স্কেটবোর্ডিং শিখতে হলে

ডিউ ট্যুর স্কেটবোর্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতিযোগী। ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ১৬ জুন।ছবি: রয়টার্স

খেলা হিসেবে স্কেটবোর্ডিং খুব বেশি পুরোনো নয়। যদিও প্রথম স্কেটবোর্ডটি ঠিক কবে তৈরি হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। শুধু এটুকু জানি, স্কেটবোর্ডিংয়ের ধারণাটি এসেছে সাগরের বিশাল ঢেউয়ে ভেসে বেড়ানোর খেলা ‘সার্ফিং’ থেকে।

স্কেটবোর্ডিংকে শুরুতে সার্ফাররা বলত ফুটপাতের সার্ফিং। তখন পেশাদার সার্ফাররা খুব একটা গুরুত্ব দিত না স্কেটবোর্ডিংকে। সাগরে ঢেউ যখন সার্ফিং করার জন্য ভালো থাকত না, তখন প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্যই তারা স্কেটবোর্ডিং করত স্থলে। এ কারণেই স্কেটবোর্ডিংয়ের শুরুর দিকের সব কৌশলই ছিল ঢেউয়ের ওপর চড়ার মতো করে।

১৯৮০–এর দশকের শুরুর দিকে স্কেটবোর্ডিংয়ের সঙ্গে ‘পাঙ্ক রক’ ধারার সংগীতের একধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়। তখন স্কেটবোর্ডারদের একরোখা বা বিদ্রোহী হিসেবে দেখা হতো। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, স্কেটবোর্ডাররা নিয়ম মানেন না এবং শহরের পরিবেশ খারাপ করেন। যদিও সব স্কেটার এমন ছিলেন না। তাঁদের সম্পর্কে এই নেতিবাচক ধারণা ছিল অতিরঞ্জিত।

আজকের দিনে স্কেটবোর্ডারদের নির্দিষ্ট কোনো সংগীত বা পোশাক দিয়ে আলাদা করা যায় না। এমনকি এখন শুধু তরুণেরাই স্কেটিং করে এমন নয়। বার্ডম্যান টনি হক, রডনি মুলেন বা স্টিভ ক্যাবালেরোর মতো নামী স্কেটিং খেলোয়াড়েরা ৪০ বছর বয়সের পরেও দাপটের সঙ্গে স্কেটিং করে গেছেন।

আরও পড়ুন

শুরুতেই বলেছি, খেলা হিসেবে বেশ পরে স্বীকৃতি পেয়েছে স্কেটবোর্ডিং। ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকে প্রথমবারের মতো স্কেটবোর্ডিংকে অন্তর্ভুক্ত হয়। তরুণদের মধ্যে এই খেলার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও এর দারুণ সব কৌশলের কারণেই অলিম্পিক কমিটি খেলাটিকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। অলিম্পিকে স্ট্রিট ও পার্ক এই দুই ধরনের স্কেটবোর্ডিং হয়।

স্ট্রিট স্কেটবোর্ডিংয়ে সিঁড়ি, রেলিং ও দেয়ালের মতো বাধাগুলোর ওপর স্কেটাররা তাঁদের কৌশল দেখান। আর পার্ক স্কেটবোর্ডিংয়ে বিশাল গামলা আকৃতির খাড়া ঢালু জায়গায় বাতাসে লাফিয়ে উঠে নানা রকম কসরত দেখান স্কেটাররা। এ খেলায় জাপানের মেয়ে মোমিজি নিশিয়া মাত্র ১৩ বছর বয়সে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতে ইতিহাস গড়েন। তিনি অলিম্পিক ইতিহাসের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ স্বর্ণপদকজয়ী।

স্কেটবোর্ডিং আসলে কী

সহজ কথায় বলতে গেলে, স্কেটবোর্ডিং হলো নিচে চারটি চাকা লাগানো একটি কাঠের বোর্ডের ওপর চড়ে সামনে এগিয়ে চলা। স্কেটাররা সাধারণত নিজের পায়ের ধাক্কায় অথবা ঢালু জায়গায় মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সাহায্যে এটি চালান। তবে বর্তমানে স্কেটবোর্ডিং শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার বাহন নয়। এটি এখন একই সঙ্গে একটি খেলা এবং শিল্পেও পরিণত হয়েছে। এই খেলায় অনেক জানতে হয় কৌশল, প্রয়োজন হয় শারীরিক দক্ষতারও।

একটি স্কেটবোর্ড মূলত তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত—ডেক, ট্রাক ও চাকা।

ডেক: স্কেটবোর্ডের এ অংশের ওপর দাঁড়ায় স্কেটাররা। আধুনিক ডেকগুলোর সামনে ও পেছনের অংশ কিছুটা ওপরের দিকে বাঁকানো থাকে এবং মাঝখানটা একটু দেবে থাকে। এই বিশেষ আকৃতির কারণে স্কেটার খুব সহজে বোর্ডটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সাধারণত চওড়া বোর্ডগুলো বড় র৵াম্পে চালানোর জন্য ও সরু বোর্ডগুলো রাস্তায় চালানোর জন্য ভালো। তবে এটি অনেকটা স্কেটারের পছন্দের ওপর নির্ভর করে।

ট্রাক: ডেক বা কাঠের নিচে লাগানো ‘T’ আকৃতির ধাতব অংশটিকে বলা হয় ট্রাক। এটি একধরনের অ্যাক্সেল বা অক্ষের মতো কাজ করে। চাকা ধরে রাখার পাশাপাশি এটি ডানে–বাঁয়ে মোড় নিতে সাহায্য করে।

চাকা ও বিয়ারিং: স্কেটবোর্ডের চাকাগুলো সাধারণত পলিইউরেথেন নামের একধরনের নমনীয় প্লাস্টিক বা রাবার দিয়ে তৈরি। চাকাগুলো যেন খুব সহজে ও মসৃণভাবে ঘুরতে পারে, সে জন্য চাকার ভেতর ছোট ছোট বলের বিয়ারিং লাগানো থাকে।

আরও পড়ুন

স্কেটবোর্ডিং শিখতে হলে যা যা মাথায় রাখতে হবে

স্কেটবোর্ডিং শেখার জন্য তোমার দরকার একটি ভালো মানের স্কেটবোর্ড আর নিরাপদ কোনো ফাঁকা রাস্তা। তবে ভালো করতে হলে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইউটিউব দেখতে পারো। এ ছাড়া বাংলাদেশে এখন স্কেটবোর্ডিংয়ের বেশ কিছু কমিউনিটি রয়েছে, যারা নিয়মিত অনুশীলন করে। দ্রুত শিখতে চাইলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। তবে বোর্ড নিয়ে রাস্তায় নামার আগে এসব বিষয়গুলো মেনে চলা খুব জরুরি।

স্কেটবোর্ডিং শেখার সময় একদমই তাড়াহুড়ো করা যাবে না। বড় কোনো কৌশল বা স্টান্ট করার আগে কীভাবে বোর্ড নিরাপদে থামাতে হয়, তা ভালোভাবে শিখে নিতে হবে।

স্কেটবোর্ডিং করতে গেলে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকেই। কিন্তু পড়ে যাওয়ার সময় হাত সামনে বাড়িয়ে দিলে হাড় ভাঙার ঝুঁকি থাকে। তাই হাত না বাড়িয়ে শরীরের ওপর ভর দিয়ে গড়িয়ে নামার অভ্যাস করা ভালো।

সব সময় হেলমেট, কনুই ও হাঁটুর প্যাড পরে নেবে। তবে মনে রাখবে, শুধু প্যাড পরলেই হবে না, সঠিক উপায়ে পড়ে যাওয়ার কৌশল জানাও নিরাপত্তার একটি বড় অংশ।

স্কেটবোর্ডিংয়ের জন্য এমন জুতা বেছে নিতে হবে, যার সোল বেশ খসখসে। এতে স্কেটবোর্ডের ওপর পা পিছলে যাবে না এবং ভালো গ্রিপ পাওয়া যাবে।

স্কেটবোর্ড, ট্রাক ও চাকা কেনার সময় সব সময় ভালো মানের জিনিস নেওয়া জরুরি। মানসম্মত সরঞ্জাম টেকসই হওয়ার পাশাপাশি বড় চোট পাওয়ার ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়।

ব্যবহারের আগে বোর্ডটি একবার পরীক্ষা করে নাও। কোনো অংশ ঢিলে হয়ে গেলে বা মেরামতের প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ কারও সাহায্য নাও।

পথে চলার সময় পথচারী বা অন্য স্কেটবোর্ডারদের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে আর কাণ্ডজ্ঞান ব্যবহার করে চালালে বড় কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই তুমি স্কেটবোর্ডিং করতে পারবে।

আরও পড়ুন

স্কেটবোর্ডিংয়ের মজার সব কৌশল

স্কেটবোর্ডিং মানেই শুধু গড়িয়ে চলা, এমনটা নয়। এই খেলায় রয়েছে দারুণ সব কারসাজি।

অলি

এটি স্কেটবোর্ডিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। অলি মানে হলো বোর্ডসহ বাতাসে একটি সাধারণ লাফ দেওয়া। ১৯৭৭ সালে অ্যালান অলি গেলফান্ড এটি আবিষ্কার করেন। বোর্ডের পেছনের অংশে জোরে লাথি মেরে স্কেটার শূন্যে লাফ দেয়। সামনের পা দিয়ে বোর্ডকে টেনে পেছনের পা সমান উচ্চতায় তুলতে হয়। এতে বোর্ডটি স্কেটারের পায়ের সঙ্গে বাতাসে ভাসতে থাকে।

ডিগ্রি টার্ন

বাতাসে লাফিয়ে শরীর ও বোর্ড নিয়ে ঘুরে যাওয়াকে ডিগ্রি টার্ন বলে। ১৮০ ডিগ্রি মানে অর্ধেক ঘুরে যাওয়া। বিখ্যাত স্কেটার টনি হক ৯০০ ডিগ্রি মানে পুরো আড়াই বার ঘুরে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন।

সুইচ স্ট্যান্স

সব স্কেটারই একটি নির্দিষ্ট পায়ে দাঁড়িয়ে বোর্ড চালাতে আরাম বোধ করেন। যদি কেউ তার উল্টো পায়ে দাঁড়িয়ে চালায়, তবে তাকে বলে ‘সুইচ স্ট্যান্স’। এটি অনেকটা ডানহাতি মানুষের বাঁ হাতে লেখার মতো কঠিন।

পপ শোভিট

এ কৌশলে স্কেটারের শরীর ঘোরে না, কিন্তু পায়ের নিচের বোর্ডটি বাতাসের মধ্যে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে আবার আগের জায়গায় চলে আসে।

গ্রাইন্ড ও স্লাইড

যখন স্কেটার কোনো রেল বা দেয়ালের ওপর দিয়ে চাকা ছাড়াই ঘেঁষে এগিয়ে যায়, তখন তাকে গ্রাইন্ড বলে। আর চাকা বা ধাতব অংশের বদলে যখন বোর্ডের কাঠের অংশ দিয়ে পিছলে যায়, তাকে বলে বোর্ডস্লাইড।

কিকফ্লিপ ও হিলফ্লিপ

লাফ দেওয়ার সময় পায়ের পাতা বা জুতার হিল দিয়ে বোর্ডকে টোকা মেরে চাকার অক্ষ বরাবর ফুটবল বা লাটিমের মতো ঘুরিয়ে ফেলাকে ফ্লিপ বলে।

ম্যানুয়াল

এটি অনেকটা সাইকেলের এক চাকা তুলে চালানোর মতো। স্কেটার যখন বোর্ডের সামনের বা পেছনের অংশ তুলে শুধু এক জোড়া চাকার ওপর ভর করে এগিয়ে যায়, তখন সেটাকে ম্যানুয়াল বলে।

আরও পড়ুন