হকি স্টিক থেকে ক্রিকেটের ব্যাট: ম্যাডসেনের দুই বিশ্বকাপ খেলার গল্প

বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ এলে স্বাভাবিকভাবেই আসবে ইতালির নাম। চারবার বিশ্বকাপজয়ী এই দল গত দুটি বিশ্বকাপে সুযোগ পায়নি। এবারও সুযোগ পাবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। অথচ এর মধ্যেই ইতালিকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে ক্রিকেটে। কারণ, টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্বে উঠে এসেছে ইতালি। আর ইতালিকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন একজন, যাঁর খেলাধুলার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল হকি স্টিক হাতে।

৯ ফেব্রুয়ারি ইডেন গার্ডেনসে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলেছে ইতালি। ম্যাচে ইতালির ওয়েন ম্যাডসেনকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ঠিক দুই দশক আগে ম্যাডসেনের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ভিন্ন এক দেশের হয়ে, ভিন্ন এক খেলাতে। ওয়েন ম্যাডসেন সেই ছোট্ট তালিকার অংশ, যাঁরা দুটি ভিন্ন ভিন্ন খেলার বিশ্বকাপ খেলেছেন। সেটিও দুটি ভিন্ন দেশের হয়ে।

২০০৬ সালে হকি বিশ্বকাপের আসর বসেছিল জার্মানির মনশেনগ্লাডব্লাখে। ম্যাডসেনের বয়স তখন মাত্র ২২। দক্ষিণ আফ্রিকা হকি দলের নিয়মিত সদস্য তিনি। ২০০৬ কমনওয়েলথ গেমসের পর বিশ্বকাপের মূল দলেও জায়গা করে নিয়েছিলেন ম্যাডসেন। শুধু জায়গা করে নিয়েছিলেন বললেও ভুল হবে, পুরো বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা করেছিল ৪ গোল, এর মধ্যে একটি ছিল তাঁর। ম্যাডসেনের হকি ক্যারিয়ার বেশি এগোয়নি। কারণ, তাঁর প্রথম ও আদি প্রেম ছিল ক্রিকেটই।

আরও পড়ুন
ম্যাডসেনের নানা ছিলেন ইতালির নাগরিক। ইতালির আইন অনুযায়ী কারও পূর্বপুরুষ ইতালীয় হলে তিনি ইতালির পাসপোর্ট এবং নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন।
২০০৬ হকি বিশ্বকাপে গোলও করেছেন ম্যাডসেন
ছবি: এক্স

ক্রিকেটে ম্যাডসেনের হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর চাচাদের কাছে। প্রত্যেকেই ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে নিষিদ্ধ না থাকলে হয়তো তাঁদেরও এক নামে চিনত সবাই। ২০০৩ সালে মূল দলে অভিষেক হয় ম্যাডসেনের, তাঁর বয়স তখন ১৯। জাতীয় দলের জন্য ম্যাডসেনের পথটা কখনোই উন্মুক্ত হয়নি, যে কারণে প্রথম শ্রেণি আর কাউন্টি ক্রিকেটে খেলেই নিজের ক্যারিয়ার গড়েছিলেন তিনি। কাউন্টি খেলে ইংল্যান্ডের নাগরিকত্বও নিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় না হলেও ইংল্যান্ডে হয়তো ভাগ্য খুলবে । কিন্তু তা হয়নি। ডার্বিশায়ারের হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করেও নির্বাচকদের সুনজরে আসতে পারেননি। তখনই তাঁর চোখে পড়ে ইতালিয়ান নাগরিকত্বের বিষয়টি।

ম্যাডসেনের নানা ছিলেন ইতালির নাগরিক। ইতালির আইন অনুযায়ী কারও পূর্বপুরুষ ইতালীয় হলে তিনি ইতালির পাসপোর্ট এবং নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ীও যে কেউ নানা-নানির জন্মসূত্রে সেই দেশের নাগরিকত্ব পান, তবে তিনি সেই দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পারেন। আর ইতালির হয়ে খেলার আগে ম্যাডসেন অন্য দেশের জার্সি গায়েও চড়াননি। ফলে ম্যাডসেনের জন্য নিয়মটা হয়ে গিয়েছিল আরও সহজ।

আরও পড়ুন
ইতালিকে এত দিন ধরে নেতৃত্ব দেওয়া জো বার্নস জায়গা করে নিতে পারেননি বিশ্বকাপের মূল স্কোয়াডে। বরং ওয়েন ম্যাডসেনের ওপরই ভরসা রেখেছে ইতালি।
কাউন্টি ক্রিকেটে ডার্বিশায়ারের তারকা ওয়েন ম্যাডসেন
ছবি: এক্স

২০২৩ সালে তাই নাগরিকত্ব বদলে ইতালির হয়ে খেলা শুরু করেন ম্যাডসেন। তাঁর বয়স ৪০ ছুঁই ছুঁই। কিন্তু তাতে কী? কাউন্টি ক্রিকেট খেলার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মাঠে নামলেন ইতালির হয়ে। ২০২৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব পার হতে পারেনি ইতালি। কিন্তু তাঁর ঠিক এক বছর পর এসেও ২০২৬ বিশ্বকাপের বৈতরণি ঠিকই পার করেছে ইতালি। আর মূল পর্বে এসে ম্যাডসেনের ওপর জুড়ে বসেছে আরেকটি দায়িত্ব। দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার।

ইতালিকে এত দিন ধরে নেতৃত্ব দেওয়া জো বার্নস জায়গা করে নিতে পারেননি বিশ্বকাপের মূল স্কোয়াডে। বরং ওয়েন ম্যাডসেনের ওপরই ভরসা রেখেছে ইতালি। ফলে প্রথমবারের মতো ইতালি দলকে নিয়ে মাঠে নামবেন ম্যাডসেন। আর সেটাও বিশ্বকাপের মঞ্চে। ‘আমি কখনোই ভাবিনি বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে কখনো খেলতে পারব। সেখানে অধিনায়ক হিসেবে দলকে নিয়ে যাচ্ছি আমি। এর থেকে বড় গর্বের আর কোনো কিছুই হতে পারে না।’ ম্যাডসেন নিজের নাম ইতিহাসে লিখে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই, এখন সেটাকে কতটা ছাড়িয়ে যেতে পারেন, সেটা দেখা যাবে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চেই।

আরও পড়ুন