ইতালি কি এবার বিশ্বকাপের টিকিট পাবে?

  • টানা ১২ বছর বিশ্বকাপে সুযোগ পায়নি ইতালি।

  • বিশ্বকাপে খেলতে হলে ইতালিকে পেরেতো হবে নর্দান আয়ার‌ল্যান্ড, ওয়েলস অথবা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বাধা।

  • কোচ গাত্তুসো বলেন, ইতালিকে বিশ্বকাপে নিতে না পারলে ইতালি ছেড়ে চলে যাবেন।

বিশ্বকাপ আর ইতালি—শব্দদুটি যেন দুই মেরুতে গিয়ে মিলেছে। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, শিরোপার তালিকায় ব্রাজিলের পরই যাদের নাম, সেই দলটাই ১২ বছর ধরে বিশ্বকাপের ধারেকাছে নেই। শুধু ধারেকাছে নেই বললে ভুল হবে, শেষবার তারা নকআউট পর্বে খেলেছিল আজ থেকে ২০ বছর আগে। এবার যুক্তরাষ্ট্রে এসে কি বিশ্বকাপ ভাগ্য খুলবে ইতালির?

ইতালির বিশ্বকাপ ভাগ্যে কাটা পড়া শুরু হয়েছিল ২০০৬ বিশ্বকাপের পরই। সেবার জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সকে হারিয়ে নিজেদের চতুর্থ শিরোপা জিতেছিল ইতালি। বিশ্বকাপের সুবাদে ব্যালন ডি’অর জিতে নিয়েছিলেন ফ্যাবিও ক্যানাভারো। ইতালিয়ানদের জন্য সেটা ছিল এক স্বর্ণযুগ। কিন্তু এর পর থেকেই ইতালিয়ান ফুটবল ঘুরপাক খেতে লাগল এক ঘূর্ণিপাকে।

বিশ্বকাপজয়ী ইতালি ২০১০ বিশ্বকাপ শেষ করেছিল গ্রুপের চতুর্থ অবস্থানে থেকে। অথচ পুরো বিশ্বকাপের সবচেয়ে সহজ গ্রুপ ছিল তাদের। প্যারাগুয়ে, স্লোভেনিয়া, নিউজিল্যান্ডের বাধা পেরোতে ব্যর্থ হয়েছিল তারা।

আরও পড়ুন
২০০৬ বিশ্বকাপজয়ী ইতালি দল।
ছবি: এক্স

২০১৪ বিশ্বকাপে ইতালি পড়েছিল গ্রুপ অব ডেথে—ইংল্যান্ড, উরুগুয়ে আর কোস্টারিকা। বিশ্বকাপের অন্যতম সফল দল হিসেবে সেই বাধাও উতরে যাওয়ার কথা তাদের। কিন্তু সেই বিশ্বকাপও তারা শেষ করেছিল গ্রুপে তৃতীয় অবস্থানে থেকে। সুয়ারেজের সেই বিখ্যাত কামড়কাণ্ড হয়ে রয়েছে তাদের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। এর পর থেকে আর কখনো বিশ্বকাপের রঙিন মঞ্চে জায়গা হয়নি ইতালির।

এ তো গেল বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েও ব্যর্থতার গল্প। এর পর থেকে ইতালি শুধু বিশ্বকাপের কাছাকাছি গিয়ে ঘুরপাকই খেয়েছে, কোনো দিন মূল মঞ্চের স্বপ্ন দেখতে পারেনি। ২০১৮ বিশ্বকাপে সরাসরি সুযোগ হয়নি, খেলতে হয়েছিল বাছাইপর্ব। ইতালির মতো দল বাছাইপর্ব উতরাতে পারবে না, এমনটা স্বপ্নেও ভাবেননি কেউ। সেবার ইতালির প্রতিপক্ষ ছিল সুইডেন। প্রথম লেগে সুইডেনের মাটিতে ইতালি হেরেছিল ১-০ গোলে। ফিরতি লেগে ইতালির ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিল পুরো বিশ্ব, প্রস্তুত ছিল বিখ্যাত সান সিরো স্টেডিয়াম। অথচ ম্যাচজুড়ে একের পর এক আক্রমণ করেও সুইডিশ রক্ষণ দুর্গ ভাঙতে পারেনি আজ্জুরিরা। ০-০ গোলে ড্র করে শেষ হয় ম্যাচ। ১৯৫৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ইতালিকে ছাড়া।

আরও পড়ুন
এটাই ছিল বিশ্বকাপে ইতালির শেষ ম্যাচ।
ছবি: এক্স

এরপর পুরোপুরি বদলে ফেলা হয় ইতালি দল। কোচ থেকে শুরু করে দলের মাথা, সবাইকে ছেঁটে ফেলে নতুন করে শুরু প্রত্যাশা। ইতালির দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় রবার্তো মানচিনির হাতে। মানচিনি শুধু স্বপ্ন দেখাননি, প্রমাণও করেছিলেন ইউরো জিতে। ২০২১ ইউরো শিরোপার উল্লাসে ইতালি যখন মত্ত, তখন সবাই ধরেই নিয়েছিল দলটির সেই দুঃসময় কেটেছে। বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছিল তারা। কিন্তু ঘরের মাটিতে সেই স্বপ্ন বিষাদে পরিণত হবে, কে ভেবেছিল? সেটাও আবার নর্থ মেসিডোনিয়ার মতো দলের কাছে এসে। পুরো ম্যাচে ৩২টি শট নিয়েও কোনো গোলের দেখা পায়নি ইতালি। অবশেষে ৯৩ মিনিটে এসে নর্থ মেসিডোনিয়ার আলেকজান্দার ত্রাজকোভস্কির গোলে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব থেকে বিদায় নেয় ইতালি। পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছিল, টানা দুই বিশ্বকাপের আসর বসছে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ছাড়াই।

এখনো বিশ্বকাপ খেলা হয়নি তারকা গোলকিপার জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মার
ছবি: এক্স

২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখেও ইতালির গল্পটা একই রকম। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ইতালির গ্রুপে ছিল নরওয়ে। আর্লিং হলান্ডের দুর্দান্ত ফর্মের কাছ পাত্তাই পায়নি ইতালি। বাছাইপর্বে অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে নরওয়ে। ইতালির দুই হার এসেছে এই নরওয়ের কাছেই। অগত্যা, টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ইতালি। শুধু হার নয়, বাছাইপর্বের মাঝপথে কোচ লুসিয়ানো স্পালেত্তিকে বরখাস্তও করেছে তারা। নতুন দায়িত্ব পেয়ে জেনেরো গাত্তুসো কথা দিয়েছেন, ইতালিকে বিশ্বকাপে না নিতে পারলে ইতালি ছেড়ে চলে যাবেন তিনি। আর সেই লড়াইটা এখন নর্দান আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে।

আরও পড়ুন

লড়াইয়ে নামার আগে থেকেই সতর্ক গাত্তুসো। শুধু সতর্ক বললে ভুল হবে, এবার বাড়তি কোনো চাপই রাখতে চান না তিনি। তাই তো কোচের ওপরই ম্যাচের ভেন্যু বাছাই করার দায়িত্ব দিয়েছিল ইতালিয়ান বোর্ড। ম্যাচের ভেন্যু বিখ্যাত সান সিরো থেকে সরিয়ে এনেছেন আতালান্তার স্তাদিও অ্যাতলেতি আজ্জুরি স্টেডিয়ামে। অনেকে এটাকে বিখ্যাত গেউইস স্টেডিয়ামও বলে থাকেন। সান সিরো স্টেডিয়ামের চাপে দলকে ফেলতে চাননি গাত্তুসো, তাই তো দলকে টেনে এসেছেন এমন জায়গায়, যেখানে সামান্যতম ভুল করলেও সমর্থকেরা মুখ ফিরিয়ে নেবে না।

বাছাইপর্ব নিয়ে বেশ সতর্ক কোচ জেনেরো গাত্তুসো।
ছবি: এক্স

কোচের মতো ইতালি দলও জানে এখানে সামান্যতম ভুলের সুযোগ নেই। টানা ১২ বছর বিশ্বকাপ খেলতে না পারার গ্লানি অনেকের ওপরই বর্তায়। কেউ বলেন লিগের বাজে অবস্থা, কেউ বলেন ম্যানেজমেন্টের। তবে যত যা–ই হোক না কেন, বিশ্বকাপের মূল আসরে জায়গা করে নেওয়ার বিকল্প আর কিছুই নেই। নর্দান আয়ারল্যান্ডের বাধা পার হলে মুখোমুখি হতে হবে ওয়েলস অথবা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে। পথটা সহজ, প্রতিবারই ছিল। এবার শুধু দেখার অপেক্ষা এই সহজ পথটা ইতালি পারি দিতে পারে কি না। নাহলে জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা, নিকোলা বারেলা, সান্দ্রো তোনালির মতো তারকাদের ছাড়াই দেখতে হবে আরেকটি বিশ্বকাপ।

আরও পড়ুন