অবশেষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজেকে প্রমাণ করলেন রুট

সিডনিতে ৪১তম টেস্ট সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন জো রুটএএফপি

অ্যাশেজ শুরুর কিছুদিন আগের কথা। ‘বার্মি আর্মি’ (ইংলিশ সাপোর্টার গ্রুপ) দাবি করেছিল, জো রুট টেস্ট ক্রিকেটে অমরত্ব পাবেন এই সিরিজ দিয়েই। অজি সমর্থকেরা সে দাবি উড়িয়ে দিয়েছিল এক তুড়িতেই। জো রুটের ঝুলিতে রেকর্ডের পরিমাণ কম নেই। কিন্তু যাঁর ঝুলিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মাঠে গিয়ে একটা সেঞ্চুরি নেই, তাঁকে কীভাবে সেরা বলা চলে? জো রুট যেন সেই আলোচনার জবাব দিলেন নিজের ব্যাটে।

জো রুটের ক্যারিয়ারকে ঠিক দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটা অংশ হবে কোভিড-পূর্ববর্তী রুট। সেই রুটের হাতে স্ট্রোক ছিল, রানও ছিল হাতে। কিন্তু জো রুট নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের বাকি দশটা ব্যাটসম্যানের মতো। ক্যারিয়ারটা আটকে ছিল সাদামাটা হয়ে। বাকিদের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন বটে কিন্তু ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়ার মতো নয়। সেই রুট নিজের পুরো ভোল পাল্টে ফেললেন কোভিডের পর। ২০২১ অ্যাশেজ থেকে যেন এক নতুন রুটকে চোখে পড়ল বিশ্বের। এই রুট সাদামাটা নন, তাঁর ক্যারিয়ার গড়তে চান নিজের নামে। ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখে যেতে চান স্বর্ণাক্ষরে। লাল বলে নিজের প্রস্তুতি সেরেছেন ঠিক সেভাবেই।

২০১৯ সালের পর থেকেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে আস্তে আস্তে নিজেকে সরিয়ে এনেছেন রুট। টি-টোয়েন্টির রং শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলে সময় দিয়েছেন লাল বলে। লম্বা সময়ের কোভিড বিরতি বদলে দিয়েছিল তাঁর প্রস্তুতিও। ধৈর্যের যে পরীক্ষা দিয়েছিলেন নিজের সঙ্গে নিজের, তার প্রমাণ মিলেছে মাঠে।

আরও পড়ুন

কোভিড-পূর্ববর্তী রুট খেলেছিলেন ৯৭ টেস্ট। প্রায় ৪৮ গড়ে তাঁর রান ছিল ৭৮২৩, ঝুলিতে ছিল ১৭ সেঞ্চুরি। আট বছর ধরে নিয়মিত টেস্ট খেলা কারও জন্য রেকর্ডটা ঈর্ষণীয়ই বটে। কিন্তু পরবর্তী চার বছরে রুট যা করেছেন, তা বদলে দিয়েছে বাকি চিত্র। ক্রিকেটে রুট নিজেকে প্রমাণ করেছেন এই চার বছরে। ৬৬ টেস্টে ৫৬ গড়ে ৬১১৪ রান, সেঞ্চুরির সংখ্যা ২৪! অ্যালিস্টার কুককে তো ছাড়িয়ে গিয়েছিলেনই, সঙ্গে ছাড়িয়ে গিয়েছেন সমসাময়িক সবাইকে।

কিন্তু জো রুট আটকে ছিলেন একটা জায়গাতেই—চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়া। যাদের সঙ্গে ইতিহাসের শুরু থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তাদের বিপক্ষেই জো রুট যেন হারিয়ে যান। অস্ট্রেলিয়া যেন এক গোলকধাঁধা, যার সমাধান জানা নেই রুটের। এই বছরের আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাঁর রান ছিল ১৪ ম্যাচে ৮৯২, গড় মাত্র ৩৫! নেই কোনো সেঞ্চুরি, ৮০ ছাড়িয়েছেন মাত্র তিনবার। এর মধ্যে একটা এসেছিল সেই ২০১৩ সালে। জো রুটের কাছে অজি গোলকধাঁধার কোনো উত্তরই ছিল না। বরং অজিরা রুটের শ্রেষ্ঠত্ব খারিজ করে দিতেন এই এক প্রশ্নে। রুট সেই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলেন এই মৌসুমে এসে।

রুটের বয়স ৩৬। পরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আসরে আসতে বয়স দাঁড়াবে ৪০। তত দিনে ব্যাট হাতে তাঁকে দেখা যাবে কি না, সেটার নিশ্চয়তা নেই। ধারণা করা যায়, এই মৌসুমটাই হয়তো শেষ। তাই তো রুট নেমেছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে। প্রথম টেস্টে করেছিলেন ০ আর ৮। নিন্দুকেরা রুটের হতাশা চেহারা দেখলেও ব্যর্থতা রুটকে বদলে দিয়েছিল। তাই তো দিবারাত্রির দ্বিতীয় টেস্টটা করে রাখলেন স্মরণীয়। ১৩৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস দিয়ে কাটালেন নিজের সেঞ্চুরি-খরা। ব্রিসবেনে ৪ ডিসেম্বর রাতটা স্মরণীয় হয়ে রইল জো রুটের সম্মানে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে রুটের প্রথম সেঞ্চুরি এল গোলাপি বলে।

আরও পড়ুন

অনেকে মজা করেই তখন রুটকে বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গোলাপি বলে সেঞ্চুরি করেছ, লাল বলে তো আর নয়। আর জয়? সেই আশার গুড়ে বালি। রুট সেই দুই প্রশ্নের উত্তর দিলেন পরপর দুই টেস্টে। মেলবোর্নে বক্সিং ডে টেস্ট ইংল্যান্ড জিতে নিল দুই দিনে। রুটের ১৪ বছরের ক্যারিয়ার প্রায় শেষ হতে যাচ্ছিল অজিদের অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে না হারিয়ে। সেই স্বপ্ন সতীর্থরা সফল করেছেন মাত্র দুই দিনে। আর লাল বলের সেঞ্চুরি? সেটা মিলল শেষ টেস্টে এসে। ২৪২ বলে ১৬০ রানের দুর্দান্ত ইনিংস, যেখান থেকে চোখ ফেরানো দায়। বছরের প্রথম সেঞ্চুরির মালিক হিসেবে নাম লেখালেন রুট।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিকে এ বছর রুট বানিয়েছেন নিজের ঘাঁটি। ৯ ইনিংসে ৩৯৪ রান, ২ সেঞ্চুরি, ১ জয়। আরও একটা ইনিংস বাকি। অ্যাশেজের শিরোপাটা অজিরা জিতে নিলেও ব্যাট হাতে ভালোই ছন্দে ছিলেন রুট।

বিরাট কোহলি, স্টিভেন স্মিথ, কেইন উইলিয়ামসন আর জো রুটকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল আধুনিক সময়ের ‘ফ্যাব ফোর’। একসময় চারজনের মধ্যে রুটের ছিল সবচেয়ে দুর্বল। কিন্তু গত চার বছরে জো রুট এতটাই দুর্দান্ত ফর্মে যে বাকি তিনজনকে ছাড়িয়ে তো গেছেনই, লড়াই এখন সর্বকালের সেরা শচীন টেন্ডুলকারের সঙ্গে। ৪১ সেঞ্চুরি পার করে শচীন থেকে হাতছোঁয়া দূরত্বে দাঁড়িয়ে ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। রুটের রান এখন ১৩ হাজার ৯৩৭। আর মাত্র ১০টি সেঞ্চুরি আর হাজার দুয়েক রান করলেই শচীনকে ছাড়িয়ে ইতিহাস গড়বেন তিনি।

আরও পড়ুন