যে টুর্নামেন্টে মুখোমুখি হয় ৫ মহাদেশের ৭ হাজার দল
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল টুর্নামেন্ট কোনটা? যে কেউ এর উত্তর দেবে ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত থেকে প্রতিটি দল অংশ নেয় বিশ্বকাপে। এমনও দেশ বা দ্বীপরাষ্ট্র আছে, যাদের হয়তো পূর্ণ স্বাধীনতা নেই। জায়গা নেই জাতিসংঘে। তবুও বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে জায়গা হয় তাদের; কিন্তু ক্লাব পর্যায়ে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে যে কাউকে হিমশিম খেতে হবে। কেউ বলতে পারো ইংল্যান্ডের এফএ কাপ। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো টুর্নামেন্ট; কিন্তু না, ক্লাব পর্যায়ে এমন একটি টুর্নামেন্টও আছে, যেখানে পাঁচ মহাদেশের প্রায় সাত হাজারের বেশি ক্লাব মুখোমুখি হয় শিরোপার লড়াইয়ে।
বলছি ফ্রান্সের কাপ দ্য ফ্রান্সের কথা। কাপ দ্য ফ্রান্স মূলত ফ্রান্সের ন্যাশনাল লিগ কাপ। প্রতিটি দেশের ন্যাশনাল লিগ কাপ অনুষ্ঠিত হয় একটি কারণেই। পুরো দেশের প্রতিটি ক্লাবকে এক সূত্রে গাঁথার জন্য। যাতে তৃতীয় বা চতুর্থ বিভাগের ক্লাবটিও এসে নিজেকে প্রমাণ করতে পারে দেশের সেরা ক্লাবের সঙ্গে। এফএ কাপের কথাই ধরো, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো টুর্নামেন্ট, সেখানে ইংল্যান্ডের সব স্তরের দল মুখোমুখি হয় একে অপরের। সুযোগ পায় লিভারপুল ম্যানচেস্টার সিটি থেকে শুরু করে নবম বিভাগের অপেশাদার দলও। শুধু ইংল্যান্ড নয়, ওয়েলসের কিছু ক্লাব যারা ইংলিশ ফুটবলে নিয়মিত, তারাও অংশ নেয় এফএ কাপে। এবারের আসরে মোট ৭৪৫টি ক্লাব অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে শেষ ৩২-এ টিকে আছে ষষ্ঠ বিভাগের ম্যাকেসফিল্ড এফসি।
অন্যদিকে কাপ দ্য ফ্রান্স? সেই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে ৭৩৪২টি দল। শুনে হতভম্ব হয়ে যাচ্ছ? আসলেই হতভম্ব হওয়ার মতোই একটি বিষয়। কারণ, একটি দেশে তো আর এত ক্লাব থাকা সম্ভব নয়। এই টুর্নামেন্টের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফ্রান্সের অতীত বর্বর ইতিহাসও।
একটি সময় ছিল যখন ফ্রান্সকে ধরা হতো সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম বড় অংশীদার। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে যেমন সূর্য অস্ত যেত না, ফ্রান্স সাম্রাজ্যেও ছিল তা–ই। ইউরোপ থেকে আফ্রিকা, আমেরিকা এমনকি এশিয়া-ওশেনিয়াতেও বিস্তৃত্ব ছিল তাদের সাম্রাজ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পর আস্তে আস্তে সব দেশ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করে ফ্রান্স। অনেক দেশকে স্বাধীনতা দিলেও তাদের বিভিন্ন অধিকার এবং সম্পদের ওপর তাদের আধিপত্য রয়ে গিয়েছে। এখনো কিছু জায়গায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাসন করে চলছে ফ্রান্স। সেসব দেশ এখনো ফ্রান্সের অংশ। ফলে কাপ দ্য ফ্রান্সে তাদের অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকেই।
এই ফ্রেঞ্চ টেরিটোরির মধ্যে রয়েছে ফ্রেঞ্চ গিনি, সেন্ট মার্টিন, রেনোন, তাহিতি, সেন্ট পিরে, নিউ সেলেডোনিয়ার মতো দেশ। ফ্রেঞ্চ গিনির অবস্থান দক্ষিণ আমেরিকায়, তাহিতি-নিউ সেলেডোনিয়া ওশেনিয়ায়, সেন্ট মার্টিন উত্তর আমেরিকায় আর রেনোনের অবস্থান আফ্রিকায়। এককথায় বলতে গেলে পৃথিবীর ৭ মহাদেশের মধ্যে এশিয়া আর অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রতিটি মহাদেশের দলই আছে এই টুর্নামেন্টে। কিন্তু এই দেশগুলো থেকে অংশ নেয় হাতে গোনা কয়েকটি দল। সব অংশ আসে ফ্রান্সের নিজেদের দেশ থেকে। এই মৌসুমে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাপ দ্য ফ্রান্সে অংশ নিয়েছে ৩৫৮টি দল। এ ছাড়া বাকি সব দলই মূল ফ্রান্সের অংশ। কিন্তু কীভাবে?
কাপ দ্য ফ্রান্স মূলত তাদের মাস্টারস্ট্রোক খেলেছে এখানেই। ফ্রান্সে মূলত পেশাদার ক্লাব আছে মোট ৩৮টি। যে ৩৮ দল ফ্রান্স লিগের প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগে খেলে, তারাই একমাত্র পেশাদার লাইন্সেন্স পায়। এ ছাড়া সেমি প্রফেশনাল দল আছে মোট ২৩৪টি। যারা তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বিভাগে খেলে। এর পরেই আসে নন-প্রফেশনাল বা অ্যামেচার ক্লাবদের কথা।
বিভিন্ন দেশে এসব ক্লাবকে খুব একটা পাত্তা দেওয়া হয় না; বরং পাড়া–মহল্লার ক্লাব হিসেবেই তাদের ভাবা হয়। পেশাদার ক্লাব হিসেবে নিয়ম–কানুন না মানলে তাদের খেলার সুযোগও দেওয়া হয় না। ফ্রান্স সেদিকে হাঁটেনি। কিছু নির্দিষ্ট জিনিস দেখেই একটি ক্লাবকে তাদের লাইসেন্স দিয়ে দেয় ফ্রান্স। আর সেই লাইসেন্স পেতে খুব একটা কাঠখড় পোড়াতে হয় না ক্লাবগুলোকে। ফলে কলেজের ছেলেরা মিলে চাইলেই একটা ক্লাব খুলে ফেলতে পারে। আর সব নিয়ম মানতে পারলে তারাও সুযোগ করে নিতে পারে কাপ দ্য ফ্রান্সের বাছাইপর্বে। এবারের টুর্নামেন্টে নন-প্রফেশনাল দলের সংখ্যা ছিল ৬৭৩৪টি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধে৵ সূচনা হয়েছিল কাপ দ্য ফ্রান্সের। তখনই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল, এই টুর্নামেন্টে খেলতে চাইলে কেউ বাদ পড়বে না। তখন অবশ্য প্রফেশনাল নন প্রফেশনালের ব্যাপারস্যাপার ছিল না। সবাই ফুটবল খেলত শখের বশে। প্রথম মৌসুমেই সেবার অংশ নিয়েছিল ৪৮ দল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ১০০০-এ। সে সময় টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলগুলো উড়ে আসত ফ্রান্সে। আলজেরিয়ান দল এল বিয়ের একবার হারিয়ে দিয়েছিল স্টাড দ্য রাঁসকে। তখন রেইমস ছিল চার বারের ফ্রেঞ্চ লিগ–জয়ী দল, যারা ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনাল হেরেছে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে। সেই দলকে এসে হারিয়ে দিয়েছিল আলজেরিয়ার একটি দল। ১৯৯৯-২০০০ সালে পঞ্চম বিভাগের দল ক্যালে জায়গা করে নিয়েছিল ফাইনালে। তাই বলাই যায় অঘটন এখানে নিয়মিত।
এর অবশ্য একটি কারণও আছে। নিয়ম অনুযায়ী ড্রয়ে কোনো দুই বিভাগ ওপর-নিচ থাকলে বড় দলকে খেলতে হবে ছোট দলের মাঠে গিয়ে। ফলে ছোট দলগুলো যাতে হোম অ্যাডভান্টেজের সর্বোচ্চটা ব্যবহার করতে পারে। আর তার সুবাদে বড় বড় চমক দেখা যায় নিয়মিতই। তাই তো এই টুর্নামেন্টকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ টুর্নামেন্ট বললেও খুব একটা ভুল হবে না।