বছরের প্রথম দিনে কেন দল ছাড়লেন চেলসি কোচ
নতুন বছরের প্রথম দিনটা সুসংবাদ দিয়ে শুরু করতে চায় সবাই। কিন্তু চেলসির ভক্তদের জন্য ব্যাপারটা হয়েছে উল্টো। বছরের প্রথম দিন ঘুম থেকে উঠেই তারা খবর পেলেন, চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন তাঁদের কোচ। একটু ঘুরিয়ে বললে, ইতালিয়ান কোচ এনজো মারেসকা বছরটা শুরু করেছেন পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে। কিন্তু কী এমন ঘটেছিল পর্দার আড়ালে যে মৌসুমের মাঝখানে একেবারে বছরের প্রথম দিনই বিদায় বলতে হলো কোচকে?
কাগজে–কলমে চেলসি বলেছে, কোচই তাঁর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে ছিল বোর্ডের সঙ্গে মনমালিন্য। তাই বোর্ড থেকে সিদ্ধান্ত আসার আগেই ইতালিয়ান কোচ নিজের সম্মান নিয়ে ছেড়েছেন চাকরি। আপাতদৃষ্টিতে চেলসি কোচের চাকরি ছাড়ার কোনো কারণই নেই। একজন কোচকে কখন বিদায় বলা হয়? যখন তিনি পারফর্ম করতে পারছেন না কিংবা দলের ভেতরে ড্রেসিংরুমের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। কোচের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করতে এর চেয়ে বেশি কিছু দরকার হয় না। মজার ব্যাপার হলো এনজো মারেসকার ক্ষেত্রে কোনোটিই হয়নি।
মারেসকা চেলসিতে যোগ দিয়েছিলেন গত মৌসুমে। লেস্টার সিটির হয়ে দুর্দান্ত এক মৌসুম কাটানোর পর তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় চেলসির দায়িত্ব। লেস্টার সিটিকে চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে প্রিমিয়ার লিগে তুলেছিলেন নিজের ম্যাজিকে। চেলসির হয়েও সেই ম্যাজিক দেখিয়েছেন মারেসকা। প্রথম মৌসুমে দলকে রেখেছেন সেরা চারে। যদিও চেলসির মতো দলের কাছে সাফল্য মানেই শিরোপা, তবু মারেসকার এই পারফরম্যান্স কাগজে–কলমে খুব একটা খারাপ নয়। বরং মারেসকার বাজিমাত হয়েছেন আন্ততর্জাতিক টুর্নামেন্টে। প্রথমবারের মতো জিতে নিয়েছেন ইউয়েফা কনফারেন্স লিগের শিরোপা। প্রথম ক্লাব হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরোপা লিগ ও কনফারেন্স লিগ জেতা একমাত্র ক্লাব হয়েছিল চেলসি। সেই অনন্য রেকর্ডকে আরেক দফা বাড়িয়েছেন প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জিতে। চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী দল পিএসজিকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নেয় চেলসি।
এই মৌসুমেও সেই ফর্ম ধরে রেখেছেন মারেসকা। ১৯ ম্যাচ শেষে ৮ জয় ও ৬ ড্র নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে চেলসি। তাদের ঝুলিতে সংগ্রহ ৩০ পিয়েন্ট। যদিও লিগের শীর্ষে থাকা আর্সেনালের সঙ্গে তাদের পার্থক্য ১৫ পয়েন্টের, তবে চ্যাম্পিয়নস লিগের লড়াইয়ে ভালোমতোই ছিলেন তিনি। এমনকি বাকি কাপেও তাঁর পারফরম্যান্স বেশ ভালো।
সবকিছু ভালো চললে বরখাস্ত কেন? এ জায়গাতেই কলকাঠি নাড়ছে চেলসি বোর্ড। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের আগপর্যন্ত চেলসির মালিক ছিলেন রাশিয়ান রোমান আব্রামোভিচ। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ক্লাবকে বিক্রি করে দিতে হয় তাঁর। কম দামে তখন সেই ক্লাব কিনে নেন মার্কিন ধনকুবের টড বোহেলি। সেই সময় ক্লাবে এসে যোগ দেন বাহদাদ এগভাল্লি। ইরানীয় ব্যবসায়ী চেলসির একটি অংশের মালিক। তাঁর সঙ্গেই মূল ঝামেলার সূত্রপাত।
সাবেক কোচ টমাস টুখেল থাকাকালীন সময়ে ‘৪-৪-৩’ ফরমেশন দিয়ে হাসির পাত্র হয়েছিলেন তিনি। এর পর থেকে তাঁকে ক্লাবে দেখে যেত কম। কিন্তু এই মৌসুম থেকে তিনি আবারও এসেছেন দৃশ্যপটে। সেখান থেকেই ঝামেলার শুরু। এগভাল্লি দলের চেয়ে নিজের ব্যবসা নিয়ে বেশি চিন্তিত। এ কারণে মারেসকার সিলেকশন নিয়ে বেশ খুঁটিনাটি ভুল ধরেন তিনি। বিশেষ করে ম্যাচের মধ্যে কে থাকবে, কে থাকবে না, কোন খেলোয়াড়কে বেঞ্চ থেকে নামানো হবে—এ ব্যাপারে কলকাঠি নাড়তেন তিনি। এমনও শোনা যায়, কোচকে চাপ দিয়ে দলের সেরা তারকা কোল পালমারকে মাঠ থেকে উঠিয়ে নিয়েছেন তিনি।
এর পেছনে কারণ একটাই, কোল পালমারকে উচ্চমূল্যে বিক্রি করতে চান তিনি। যদি পালমার চোটে পরে যান, তাহলে তাঁর দামটাও কমে আসবে স্বাভাবিক। ফলে তাঁকে ফিট রাখতে বেশি সময় না খেলানোর পরামর্শ ছিল তাঁর। এমনকি দলে পেদ্রো নেতোর পরিবর্তে এস্তেভাওকে রাখা, দলের মূল খেলোয়াড়দের নিয়ে নড়াচড়া করার গুঞ্জন আছে তাঁর বিপক্ষে।
তাঁর ওপর যুক্ত হয়েছিল ভূরি ভূরি খেলোয়াড় কেনা। এই মৌসুমে মোট ১১ খেলোয়াড়কে দলে ভিড়িয়েছে চেলসি। এর মধ্যে তিন-চারজন সুযোগ পাচ্ছেন নিয়মিত। অন্যরা শুধু দলের সঙ্গেই আছেন। আর এই খেলোয়াড়দের কেনার আগে কোচের সঙ্গে পরামর্শ করা কিংবা তাঁদের প্রয়োজন আছে কি না, সে ব্যাপারে কোনো আলোচনাই হয়নি। বরং দলের মালিকেরা ইচ্ছেমতো খেলোয়াড় কিনে ধরিয়ে দিয়েছেন তাঁর হাতে। গত মৌসুমেও ৯ জন খেলোয়াড় কিনেছিল চেলসি একইভাবে। তাঁদের বেশির ভাগকে ব্যবহার করার বদলে বেঞ্চেই রাখতে হয়েছে কোচকে। বর্তমানে দলে মোট ৩১ খেলোয়াড়, তাঁদের নিয়ে দল সামলানোর দায়িত্ব যদি মালিকই নিয়ে নেন, তবে আর কোচের কী দরকার?
যেকোনো কোচই তাঁর দলের ওপর এমন হস্তক্ষেপ মানবেন না। কোচ চাইবেন দলের সাফল্য, সে জন্য তাঁর হাতে যে থাকবে, তাঁকেই ব্যবহার করবেন সর্বোচ্চ। সেখানে যদি মিনিটে মিনিটে কোচকে পরামর্শ দেওয়া হয়, তাহলে তো কাজ করা কঠিন হয়ে ওঠে। মারেসকা সেটাই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই দলের পারফরম্যান্স খারাপ হওয়ার আগেই নিজ থেকেই জমা দিয়েছেন পদত্যাগপত্র, যাতে অন্তত নিজের মান থেকে। যেখানে তাঁকে বরখাস্ত করলে বিশাল অঙ্কের একটা অর্থ পেতেন, সেখানে টাকার মায়া বাদ দিয়েই দল ছেড়েছেন তিনি।
দেড় মৌসুমে দুই শিরোপা জেতানো কোচ মারেসকার বিদায় স্তম্ভিত করে দিয়েছে চেলসির সমর্থকদের। খেলোয়াড় থেকে সমর্থক—সবাই বিরক্ত এই ব্যবসায়ীর ওপর। তাঁদের দাবি এখন একটাই—হয় এই ব্যবসায়ীকে সরাও, নইলে চেলসি আর নিজের জায়গাতে ফিরতে পারবে না।