ইতালি কেন বারবার বিশ্বকাপে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে?

আবারও আশাভঙ্গ। কষ্টে মাঠেই শুয়ে পড়লেন ইতালির এক খেলোয়াড়রয়টার্স

বসনিয়ার ‘বেলেনো পোহইয়ে’ স্টেডিয়ামে ৪ মার্চ রাতে লেখা হলো নতুন এক রেকর্ড, যেখানে নাম উঠল ইতালির। সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তিন-তিনবার বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা হারানো একমাত্র দল তারা। ঠিক এক পা দূরে থাকা বিশ্বকাপ যাত্রায় যাওয়া হলো না এবারও! একদিকে বসনিয়ার খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস, আরেকদিকে মুখ লুকিয়ে আজ্জুরিদের কান্না--দুইয়ে মিলে স্টেডিয়ামে তখন অবিশ্বাস ছড়ানো। কারণ ২০১৭ সালে ইতালি যখন বিশ্বকাপে অংশ নিতে ব্যর্থ হলো, তাদের ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি বলেছিলেন, এটা একটা মহাপ্রলয়! কিন্তু মহাপ্রলয় নিশ্চয়ই বারবার ঘটে না। যদি ঘটেও থাকে, মহাপ্রলয়ের তিনটি সিক্যুয়েল হয়ে যাওয়া রীতিমতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার--মজা করে এরকমই বলেছে খেলাধুলার জনপ্রিয় ওয়েবসাইট দ্য অ্যাথলেটিক।

যদিও খেলা শেষে ইতালির কোচ গাত্তুসো আগলে রেখেছেন খেলোয়াড়দের, “ওরা একেবারে জানপ্রাণ দিয়ে খেলেছে” কিন্তু তবুও বিশ্বকাপে অংশ নিতে না পারায় আতশ কাচের নিচে নেয়া হবে সবাইকে। কেন না এত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের মাত্র ৪১ মিনিটে ডিফেন্ডার বাস্তোনি এমন এক ফাউল করে লাল কার্ড দেখেছেন, যেটা শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে ইতালির জন্যে। ১-০ গোলে এগিয়ে থাকার পর 'প্রফেশনাল' ফাউল করা মানে নিশ্চিত লাল কার্ড। সেক্ষেত্রে ফাউল না করে ওই অবস্থায় গোল হজম করলেও বরং এগারো জনের দল হয়ে লড়াই করা বুদ্ধিমানের কাজ হতো। দায় থাকবে প্রথম গোল করা ময়েসে কিনেরও, কেননা দ্বিতীয়ার্ধে দশ জন হবার পরও দারুণ এক গোলের সুযোগ মিস করেছেন তিনি।

আরও পড়ুন

ইতালির এমন দৈন্যদশার সুযোগ নিয়ে ম্যাচে ফিরেছে বসনিয়া। আজ্জুরিদের কাপ্তান দোন্নারুম্মা প্রাণপণ চেষ্টা করে গেলেও শেষ পর্যন্ত পারেননি। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে এডিন জেকোর হেড ঠেকিয়ে দিলেও ফাঁকায় বল পেয়ে গোল দিয়েছেন তাবাকোভিচ। তারপর কোনো দল আর গোল পায়নি। কিন্তু একজন কম নিয়ে খেলায় অতিরিক্ত সময়ে শুধু ডিফেন্স করে যেতে হয়েছে তোনালি, ক্যালাফিওরিদের। আশা ছিল টাইব্রেকারে অতিমানব হয়ে উঠবেন দোন্নারুম্মা। সেটা হয়নি। ক্রিস্টান্তে টাইব্রেকারের সুযোগ মিস করার সুবাদে ১২ বছর পর বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনিয়া।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমেই ইতালির সমর্থকদের আঙুল উঠেছে বোর্ড সভাপতি গ্রাভিনার দিকে। ২০২২ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে নর্থ মেসিডিনোয়ার কাছে ইতালির হার কিংবা ২০২৪ ইউরোতে সুইজারল্যান্ডের কাছে শেষ ষোলোতে হারের পরও সভাপতির আসন ছাড়েননি তিনি। বরং প্রতিবার কোনো না কোনো অযুহাত দিয়ে বাঁচিয়ে গেছেন নিজের গদি এবং প্রিয় কর্মকর্তাদের। সমর্থকদের মতে, এসবের খেসারত দিতে হচ্ছে ইতালি ফুটবল দলকে।

আরও পড়ুন
লাল কার্ড দেখেন ইতালির বাস্তোনি
এএফপি

২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ার পর ইতালি দলে এ পর্যন্ত ৬ জন কোচকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কেবল রবার্তো মানচিনি ছাড়া বলার মতো সাফল্য এনে দিতে পারেননি কেউই। মানচিনির অধীনে ২০২১ ইউরো জিতে ইতালি। বারো বছরে ছয় জন হেড কোচ বদল, স্বাভাবিকভাবেই দলে স্থিতিশীলতা আনতে দেয়নি। তা ছাড়া আন্তোনিও কন্তে, মানচিনি ও স্পালেত্তি ছাড়া অন্যদের কোচিং ক্যারিয়ারে বলার মতো তেমন কিছু নেই। ২০১৭ বিশ্বকাপ প্লে-অফ হেরে যাবার পেছনে তো সেই সময়ের কোচ জিয়ান পিয়েরো ভেনচুরাকে সরাসরি দায়ী করেন বেশিরভাগ ফ্যানরাই। কোচ ও স্টাফ নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ বরাবরই তোলা হয়েছে ইতালিয়ান ফেডারেশনের বিরুদ্ধে।

কিন্তু এই বিশ্বকাপ না খেলার ব্যর্থতা একদিকে সরিয়ে রাখলে, ইতালির ফুটবল যে একেবারে মন্দ করছে তা না। বরং ২০১০ সালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হয়ে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ায় বয়সভিত্তিক দলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রজেক্ট হাতে নেয় তারা। তিনবার অনূর্ধ্ব-১৭ ইউরোর রানার্সআপ হবার পর, ২০২৪ সালে এর শিরোপা জেতে ইতালির কিশোরেরা। একইভাবে দুইবার ফাইনাল খেলার পর ২০২৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরো জেতে তারা। সেখান থেকে উঠে আসা এসব তরুণেরা ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে ইতালির ক্লাবগুলোর মূল একাদশে, এমনকি জাতীয় দলেও।

আরও পড়ুন
টাইব্রেকার শেষে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ইতালি গোলকিপার দোন্নারুম্মা
রয়টার্স

তাহলে ২০২৬ বিশ্বকাপের এত কাছে এসেও হেরে যাওয়ার কারণ কী? ফুটবল বিশারদদের মতে, এর অন্যতম কারণ ইতালির প্রথাগত ডিফেন্সিভ ফুটবল। অন্য সব দল যেখানে পজেশন নিয়ে কাজ করছে, আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করছে, সেখানে ইতালির খেলা এখনো বিরক্তিকর ও একঘেয়ে। রবার্তো মানচিনি কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন ইতালিকে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলানোর, কিন্তু সেটা দীর্ঘমেয়াদে টেকেনি। অনেকের মতে এর পেছনে দায় আছে দলের কোচিং স্টাফদের। এমনকি ঘরোয়া লিগ সিরি আ-কেও দায়ী করছেন তাঁরা। দ্রুতগতির ও আক্রমণাত্মক ফুটবলের বিচারে এখনো সিরি-আ’র বেশিরভাগ দল পিছিয়ে আছে। তা ছাড়া ইতালির তরুণ খেলোয়াড়দের ক্লাবের মূল একাদশে নিয়মিত সুযোগও কম দেয়া হয়। ফলে তাদের উন্নতি হয় ধীরগতিতে। যেকারণে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা ফ্রেঞ্চ লিগ থেকে যে পরিমাণ তরুণ ফরাসী ফুটবলার উঠে আসে, তার চেয়ে অনেক কম তৈরি হয় ইতালির তরুণ ফুটবলাররা। আর তরুণ তুর্কি ছাড়া ফুটবলে আধুনিক কৌশল বাস্তবায়ন করা কঠিন।

তবে যতো কথাই হোক, শেষ পর্যন্ত দায় গড়ায় কোচ এবং বোর্ডের কাঁধেই। হয়তো গাত্তুসো তার আসন ছেড়ে দেবেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল গ্রাভিনা পদত্যাগ করবেন কিনা কে জানে! একের পর এক চলতে থাকা দুর্দশা কাটিয়ে নতুন শুরুর জন্য বেশ বড়সড় পরিবর্তনের বিকল্প নেই তাদের হাতে। তা করা সম্ভব হলেই হয়তো ২০৩০ সালে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ খেলার সৌভাগ্য অর্জন করবেন দোননারুমা, লোকাতেল্লি, তোনালি, বাস্তেনিরা।

আরও পড়ুন