ভালুক কি আসলেই শীতনিদ্রায় যায়
শীতকাল মানেই যেন আলসেমি। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় লেপ-কম্বলের নিচে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকতে কার না ভালো লাগে? ছোটবেলায় আমরা বইয়ে পড়েছি বা কার্টুনে দেখেছি, শীত এলেই ভালুকেরা নাকি লম্বা এক ঘুমে চলে যায়। একে আমরা বলি শীতঘুম বা হাইবারনেশন। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, আমাদের ছোটবেলার এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়।
অবাক হতে পারো অনেকে! হওয়ারই কথা। শীতকালে ভালুকেরা তাদের গুহায় গিয়ে নিশ্চুপ হয়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু বিজ্ঞানীরা একে ঠিক হাইবারনেশন বলতে রাজি নন। কাঠবিড়ালি, বাদুড় বা মৌমাছিরা যেভাবে শীতঘুম দেয়, ভালুকেরা আসলে সেভাবে ঘুমায় না। তাহলে তারা কী করে?
প্রকৃত হাইবারনেশন হলো এমন এক অবস্থা, যখন প্রাণীর শরীরের তাপমাত্রা বাইরের আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে একদম কমে যায়। হৃৎস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিকের মাত্র ১ শতাংশে নেমে আসে! এটা অনেকটা মোবাইলের পাওয়ার সেভিং মোডের মতো।
একটা কাঠবিড়ালি যখন হাইবারনেশনে যায়, তার হৃৎস্পন্দন মিনিটে ৩৫০ থেকে কমে মাত্র ৪-এ নেমে আসে! প্রায় ৯৯ শতাংশ কমে যায়।
সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো আর্টিক গ্রাউন্ড স্কুইরেল বা একধরনের কাঠবিড়ালি। শীতঘুমে এদের শরীরের তাপমাত্রা মাইনাস ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেতে পারে! স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে এটাই সর্বনিম্ন। এ সময় তারা নড়াচড়া করে না। তবে মজার ব্যাপার হলো, সত্যিকারের হাইবারনেশনে থাকা প্রাণীরাও কিন্তু মাঝেমধ্যে জাগে। প্রতি এক বা তিন সপ্তাহ পরপর তারা কিছুক্ষণের জন্য জেগে ওঠে। হয়তো একটু বাথরুম করে বা জমানো খাবার খায়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন অ্যারাউজাল।
কিন্তু ভালুকদের ব্যাপারটা আলাদা। ভালুকেরা যে অবস্থায় যায়, তাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় টরপর। হাইবারনেশন হলো ঐচ্ছিক ব্যাপার। দিন ছোট হয়ে এলে প্রাণীরা বুঝে যায় ঘুমানোর সময় হয়েছে। কিন্তু ভালুকের টরপর হলো অনিচ্ছাকৃত। এটা মূলত খাবারের অভাবে শুরু হয়। কালো ভালুক বা বাদামি ভালুকেরা সাধারণত সর্বভুক, কিন্তু তাদের খাবারের ৮০-৯০ শতাংশই আসে লতাপাতা বা ফলমূল থেকে। শীতে বরফ পড়লে যখন গাছপালা মরে যায়, তখন পেটের দায়েই তারা শক্তি বাঁচাতে এই তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় চলে যায়।
হাইবারনেশনের সঙ্গে টরপরের বড় পার্থক্য হলো, টরপরে থাকা ভালুক একনাগাড়ে ঘুমায় না, আবার কাঠবিড়ালির মতো পুরোপুরি জেগেও ওঠে না। এটা একটা নিরবচ্ছিন্ন ঝিমুনি অবস্থা।
কাঠবিড়ালির মতো প্রাণীরা শীতের জন্য খাবার জমিয়ে রাখে, কিন্তু ভালুকেরা জমিয়ে রাখে চর্বি। শীত আসার আগেই প্রচুর খেয়ে তারা মেদভুঁড়ি বানায়। তাদের শরীরের ওজনের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এ সময়। টরপর অবস্থায় তারা কিছুই খায় না, পানিও পান করে না, এমনকি টয়লেটও করে না। শরীর ওই জমানো চর্বি ভেঙে শক্তি তৈরি করে।
একটা কাঠবিড়ালি যখন হাইবারনেশনে যায়, তার হৃৎস্পন্দন মিনিটে ৩৫০ থেকে কমে মাত্র ৪-এ নেমে আসে! প্রায় ৯৯ শতাংশ কমে যায়। কিন্তু গ্রিজলি ভালুকের হৃৎস্পন্দন ৮৪ থেকে কমে ১৯-এ নামে। অর্থাৎ পুরো বন্ধ হয় না। তাদের শরীরের তাপমাত্রাও খুব বেশি কমে না, মাত্র ৮-১২ ডিগ্রি ফারেনহাইট কমে। অর্থাৎ তারা মৃতপ্রায় অবস্থায় থাকে না, বরং হালকা ঘুমে থাকে।
শুনলে অবাক হবে, টরপর অবস্থায় ভালুকেরা কিন্তু নড়াচড়া করে। আলাস্কার জীববিজ্ঞানী শন ফার্লি জানিয়েছেন, গুহার ভেতর ভালুকেরা প্রায়ই পাশ ফেরে বা অবস্থান বদলায়। এটা তারা করে যাতে শরীরে চাপ লেগে কোনো ক্ষত না হয় এবং শরীরের তাপ ধরে রাখা যায়।
২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, টরপর অবস্থায় ভালুকের শরীরে বিশেষ কিছু প্রোটিন কাজ করে, যা রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে মা ভালুকদের ক্ষেত্রে। বসন্ত বা গ্রীষ্মে ভালুকদের মিলন হলেও মা ভালুক তখনই গর্ভবতী হয় না। একে বলা হয় ডিলেড ইমপ্ল্যান্টেশন। ডিম্বাণুটি মায়ের শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। মা যদি শীতের আগে পর্যাপ্ত চর্বি জমিয়ে শরীরকে প্রস্তুত করতে পারে, তবেই বাচ্চা বড় হতে শুরু করে। আর সেই হাড়কাঁপানো শীতে, টরপর অবস্থায় ঘুমের মধ্যেই মা ভালুক বাচ্চার জন্ম দেয় এবং তাদের যত্ন নেয়! বসন্তকালে যখন তারা গুহা থেকে বের হয়, তখন সঙ্গে থাকে নতুন অতিথিরা।
তবে সব ভালুকই যে শীতে টরপরে যায়, তা নয়। চিড়িয়াখানার ভালুকেরা নিয়মিত খাবার পায়, তাই তারা ঘুমায় না। আবার জায়ান্ট পান্ডারাও টরপরে যায় না। কারণ, তারা বাঁশ খায়, আর বাঁশে ক্যালরি এত কম যে শরীরে চর্বি জমানো সম্ভব হয় না। তাই শীতে তারা ঘুমায় না, বরং পাহাড়ের নিচু জায়গায় কম শীতের অঞ্চলে নেমে আসে।
আর্কটিকের ওই ভয়ংকর শীতে মেরু ভালুকের সবচেয়ে বেশি ঘুমানোর কথা, তাই না? কিন্তু তারা তা করে না। কারণ, তারা মাংসাশী। শীতে সিল মাছ শিকার করা তাদের জন্য আরও সহজ হয়। তাই গর্ভবতী মা ছাড়া বাকি মেরু ভালুকেরা সারা শীত জেগেই থাকে।
কিন্তু ভালুকের এসব গল্প জেনে আমাদের লাভ কী? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখানেই আছে মানুষের চিকিৎসার চাবিকাঠি। মানুষ যদি কিছুদিন বিছানায় শুয়ে থাকে, তার পেশি শুকিয়ে যায়, হাড় দুর্বল হয়ে যায়, রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু ভালুকেরা মাসের পর মাস না খেয়ে, না নড়েও দিব্যি সুস্থ থাকে। তাদের পেশি কমে না, হাড় ঠিক থাকে।
২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, টরপর অবস্থায় ভালুকের শরীরে বিশেষ কিছু প্রোটিন কাজ করে, যা রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না। বিজ্ঞানীরা যদি এই রহস্য ভেদ করতে পারেন, তবে দীর্ঘমেয়াদি শয্যাশায়ী রোগী, হার্টের রোগী, এমনকি নাইট শিফটে কাজ করা মানুষদের চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটে যাবে। নাইট শিফটের কথা বিশেষভাবে বলার কারণ, রাতে না ঘুমানোর জন্য তাঁদের সার্কাডিয়ান রিদম উল্টাপাল্টা হয়ে যায়।
ফলে ভালুক যে শীতনিদ্রায় যায় না, তা তো বুঝতেই পারছ। প্রকৃতির এই অদ্ভুত টিকে থাকার কৌশল থেকে আমাদেরও শেখার আছে অনেক কিছু!