এ যেন শুধু মরিনিও বলেই সম্ভব
‘ক্যারিয়ারে অনেক কিছু দেখেছি, যা-ই ঘটুক না কেন দেখে মনে হয় দ্যেজা ভ্যু। আজকে স্বীকার করতেই হচ্ছে, এমন অনুভূতি আগে কখনও হয়নি।’ কথাটা বলেছেন জোসে মরিনিও ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটাকে বিশ্লেষণ করতে এই একটা বাক্যই যেন যথেষ্ট। কেন নয়? এক যুগ আগে, প্রিমিয়ার লিগে পদার্পণ করেই মরিনিও ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘‘আমি অহংকার করছি না। কিন্তু আমি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন। আমি ‘স্পেশাল ওয়ান’।’’ সেই ‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’ যখন বলেন এমনটা আগে কখনও দেখিনি, তখন ফিরে গিয়ে ভাবতে হয় কতটা রোমাঞ্চকর ছিল বেনফিকার শেষ ম্যাচের লড়াইটা।
ঘটনা শুরু করতে হবে মৌসুমের একেবারে শুরু থেকে। তখন মরিনিও বেনফিকার কোচই ছিলেন না। বরং তাঁর জায়গা তখন বেনফিকার প্রতিপক্ষের ডাগআউটে। চ্যাম্পিয়নস লিগ বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি ফেরেনবাচ আর বেনফিকা। জিতলেই পরবর্তী পর্ব নিশ্চিত। সেই ম্যাচ বেনফিকার মাঠে এসে মরিনিও হেরে গেলেন ১-০ গোলে। যে ইউরোপে খেলার স্বপ্ন নিয়ে মরিনিওকে আনা, সেই ইউরোপেই যখন আর নেই, ফেরেনবাচ কর্তৃপক্ষও তাই আর দেরি করল না। পত্রপাঠে বিদেয় করে দিলো মরিনিওকে।
চাকরি হারিয়ে ৯ মিলিয়ন ইউরো পকেটে নিয়ে যখন পর্তুগালে নিজের বাড়িতে আয়েশ করছেন জোসে, তখনই খবর এল বেনফিকার কাছ থেকে। কোচকে ছাঁটাই করে দিয়েছে তারা, ব্রুনো লাগে দলকে চ্যাম্পিয়নস লিগে তুলতে পেরেছেন বটে, কিন্তু মূল পর্বে উঠেই মেলে তথৈবচ অবস্থা। আজারবাইজানের ক্লাব কারাবাগের কাছে হারের লজ্জা সহ্য হয়নি পর্তুগিজ ক্লাবটির। সঙ্গে সঙ্গে ব্রুনো লাগের চুক্তি বাতিল করেছে তারা। ফিরে তাকিয়েছে জোসে মরিনিওর দিকে। তাঁর কোচিং ক্যারিয়ারের হাতেখড়ি হয়েছিল এই বেনফিকার সঙ্গেই।
ভাগ্যের কী খেল বলো তো, যে দলের জন্য আগের ক্লাবে চাকরি গেল, সেই ক্লাবই তাঁকে বরণ করে নিয়ে এল দলে। লক্ষ্য একটাই–চ্যাম্পিয়নস লিগের পরের পর্বের টিকিটটা তাদের লাগবেই, লাগবে। ভাগ্য বুঝি একেই বলে। জোসে মরিনিও দলকে টেনে আনলেন লিগে, যোগ দেওয়ার পর থেকে হার কী জিনিস, সেটা ভুলেই গিয়েছে তাঁর দল। ১৪ ম্যাচে বেনফিকা ড্র করেছে মাত্র ৫টিতে। কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগে সেই তথৈবচ অবস্থা। মরিনিওকে ঠিক দোষ দিয়েও লাভ নেই। পরপর খেলা পড়েছে চেলসি, নিউক্যাসল আর বায়ার লেভারকুসেনের বিপক্ষে। তাদের বিপক্ষে জিতে আসা কি চাট্টিখানি কথা নাকি? ডিফেন্স শক্ত থাকলেও অফেন্সে ঠিকই তাঁকে ধরা দিয়ে গিয়েছে স্ট্রাইকাররা। ৪ ম্যাচ শেষে বেনফিকার পকেটে ছিল ০ পয়েন্ট। গোল ব্যবধানে পিছিয়ে আছে -৬!
জোসে মরিনিওর মনে তখন নিজের রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা। ২৪ মৌসুম ধরে ইউরোপিয়ান আসরে আছেন, প্রতিবারই নিজের দলকে নিয়ে পরবর্তী পর্বের বাধা পাড়ি দিয়েছেন তিনি। স্পেশাল ওয়ানের কারসাজি তো এখানেই। আয়াক্স আর নাপোলির বিপক্ষে পরপর দুই ম্যাচ জিতে দলকে নিয়ে এলেন শেষ ২৪ এর দ্বারপ্রান্তে। আবার জুভেন্টাসের বিপক্ষে ২-০ গোলে হেরে ফিরে গেলেন সেই পুরোনো সমীকরণে। পরবর্তী পর্বের টিকিট কাটতে হলে জিততেই হবে। আর সেটাও পুরোনো দল রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে। সেটাও আবার যে সে রিয়াল মাদ্রিদ নয়, নিজের পছন্দের শিষ্য আলভেরো আরবেলোয়ার অধীনে থাকা রিয়াল মাদ্রিদ। যে আরবেলোয়া তাঁর খেলোয়াড়ি জীবন থেকে আদর্শ মেনেছেন মরিনিওকে। কোচিং ক্যারিয়ারে তাঁর সূচনাও ছিল মরিনিওর মতোই। এ যেন অদ্ভুত এক গুরু-শিষ্যের লড়াই দেখার জন্য মুখোমুখি হয়েছিল বিশ্ব।
শুরুটা হয়েছিল শিষ্যকে দিয়েই। আলভেরো আরবেলোয়ার রিয়াল মাদ্রিদ এগিয়ে গিয়েছিল এমবাপ্পের দূর্দান্ত এক হেডে। বেনফিকাকে ম্যাচে ফিরতে সময় লাগেনি বেশি। প্রথমার্ধেই ২ গোল দিয়ে লিড করে নিয়েছিল নিজেদের। দ্বিতীয় হাফে মাঠে ফিরেই তৃতীয় গোল। ততক্ষণে বেনফিকার পরবর্তী পর্বে পা রাখা শেষ। ম্যাচ যেকোনো ব্যবধানে জিতলেই পরবর্তী রাউন্ড নিশ্চিত, এই ভেবে দলের সাব করা শুরু করেন মরিনিও। এমবাপ্পে ব্যবধান কমিয়ে ৩-২ এ আনলেও খুব একটা চিন্তা ছিল না। চিন্তার ভাঁজ শুরু হলো যখন খবর এল বোদো গ্লিমট হারিয়ে দিয়েছে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদকে। আর মার্শেই হেরেছে ৩-০ গোলে। ফলাফল যদি এরকমই থাকে, তবে গোলব্যবধান সমান থাকলেও গোল কম করায় বাদ পড়তে হবে বেনফিকাকে।
মাদ্রিদ তাদের দুই খেলোয়াড়কে হারিয়ে পরিণত হয়েছে ৯ জনের দলে। এমন খবর পাওয়া মাত্র মরিনিও চিৎকার করে উঠলেন ডাগ-আউট থেকে। ম্যাচের শেষ শট, একটা ফ্রি কিক। পরবর্তী রাউন্ড নিশ্চিত করতে হলে সেই ফ্রি কিক থেকে গোল করতেই হবে। গোলরক্ষক আনাতলি ত্রুবিনকে নির্দেশ দিলেন, এগিয়ে যাও। এখন না পারলে আর পেরে লাভ নেই।
অতিরিক্ত যোগ করা সময়ের অষ্টম মিনিটে ফ্রেডরিক অর্সনেসের বাড়ানো ফ্রি কিকে মাথা ছুইয়ে দিলেন ত্রুবিন। ব্যাস, হয়ে গেল। কর্তোয়াকে ফাঁকি দিয়ে বল জড়িয়ে গেল জালে। কোনো স্ট্রাইকার নয়, ডিফেন্ডার নয়, সাব থেকে আসা সুপার-সাব নয়।, এক গোলরক্ষকের গোলে পরবর্তী রাউন্ড নিশ্চিত করলো বেনফিকা। ঘরের মাটিতে তাদের বাধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস আর দেখে কে? জোসে মরিনিও আনন্দে ছুটলেন দিগ্বিধিক। পুরো ম্যাচে নিজের শিষ্য আর রিয়ালের প্রতি সম্মান দেখিয়ে চুপচাপ ছিলেন। কিন্তু এমন দিনে, এমন সময়ে কি আর চুপচাপ থাকা যায়? উল্লাস করার জন্য আর কাউকে না পেয়ে জড়িয়ে ধরলেন বলবয়কে। ‘স্পেশাল ওয়ান’ এর উল্লাসগুলো এমনই হয়।
স্পেশাল ওয়ানের কল্যাণে রিয়াল মাদ্রিদ শীর্ষ আটে থেকে শেষ করতে পারেনি চ্যাম্পিয়নস লিগ। ফলে তাদেরকে খেলতে হবে নক-আউট রাউন্ডের ম্যাচে। স্পেশাল ওয়ানের স্পেশাল জয়ে লাভ হয়েছে আরেকজনের, তাঁরই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পেপ গার্দিওলার। রিয়াল জিতে গেলে বা ড্র করলে গোল ব্যবধানে নক আউট খেলা লাগতো সিটির। সেটি আর হচ্ছে না। গার্দিওলা অবশ্য সে জন্য ধন্যবাদও দিয়েছেন।
তিনদিন আগে মরিনিও পা দিয়েছেন ৬৩ বছর বয়সে। ইউরোপের শীর্ষ লিগে নেই অনেকদিন। অনেকের মতেই ফুরিয়ে গিয়েছেন, তাকে আর চলে না ইউরোপে। কিন্তু প্রতিটি বাদ যখনই সুযোগ পান ইউরোপে খেল দেখানোর, নিজের জাত চেনানোর। মরিনিও চিনিয়ে যান। আর যেতে পারেন বলেই হয়তো নাম তার ‘স্পেশাল ওয়ান’!