জাতে বিড়াল, ডাকে কুকুরের মতো

স্যান্ড ক্যাটইভা কোহোতোভা

খাঁ খাঁ মরুভূমি। চারদিকে শুধুই বালিয়াড়ি ও রাতের নিস্তব্ধতা। এমন সময় হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এল কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক! মরুভূমির এই জনমানবহীন রুক্ষ প্রান্তরে কুকুর এল কোথা থেকে? শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে যদি টর্চলাইটটা জ্বালাও, তবে কুকুরের বদলে দেখতে পাবে তুলতুলে ছোটখাটো একটি বিড়ালকে!

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ। বিড়াল হয়েও কুকুরের মতো ডাকতে পারে, এমন এক অদ্ভুত প্রাণীর নাম স্যান্ড ক্যাট। এর বৈজ্ঞানিক নাম ফেলিস মার্গারিটা (Felis margarita)। বাঘ, সিংহ বা চিতার মতো বড় বড় বন্য বিড়ালদের কথা আমরা সবাই জানি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বা অ্যানিমেল প্ল্যানেটে এদের দাপটই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। কিন্তু বিড়াল পরিবারে এমন কিছু ছোট ও দুর্লভ প্রজাতি লুকিয়ে আছে, যারা নিজেদের বৈশিষ্ট্যে সবাইকে চমকে দিতে পারে। ফিশিং ক্যাট বা পাম্পাস ক্যাটের মতো স্যান্ড ক্যাটও তাদেরই একটি। তবে এরা শুধু দেখতেই অদ্ভুত নয়, এদের আওয়াজও তোমার কানকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট!

আরও পড়ুন

বিড়ালজগতের পিচ্চি ছেলে

স্যান্ড ক্যাটকে বলা যায় বিড়ালজগতের ‘পিচ্চি ছেলে’। এদের আকার বেশ ছোট। লম্বায় এরা মাত্র ৪৫ থেকে ৫৭ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। তবে এদের শরীরের তুলনায় লেজটা বেশ লম্বা, প্রায় ২৮ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ, শরীরের প্রায় অর্ধেক দৈর্ঘ্যের সমান একটা লেজ থাকে এদের। আর ওজন? শুনলে অবাক হবে, এই পুঁচকে বিড়ালগুলোর ওজন মাত্র ১ থেকে ৩ কেজি।

মরুভূমির একমাত্র বাসিন্দা

আকারে ছোট হলেও টিকে থাকার লড়াইয়ে এরা দারুণ পটু। বিড়াল পরিবারের মধ্যে স্যান্ড ক্যাটই একমাত্র প্রজাতি, যারা পুরোপুরি মরুভূমির চরম ও রুক্ষ পরিবেশে বাস করে। এদের আদি নিবাস মরক্কো থেকে শুরু করে আরব উপদ্বীপ এবং পাকিস্তান, কাজাখস্তান ও সিরিয়ার মতো দেশগুলোর বিস্তীর্ণ বালুকাময় মরুভূমি। উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার কিছু অংশে এদের উপস্থিতির কথা নথিপত্রে পাওয়া গেলেও বিশাল মরুভূমির বুকে এদের প্রকৃত বিচরণক্ষেত্র সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ কঠিন কাজ।

আরও পড়ুন

আদুরে চেহারার দুর্ধর্ষ শিকারি

এরা মূলত নিশাচর। দিনের বেলার কাঠফাটা রোদ এড়িয়ে রাতের ঠান্ডা ও অন্ধকার পরিবেশে এরা শিকারে বের হয়। মরুভূমির ধু ধু প্রান্তরে শিকার খোঁজার জন্য এরা চোখের চেয়েও নিজেদের তীক্ষ্ণ শ্রবণশক্তির ওপর বেশি নির্ভর করে। বালুর নিচে লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট ইঁদুর, স্পাইনি মাউস বা জারবিলের সামান্য নড়াচড়ার শব্দও এদের রাডারের মতো কানে ধরা পড়ে যায়। ইঁদুর ছাড়াও ছোট পাখি, খরগোশের ছানা এবং মাঝেমধ্যে টিকটিকি বা সাপের মতো সরীসৃপও এদের খাদ্যতালিকায় থাকে।

সাহারা মরুভূমিতে এদের সাহসিকতার একটা দারুণ উদাহরণ দেখা যায়। এই আদুরে বিড়ালগুলো মারাত্মক বিষাক্ত স্যান্ড ভাইপার সাপকেও অনায়াসে শিকার করতে পারে! শুধু তা-ই নয়, শিকার করার পর যদি পেট ভরে যায়, তবে এরা বাকি খাবারটা বালুর নিচে যত্ন করে পুঁতে রাখে, যাতে খিদে পেলে পরে এসে খেতে পারে।

কুকুরের মতো ডাক

স্যান্ড ক্যাটরা সাধারণত একা জীবনযাপন করতে ভালোবাসে। সারা বছর একা একা ঘুরে বেড়ালেও প্রজননের মৌসুমে এরা সঙ্গীর খোঁজে বের হয়। আর তখনই এরা নিজেদের সেই গোপন অস্ত্রটি ব্যবহার করে। অর্থাৎ কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ ডাকে! বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে যেখানে দৃষ্টিসীমা খুব সীমিত, সেখানে এই জোরালো ডাক সঙ্গীকে খুঁজে পেতে সাহায্য করে। এদের অসাধারণ শ্রবণশক্তির কারণে বহু দূর থেকেও এরা একে অপরের এই ডাক শুনতে পায়।

আরও পড়ুন

মরুভূমির অদৃশ্য ভূত

স্যান্ড ক্যাটরা কিন্তু মাটি খোঁড়ায়ও দারুণ ওস্তাদ। বালুর নিচে লুকিয়ে থাকা শিকারকে এরা নিমেষেই খুঁড়ে বের করে আনতে পারে। এমনকি নিজেদের থাকার জন্য বালুর ভেতরে গর্তও বানায়।

তবে এদের শরীরের সবচেয়ে জাদুকরি বৈশিষ্ট্যটি লুকিয়ে আছে পায়ের তলায়। সাধারণ বিড়ালদের পায়ের তলা নরম প্যাডের মতো হলেও স্যান্ড ক্যাটের পায়ের তলায় থাকে ঘন ও লম্বা লোমের আস্তরণ। এই লোমের দুটি দারুণ সুবিধা আছে। প্রথমত, মরুভূমির তপ্ত বালুর ছ্যাঁকা থেকে এই লোম তাদের পা রক্ষা করে। এটা অনেকটা প্রাকৃতিক জুতার মতো কাজ করে!

দ্বিতীয়ত, এই ঘন লোমের কারণে বালুর ওপর এদের পায়ের কোনো ছাপ পড়ে না বললেই চলে। পায়ের ছাপ না থাকায় এরা মরুভূমির বালুতে একরকম অদৃশ্য হয়ে ঘুরে বেড়ায়। আর এ কারণেই বিজ্ঞানীদের পক্ষে এদের খুঁজে বের করা এত কঠিন।

প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেয়াল, তাই না? দেখতে আদুরে পুতুলের মতো, ডাকে কুকুরের মতো, আর শিকার ধরে একেবারে পেশাদার শিকারির মতো। স্যান্ড ক্যাট প্রমাণ করে দেয়, টিকে থাকার জন্য সব সময় বিশাল আকার বা গায়ের জোরের প্রয়োজন নেই, দরকার শুধু পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে নিখুঁতভাবে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন