বেনজেমা এখন সৌদি লিগের ‘ফিগো’

লুইস ফিগোর কথা মনে আছে? পর্তুগিজ সুপারস্টার তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে বার্সেলোনা ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদে। রীতিমতো ঝড় বয়ে গিয়েছিল সেই সময় ফুটবল দুনিয়ায়। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের মধ্যে যে দলবদল হতে পারে, সেটা কেউ ভাবতেই পারেননি। সেই সময় ফিগো আবার বার্সেলোনার সহ-অধিনায়ক। দলকে লা লিগা জিতিয়ে চুল রাঙিয়ে ফিগো ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি বার্সেলোনারই একজন। সেই খেলোয়াড় রাতারাতি এক ‘বাজি’ হেরে যোগ দিয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদে। বার্সা সমর্থকেরা ফিগোর নাম দিয়েছিল ‘জুডাস’। সেই জুডাস, যিনি যিশুখ্রিষ্টকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন রোমান সৈন্যদের হাতে।

সেই ঘটনার ২৬ বছর পর এসে যেন আরেক ‘ফিগো’র দেখা পেল ফুটবল–বিশ্ব। এবার সেটা ঘটেছে সৌদি প্রো লিগে। ঘটনার পেছনেও আছেন আরেক ব্যালন ডি’অর জয়ী তারকাও। ফ্রেঞ্চ স্ট্রাইকার করিম বেনজেমা আল ইতিহাদ ছেড়ে যোগ দিয়েছেন সৌদি লিগের সবচেয়ে সফল ক্লাব আল হিলালে। আর সেই সঙ্গে শুনছেন পুরো লিগে দুয়োধ্বনি। করিম বেনজমা হয়ে উঠেছেন সৌদি লিগের ‘ফিগো’।

করিম বেনজেমা সৌদি লিগে যোগ দিয়েছিলেন সবকিছু জয় করেই। রিয়াল মাদ্রিদে ছিলেন ১৪ বছরের বেশি সময়। এর মধ্যে বড় একটা সময় কাটিয়েছেন রোনালদোর ছত্রচ্ছায়ায়। দলের জন্য নিজের পছন্দের ভূমিকা বিসর্জন দিয়ে খেলে গিয়েছেন, পারফরম্যান্সে ভাটা পড়েছে। কিন্তু কোনো দিন টুঁ শব্দটি করেননি। রোনালদো পরবর্তী রিয়াল যখন ‘মেইনম্যান’ খুঁজে বেড়াচ্ছে, তখন বেনজেমা আবির্ভূত হয়েছিলেন ত্রাতা হিসেবে। দলের জন্য হাতের আঙুল পাকাপাকিভাবে বেঁকে গিয়েছে, কিন্তু দলকে হাল ছাড়তে দেননি। যার প্রতিদান পেয়েছেন ব্যালন ডি’অর জয় করে।

আরও পড়ুন
২০২২ ব্যালন ডি’অরের মালিক করিম বেনজেমা।
ছবি: এক্স

২০২৩ সালে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে বেনজেমা যোগ দেন সৌদি ক্লাব আল ইতিহাদে। রোনালদোর পর বেনজেমাই ছিলেন লিগের সবচেয়ে বড় তারকা। তাই তাঁর চুক্তির অর্থের পরিমাণটাও ছিল ঈর্ষণীয়। তিন বছরের চুক্তিতে প্রতিবছর সবকিছু মিলিয়ে ১০০ মিলিয়ন ইউরো করে পেতেন তিনি। তিন বছরেই তাঁর আয় ছাড়াত ৩০০ মিলিয়ন ইউরো। টাকা আর খ্যাতির মূল্য ঠিকভাবেই রেখেছিলেন তিনি। প্রথম মৌসুমে ৩৩ ম্যাচে ১৬ গোল, পরের মৌসুমে ৩৩ ম্যাচে ২৫ গোল। এর মধ্যে পেরিয়েছেন ব্যক্তিগত ৫০০ গোলের রেকর্ড। আর সেই সঙ্গে দলকে এনে দিয়েছেন দুটি শিরোপা—সৌদি প্রো লিগ আর কিংস কাপ। ঘরোয়া লিগের দুই শিরোপা এনে নিজের নাম আর দামের পুরো মূল্য চুকিয়ে দিয়েছিলেন বেনজেমা।

সমস্যাটা বাধে এই মৌসুমের শুরুতে নতুন চুক্তি নিয়ে। গত মৌসুমেও চুক্তি নিয়ে একবার বসেছিল বেনজেমা আর ইতিহাদ। সেবার দুই পক্ষের বনিবনা হয়নি। সেই চুক্তি নিয়ে আরেক দফা বৈঠক হয় এই মৌসুমে। চুক্তির যখন মাত্র ৮ মাস বাকি, সেই অবস্থায় বেনজেমাকে ২ বছরের নতুন চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়। যেটা দেখে বেনজেমা ও তাঁর এজেন্ট রীতিমতো ক্ষিপ্ত হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। সেই চুক্তিতে ছিল, আগামী দুই বছর করিম বেনজেমা ক্লাব থেকে কোনো বেতন পাবেন না। শুধু পাবেন ম্যাচ ফি এবং বোনাস। তবে নিজের ইমেজ রাইটস পুরোটাই নিতে পারবেন তিনি। অর্থাৎ ক্লাবের হয়ে যত ছবি বা প্রমোশনে তিনি থাকবেন, সেখানকার পুরো লভ্যাংশ হবে তাঁর। কিন্তু নির্দিষ্ট করে কোনো বেতন থাকবে না।

আরও পড়ুন
গত মৌসুমে ইতিহাদকে দুটি শিরোপা জিতিয়েছেন বেনজেমা।
ছবি: এক্স

ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা, যিনি আগের মৌসুমে দলকে ঘরোয়া লিগের দুটি শিরোপা এনে দিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে এমন চুক্তি রীতিমতো অপমানের। বেনজেমা সেটাকে অপমান হিসেবেই নিয়েছেন। যে কারণে নতুন আর কোনো চুক্তিতে বসার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করেননি। বরং তাঁর কাছে মনেই হয়েছে, এর চেয়ে ভালো কোনো জায়গায় যাওয়া উচিত। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁকে ভালো জায়গার সন্ধান দিয়েছে আল হিলাল। ক্লাব হিসেবে যেমন সফল, দল হিসেবেও তারা প্রচণ্ড গোছানো। ফলে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে বেনজেমার গন্তব্য হয়েছে সৌদি লিগের সবচেয়ে সফল দল আল হিলাল।

প্রশ্ন হচ্ছে আল হিলালই কেন? বেনজেমার যে ফর্ম, তাতে যদি ফ্রেঞ্চ জাতীয় দলের দরজা বন্ধ না হতো, তাহলে অনায়াসে ঢুকে যেতে পারতেন দলে। এই মৌসুমেই ২১ ম্যাচে করেছেন ১৬ গোল। বোঝার উপায় নেই বয়সটা যে ৩৮। কয়েকটা ইউরোপিয়ান ক্লাব থেকেও প্রস্তাব ছিল, তবুও সব ছেড়ে আল হিলালে যোগ দিয়েছেন তিনি। এর মূল কারণ তাঁর ইমেজ রাইটস বা ছবি স্বত্ব। ২০৩০ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে তাঁর ইমেজ রাইটস নিজের কাছে কেনা। ফলে সেখান থেকে বড় অঙ্কের অর্থ প্রতি মৌসুমেই পাবেন তিনি। এ ছাড়া এমন একটা সময়ে তিনি দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যখন ইউরোপিয়ান মৌসুম একেবারেই বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শেষ মুহূর্তে সৌদি আরব ছেড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা ছিল না তাঁর। সেই সঙ্গে সৌদি আরবের পরিবেশ–পরিস্থিতি আর সংস্কৃতির সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই মানিয়ে নিতে পেরেছেন বেনজেমা। ফলে সবকিছু মিলিয়ে আরও দেড় বছর সৌদি আরবে থাকাটা খুব একটা খারাপ মনে হয়নি তাঁর কাছে।

আরও পড়ুন
আল হিলালে ৯০ নম্বর জার্সি নিয়েছেন বেনজেমা।
ছবি: এক্স

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পাশেও একটা দিক রয়েছে। সেদিকে রয়েছে ক্লাবের প্রতি সম্মান আর শ্রদ্ধা। সম্প্রতি পিআইএফের সঙ্গে বেশ কঠিন দ্বন্দ্ব চলছে তিনটি দলের। সেখানে আল হিলাল আলাদা করে সুবিধা লাভ করছে মালিকদের কাছ থেকে। সে সময়ে ইতিহাদ ছেড়ে হিলালে যোগ দেওয়াটা চোখে পড়ার মতোই ঘটনা। অন্তত বেনজেমার মতো একজনের কাছ থেকে এটা অনেকেই আশা করেননি। স্বয়ং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করেছেন, যেন বেনজেমার দলবদল না হয়। কারণ, বেনজেমা আল হিলালে যোগ দেওয়ামাত্রই পুরো লিগটাই যেন একপেশে হয়ে গেল। আল ইতিহাদও তাই বেনজেমাকে বিদায় দিয়েছে এক লাইনের একটি পোস্টে। সমর্থক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই যেমন হতবাক, তেমনই অনেকে ক্ষুব্ধও। তাই তো বেনজেমাকে নতুন যুগের ‘ফিগো’ বলতেও বাধছে না কারও।

তবে এত কিছুর মধ্যেও বেনজেমা নিজে খুশি। আগের দলেও নিজের সেরাটা দিয়ে এসেছেন, নতুন দলে এসে বেছে নিয়েছেন ‘৯০’ নম্বর জার্সি। বলেছেন, ‘আল হিলাল হলো এশিয়ার রিয়াল মাদ্রিদ’। বোঝাই যাচ্ছে, পরবর্তী গন্তব্যকে এখনই আপন করে নিতে পেরেছেন। দেখা যাক বেনজেমা কত দূর যেতে পারেন।

তবে বেনজেমার কানে কোনো কথাই যেন যাচ্ছে না। আল হিলালের হয়ে বেছে নিয়েছেন ‘৯০’ নম্বর জার্সি। নিজের প্রিয় দুই নাম্বার ৯ আর ১০ এর গুণিতক। কতটা ফর্মে আছেন তিনি, সেটার প্রমাণ মিলেছে প্রথম ম্যাচেই। কোনো প্রস্তুতি নয়, মানিয়ে নেওয়া নয়। নেমেই করেছেন হ্যাটট্রিক, সঙ্গে একটি অ্যাসিস্ট। ম্যান অব দ্যা ম্যাচের পুরষ্কারও গিয়েছে তার ঝুলিতেই। করিম বেনজেমা যে আল হিলালকে সঙ্গে নিয়ে রাজত্ব করবেন সেটা বোঝাই যাচ্ছে। সাংবাদিকদের বাঁকা প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন একেবারে সোজাসাপ্টা। কেন ইতিহাদ ছেড়ে হিলালে, সেই প্রশ্ন ইতিহাদের খেলোয়াড়দেরই করতে বলেছেন। তিনি আপাতত মনোযোগ দিচ্ছেন খেলাতে। ফিগো তো রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়ে সর্বজয়ী হয়েছিলেন। বেনজেমাও হয়তো সেই পথেই হাঁটছেন।

আরও পড়ুন