শুরুর আগেই কত কাণ্ড বিশ্বকাপে

টি-২০ বিশ্বকাপের পর্দা উঠেছে শনিবার সকালে। বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে ১১টায় পাকিস্তান আর নেদারল্যান্ডসের খেলা দিয়ে শুরু হয়েছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসর। কিন্তু এই বিশ্বকাপ যতটা না মনে থাকবে আয়োজনের জন্য, তার চেয়ে বেশি মনে থাকবে এর পেছনের কর্মকাণ্ডের জন্য। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই যত কাণ্ড ঘটে গেল, তা নজিরবিহীন।

মোস্তাফিজএসিসি

এক মোস্তাফিজকে নিয়ে সূত্রপাত

পুরো ঘটনার সুতা যদি টানতে হয়, তবে সব গিয়ে মিলবে এক মোস্তাফিজুর রহমানে। ধারেকাছে না থেকেও মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরেই পুরো বিশ্বকাপের তথৈবচ অবস্থা। ঘটনার সূচনা হয়েছিল ডিসেম্বরের শেষ দিকে, আইপিএল নিলামে। এবারের আইপিএলে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়েছিলেন মোস্তাফিজ। প্রথমবারের মতো কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু এর মধ্যেই বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ফলে ভারতে একদল উগ্রপন্থী ঘোষণা দেয়, মোস্তাফিজ যদি কলকাতার হয়ে খেলে তবে খুব খারাপ কিছুও হয়ে যেতে পারে। ফলে তড়িঘড়ি করে বিসিসিআই থেকে জানানো হয়, মোস্তাফিজকে বাদ দিয়ে অন্য খেলোয়াড় বেছে নেওয়ার কথা। কলকাতার কাছে তাই আর কোনো সুযোগও ছিল না। ভারতে উগ্রপন্থীদের বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত ৩ জানুয়ারি মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দেয় বিসিসিআই।

আরও পড়ুন
বাংলাদেশ ক্রিকেট দল
রয়টার্স

বাংলাদেশের বয়কট

মোস্তাফিজ খেলতে এলে সমস্যা হতে পারে—সেই আশঙ্কা থেকে তাঁকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ এসেছিল বিসিসিআইয়ের কাছ থেকে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ তখন প্রতিবাদে উত্তাল। যদি মোস্তাফিজকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হও, তাহলে বাংলাদেশ দল ও তাদের সমর্থকেরা কীভাবে নিরাপদে থাকবে? বাংলাদেশের প্রতিটি খেলাই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ভারতে। বাংলাদেশের তাই দাবি ছিল একটাই—পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশের খেলাগুলোও সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়া হোক। আইসিসি যেহেতু পাকিস্তানের দাবি মানতে পেরেছে, তাহলে বাংলাদেশের দাবিও মানতে পারবে।

কিন্তু বহু আলাপ-আলোচনার পরও কেউই মানতে রাজি হয়নি সে সিদ্ধান্ত। বরং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি না পেয়ে আইসিসি জানায়, ভারতেই খেলতে হবে বাংলাদেশকে। নইলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য কাউকে নেবে তারা। বাংলাদেশও সাফ জানিয়ে দেয় সিদ্ধান্ত—আর যাই হোক, ভারতে খেলবে না টাইগাররা। আইসিসিও বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে সেই জায়গায় যুক্ত করে স্কটল্যান্ডকে।

আরও পড়ুন
পাকিস্তান ক্রিকেট দল
পিসিবি

পাকিস্তানের বয়কট

আইসিসিতে যে ভোট হয়েছিল, সেখানে ১৪-২ ভোটে হেরে যায় বাংলাদেশের দাবি। সেই ভোটে বাংলাদেশকে সমর্থন করেছিল একমাত্র পাকিস্তান। পাকিস্তান তো এমনিতেই ভারতের ওপর ক্ষিপ্ত অনেক বছর ধরে। পাকিস্তান ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিল। অথচ পাকিস্তানে এশিয়া কাপ খেলতে যায়নি ভারত। শুধু তা-ই নয়, জার্সিতেও আয়োজক পাকিস্তানের নাম লেখেনি ভারত। টস কিংবা ম্যাচ শেষে পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাতও মেলায়নি সূর্যকুমার যাদবের দল। এমনকি পিসিবি সভাপতির হাত থেকে বিজয়ী ট্রফি নিতেও অস্বীকৃতি জানায় তারা। ভারতের অসৌজন্যমূলক আচরণে গুমোট হয়ে উঠেছিল ক্রিকেট অঙ্গন। পাকিস্তানও খুঁজছিল একটা মোক্ষম উপায়। বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে না রাখার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে তারা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে পিসিবি জানিয়ে দেয়, বিশ্বকাপ খেললেও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে মাঠে থাকবে না পাকিস্তান।

এই সিদ্ধান্তে বদলে গেছে বিশ্বকাপের দৃশ্যপট। কারণ, ভারত পাকিস্তান যতই নিজেদের মধ্যে বৈরিতা দেখাক না কেন, খেলার মাঠে দুই পক্ষই চায় নিজেদের লাভের পুরো অংশ। যে কারণে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে আপত্তি জানালেও বিশ্বকাপের প্রতিটি পর্বেই তারা মুখোমুখি হয় একে অপরের। কারণ, এই এক ম্যাচের ওপর নির্ভর করে আইসিসির আয়। সেই আয়ে যখন টান পড়েছে, পুরো ক্রিকেট বিশ্বের তখন মাথায় হাত।

আরও পড়ুন

আর্থিক ক্ষতি

পিটিআইয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেলায় টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা। আইসিসি ধরেই নিয়েছিল সেই ক্ষতি সামলাতে পারবে। কিন্তু পাকিস্তান যখন ভারতের বিপক্ষে না খেলার ঘোষণা দিল, তখনই আইসিসির মাথায় হাত। কারণ, এই টাকার অঙ্কের ওপরই তাকিয়ে থাকে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব। রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও আইসিসির ছেলেদের টুর্নামেন্টে গত ১৩ বছর নিয়ম করে গ্রুপ পর্বে মুখোমুখি হচ্ছে ভারত-পাকিস্তান। আর তার কারণ একটাই—টাকা। কিন্তু পাকিস্তান শেষ মুহূর্তে এই ম্যাচ খেলতে না চাওয়ার এই টুর্নামেন্ট থেকে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৬ হাজার কোটি টাকায়।

টিকিট বিক্রিতে ধাক্কা

বাংলাদেশের বদলে যে স্কটল্যান্ডকে নেওয়া হয়েছে, তাতেও খুব একটা লাভ করতে পারছে না ভারত। কারণ, ইতালির বিপক্ষে যে ম্যাচে বাংলাদেশের খেলার কথা ছিল, সেই ম্যাচে স্কটল্যান্ড খেলায় টিকিট বিক্রি হয়েছে মাত্র চার শর কাছাকাছি। ইডেন গার্ডেনসের মতো মাঠে এই দুই দলের খেলা দেখার মতো দর্শকই পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু তা–ই নয়, শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান-নেদারল্যান্ডসের ম্যাচের টিকিট বিক্রি না হওয়ায় বিনা মূল্যে মাঠে ঢোকার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে সবাইকে, যাতে অন্তত মাঠ পূর্ণ দেখায়।

এক মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ হিসেবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে আইসিসিকে। অন্যদিকে মোস্তাফিজ বাংলাদেশে বসে আছেন ডোন্ট কেয়ার মুডে। খেলছেন, মনের আনন্দে উইকেট নিচ্ছেন। আইপিএল না খেলা হলেও পিএসএলে নিলামের আগেই দল পেয়েছেন। অন্যদিকে বিশ্বকাপের আনন্দ শুরুর আগেই যেন ম্লান হতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন