যেভাবে বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখছে আয়ারল্যান্ড

বিশ্বকাপের স্বপ্ন ঠিক কতটা রঙিন? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে ছুটে যেতে পারো বিশ্বের বাঘা বাঘা দলগুলোর কাছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা এর উত্তর দেবে এক ধাঁচে। তাদের কাছে বিশ্বকাপের শিরোপা জিততে না পারাটাই ব্যর্থতা। আর্জেন্টাইনরা এই ব্যর্থতা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে ৩২ বছর। ব্রাজিল এই বোঝা বয়ে চলেছে ২৪ বছর। লাতিন আমেরিকা ছেড়ে ইউরোপের গল্পটাও একই ধাঁচে গড়া। কিন্তু সেখানে উত্থান-পতন আছে, আছে আনন্দ-হতাশার গল্প। বিশ্বকাপ জিতে জার্মানি দুই বছর বাদ পড়ল প্রথম পর্ব থেকে, ইতালি বিশ্বকাপে সুযোগই পায়নি গত ১২ বছর। কিন্তু সব কটি গল্পের আড়ালে একটা কথা ভেসে আসে সত্যি হয়ে, বিশ্বকাপের গল্প বদলে যায় দলভেদে।

কারণ, ইউরোপের দ্বিতীয় সারিতে থাকা দলগুলো মাঠে নামে রীতিমতো বিদায়ের ঘণ্টা মাথায় নিয়ে। তাদের কাছে বিশ্বকাপ শব্দটাই একটা স্বপ্ন, সেখানে প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব অপরিসীম। একটু পা পিছলে গেলেই সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ। যুগের পর যুগ বিশ্বকাপে সুযোগের আশায় ঠুকরে মরা দলগুলোর কাছে বিশ্বকাপ তাই কোটি মানুষের আশার প্রতিদান। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা আইরিশদের কাছে তাই ট্রয় প্যারোটের একেকটি গোলের মূল্য জীবন দিলেও যেন শোধ হওয়ার নয়।

আয়ারল্যান্ড এখনো বিশ্বকাপে সুযোগ পায়নি। তাদের দৌড় থেমেছে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে। এখনো দুই ধাপ পাড়ি দিয়ে আমেরিকার টিকিট নিশ্চিত করতে হবে তাদের। তবু আয়ারল্যান্ডে এখন আলোচিত একটা নাম—ট্রয় প্যারোট। ট্রয় প্যারোট কী করেছেন? তিনি একটা সমীকরণ মিলিয়েছেন। বেশ সোজা একটা সমীকরণ বৈকি। ইউরোপে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের শেষ দিকে চার দলের মধ্যে আয়ারল্যান্ড ছিল তিন নম্বরে। বিশ্বকাপে বাছাইপর্ব নিশ্চিত করতে হলে আয়ারল্যান্ডকে জিততে হবে দুটো ম্যাচই। সেটাও আর কেউ নয়, টেবিলে তাদের ওপরে থাকা পর্তুগাল আর হাঙ্গেরির বিপক্ষে। টেবিলের নিচে থাকা আর্মেনিয়ার সঙ্গে যারা জিততে পারেনি, তাদের কাছে পর্তুগাল আর হাঙ্গেরিকে হারানো স্বপ্নের চেয়েও বড় কিছু।

তবু মানুষ সব আশার বিপক্ষে গিয়ে স্বপ্ন দেখে। নিজেদের ভেলায় ভাসার স্বপ্নজয়ের। আয়ারল্যান্ডও ভাসিয়েছিল, ট্রয় প্যারোট ছিলেন সেই ভেলার নাবিক।

আরও পড়ুন
আয়ারল্যান্ডের ‘সুপারহিরো’ ট্রয় প্যারোট।
ছবি: এক্স

পর্তুগালের বিপক্ষে এই আয়ারল্যান্ডের পাত্তা পাওয়ারই কথা ছিল না। নেশনস লিগ জিতে আসা দল, ফর্মের তুঙ্গে। সেই দল কিনা রীতিমতো নাকানিচুবানি খেলো আয়ারল্যান্ডের কাছে! নিজেদের মাটিতে পেয়ে পর্তুগালকে ধরাশায়ী করেনি শুধু, উসকে দিয়েছে স্বয়ং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে। কনুই মেরে সরাসরি লাল কার্ড দেখেছেন সিআর সেভেন। যে রোনালদো জাতীয় দলে খেলার সময় থাকেন চুপচাপ, শান্ত। লক্ষ্য থাকে শুধু দলকে জেতানোর, সেই রোনালদোকে পর্তুগালের জার্সিতে প্রথম লাল কার্ড দেখিয়েছে আইরিশরা। আর সেই তাতানো রোনালদোর পেছনে কার হাত? ট্রয় প্যারোট। প্যারোট রোনালদোদের তাতিয়ে দিয়েছিলেন দুই গোল করে। ম্যাচটা হারলেও যে খুব একটা যেত–আসত পর্তুগালের, তা কিন্তু নয়। কিন্তু প্রথমার্ধেই দুই গোল আর সমর্থক-খেলোয়াড়দের উসকানি। রোনালদোদের জন্য সুযোগটা ক্ষীণ হয়ে আসছিল মুহূর্তেই। ফলাফল পর্তুগাল মানসিকভাবে পড়ল পিছিয়ে, রোনালদো হারালেন মেজাজ—আয়ারল্যান্ড ম্যাচটা জিতে নিল ২-০ গোলে। দুই গোলেই শেষ ছোঁয়া ট্রয় প্যারোটের।

আরও পড়ুন
যে ছোঁয়ায় নিশ্চিত হয়েছে শেষ বাছাইপর্বের টিকিট।
ছবি: এক্স

এরপর সুযোগ বাকি একটাই। হাঙ্গেরির বিপক্ষে লড়াই বাঁচামরার, দুই দলের জন্যই সমীকরণটা এক। হাঙ্গেরির অবশ্য ড্র হলেই হবে, কিন্তু আয়ারল্যান্ডের কাছে ম্যাচ জয়ের কোনো বিকল্প নেই। আর বিকল্প নেই বলেই তো সেই অনন্ত ছুটে চলা। শুরুটা হয়েছিল হাঙ্গেরির গোল দিয়েই। ড্যানিয়েল লুকাকজ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ৪ মিনিটেই। ১৫ মিনিটে পেনাল্টি থেকে সমতা ফিরিয়েছিলেন ট্রয় প্যারোট। ৩৭ মিনিটে হাঙ্গেরিকে দ্বিতীয়বারের মতো এগিয়ে নিয়ে যান বার্নাবেস ভার্গা। তখনই আইরিশ দর্শকদের দিকে ভর্ৎসনার এক হাসি ছুড়ে দেন ডোমিনিক সোবোসলাই। তাচ্ছিল্যের সেই হাসির অর্থ ছিল, ম্যাচ তো এখন আমাদের, তোমরা শুধু বাকি সময়টা খেলে যাবে।

ট্রয় প্যারোট যেন অন্য ধাতুতে গড়া। তাঁর মনে নেই এসবের কিছুই। লক্ষ্য একটাই। দলকে বৈতরণি পার করানো। ৮০ মিনিটে গোলরক্ষকের মাথার ওপর বল পাঠিয়ে ম্যাচ নিয়ে এলেন সমতায়। বাকি আর মাত্র ১০ মিনিট, সুযোগ কম আসেনি আইরিশদের কাছে। কিন্তু কারও শটই জাল খুঁজে পাচ্ছিল না। ফুটবল যেন অপেক্ষায় ছিল ট্রয় প্যারোটের ছোঁয়া পাওয়ার।

সেই শট এল, ৯৫ মিনিটে। যোগ করা ৫ মিনিটের কাঁটা মাত্র পেরিয়েছে। আইরিশ গোলরক্ষক লম্বা এক লব বাড়ালেন ডি-বক্সে। বল গিয়ে পড়ল লিয়াম স্কেলসের মাথায়। মার্ক করা খেলোয়াড়কে ধোঁকা দিয়ে প্যারোট পৌঁছে গেলেন বলের লাইনে। বুটের সামান্য ছোঁয়ায় বদলে গেল বলের গন্তব্য। গোলরক্ষকের হাতের নিচ দিয়ে বল খুঁজে নিল জাল।

আরও পড়ুন
পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে রইল এই গোল।
ছবি: এক্স

এরপরের কয়েক সেকেন্ড যেন গেঁথে থাকবে প্রতিটি আইরিশ সমর্থকের মনে। কোথায় ছিলেন, কীভাবে ছিলেন, সব যেন আজীবনের মতো মাথায় টুকে রাখা হয়ে গেছে। ট্রয় প্যারোট মানুষের স্মৃতিতে থাকবেন তাঁর শার্ট খুলে সবুজ প্রান্তরে দৌড়ে বেড়ানোর জন্য। আর সেই সঙ্গে পুরো পৃথিবীর কোনায়-কানায় থাকা আইরিশ জনগণের উল্লাসের কারণ হয়ে। একজন খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছাতে আর কী লাগে। বয়সটা তো মাত্র ২৩, সামনে পুরো জীবনটা পড়েই আছে।

কাগজে–কলমে আয়ারল্যান্ডের জনসংখ্যা মাত্র ৫৩ লাখ। কিন্তু এর বাইরেও দেশে-বিদেশে কত কোটি আইরিশ ছড়িয়ে–ছিটিয়ে জীবন যাপন করছে, সেই সংখ্যা জানা নেই কারও। কিন্তু ট্রয় প্যারোটের গোল, সবাইকে এনেছে এক বিন্দুতে। ম্যাচ শেষ হতে না হতেই সমর্থকেরা উচ্চাভিলাষী হয়ে বিমানবন্দরের নাম রেখেছেন ট্রয় প্যারোট বিমানবন্দর।

বাঁচামরার দুই ম্যাচে আয়ারল্যান্ড দেখা পেয়েছে ৫ গোলের, পাঁচটিই এসেছে ট্রয় প্যারোটের পা থেকে। এই মৌসুমে ৬ গোল করা প্যারোট গত এক সপ্তাহে পেয়েছেন ৫ গোল। দলকে টেনে নিয়ে গেছেন বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে। বাছাইপর্বে তাদের প্রতিপক্ষ চেক রিপাবলিক। আর তাদের পার করতে পারলে ডেনমার্ক অথবা নর্থ মেসিডোনিয়া। দুই ধাপ উতরাতে পারলেই বিশ্বকাপের টিকিট। আয়ারল্যান্ডের সমর্থকেরা যেন জলজ্যান্ত প্রমাণ, ফুটবল খেলার জনপ্রিয়তা কেন বিশ্বজুড়ে। এক ট্রয় প্যারোটের নাটকীয়তায় বদলে গেছে পুরো আয়ারল্যান্ডের চিত্র। দেশজুড়ে আনন্দ, দেওয়া হচ্ছে রাজার সম্মান। বিশ্বকাপে তো এখনো যাওয়াই হয়নি। একবার টিকিট নিশ্চিত করতে পারলে কী হবে ভাবো তবে।

আরও পড়ুন