প্রাণীরা কি অন্য প্রজাতির ভাষা শিখতে পারে
আমরা প্রতিনিয়ত যেমন চারপাশে নানা শব্দ শুনি, প্রাণীরাও শোনে। প্রাণীরা অন্য প্রাণীর ডাক শোনে। আমরা প্রাণীদের ডাক শুনে তেমন কিছু বুঝতে পারি না। প্রাণীটি কী বলছে, তা অন্য প্রাণীরা বুঝতে পারে কি না, তাই নিয়ে এই লেখা।
বিজ্ঞানীদের কারণে এখন আমরা জানি, প্রাণীরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাতিরা কান নাড়িয়ে এবং গম্ভীর শব্দ করে একে অপরকে অভিবাদন জানায়। তিমিরা কথা বলার জন্য ক্লিক জাতীয় শব্দ করে। এমনকি মোল ইঁদুরদের কলোনিতে ভাষার নিজস্ব ‘অ্যাকসেন্ট’ থাকে।
প্রাণিজগতে যোগাযোগের ধরন অনেক জটিল। প্রতিটি প্রজাতির যোগাযোগের ভাষা আলাদা। কিন্তু এত পার্থক্য থাকার পরও কি কোনো প্রাণী অন্য প্রজাতির ‘ভাষা’ শিখতে পারে? আসলে, কিছু উদাহরণ পাওয়া গেছে, যেখানে প্রাণীরা অন্য প্রজাতির সিগন্যাল বা আওয়াজ বুঝতে পারে। এমনকি কখনো কখনো ব্যবহারও করতে পারে। তবে এই প্রাণীদের মনে আসলে কী চলছে, তা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।
প্রথমেই বলা দরকার, যদিও ‘ভাষা’ শব্দটি দিয়ে প্রাণীর ক্ষেত্রে মানুষের তুলনায় ভিন্ন কিছু বোঝানো হয়। প্রাণীদের আসলে মানুষের মতো ভাষা নেই। ভাষা মানুষের জন্য একটি নির্দিষ্ট যোগাযোগব্যবস্থা। তাই প্রাণী নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সাধারণত দেখেন, কোনো নির্দিষ্ট শব্দ বা সংকেতের সঙ্গে নির্দিষ্ট অর্থ যুক্ত আছে কি না।
এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে পাখিদের নিয়ে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু পরিযায়ী সুরেলা ডাকের পাখি দীর্ঘ যাত্রাপথে অন্য প্রজাতির পাখির ডাক বুঝতে পারে। ফলে এরা নিরাপদে চলাচল করতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের অধ্যাপক ও গবেষণার প্রধান লেখক বেঞ্জামিন ভ্যান ডোরেন জানান, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি পাশাপাশি ওড়ার সময় রেকর্ড করা ডাক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত কিছু পর্যায়ে প্রজাতির মধ্যে যোগাযোগ ঘটছে।
একসময় ধারণা করা হতো, দূরদেশে পরিযায়ী হওয়ার সময় পাখিরা শুধু নিজ প্রজাতির সঙ্গী হয়। এখন আমরা জানি, এই পথ চলতে এরা ভিন্ন প্রজাতির পাখির সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে এই ডাকগুলোর ভেতরে ঠিক কী তথ্য লুকিয়ে আছে, তা এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। ভ্যান ডোরেনের ভাষায়, এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সামাজিক সংযোগ থাকতে পারে। এই ডাকগুলোতে এমন তথ্য থাকতে পারে, যা আমরা এখনো ধরতে পারিনি।
কিছু প্রাণী অন্য প্রজাতির শব্দ ‘বলতে পারে’ বা নকল করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে চমকপ্রদ উদাহরণ আফ্রিকার ছোট কালো পাখি ফর্ক-টেইলড ড্রংগো বা ফিঙে। এই পাখিগুলো অন্য প্রাণীদের অনুসরণ করে বেড়ায়। সুযোগ পেলেই অন্যদের খাবার চুরি করে খায়। কানাডার ক্যাপিলানো ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের শিক্ষক থমাস ফ্লাওয়ার মাঠপর্যায়ে ফিঙেদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিশেষ করে যখন এরা মিয়্যারক্যাটদের অনুসরণ করে।
ফ্লাওয়ার দেখেছেন, ফিঙেরা নিজেদের শিকারি সতর্কবাণীর শব্দ ব্যবহার করে মিয়্যারক্যাটদের ভয় দেখিয়ে গর্তে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর ফেলে রাখা খাবার কুড়িয়ে নেয়। কিন্তু একই শব্দ বারবার ব্যবহার করলে মিয়্যারক্যাটরা ধীরে ধীরে বুঝে যায় এটি ভুয়া সতর্কতা। ফলে আর প্রতিক্রিয়া দেখায় না। তখন ফিঙেরা কৌশল বদলায়। তারা অন্য পাখির সতর্কবাণী, এমনকি মিয়্যারক্যাটদের নিজস্ব সতর্ক শব্দও নকল করে ব্যবহার করে। নিয়মিত শব্দ পাল্টে পাল্টে বলে এরা আশপাশের প্রাণীদের বিভ্রান্ত করে রাখে এবং প্রতারণার খেলা চালিয়ে যায়।
ফ্লাওয়ার বলেন, ফিঙেরা যেন জানে, মিয়্যারক্যাট জানে এমন ‘ভাষা’ নকল করলেই কাজ হবে। শুধু মিয়্যারক্যাট না, অন্য পাখিদের সঙ্গেও এরা এই কৌশল প্রয়োগ করে। এতে বোঝা যায়, ফিঙেরা নতুন শব্দ সহজে শিখতে পারে। প্রয়োজনে এরা নিজেদের আচরণ বদলাতে সক্ষম হয়।
এ ধরনের আচরণ প্রাণীদের ‘ওপেন-এন্ডেড লার্নার’ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। মানে এরা শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি শব্দে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নতুন শব্দ শিখতে পারে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, ফিঙেরা কি সচেতনভাবে প্রতারণা করছে, নাকি কেবল অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে যে কিছু নির্দিষ্ট শব্দ বললেই খাবার পাওয়া যায়? ফ্লাওয়ারের মতে, সচেতন প্রতারণার পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ দেওয়া এখনো খুব কঠিন।
ফ্লাওয়ার জানান, এখনো কোনো প্রমাণ নেই যে ছোট ফিঙেরা জানে তারা অন্য প্রাণীদের ঠকাচ্ছে। মানুষের শিশুদের মতোই, তারা হয়তো প্রথমে শুধু শব্দ অনুকরণ করে। পরে ধীরে ধীরে অর্থ বুঝতে পারে। আপাতত বলা যায়, ফিঙেদের আচরণে ভাষা শেখার কিছু উপাদান দেখা গেলেও, প্রাণীরা ঠিক কতটা গভীরভাবে অন্য প্রজাতির ভাষা বুঝতে পারে, সেই রহস্য এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।