ইতালি: বিষাদের রং নীল

২০১৮ ও ২০২২–এর পর এখন ২০২৬ বিশ্বকাপেও খেলা হচ্ছে না ইতালিররয়টার্স

কোনো সন্দেহ ছাড়াই বলা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। সুতরাং, পুরুষদের ফুটবল বিশ্বকাপ আসলে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট, সেটা অলিম্পিকের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও বলা যায়। তাতে ফিফার সদস্য সব দেশ, অর্থাৎ বিশ্বের সব দেশই অংশ নিতে চায়। সুযোগ সবাই পায় না। যা হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা হয় বাছাইপর্বে! অনেকে এক আসরে সুযোগ পেলে পরেরবার আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কাজেই, কোনো দল একবার তো বটেই, তিন–চারবার সুযোগ না পেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিশেষ করে ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও সত্য। তাহলে ইতালির সুযোগ না পাওয়া নিয়ে এত হইচই কিসের? বিশেষ এমন কী আছে ইতালির ফুটবল দলে?

উত্তরটা জানতে হলে একটু তাকাতে হবে ইতালির সংস্কৃতির দিকে।

ইতালি ইউরোপের সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত। তাদের রোমান সভ্যতার দেখানো পথ ধরে এখনো আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা চলছে। সংগীত, সাহিত্য, নাটক, চিত্রকলা, ফ্যাশন তো বটেই, তাদের খাবারও বিশ্বসেরা। পিৎজা, পাস্তা, লাজানিয়া তুমি পছন্দ করো না? তেমনি সবাই করে। আমরা তাদের এত কিছুর জন্য চিনি, অথচ সেই ইতালির মানুষদের ধ্যানজ্ঞানজুড়ে শুধুই ফুটবল।

আমরা এবং আমাদের আশপাশের দেশগুলো ক্রিকেট নিয়ে কতটা পাগল? ইতালি বোধ হয় তার চেয়েও বেশি। ‘ফুটবল’ খেলাটাকে সবাই কাছাকাছি একটা নাম ধরে ডাকলেও, ইতালিয়ানরা পরম ভালোবেসে বলে ‘ক্যালসিও’। তারা ঠাট্টা করে, দেশটার আকৃতিই ফুটবল বুট পরা পায়ের মতো! গুগল ম্যাপে দেখতে পারো তোমরাও, আসলেই যেন তা–ই। ‘পা’টার সামনে একটা বদখত বলও আছে, সিসিলি দ্বীপ।

তোমাদের বয়সী ইতালিয়ানরা ফুটবল খেলে, ফুটবল দেখে সব বয়সীরা, ফুটবল নিয়ে গল্প করে স্কুলে, বাড়িতে, অফিসে। ছোট-বড় সব শহরে একটা না একটা ফুটবল ক্লাব আছে। বড় শহরের ক্লাবগুলো বিশ্ব আসরেও পরিচিত—জুভেন্টাস, এসি মিলান, ইন্টার মিলান, রোমা। ইতালিয়ান লিগ, যাকে ‘সিরি আ’ বলা হয়, ইউরোপের সেরা চারটি লিগের একটি। কিংবদন্তি ফুটবলার ম্যারাডোনা তো জীবনের বড় একটা অংশ কাটালেন নাপোলির হয়ে খেলে। (তাঁর শরীরে, এবং বেশির ভাগ আর্জেন্টাইনের শরীরে ইতালিয়ান রক্ত আছে, জানো কি?) ইতালির ফ্যানরা উন্মাদ হয়ে যায় নিজ দলের খেলা থাকলে। আর ইতালি যখন নীল জার্সিতে জাতীয় দলের খেলা খেলে, সেই আবেগ হয়ে পড়ে বাঁধভাঙা। আদর করে তারা জাতীয় দলকে বলে ‘আজ্জুরি’। এটা তাদের জাতীয় দলের জার্সির নীল রংটার ইতালিয়ান নাম। জাতীয় দলের স্লোগান: ফোর্জা আজ্জুরি! মানে, লেটস গো ব্লুজ!

বিনা কারণে নয় এই ভক্তি। বিশ্ব আসরে বারবার ইতালির মাথা উঁচু করেছে তাদের ফুটবল দল। পুরো বিশ্বকাপের ইতিহাসজুড়ে বারবার এসে পড়েছে ইতালির নাম, সেটা ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায়।

বিশ্বকাপ ফুটবলের নাম প্রথমে ছিল জুলে রিমে কাপ। সেটার ১৯৩০ সালের প্রথম আসরে খেলেনি ইতালি। ১৯৩৪ সালে প্রথম বিশ্বকাপে নেমেই বাজিমাত। ঘরের মাটিতে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় ফাইনাল ম্যাচে চেকোস্লোভাকিয়াকে অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় ইতালি।

১৯৩৮ সালে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি।
ফিফা

পরের বিশ্বকাপ ছিল ফ্রান্সে। প্রথমদিকে ভালো খেলতে পারছিল না ইতালি। তবু ব্রাজিলকে সেমিফাইনালে হারিয়ে পৌঁছে যায় ফাইনালে। প্যারিসের ফাইনালে গোলবন্যার ম্যাচে হাঙ্গেরিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে আবারও শিরোপা জিতে নেয় ইতালি।

এর পরে এল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। একদিকে তাতে দেশ হিসেবে পরাজিত হয় স্বৈরশাসক মুসোলিনির ইতালি, আবার পরপর দুই আসর বিশ্বকাপও হয়নি, যেটা হবার কথা ছিল ১৯৪২ আর ১৯৪৬ সালে। এই পুরো সময়টা ইতালি চ্যাম্পিয়ন ছিল বটে, কিন্তু আবার যখন বিশ্বকাপ চালু হলো ১৯৫০ সালে, তত দিনে অনেক কিছু বদলে গেছে। ১৯৫০–এর আসরে জিতল উরুগুয়ে, আর ইতালি বাদ পড়ল গ্রুপ পর্বে। ’৫৪ বিশ্বকাপেও গ্রুপ পর্বে বাদ। ’৫৮ বিশ্বকাপে খেলারই সুযোগ পায়নি আজ্জুরিরা। ’৬২ আর ’৬৬ বিশ্বকাপেও যখন গ্রুপ পর্বে বাদ পড়ল, তখন অনেকে ধরে নিয়েছিল ইতালির সোনালি যুগ শেষ। তাদের দুটি বিশ্বকাপ জেতা তখন দূর অতীতের স্মৃতি। এই দল আর কোনো দিন ভালো করবে, বা বিশ্বকাপ জিতবে, কেউ আশা করেনি।

১৯৭০ বিশ্বকাপ, আসর বসেছে মেক্সিকোতে। ‘জুলে রিমে’ যুগের শেষ পালা। যে জিতবে, চিরদিনের মতো জুলে রিমে কাপ তার। পরিষ্কার ফেবারিট ছিল ব্রাজিল। তাদের দলে তখন তারার মেলা—পেলে, গেরসন, জরজিনহোর মতো মহাতারকার এই দলটাকে কেউ কেউ সর্বকালের সেরা দল বলে থাকেন। তারা সব ম্যাচ জিতে ঠিকই ফাইনালে চলে যায়। অন্যদিকে ইতালিও ভালো খেলে চলে আসে সেমিফাইনালে। তাদের প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানি (তখন জার্মানি পূর্ব ও পশ্চিম নামে দুটি দেশে ভাগ করা ছিল)। আর এই খেলাটা অমর হয়ে আছে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ম্যাচ হিসেবে।

রোমের ফাইনাল শুরুর আগে ইতালি দল।
এএফপি

৯০ মিনিটে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর পর দুই দল মিলে গোল করল পাঁচ-পাঁচটি! ৪-৩ গোলে জিতে ফাইনালে চলে গেল ইতালি। মেক্সিকোর যে মাঠে ম্যাচটা হয়েছিল, তাতে এখনো একটি ফলক বসানো আছে—পার্তিদো দেল সিগলো। মানে, শতাব্দীর সেরা ম্যাচ!

তাতে কী? ফাইনালে পেলের ব্রাজিলের কাছে পাত্তাই পেল না ইতালি। ৪-১ গোলে হেরে বসল। তবে ভক্তরা তখন আরেকবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, ইতালি ফিরেছে। ইতালি পারবে।

বিশ্বাস কেনই বা করবে না? তাদের আছে নিজস্ব খেলার কৌশল—কাতেনাচ্চিও। দুর্ভেদ্য ডিফেন্স, সঙ্গে হঠাৎ পাল্টা আক্রমণে গোল। অনেক ফুটবলবোদ্ধা পছন্দ করেন না এই কৌশল। তাতে কী? বারবার ইতালি সফল হয়েছে এই ছকে। বহু বড় বড় দল এঁটে উঠতে পারেনি এই সাজানো পরিকল্পনার মুখে।

আরও পড়ুন

ইতালির জোরালো ঘরোয়া ফুটবলের কথা তো আগেই বলেছি। সেখান থেকে নতুন নতুন মুখ উঠে আসে প্রতিবছর। তাদের বিশ্বের বাকি দেশগুলো পাত্তা দিক না দিক, মিডিয়ার মনোযোগ পাক না পাক, তারা ঠিকই ঝলসে ওঠে আসল সময়ে, চিনতে বাধ্য করায়। আবার এই ‘সিরি আ’ দুর্নীতির জন্যও কুখ্যাত। ইতালির মাফিয়া সেখানে অনকে কিছু নিয়ন্ত্রণ করত, এখনো করে। সবকিছু মিলিয়ে যে চিত্রটা, সেটা ১৯৮২ বিশ্বকাপের গল্প শুনলে বুঝতে পারবে।

ইতালি ১৯৭৮-এ চতুর্থ হয়েছিল বটে, কিন্তু ’৮২ বিশ্বকাপে তাদের ফেবারিট হিসেবে ধরেনি কেউ। আগের আসরের বিজয়ী আর্জেন্টিনা তো শিরোপাপ্রত্যাশী বটেই, সেই সঙ্গে ছিল ব্রাজিল। জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাওদের দলটাকে অনেকে বলেন সর্বকালের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল, হয়তো ’৭০–এর দলটার চেয়েও ভালো। সবাই ধরেই নিয়েছিল, ব্রাজিলকে ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হবে। এই দলকে আটকাতে প্রয়োজন অলৌকিক কিছুর।

ব্রাজিলকে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছিলেন পাওলো রসি।
ছবি: এক্স

কারও হিসাবের মধ্যে না থাকা ইতালি ধুঁকে ধুঁকে পার করেছিল গ্রুপ পর্ব। তিনটি ম্যাচই ড্র, কেবল এক গোলের ব্যবধানের কারণে ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলে পরের রাউন্ডে যেতে পেরেছে। তখন দ্বিতীয় রাউন্ডেও গ্রুপ পর্বের মতো খেলা হতো। যে গ্রুপে ইতালি পড়ল, সেটা ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত গ্রুপ অব ডেথ। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি! মাত্র একটি দলই সেমিফাইনালে যাবে এই গ্রুপ থেকে। ফুটবলবোদ্ধারা ধরে নিয়েছিলেন, দলটা হবে ব্রাজিল।

সবাইকে চমকে দিয়ে প্রথম ম্যাচে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে দিল ইতালি। ২১ বছরের ম্যারাডোনাকে থামিয়ে দেওয়াটা সে ম্যাচে তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। দক্ষ ডিফেন্ডার ক্লদিও জেন্তিলে আঠার মতো লেগে ছিলেন ভবিষ্যৎ সুপারস্টারের সঙ্গে। কিন্তু তখনো আসল বিপদ সামনে। ব্রাজিলও তাদের ম্যাচ জিতেছে আর্জেন্টিনার সঙ্গে। ৩-১ গোলের জয়ের কারণে গোল ব্যবধান তাদের পক্ষে। ইতালির সঙ্গে গ্রুপের শেষ ম্যাচে তারা শুধু ড্র করলেই চলে যাবে পরের পর্বে।

৫ জুলাই ১৯৮২-তে ছিল ব্রাজিল বনাম ইতালির ম্যাচটা। ব্রাজিল ছিল ফুরফুরে মেজাজে। পুরো টুর্নামেন্ট তারা অনায়াসে খেলেছে। তারকায় ঠাসা দল দারুণ ছন্দে। ম্যাচের আগে মিডিয়ার সঙ্গে বলা খেলোয়াড়দের আলোচনাতেও পাওয়া যায় সেই আত্মবিশ্বাসের ছাপ। সবাই আশাবাদী, জিতবেন। শুধু একজন একটু ভিন্ন কথা বলেছিলেন। ব্রাজিলের গোলকিপার পেরেজ বলেছিলেন, ‘রসি যদি ভালো খেলেন, তাহলে বিপদ হতে পারে।’

স্পেন বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করেছিলেন রসি।
ছবি: টুইটার

পাওলো রসি। ইতালির ফরোয়ার্ড। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে তিনটি গোল করেছিলেন। কিন্তু তাতে কী? ইতালির সমর্থকদেরও বিশ্বাস ছিল না তাঁর ওপর। ’৭৯ সালে একটা দুর্নীতির অভিযোগে তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে তিনি তখন ক্যারিয়ারের ধূসর সময় পার করছিলেন। বিশ্বকাপটা মিসই করতেন, পরে এক বছর সাজা কমে যাওয়ার কারণে দলে সুযোগ পান। এ কারণে কোচকে অনেক সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছিল। প্রথম যে তিনটি ম্যাচে ইতালি ভালো খেলেনি, সেগুলোয় রসিকে যেন মাঠে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না। একটা পত্রিকা তাঁকে নিয়ে লিখল, ‘একটা ভূত যেন উদ্দেশ্যহীনভাবে মাঠের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

ভূতই ভর করেছিল রসির ওপরে, বার্সেলোনায় ব্রাজিলের সঙ্গে সেই ম্যাচে। তবে এই ভূত অন্য জাতের। পাঁচ মিনিটের মধ্যে গোল করে বসলেন অসাধারণ হেডে। সর্বকালের সেরা ব্রাজিল দল সেটা শোধ দিল সাত মিনিট পরেই। আবার জ্বলে উঠলেন রসি ২৫ মিনিটের সময়। জুনিয়রকে পাশ কাটিয়ে ডি–বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শটে দ্বিতীয়বারের মতো বল জড়ালেন ব্রাজিলের জালে!

অনেক চেষ্টার পর ৬৮ মিনিটে ফ্যালকাও গোল শোধ দিলেন। ২-২। এখন ম্যাচ শেষ হলেই সেমিফাইনালে চলে যাবে ব্রাজিল। কিন্তু দিনটা ছিল রসির, দিনটা ছিল ইতালির প্রত্যাবর্তনের। ৭৪ মিনিটে ব্রাজিলের সামান্য ভুলের কারণে ডি-বক্সের ভেতর বল চলে এল। রসি আর তাঁর সতীর্থ গ্রাজিয়ানি, দুজনই পা চালিয়েছিলেন। রসির লাথিটা লাগল। হ্যাটট্রিক!

ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে পাওলো রসি।
ছবি: এক্স

পরে জিকো এই ম্যাচ নিয়ে বলেছিলেন, ‘আজকের দিনে ফুটবল মারা গেল।’ তাঁর কথার অর্থ ছিল, আর আগের মতো থাকবে না ফুটবল। তা–ই হয়েছে। এখন আর কেউ শুধু নিজের অনুশীলন আর নিজের পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে না। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়, কৌশল নিয়ে সূক্ষ্ম বিচার এখন খেলার বড় একটা অংশ, বড় ছোট সব কোচ আর সব খেলোয়াড়ই তা করেন। নতুন এই যুগের শুরু ওই ম্যাচ থেকে।

ম্যাচটা নিয়ে এত আলোচনা হয়েছে যে ইতালি যে তারপর বিশ্বকাপটাই জিতে গেল পরের দুটি ম্যাচ জিতে, সেটাই যেন আড়াল হয়ে যায়। ৪৪ বছর পর বিশ্বকাপ ফিরে পেল ইতালি। সেমিফাইনালে দুটি, ফাইনালে একটি গোল করেছিলেন রসি। যে রসিকে কেউ পাত্তা দেয়নি, কেউ ভালোবাসেনি, কেউ আলোচনা করেনি—ক্যারিয়ারের তুমুল অন্ধকার সময়টা থেকে উঠে এসে তিনি জিতলেন বিশ্বকাপ, গোল্ডেন বল, গোল্ডেন বুট আর সেই বছরের ব্যালন ডি’অর।

আরও পড়ুন

এর পরেও ইতালিতে সুপারস্টার খেলোয়াড় এসেছেন। ’৯০ বিশ্বকাপে সালভাতোর শিলাচ্চি সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন। তবে রসির সঙ্গে সবচেয়ে তুলনা করা যায় মনে হয় রবার্তো বাজ্জিওর। ’৯৪ বিশ্বকাপে বলতে গেলে একাই ইতালিকে ফাইনালে তুলেছিলেন। ফাইনালে প্রতিপক্ষ কে? সেই ব্রাজিল। মূল খেলা ড্র হওয়ার পরে এল টাইব্রেকারের পালা। সুপারস্টার বাজ্জিও তাঁর শটটা উড়িয়ে মারলেন পোস্টের ওপর দিয়ে! ব্রাজিল প্রতিশোধ নিল ১২ বছর আগের। চতুর্থবার কাপ জিতল তারা।

এ রকম তীব্র আনন্দ আর প্রবল বিষাদ যেন ইতালির ভক্তদের নিয়তি। আমার কথাই বলি। ’৯৪ সালে আমার জন্ম হয়েছে মাত্র। ’৯৮–এর বিশ্বকাপ যখন এল, আমার বয়স চার বছর। মানুষের প্রথম স্মৃতিগুলো তৈরি হয় ওরকম বয়সে। আমার তেমন একটা স্মৃতি হচ্ছে, রংপুরের মিঠাপুকুরের নানুবাড়ি থেকে ফিরছি শহরে নিজেদের বাসায়। একটা ভ্যানগাড়িতে করে আমি, আম্মু আর আট বছর বয়সের ভাইয়া যাচ্ছি বাসস্টেশনের দিকে। নানাভাইয়ের পোষা কুকুরটা আমাদের ছাড়তে চাচ্ছে না। প্রায় তিন কিলোমিটার রাস্তা আমাদের সঙ্গে আসার পর ফিরে গেল।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আব্বু ফিরেছেন ঢাকা থেকে। অফিসের কাজে গিয়েছিলেন। দুই ছেলের জন্য কমিকস এনেছেন—অগ্নিপুত্র অভয়, চাচা চৌধুরী, ফ্যান্টম। পুরোনো হয়ে গেছে বইগুলো, তবু এখনো আছে আমার কাছে।

বাজ্জো: ‘ম্যান হু ডাইড স্ট্যান্ডিং’
ছবি: এক্স

তোমরা হয়তো ভাবছ, ইতালি ফুটবল দলের সঙ্গে আমার এই ছোটবেলার স্মৃতির সম্পর্ক কী? বলছি, কারণ, ওই দিনই শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবল। ফ্রান্স ছিল আয়োজক। টিভিতে একটা খেলা দেখতে দেখতে আমি আর ভাইয়া মেঝেতে বসে খেলছি। হঠাৎ ভাইয়া প্রশ্ন করল, ‘তুই কোন দল সাপোর্ট করবি?’

চার বছরের শিশু আর কী বোঝে! আমি পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন কোন দল আছে?’

‘অনেকগুলা। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইতালি।’

আমি কিছু না বুঝেই বললাম, ‘ইতালি।’ কে জানে, নামটা হয়তো ভালো লেগেছিল। কিংবা কে জানে, সেটাই হয়তো ভাগ্যে ছিল।

সেই বিশ্বকাপে ইতালি কী খেলেছিল কিচ্ছু মনে নেই, থাকার কথাও না। সবাই জিদানকে নিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত ছিল, সেটা বলতে পারি। সত্যিকারের খেলা দেখলাম ২০০২ সালে। বুফন, টট্টি, মালদিনি, দেল পিয়েরোর দলটা ছিল বিশ্বকাপের ফেবারিট। কোয়ার্টার ফাইনালে তারা হেরে বসল আয়োজক দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে। রেফারির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল ইতালি। যাক সে কথা। আমি তত দিনে পাঁড় ইতালি ভক্ত। স্কুলের বন্ধুরা সবাই জানত, নাবিল ইতালির সাপোর্টার। চেনাজানা সবাই হয় আর্জেন্টিনা না হয় ব্রাজিল, তার মাঝে এক–দুজন ইতালি, জার্মানি, স্পেন। আমি ছিলাম তেমনই একজন।

আরও পড়ুন

সেই বিশ্বকাপের প্রায় একই দলটা পরের বিশ্বকাপ এল, দেখল, জয় করল। সব ম্যাচেই দুর্দান্ত খেলেছিল ইতালি, কিন্তু বিশেষ করে বলতে হয় জার্মানির সঙ্গে সেমিফাইনালের ম্যাচটির কথা। বার্লিনে খেলা, জার্মানির ঘরের মাঠ। পুরো ম্যাচে টান টান উত্তেজনা, আক্রমণ–পাল্টা আক্রমণ, তবু গোল করতে পারছিল না কেউ। প্রায় ১১৮ মিনিটের দিকে গোল খেতে খেতে বেঁচে গেল ইতালি কিংবদন্তি গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনের কারণে। পাল্টা আক্রমণে ১১৯ মিনিটে গোল দিলেন গ্রোসো। পরের মিনিটে ব্যবধান বাড়িয়ে দিলেন সুপারস্টার দেল পিয়েরো।

রাত প্রায় তিনটা। অত রাত কখনোই জাগিনি ক্লাস সিক্সে পড়া আমি। ভাইয়া আর আব্বু খেলা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছেন বসে বসেই। আমি একা জেগে ছিলাম। আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল আগেই বাদ পড়ে যাওয়ায় আমার চেনা পরিচিত কারও তেমন আগ্রহ ছিল না বিশ্বকাপ নিয়ে। কিন্তু আমি কীভাবে ঘুমাই, আমার ইতালি খেলছে না? ঘন নীল ওই জার্সিকে একবার ভালোবেসে ফেললে সেটার ভার তো বহন করতেই হবে।

বিশ্বকাপে সুযোগ না পেলেও জিতেছে ২০২১ ইউরো।
ছবি: এক্স

পরদিন রংপুর জিলা স্কুলে আমার ক্লাসে ঢুকছি আনমনে। দেখি, বন্ধুরা গোল হয়ে ঘিরে ধরেছে আমাকে, পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে, অভিনন্দন জানাচ্ছে। ওরা জানত যে এই পাগল ছেলেটা ইতালিকে মনেপ্রাণে ভালোবাসে। আমার তখনই মনে হলো, বিশ্বকাপ জিতে গেছে ইতালি। খালি ইউরোপের দেশটা না, বিশ্বকাপ জিতেছি আমিও।

আসলেই ফাইনালে বিশ্বকাপ জিতল ইতালি, ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে। অসাধারণ সেমিফাইনালের পরে সেটা যেন হবারই ছিল!

ইতালির ভক্তদের সুখের দিনের এখানেই শেষ। পরের দুটো বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বেই বাদ। সর্বনাশ যে কতটুকু বাকি আছে, সেটা তখনো বুঝতে বাকি ছিল সবার। ’১৮ আর ’২২–এর বিশ্বকাপে মূল পর্বেই সুযোগ পেল না চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। আর এইতো সেদিন বসনিয়া-হার্জেগোভিনার সঙ্গে সেই টাইব্রেকারেই হেরে বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচ থেকে বাদ পড়ে গেল আবারও। টানা তৃতীয়বার। এ এক অবিশ্বাস্য বিপর্যয়। সাহিত্যের ভাষায় বলা হয়, বিষাদের রং নাকি নীল। ইতালি বোধ হয় তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ!

আরও পড়ুন

সমস্যাটা কোথায়? এ ওকে দোষ দিচ্ছে, কোচ বদল হচ্ছে, কিন্তু সমস্যার মূলটা সম্ভবত অনেক গভীরে। ঘরোয়া ফুটবলের কাঠামো ইংল্যান্ড বা স্পেনের তুলনায় অনেক দুর্বল তাদের, ভক্তদের অত উন্মাদনা সত্ত্বেও। নতুন খেলোয়াড়দের ঠিকমতো স্কিল শেখানো হচ্ছে না। সিরি আ লিগে বিদেশি খেলোয়াড়ের কদর বেশি, দেশি খেলোয়াড় সুযোগ পায় না। রসি বাজ্জিও টট্টির দেশ এখন বিশ্বমানের স্ট্রাইকার খুঁজে পায় না। নানা পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগও আছে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, দৃঢ় ফুটবল-সংস্কৃতি থাকলে বারবার ব্যর্থতার পরও একটা দল ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেন সেটা দেখিয়েছে। অনেকে তাদের কোনো হিসাবের মধ্যে রাখেনি, কিন্তু ফুটবল নিয়ে প্রবল আবেগ তাদের সর্বোচ্চ শিখরে তুলেছে। ইতালি নিজেও তো এটার বড় প্রমাণ। ৪৪ বছর মধ্যম সারির দল হয়ে থাকার পর তারা বিশ্বকাপ জিতেছে। এমনকি বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়ার ব্যর্থতার মধ্যেও তারা ইউরো কাপ জিতেছে ২০২১ সালে।

বিশ্বকাপ বাছাই প্লে অফ ফাইনালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে হারের পর হতাশ ইতালি জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা
রয়টার্স

বিশ্বজুড়ে ইতালির ভক্ত হয়তো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মতো বেশি নয়। তবে খুব কমও নয় তাদের সংখ্যা। আমি নিজে এই দলভুক্ত, তাই দেখেছি, ইতালির ভক্তদের একটা গুণ হচ্ছে সহ্যক্ষমতা। বন্ধুরা, পরিবারের লোকেরা তাদের নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করছে, এরই মাঝে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে, কোন নতুন খেলোয়াড়টা দলে ভালো করতে পারে। কোন কোচ দলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন। কী করলে সিরি আ আরও উন্নত হবে!

১৯১১ সালে স্থাপিত হওয়ার পর তাদের সবচেয়ে কালো সময়টা পার করছে ইতালি। তবু ভক্তরা আশায় বুক বেঁধে আছেন। একসময় হয়তো কেটে যাবে এই দুঃস্বপ্ন। হয়তো কারও কল্পনাতেও না থাকা ইতালির কোনো খেলোয়াড় পাওলো রসির মতো ঝলসে উঠবেন বিশ্বমঞ্চে।

হয়তো তখন আজ্জুরিদের নীল রংটা তখন আর বিষাদের থাকবে না, হবে বিজয়ের রং।