পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হলে পৃথিবীর যে দেশগুলো নিরাপদ থাকবে

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পারমাণবিক যুদ্ধের ফল ভয়ংকর হলেও পুরো পৃথিবী কিন্তু একবারে শেষ হয়ে যাবে নানিউজউইক

পত্রিকা কিংবা টিভির খবরে যুদ্ধের কথা শুনলে আজকাল অনেকের মধ্যেই একধরনের ‘নিউক্লিয়ার অ্যাংজাইটি’ বা পারমাণবিক ভীতি কাজ করে। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে যে অশান্তি চলছে, তাতে অনেকেই এখন শঙ্কিত। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, যদি সত্যিই কোনো দিন পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, তবে কি পৃথিবীটা একনিমেষেই ধ্বংস হয়ে যাবে? হিরোশিমা ও নাগাসাকির সেই ভয়াবহতা কি তবে আবারও ফিরে আসবে?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পারমাণবিক যুদ্ধের ফল ভয়ংকর হলেও পুরো পৃথিবী কিন্তু একবারে শেষ হয়ে যাবে না। ধ্বংসলীলার মধ্যেও এমন কিছু দেশ থাকবে, যারা ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে এই ভয়াবহতার মধ্যেও টিকে থাকতে পারবে। কিন্তু মানচিত্রের কোন দেশগুলো হবে সেই নিরাপদ আশ্রয়স্থল? আর কেনই–বা তারা এই বিপর্যয় রুখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে?

যুক্তরাজ্যের ‘রিস্ক অ্যানালাইসিস’ নামের একটি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, পারমাণবিক যুদ্ধ যদি পৃথিবীকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফেলে, তারপরও কিছু দেশ নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখে। এমন ভয়াবহ বিপদেও টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে অস্ট্রেলিয়া ও তার প্রতিবেশী দেশ নিউজিল্যান্ড। মূলত এই দেশগুলোর ভৌগোলিক গঠন ও নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে তারা মানব সভ্যতাকে আবারও পুনর্গঠন করার সক্ষমতা রাখে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানীরা অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আইসল্যান্ড, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ ও ভানুয়াতুকে এমন এক বিশেষ ধরনের দ্বীপরাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যারা ‘আকস্মিক সূর্যালোক কমে যাওয়ার’ বিপর্যয়েও টিকে থাকতে পারবে। সহজ কথায়, পারমাণবিক যুদ্ধ, বিশাল কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত কিংবা মহাকাশ থেকে আসা গ্রহাণুর আঘাতে যখন আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে এবং সূর্যের আলো আসা বন্ধ হয়ে যাবে, তখনো এই দেশগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে।

সূর্যের আলোহীন সেই চরম দুর্দিনেও এই দেশগুলো তাদের জনগণের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। মূলত অন্য বড় দেশগুলো থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হওয়া এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার কারণেই এই দ্বীপরাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে নিরাপদ। গবেষকদের মতে, পৃথিবীর বাকি সব দেশ যখন ধ্বংসের মুখে পড়বে, তখন এই দেশগুলোই হবে ভেঙে পড়া মানব সভ্যতাকে আবারও বাঁচিয়ে তোলার প্রধান ভরসা।

গবেষকদের মতে, পারমাণবিক যুদ্ধের মতো চরম ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও পৃথিবীর সব দেশ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না। বিশেষ করে কিছু দ্বীপরাষ্ট্র আধুনিক সভ্যতার ধ্বংস ঠেকানোর জন্য সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ৩৮টি দ্বীপদেশকে মোট ১৩টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গবেষণা করেছেন। এই বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল—বিপর্যস্ত পৃথিবীতে তারা পর্যাপ্ত খাবার উৎপাদন করতে পারবে কি না, নিজেদের জ্বালানি বা শক্তির উৎস আছে কি না এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের ধাক্কা তারা কতটা সইতে পারবে।

আরও পড়ুন

গবেষণার তালিকায় সবার শীর্ষে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। এর প্রধান কারণ হলো, এই দুটি দেশই কৃষিতে অত্যন্ত উন্নত ও উত্তর গোলার্ধের যেসব জায়গায় পারমাণবিক যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সেখান থেকে দেশ দুটি অনেক দূরে অবস্থিত।

গবেষণার শেষে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার খাবারের ভান্ডার এত বিশাল, যুদ্ধের চরম সংকটের সময়ও তারা নিজেদের জনগণের চাহিদা মিটিয়ে আরও কয়েক কোটি বাড়তি মানুষকে খাওয়ানোর ক্ষমতা রাখে। মূলত এই বিশাল খাদ্য উৎপাদনক্ষমতা ও নিরাপদ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই অস্ট্রেলিয়া এই তালিকায় এক নম্বরে স্থানে।

অস্ট্রেলিয়া তালিকার সবার ওপরে থাকার পেছনে রয়েছে দেশটির উন্নত পরিকাঠামো, বিপুল জ্বালানি মজুত, শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট। তবে অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি বড় ভয়ের কারণও আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক থাকায় পারমাণবিক যুদ্ধের সময় অস্ট্রেলিয়া সরাসরি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন

ঠিক এ জায়গাতেই নিউজিল্যান্ড কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পারমাণবিক শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় ও কোনো জোরালো সামরিক জোটে না থাকায় নিউজিল্যান্ড আক্রমণের হাত থেকে বেঁচে যেতে পারে। এ ছাড়া নিউজিল্যান্ডের চারপাশ সমুদ্র দিয়ে ঘেরা হওয়ায় প্রচণ্ড ঠান্ডার সময়ও এখানকার তাপমাত্রা খুব বেশি কমে যাবে না। সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থান দেশটিকে চরম হাড়কাঁপানো শীত থেকে রক্ষা করবে।

নিউজিল্যান্ডের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিক উইলসনের জানান, নিউজিল্যান্ডের খাদ্যব্যবস্থা এত উন্নত যে তারা চাইলে দেশের মানুষকে প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি খাবার খাওয়াতে পারবে। যদি কোনো কারণে ফসলের উৎপাদন ৬১ শতাংশও কমে যায়, তাহলেও নিউজিল্যান্ডের মানুষের খাবারের অভাব হবে না।

তবে কিছু অসুবিধাও আছে। নিউজিল্যান্ডের নিজস্ব কোনো জ্বালানি শোধনাগার নেই। ফলে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেলে চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল, কীটনাশক বা যন্ত্রপাতি আমদানি করা সম্ভব হবে না। এটি দেশটিকে সামাজিক পতনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। গবেষকদের মতে, অন্য দ্বীপরাষ্ট্রগুলো হয়তো খাবার জোগাতে পারবে, কিন্তু কলকারখানা চালু রাখা বা সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। গবেষণার সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশগুলোতে পারমাণবিক বিপর্যয়ের কারণে খাদ্য উৎপাদন প্রায় ৯৭ শতাংশ কমে যেতে পারে।

বিজ্ঞানীরা এ গবেষণা আমাদের আশ্বস্ত করার জন্য বলেননি। তাঁরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো যুদ্ধ নয়, বরং শান্তির পথে চলা। কারণ দিনশেষে, কোনো দেশই এই পৃথিবীর বাইরের কোনো দ্বীপ নয়।

সূত্র: নিউজউইক, দ্য টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন