অধিনায়ক না হয়েও নেতা সাদিও মানে
আফকনের ফাইনালে খেলছে সেনেগাল আর মরক্কো। ম্যাচের তখন ৯৮ মিনিট। অতিরিক্ত যোগ করা সময়ও আস্তে আস্তে শেষ হয়ে আসছে। এমন সময় কর্নার ক্লিয়ার করতে গিয়ে মরক্কোর ব্রাহিম ডিয়াজকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন সেনেগালের ডিফেন্ডার মালিক ডিউফ। খুব যে গুরুতর ধাক্কা ছিল, তা নয়, ফাইনালে শেষ মুহূর্তে এমন ট্যাকলকে সাধারণত খুব একটা আমলে নেন না রেফারিরা। কিন্তু ফাইনালে সেই ট্যাকলটাই হয়ে উঠল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সবকিছুকে ছাড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন সেনেগালের নম্বর টেন সাদিও মানে।
ঘটনার সূত্রপাত কিছুক্ষণ আগেই। অতিরিক্ত যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটেই নিশ্চিত গোলের সুযোগ পায় সেনেগাল। ইসলাইমা সারের গোল বাতিল ঘোষণা করেন রেফারি। তার ঠিক মিনিট দুয়েক পরেই বাঁশি বাজল আরেকবার—এবার পেনাল্টি মরক্কোর পক্ষে। কাগজে-কলমে ততক্ষণে ম্যাচের সময় শেষ। শেষ বাঁশি বাজার আগে শেষ কর্নার। কর্নার থেকে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ব্রাহিম ডিয়াজকে ফেলে দিলেন সেনেগালের ডিফেন্ডার মালিক ডিউফ। রেফারি সেটাকে না ধরলেও পারতেন, কিন্তু তিনি ধরেছেন। সরাসরি মরক্কোর পেনাল্টি আবেদন মেনে নিলেন রেফারি জ্যাকস এনদালা। সঙ্গে সঙ্গে ফেটে পড়ল সেনেগাল। একে তো রেফারির সিদ্ধান্ত মানতে পারল না তারা, তার ওপর ম্যাচের শেষ মিনিটে পেনাল্টি। মুহূর্তেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে সেনেগালের খেলোয়াড়েরা। কোচ পাপে থিয়াও সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন মাঠের বাইরে থেকে—উঠে এসো, আমরা আর খেলব না। বাজে রেফারিং আর পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নিয়ে একসঙ্গে মাঠ ছাড়লেন সবাই।
সেনেগালের খেলোয়াড়েরা যখন একে একে ড্রেসিংরুমের দিকে যাত্রা শুরু করেছেন, তখন মাঠে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন শুধু একজন—সাদিও মানে। রেফারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে, কিন্তু খেলা ছেড়ে মাঠ থেকে উঠে গেলে প্রশ্ন উঠতে পারে পুরো আফ্রিকার সম্মান নিয়ে। মাঠ থেকে উঠে গিয়ে খেলা বর্জন করে কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই পুরো দল যখন মাঠ ছেড়ে চলে গেছে, সাদিও মানে তখনো মাঠ থেকে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছেন। দলকে মাঠে ফেরত আনার আপ্রাণ প্রচেষ্টা তাঁর। যেন আর কেউ না খেললেও সাদিও মানে একাই খেলবেন।
মানের কথায় কাজ হয়েছে, মিনিট দশেক বন্ধ থাকার পর আবারও মাঠে গড়িয়েছে খেলা। সেনেগালের আবেদন অবশ্য কাজে দেয়নি, বদলায়নি রেফারির সিদ্ধান্ত। মরক্কোর পেনাল্টির মুখোমুখি হতে হয়েছে সেনেগালকে।
কিন্তু সেনেগাল তাদের শেষ অস্ত্রটা জমিয়ে রেখেছিল ফিরে আসার জন্য। সাদিও মানের ডাকে ফিরে আসা দল যেন মরিয়া হয়ে ছিল নিজেদের প্রমাণ করার জন্য। গোলরক্ষক এদুয়ার্দো মেন্দি সেই ঝলক দেখালেন পেনাল্টিতে। পেনাল্টিতে ব্রাহিম ডিয়াজের করা পানেনকা শট মুঠোয় পুরে নিলেন অনায়াসে। বরাবরই পেনাল্টিতে দেরিতে লাফ দেন মেন্দি, তাই ব্রাহিমের শট থামাতে কোনো বেগই পেতে হয়নি তাদের।
বাকি সময়টা শুধুই রূপকথা। অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে একক নৈপুণ্যে অসাধারণ এক গোল করেন সেনেগালের পাপে গেয়ে। এই গোলই সেনেগালকে এনে দিয়েছে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের দ্বিতীয় শিরোপা। আর অন্যদিক থেকে দলকে মাঠে ফিরিয়ে সেনেগালের রাজা হয়ে আছেন সাদিও মানে। থাকবেন না-ইবা কেন? আফ্রিকার ইতিহাসে সেনেগাল বরাবরই ছিল আন্ডারডগ। তাদের উত্থানের সূচনা হয়েছিল ২০০২ বিশ্বকাপ। সেবার প্রথমবারের মতো আফকন ফাইনালেও পা দিয়েছিল তারা। যে স্বপ্ন তাদের স্বর্ণালি যুগ দেখিয়ে গিয়েছিল, সেই স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সাদিও মানে। মানে আসার পর থেকেই সেনেগাল পরিণত হয়েছে অনন্য এক দলে। ২০১৯-২০ আসরে আলজেরিয়ার কাছে হেরে হতে হয় রানার্সআপ। অতঃপর পরবর্তী আসরেই প্রথমবারের মতো সেনেগাল জিতে নেয় আফকনের শিরোপা। সেবার দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাদিও মানে। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও বাগিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
এবার অবশ্য ঘটনা কিছুটা ভিন্ন। সাদিও মানে সেমিফাইনাল শেষেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, জাতীয় দলে তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে। এবারই শেষবারের মতো আফকনে দেখা যাবে তাঁকে। নিজের শেষ আফকন স্মরণ করিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন মানে। তাই তো তাঁর ডাক ফেলে দিতে পারেনি দল। রাগে-অভিমানে মাঠ ছাড়লেও সাদিও মানের ডাকে ফেরত এসেছিল সেনেগাল। ফেরত এসে মানের হাতে তুলে দিয়েছেন আফকনের দ্বিতীয় শিরোপা।
খেলোয়াড় হিসেবে সাদিও মানের বাকি রইল না আর কিছুই। ২০১১ সালে সেনেগালের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জার্মান ক্লাব মেটজে খেলতে এসেছিলেন মানে। তখনো জানতেন না ইউরোপে কীভাবে চলতে হয়, কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়। সাইনিংয়ের দিন এক ফটোসাংবাদিককে দেখে অনুরোধ করেছিলেন একটা ছবি তুলে দিতে। যাতে সেই ছবি গ্রামে পাঠিয়ে বলতে পারেন, তিনি ইউরোপে ঠিকঠাক পৌঁছেছেন। মানে মেটজে সুযোগও পেয়েছিলেন এই আফকনের বদৌলতে। দলের মূল দুই স্ট্রাইকার আফকনে ব্যস্ত থাকায় তাঁকে যুবদল থেকে তুলে এনেছিলেন কোচ। কোচের মান রেখেছিলেন মানে। দল অবনমিত হয়ে গেলেও তাঁকে আরবি সালজবার্গে টেনে নিয়েছিলেন কোচ রালফ রাগনারিক। সেখান থেকেই ঊর্ধ্বমুখী ক্যারিয়ারের গ্রাফ। সাউদাম্পটন থেকে লিভারপুল, সেখানে সর্বজয়ী হয়ে খেলেছেন বায়ার্ন মিউনিখে। সেই গল্প শেষ করে সাদিও মানে এখন খেলছেন সৌদি ক্লাব আল নাসরে।
চ্যাম্পিয়নস লিগ, প্রিমিয়ার লিগ, বুন্দেসলিগা থেকে শুরু করে আফকন, খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর ষোলোকলা পূর্ণ হয়েছে। মানুষ হিসেবেও বরাবরই সমাদৃত মানে যেন নিজেকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেলেন ফাইনালের ঘটনা দিয়ে। সেনেগালের অধিনায়ক কালিদু কুলেবালি তাই কার্পণ্য করেননি। শিরোপা উঁচিয়ে ধরার জন্য ডেকে এনেছিলেন সাদিও মানেকে। পুরো দুনিয়ার সামনে সাদিও মানে শিরোপা উঁচিয়ে জানিয়ে দিলেন, অধিনায়ক হতে হলে সব সময় আর্মব্যান্ড লাগে না। মাঝেমধ্যে আর্মব্যান্ড ছাড়াও অধিনায়ক হওয়া যায়। দরকার শুধু সময়মতো নিজেকে জানান দেওয়া।