অতিরিক্ত শব্দ কি পাখিদের জীবন বদলে দিচ্ছে
দিন দিন শব্দদূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে শহরের ঘিঞ্জি পরিবেশে এই শব্দ এখন মানুষের জন্য অসহ্য হয়ে উঠেছে। তবে শুধু মানুষই নয়, তীব্র এই কোলাহল প্রাণিকুলের জন্যও এক ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে। শহরের পাখিরাই এর সবচেয়ে বড় শিকার। রাস্তাঘাটের অবিরাম ট্রাফিক, নতুন বিল্ডিং তৈরির শব্দ আর মানুষের তৈরি নানা রকম যান্ত্রিক কোলাহল পাখিদের কেবল বিরক্তই করছে না; বরং এদের জীবনযাত্রাই বদলে দিচ্ছে। অতিরিক্ত শব্দের কারণে পাখিরা মারাত্মক মানসিক চাপে পড়ছে। এতে স্বাভাবিক স্বভাব বদলে যাচ্ছে।
হয়তো এই পরিবর্তনগুলো আলাদাভাবে দেখলে খুব ছোট মনে হয়। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, এগুলো আসলে এক বিশাল সংকটের সংকেত। মানুষ যেভাবে দিন দিন পৃথিবীকে কোলাহলপূর্ণ করে তুলছে। এর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে পাখিদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ১৯৯০ সাল থেকে প্রকাশিত প্রায় ১৫০টির বেশি গবেষণার ফল বিশ্লেষণ করেছেন। বিশাল এই গবেষণার আওতায় ছিল পৃথিবীর ছয়টি মহাদেশের অন্তত ১৬০ প্রজাতির পাখি। এই গবেষণার প্রধান লেখক ন্যাটালি ম্যাডেন বলেন, ‘আমাদের করা গবেষণার মূলকথা হলো, মানুষের তৈরি শব্দ পাখিদের আচরণের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই শব্দদূষণ পাখিদের টিকে থাকার ক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে।’ গবেষণাটি প্রসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
সাধারণত শব্দদূষণ নিয়ে গবেষণাগুলো হয় খুব ছোট পরিসরে। হয়তো একটি নির্দিষ্ট এলাকার কোনো এক প্রজাতির পাখির ওপর কেবল গাড়ির হর্নের প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করেন। কিন্তু গবেষক ন্যাটালি ম্যাডেন একটু ভিন্নভাবে ভেবেছেন। তিনি গত কয়েক দশকের অনেকগুলো ছোট ছোট গবেষণাকে একত্র করে পাখিদের জীবনে কী কী প্রভাব পড়ছে, তা দেখার চেষ্টা করেছেন।
ম্যাডেন বর্তমানে ডিফেন্ডারস অব ওয়াইল্ডলাইফের একজন বিজ্ঞানী। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেকগুলো আলাদা আলাদা প্রজাতির ওপর করা বিভিন্ন গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করেছি। এর ফলে আমরা এখন অনেক বড় পরিসরে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছি।’
গবেষণার পরিসংখ্যান বলছে, মানুষের তৈরি শব্দ পাখিদের কেবল বিরক্তই করে না; বরং এটি এদের শরীর ও স্বভাবের ওপর প্রভাব ফেলে। এই কোলাহল পাখিদের জীবনকে এমনভাবে বদলে দিচ্ছে যে, এদের বেঁচে থাকা ও নতুন ছানা জন্ম দেওয়ার ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। মেটা অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, শব্দদূষণের কারণে পাখিদের আচার–আচরণ ও শরীরের ভেতর নানা রকম মানসিক চাপের সৃষ্টি হচ্ছে।
আমাদের কাছে শব্দ মানে, হয়তো চারপাশের সাধারণ কোনো আওয়াজ। কিন্তু পাখিদের কাছে শব্দই হলো বেঁচে থাকার প্রধান উপায়। এরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য পুরোপুরি শব্দের ওপর নির্ভর করে। এখন মানুষের তৈরি কোলাহল যদি সেই শব্দের পথ আটকে দেয়, তবে এদের জীবনটাই এলোমেলো হয়ে যায়।
গবেষক ম্যাডেন সহজ করে বুঝিয়ে বলেছেন, পাখিরা শব্দ শুনেই সঙ্গী খুঁজে নেয়, শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে বন্ধুদের সতর্ক করে, এমনকি ছোট ছানারাও কিচিরমিচির করে মা–বাবাকে জানায় যে, তাদের খিদে পেয়েছে। এখন ভাবো তো, চারপাশে যদি সারাক্ষণ প্রচণ্ড শব্দ থাকে, তবে কি এরা একে অপরের ডাক শুনতে পাবে?
এটাই হলো আসল সমস্যা। যখন পাখিরা একে অপরকে ঠিকমতো শুনতে পায় না, তখন তারা বাধ্য হয়ে আরও জোরে গান গায় অথবা গানের সুর বদলে ফেলে। কেউ কেউ আবার এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়। এতে এদের প্রচুর শক্তি খরচ হয় এবং সময় নষ্ট হয়। যার ফলে খাবার খোঁজা, ছানাদের লালন–পালন করা বা নিজেদের রক্ষা করার কাজগুলো কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমানে সারা বিশ্বে পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৭০ সালের পর থেকে শুধু উত্তর আমেরিকাতেই প্রায় ৩০০ কোটি পাখি হারিয়ে গেছে। বনভূমি ধ্বংস করা বা বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পাখিরা মারা যাচ্ছে। কিন্তু এই নতুন গবেষণা বলছে, শব্দদূষণও এই তালিকার ওপরের দিকেই আছে।
হয়তো শব্দদূষণ সরাসরি পাখিদের মেরে ফেলছে না, কিন্তু এটি এদের ওপর এমন এক মানসিক চাপ তৈরি করছে, যা এদের জীবনকে দিন দিন কঠিন করে দিচ্ছে।
তবে সব পাখি শব্দদূষণে একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। যারা গাছের কোটরে বাসা বাঁধে, এদের ওপর এই প্রভাব খোলা জায়গায় থাকা পাখিদের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি শহরের পাখিদের শরীরে বনের পাখির তুলনায় মানসিক চাপের মাত্রা অনেক বেশি থাকে, যা এদের জীবনকে কঠিন করে তোলে। তবে আশার কথা হলো, বিজ্ঞানীরা মনে করেন শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের পক্ষেই সম্ভব। আমরা যেভাবে নিজেদের ঘরবাড়ি শব্দমুক্ত রাখার প্রযুক্তি ব্যবহার করি, সেই একই কৌশল বন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। একটু সচেতনতা আর সঠিক পরিকল্পনা থাকলে আমরা সহজেই পাখিদের জন্য একটি শান্ত ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি।
সূত্র: আর্থ ডটকম