে পারো? কাগজের নৌকা, কাগজের বিমান? কিন্তু তুমি কি জানো, কাগজ দিয়ে আরও হাজার রকমের চমৎকার জিনিস বানানো যায়? পাখি, প্রজাপতি, তারা, এমনকি জটিল স্থাপত্যও! এই শিল্পের নাম অরিগ্যামি। সারা পৃথিবীতে এখন অরিগ্যামি জনপ্রিয়। চলো, আজ এই প্রাচীন শিল্পের গল্প জানি।
অরিগ্যামি আসলে কী?
অরিগ্যামি হলো কাগজ ভাঁজ করে দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক আকৃতি তৈরির শিল্প। এতে আঠা বা টেপ লাগানো যায় না। কোনো কাঁচিও ব্যবহার করতে পারবে না। শুধু হাতের সাহায্যে কাগজ ভাঁজ করে নানা ধরনের আকৃতি বানাতে হয়। এই আকৃতি বানাতে ব্যবহৃত হয় বিশেষ ধরনের কাগজ। এগুলো প্রিন্টারের কাগজের চেয়ে পাতলা।
অরিগ্যামির অনেক ধরন আছে। যেমন মডুলার অরিগ্যামিতে অনেকগুলো ছোট টুকরা আলাদা করে বানিয়ে সেগুলোকে একটার সঙ্গে আরেকটা জুড়ে একটা বড় জিনিস বানাতে হয়।
আবার ওয়েট ফোল্ডিং নামেও একটা দারুণ কৌশল আছে। এতে কাগজটাকে সামান্য ভিজিয়ে নরম করে নেওয়া হয়। এতে কাগজকে গোলাকার আকার দেওয়া যায়। তারপর কাগজ শুকিয়ে গেলে আবার শক্ত হয়ে যায়।
অরিগ্যামির শুরু কোথায়
পনেরো শতকের আগের অরিগ্যামির ইতিহাস ঠিকভাবে জানা যায় না। তবে আমরা এটা জানি, ১০৫ খ্রিষ্টাব্দে চীনে প্রথম কাগজ আবিষ্কৃত হয়। সেই কাগজ জাপানে পৌঁছায় ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে। এর কিছুদিন পর থেকে হয়তো এই অরিগ্যামিশিল্প শুরু হয়।
অরিগ্যামির সবচেয়ে পুরোনো ইতিহাসের উল্লেখ পাওয়া যায় ১৬৮০ সালে, জাপানি লেখক ইহারা সাইকাকুর কবিতায়। জাপানে এদো যুগে (১৬০৩-১৮৬৮) কাগজের দাম অনেক কমে গেলে এই শিল্প সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। শুধু জাপানই নয়, জাপানের বাইরেও শুরু হয় অরিগ্যামিশিল্প।
যেভাবে অরিগ্যামি জনপ্রিয় হলো
সতেরো শতকের মধ্যে ইউরোপে ন্যাপকিন ভাঁজের শিল্প জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া কিন্ডারগার্টেনের উদ্ভাবক ছিলেন ফ্রিড্রিশ ফ্রোবেল নামে একজন জার্মান ব্যক্তি। ১৭৮২-১৮৫২ সাল পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন। শিক্ষার অনুশীলন হিসেবে অরিগ্যামিশিল্পকে সমর্থন করতেন ফ্রোবেল। উনিশ শতকে এই ধারণাগুলো জাপানেও ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এই শিল্পকে যিনি অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান, তাঁর নাম আকিরা ইয়োশিজাওয়া। তাঁকে আধুনিক অরিগ্যামির গ্র্যান্ডমাস্টার বলা হয়। ১৯৫০-এর দশকে তিনিই ওয়েট ফোল্ডিং কৌশলটি আবিষ্কার করেন। ১৯৫৭ সালে অরিগ্যামির দারুণ সব ডিজাইন নিয়ে একটা বই প্রকাশ করেন। সেই বই সারা বিশ্বে হইচই ফেলে দেয়।
অরিগ্যামি শব্দটা যেভাবে এল জাপানি শব্দ ‘ওরি’ মানে ভাঁজ এবং ‘কামি’ মানে কাগজ।
সারা বিশ্বে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ল
লিলিয়ান ওপেনহাইমার নামে একজন অরিগ্যামিপ্রেমী যুক্তরাষ্ট্রে এই শিল্পকে আরও জনপ্রিয় করতে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৫৮ সালে তিনি অরিগ্যামি সেন্টার অব আমেরিকা নামে একটি সংস্থা খোলেন। প্রতিবছর এই সংস্থা নিউইয়র্কের জাদুঘরে ক্রিসমাস ট্রি সাজায়। সেই ট্রি বা গাছে ঝোলানো থাকে হাজার হাজার অরিগ্যামির বানানো জিনিস।
শুধু শিল্প বা খেলা নয়, অরিগ্যামি এখন বিজ্ঞানকেও পথ দেখাচ্ছে। ব্রিজ, চিকিৎসার যন্ত্রপাতি, এমনকি নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো বিশাল যন্ত্রকেও অরিগ্যামির মতো ভাঁজ করে রকেটের ভেতর ঢোকানো হয়েছিল। পরে মহাকাশে গিয়ে সেই যন্ত্র ডানা মেলেছে!
এখন কি তুমিও অরিগ্যামি বানাতে চাও? তাহলে চোখ রাখতে পারো কিশোর আলোয়। কিআ কিন্তু নিয়মিত অরিগ্যামি ছাপে!
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অরিগামি কাগজের সারস তৈরি করেছিল জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এর ডানা দুটি ছিল ২৬৮ ফুটের বেশি চওড়া!
জনপ্রিয় ডিজাইন
অরিগ্যামি দিয়ে হাজার রকমের জিনিস বানানো যায়। তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় তিনটার কথা জানা যাক।
ঘুঘু
এই পাখিটি শান্তির প্রতীক। একটা কাগজকে কয়েকবার ভাঁজ করেই ঘুঘু বানানো যায়। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় যে অরিগ্যামি ঘুঘু বানানো হয়েছে, সেটা প্রায় ১০ ফুট চওড়া ছিল।
তারা
এই আট কোনা তারাগুলো অরিগ্যামির খুব জনপ্রিয় ডিজাইন। এগুলো দেখতে নিনজাদের ছোড়া তারার মতো। তাই এগুলোকে নিনজা স্টারও বলে। জাপানি ভাষায় এর নাম শুরিকেন। এর অর্থ ‘হাতে লুকানো তলোয়ার’।
প্রজাপতি
যারা নতুন অরিগ্যামি শিখছ, তাদের জন্য এই প্রজাপতির ডিজাইনটা অনুশীলন করা ভালো। অরিগ্যামির প্রজাপতি নিয়েও একটা বিশ্ব রেকর্ড আছে। ২০২৪ সালে জাপানের সুগায়া এলিমেন্টারি স্কুল ৪২ হাজার ৫১৬টি প্রজাপতি বানিয়ে প্রদর্শন করেছিল।