সৌদি লিগ কি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

বেনজেমার দলবদল আটকে দিতে চেয়েছিলেন রোনালদো।ছবি: এক্স

শীতকালীন দলবদলের মৌসুম শেষ হওয়ার ঠিক আগের ম্যাচ। আল নাসরের একাদশে নেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম। কোনো নিষেধাজ্ঞা বা চোট নয়। এমনিতেই খেলছেন না রোনালদো। যিনি মুখিয়ে আছেন ক্যারিয়ারের ১০০০তম গোল পাওয়ার জন্য, তিনি এমনি এমনি খেলবেন না, তা কি হয়? ঘটনার পরত খুলতেই জানা গেল, শুধু রোনালদো বা আল নাসর নয়, পুরো সৌদি লিগেরই তথৈবচ অবস্থা। রীতিমতো আগুন লেগে আছে প্রতিটি দলেই।

সৌদি লিগ বাকি সব লিগের থেকে কিছুটা আলাদা। এই লিগে মূল দল বলতে আছে চারটি। আল নাসর, আল ইতিহাদ, আল আহলি ও আল হিলাল। চারটি বড় দলেরই মালিকানা পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড বা পিআইএফের হাতে। এককথায় বলতে গেলে চারটি দলের মালিকই সৌদি আরবের সরকার। পুরোপুরি না হলেও ৭৫ শতাংশ মালিকানাই সরকারের। বুঝতেই পারছ, যত টাকাপয়সা আসছে, সব আসছে সৌদি আরবের সরকারের কাছ থেকেই। যে কারণেই ২০২৩ সাল থেকে টাকার ছড়াছড়ি চলছে লিগে। চারটি দলই ভাগাভাগি করে নিজেদের পছন্দসই খেলোয়াড় দলে ভিড়িয়েছে। আল নাসরে যোগ দিয়েছেন রোনালদো, আল ইতিহাদে যোগ দিয়েছিলেন করিম বেনজেমা-এনগোলো কান্তে। আল আহলিতে রবার্তো ফিরমিনো আর আল হিলালে নেইমার। মোটাদাগে এঁরাই ছিলেন দলের মূল তারকা।

আরও পড়ুন

সমস্যাটার শুরু হয় গত বছর থেকে, সৌদি লিগের এই চার ক্লাবের মধ্যে সবচেয়ে সফল ক্লাব আল হিলাল। নেইমারের আগে তাদের লক্ষ্য ছিল লিওনেল মেসিকে দলে ভেড়ানোর। সেটা অবশ্য সম্ভব হয়নি। নেইমারও তাদের জার্সিতে খেলেছেন মাত্র ৭ ম্যাচ। তাই বলে তাদের তারকার অভাব ছিল না। কালিদু কুলেবালি, ডারউইন নুনেজ, রুবেন নেভেস, থিও হার্নানদেজ থেকে শুরু করে ইয়াসিন বোনো— তারকা খেলোয়াড়ের অভাব নেই। এখানেই লুকিয়ে আছে বৈষম্য।

প্রতিবাদে শেষ ম্যাচে খেলেননি রোনালদো।
এক্স
আরও পড়ুন

পিআইএফ কাগজে–কলমে চার দলের মালিক হলেও আস্তে আস্তে তাদের নজর চলে গেছে আল হিলালের দিকে। কারণটা বেশ স্বাভাবিক, আল হিলাল যেমন শিরোপা জিতছে, তেমনই দলকে বড় মঞ্চে প্রতিনিধিত্বও করছে। ক্লাব বিশ্বকাপ, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নস লিগে আল হিলালকেই দেখা যাচ্ছে। ফলে তাদের প্রতি দুর্বল হওয়াটা দোষের কিছু নয়।

কিন্তু আল হিলালকে নজর দিতে গিয়ে বাকি দলগুলোকে বৈষম্যের মুখোমুখি করছে পিআইএফ। এবারের শীতকালীন দলবদলের মৌসুমটাই দেখা যাক। আল হিলাল খরচ করেছে প্রায় ৭০ মিলিয়ন ইউরো। এমনকি করিম বেনজেমাকে দলে ভিড়িয়েছে ফ্রিতে। অন্যদিকে লিগে তাদের মালিকানায় থাকা বাকি তিন দল মিলে খরচ করেছে ৫৫ মিলিয়ন ইউরো।

২০২৩ সালে পিআইএফ মালিকানা নেওয়ার পর ক্লাবগুলোর খরচ

শুধু এখানেই নয়, করিম বেনজেমার কথা যেমন ধরো। আল ইতিহাদকে শিরোপা জেতানো ব্যালন ডি’অর জেতা খেলোয়াড় নতুন চুক্তি চেয়েছিলেন ক্লাবের কাছে। ক্লাব সাফ তাঁকে জানিয়ে দিয়েছে, পিআইএফ তাদের কোনো টাকা দিচ্ছে না। ফলে তাঁর সঙ্গে নতুন চুক্তিতে কোনো বেতন দিতে পারবে না তারা। বরং করিম বেনজেমার ইমেজ রাইটস পুরোটাই তাঁর কাছে দিয়ে দেবে ক্লাব। এই চুক্তি শুনে অপমানিত বোধ করাটাই স্বাভাবিক। আর যে কারণে ফ্রিতেই ক্লাব ছেড়ে বেনজেমা যোগ দিয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী আল হিলালে। এখানেই তৈরি হয়েছে আরেকটি সমস্যার।

নিয়ম অনুযায়ী সৌদি ক্লাবে এক দলে ১০ জনের বেশি–বিদেশি খেলোয়াড় রাখা যাবে না। আল হিলাল সেই নিয়মের কোনো তোয়াক্কাই করছে না। করিম বেনজেমাকে দলে ভেড়ানোর পর তাদের দলে বিদেশি খেলোয়াড়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪। ফলে নিয়ম ভেঙেই লিগে টিকে আছে তারা।

আরও পড়ুন
আল ইতিহাদ ছেড়ে আল হিলালে যোগ দিয়েছেন বেনজেমা।
ছবি: এক্স

রোনালদোর দলেও একই অবস্থা। সাদিও মানে, মার্সেলো ব্রোজোভিচ, হোয়াও ফেলিক্স, কিংসলে কোমানের মতো খেলোয়াড় থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে যথেষ্ট ‘সম্মান’ করা হচ্ছে না বলে দাবি তাদের। কারণ, নিয়ম ভেঙে যদি একটি দল সাজানো হয়, এক দলকে টাকার বস্তা উপহার দেওয়া হয়, আরেকটি দলকে কিছুই না। তাহলে তো লিগে সাম্যতা বজায় থাকে না। যে কারণে গুঞ্জন উঠেছিল রোনালদো নাকি চেয়েছেন করিম বেনজেমা দল না ছাড়ুক। কিন্তু রোনালদোর কথায় তো আর বেনজেমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বসে থাকবে না? ভালো প্রস্তাব পেয়ে বেনজেমাও যোগ দিয়েছেন আল হিলালে।

মোটাদাগে যেমনটা ভাবা হচ্ছিল, ঠিক যেন সেটাই হয়েছে। টাকার বস্তা নিয়ে শুরু হওয়া সৌদি লিগ নিজেদের সেরাটা দেখানোর আগেই ঝরে পড়ছে। চারটি ক্লাবের একই মালিক যদি সবাইকে সমান প্রাধান্য না দেন, একটি ক্লাব নিয়মবহির্ভূতভাবে পুরো লিগকে গচ্চা করে নেয়। তাহলে সেই লিগের পতন হতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। একে তো লিগে এক ক্লাবেরই মনোপলি চলবে, সেই সঙ্গে অন্যান্য ক্লাব বা বড় খেলোয়াড়ও ক্যারিয়ার ফেলে সৌদিতে আসতে চাইবেন না।

এমনিতেই অনেক তরুণ খেলোয়াড় সৌদি লিগকে বেছে নিয়েছেন ‘ওয়ান–স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ হিসেবে। টাকার প্রয়োজন? ছয় মাস বা এক বছর সৌদি লিগে খেলে আবার ইউরোপে ফিরে আসব। এই নীতিতে লাভবানও হয়েছেন অনেকে। তার ওপর লিগের শীর্ষ ক্লাবগুলোর যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে দ্রুতই চাইনিজ লিগের অবস্থা বরণ করতে হতে পারে সৌদিকে।

আরও পড়ুন