পাঁচ বছর ধরে জেতেন না ট্রফি, তবু সিমিওনে কেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোচ?
বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোচ কে? কার্লো আনচেলত্তি, পেপ গার্দিওলা বা হোসে মোরিনহো নন। একের পর এক শিরোপা জেতা কোচদের থেকেও অনেক বেশি টাকা আয় করেন আতলেতিকো মাদ্রিদের ডাগআউটে দাঁড়ানো আর্জেন্টাইন কোচ ডিয়েগো সিমিওনে। অথচ গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর ক্যাবিনেটে নেই কোনো শিরোপা। তবু কেন সবচেয়ে বেশি টাকা তাঁর পকেটে?
বর্তমানে ফুটবল বদলে গিয়েছে অনেকটাই। এখনকার যুগে কোচদের সময়টা বেশ কঠিন। পান থেকে চুন খসলেই তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় বিদায়ের চিঠি। কোচরা এখন শুধু যেন খেলার পুতুল। প্রয়োজনে কোচদের ডেকে আনছে ক্লাবগুলো, আবার কয়েক মাস যেতে না যেতেই বিদায় করে আনা হচ্ছে নতুন কোচ। এ রকম পরিস্থিতিতে সিমিওনে বছরের পর বছর একই দলে টিকে আছেন। তাঁকে বরখাস্ত করা দূরে থাক, শিরোপার দেখা না পেলেও কোনো কথা ওঠে না মিডিয়ায়। আতলেতিকো মাদ্রিদের আর্জেন্টাইন কোচ শুধু বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে একটি দলে থাকা কোচ নন, সবচেয়ে বেশি আয় করা কোচও বটে।
কারণটা খুঁজতে ফিরে যেতে হবে ২০১১ সালে। সে বছরই সিমিওনেকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল আতলেতিকো মাদ্রিদ। খেলোয়াড়ি জীবনে সিমিওনে দুই দফায় পাঁচ বছর কাটিয়েছেন আতলেতিকোতে। তারাই যখন কোচ হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে এল, রাজি হয়ে গিয়েছিলেন এক বাক্যে। যখন দায়িত্ব নেন, তখন তৃতীয় বিভাগের একটি দলের কাছে হেরে কোপা দেল রে থেকে বাদ পড়েছিল আতলেতিকো। লিগে দলটির অবস্থান ছিল ১০ নম্বরে। অবস্থাটা এ রকম, কোনোমতে শীর্ষ ১০-এ থেকে শেষ করতে পারলেই সবাই খুশি। সিমিওনে সেই মৌসুম শেষ করেছিলেন ইউরোপা লিগের শিরোপা হাতে। আতলেতিকোর নতুন আলোর দিশা হয়ে এসেছিলেন তিনি।
২১ শতকের শুরুতে আতলেতিকো মাদ্রিদ ছিল মাঝ সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো এক দল। শিরোপা জেতা দূরে থাক, ক্লাব হিসেবেই নিজেদের হারিয়ে ফেলেছিল তারা। শেষ যেবার আতলেতিকো স্পেনে শিরোপা জিতেছিল, সিমিওনে তখন ছিলেন তাদের খেলোয়াড়। সেখান থেকে বহু পথ পাড়ি দিয়ে সিমিওনে এসেছেন কোচ হয়ে, অথচ শিরোপার দেখা পায়নি একটিও। এর মধ্যে দুবার অবনমিত হওয়ার গ্লানি যুক্ত হয়েছে নামের পাশে। আতলেতিকো মাদ্রিদ নিজেদের জায়গা হারিয়ে ফেলেছিল স্প্যানিশ ফুটবল থেকে।
সিমিওনে এসেছিলেন সেই সময়ে ত্রাতা হয়ে। শুধু কোচ নয়, সিমিওনে হয়ে উঠেছিলেন আতলেতিকোর সর্বেসর্বা। দলের প্রতিটি দিকে ছিল তাঁর তীক্ষ্ণ নজর, খেলোয়াড়দের পুষ্টি থেকে শুরু করে দলের খরচ, দলবদল—সবকিছুই ছিল তাঁর অধীনে। ফলাফল? গত ১৪ মৌসুমে একবারের জন্যও শীর্ষ চারের বাইরে যায়নি আতলেতিকো। দলকে যে শুধু ধারাবাহিক করেছেন তা নয়, দলকে জিতিয়েছেনও। ২০১২-১৩ মৌসুমে শুরুটা করেছিলেন কোপা দেল রে দিয়ে। ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ে রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে নিজের প্রথম শিরোপা জিতে নেন সিমিওনে।
পরের মৌসুমে উঁচিয়ে ধরলেন লা লিগা। মেসি-রোনালদো তখন একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গোল করেন। তাঁদের গোলবন্যা শুরু হলে আর থামানো যায় না। সেখানে সিমিওনে গোল না করেই জিতে নিয়েছেন শিরোপা। কীভাবে? ডিফেন্সটাকে শক্ত করে। যে মৌসুমে রিয়াল-বার্সা দুই দলই ১০০ গোল করেছে লিগে, সেই মৌসুমে মাত্র ৭৭ গোল করে ৯০ পয়েন্ট নিয়ে লিগ জিতেছেন সিমিওনে। এরপর আর তাঁর অর্জন নিয়ে কিছু বলার দরকার আছে?
সিমিওনে অর্জন শুরু করেছেন উল্টোদিক থেকে। প্রথমে ইউরোপা, এরপর কোপা দেল রে, অবশেষে লা লিগা। মূল লক্ষ্য ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগ। সেখানেই বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে তাঁকে। ঘুরেফিরে একটা দলের কাছেই—নগর প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ। যতবারই আতলেতিকো শিরোপার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে, বাগড়া দিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। ২০১৪, ২০১৬—দুই ফাইনালেই রিয়াল মাদ্রিদ বাধা দিয়েছিল তাঁকে। একটা ম্যাচ হাতছাড়া হয়েছিল সার্জিও রামোসের ম্যাজিকাল গোলে। আরেকটা টাইব্রেকারে গিয়ে।
সিমিওনে আসলে এত টাকা পান শুধু তাঁর কোচিংয়ের জন্য নয়। বরং আতলেতিকোকে ওপরে তুলে আনার জন্য। তাঁর বিশ্বস্ততার জন্য। সিমিওনেকে উড়িয়ে নেওয়ার জন্য কম প্রস্তাব আসেনি। সিমিওনে তা বাদ দিয়ে হাল ধরে রেখেছেন আতলেতিকোর। তিনি আসার আগে আতলেতিকো ছিল খেলোয়াড়দের ‘স্টেপিং স্টোন’। এই ক্লাব থেকে ভালো খেলেই বড় দলে সুযোগ পেতে হবে। ক্লাবটিকে না কেউ অন্তরে ধারণ করত, না কেউ ভালোবেসে থেকে যেত। সিমিওনে তাদেরকে পৌঁছে দিয়েছেন শীর্ষে। শুধু সম্মানে নয়, টাকাপয়সাতেও আতলেতিকোর ধারেকাছে আছে খুব কম দলই। একটা সময় স্প্যানিশ লিগকে বলা হতো দুই ঘোড়ার রেস, সেখান থেকে সিমিওনে সেটাকে পরিণত করেছেন তিন ঘোড়ার দৌড়ে। সিমিওনে আতলেতিকোতে এসে সমীকরণটাই বদলে দিয়েছেন। একসময় মধ্য টেবিলে ঘুরপাক খাওয়া দলটা এখন শিরোপার লড়াই করে, ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করে। তাবৎ দুনিয়ার দল সামনে এসে নার্ভাস হয়ে পড়ে, শুধু সিমিওনে আর তাঁর ট্যাক্টিসের জন্যই।
সিমিওনের তৈরি করা ‘চোলিজমো’ শুধু আতলেতিকো নয়, ছড়িয়ে গেছে পুরো ফুটবল বিশ্বেই। ফুটবল ফলাফলের খেলা। দিন শেষে কেউ কীভাবে খেলেছি মনে রাখে না। বরং জিতেছে কি না, সেটাই মনে রাখে। সিমিওনে খেলেন সেভাবেই। ‘ডিফেন্সিভ ডার্টি ফুটবল’ তাঁর চেয়ে ভালো আর কেই–বা খেলতে পারে? বার্সেলোনার বিপক্ষে শেষ কোপা দেল রের সেমিফাইনালটাই দেখো। প্রথম লেগে ৪-০ গোলে এগিয়ে থাকা আতলেতিকো পরের লেগে শুধু জানপ্রাণ দিয়ে ডিফেন্ডই করেছে। ০-৩ গোলে হেরেছে বটে, কিন্তু ফাইনালে নামটা কিন্তু তাদেরই।
ডিয়েগো সিমিওনে শুধু আতলেতিকো মাদ্রিদের কোচ নয়, আধুনিক আতলেতিকোর স্থপতিও বটে। বিশ্বের অন্যতম কঠিন লিগে রিয়াল-বার্সার সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করার যে সংস্কৃতি তিনি তৈরি করেছেন, তার মূল্য কেবল কয়েক মিলিয়ন ইউরো দিয়ে পরিমাপ করা কঠিন। আতলেতিকো তাই তাঁকে হাজার কোটি টাকা দিলেও সেই মূল্য পরিশোধ করা হবে না।