এলিয়েন কি সত্যিই পাওয়া গেছে?
২০২৫ সালে মহাকাশে প্রাণের সন্ধান নিয়ে দুটি খবর সারা বিশ্বে বেশ আলোড়ন তুলেছিল। একটি ছিল পৃথিবী থেকে প্রায় ১২৪ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ কে২–১৮বি নিয়ে। অন্যটি ছিল মঙ্গল গ্রহের একটি পাথর, যার নাম ‘শিয়াভা ফলস’। দুটি ঘটনাতেই এমন কিছু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, যা দেখে মনে হতে পারে, হয়তো সত্যিই ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধান মিলতে যাচ্ছে!
কিন্তু বিজ্ঞানীরা কি আসলেই তা মনে করেন? বিশ্বের কয়েক শ অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট বা মহাকাশে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীর মতামত জানতে একটি জরিপ করা হয়েছিল। ফলাফল বেশ চমকপ্রদ। বেশির ভাগ বিজ্ঞানী এখনো মনে করেন না যে এলিয়েনের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে মঙ্গলের পাথরটির ক্ষেত্রে তাঁরা কে২–১৮বি–এর তুলনায় কিছুটা বেশি আশাবাদী।
কে২–১৮বি–তে কী পাওয়া গিয়েছিল
২০২৫ সালের এপ্রিলে বিজ্ঞানীরা কে২–১৮বি–এর বায়ুমণ্ডলে দুটি রাসায়নিক অণুর সম্ভাব্য উপস্থিতির কথা জানান। এগুলো হলো ডাইমিথাইল সালফাইড ও ডাইমিথাইল ডাইসালফাইড। পৃথিবীতে এই দুটি অণু সাধারণত জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে সমুদ্রের ক্ষুদ্র জীব ও কিছু অণুজীব এসব অণু তৈরি করতে পারে। তাই দূরের কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এ ধরনের অণুর সম্ভাব্য উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের কৌতূহলী করে তুলেছিল।
খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সংবাদে বলা হয়, এটি হয়তো পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতগুলোর একটি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবাই এতটা নিশ্চিত ছিলেন না। জরিপে অংশ নেওয়া অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্টদের মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেছেন, কে২–১৮বি–তে সম্ভবত সত্যিই ভিনগ্রহের প্রাণ পাওয়া গেছে। প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ বিজ্ঞানী এই ধারণার সঙ্গে একমত হননি। আর ২৮ শতাংশ বিজ্ঞানী কোনো পক্ষেই স্পষ্ট মত দেননি।
এর একটা বড় কারণ হলো, কে২–১৮বি অনেক দূরে। গ্রহটির বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে আমরা সরাসরি গিয়ে পরীক্ষা করতে পারছি না। পৃথিবী থেকে পাওয়া আলো বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীদের ধারণা করতে হচ্ছে, সেখানে কী ধরনের গ্যাস বা অণু রয়েছে। তাই কোনো রাসায়নিক অণু দেখা গেলেই সেটিকে জীবনের প্রমাণ বলা যায় না।
মঙ্গলের পাথর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মঙ্গলের ক্ষেত্রে আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে। নাসার পার্সিভারেন্স রোভার মঙ্গলের পৃষ্ঠে ‘শিয়াভা ফলস’ নামের একটি পাথর খুঁজে পায়। পাথরটির মধ্যে ছোট ছোট দাগ ও খনিজের তৈরি বলয়ের মতো কিছু গঠন দেখা যায়। এগুলোকে বলা হচ্ছে ‘লেপার্ড স্পট’ বা চিতাবাঘের দাগ।
পৃথিবীতে এ ধরনের কিছু খনিজ গঠন অণুজীবের কার্যকলাপের ফলে তৈরি হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠল, মঙ্গলের এই পাথরেও কি একসময় অণুজীবের উপস্থিতি ছিল?
নাসার কর্মকর্তারাও ঘটনাটিকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। এমনকি এটিকে মঙ্গলে প্রাণ খোঁজার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানোর ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
তবে এখানেও বিজ্ঞানীরা বেশ সতর্ক। জরিপে অংশ নেওয়া বিজ্ঞানীদের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ মনে করেছেন, মঙ্গলের পাথরটিতে সম্ভবত প্রাণের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ এতে একমত হননি। আর ৪০ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো পক্ষ নেননি।
অর্থাৎ মঙ্গলের ঘটনাটি নিয়ে বিজ্ঞানীরা কে২–১৮বি–এর চেয়ে কিছুটা বেশি আশাবাদী হলেও অধিকাংশ বিজ্ঞানী এখনো নিশ্চিত নন।
নিশ্চিত নয় মানেই প্রাণ নেই, এমন নয়
এই জরিপের আরেকটি বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীদের মতামত শুধু ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’ এভাবে ভাগ করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না।
কে২–১৮বি নিয়ে ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ বিজ্ঞানী দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। মঙ্গলের ক্ষেত্রে সেই সংখ্যা কমে হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ মঙ্গলের পাথর নিয়ে অনেক বিজ্ঞানী সরাসরি ‘না’ বলার বদলে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
এর মানে এই নয় যে বিজ্ঞানীরা হঠাৎ মঙ্গল গ্রহে প্রাণ থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেছেন; বরং তাঁরা বলছেন, বিষয়টি আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করা দরকার। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন অবস্থান খুবই স্বাভাবিক। কোনো প্রমাণকে একেবারে বাতিল না করেও তার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।
মঙ্গলের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের একটু বেশি আগ্রহী হওয়ার একটি কারণ হতে পারে, এ প্রমাণটি একটি পাথরের সঙ্গে সম্পর্কিত। রোভারটি পাথরটি সরাসরি দেখতে ও বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করতে পারে। অন্যদিকে কে২–১৮বি–এর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের বহুদূর থেকে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে।
তবে এখানেও একটি সমস্যা আছে। পৃথিবীতে কোনো গঠন বা রাসায়নিক পদার্থ জীবনের কারণে তৈরি হতে পারে বলেই যে মঙ্গলেও সেটি জীবনের কারণে তৈরি হয়েছে, এমন নয়। জীবনের অনুপস্থিতিতেও প্রকৃতির নানা প্রক্রিয়ায় একই রকম গঠন বা রাসায়নিক সংকেত তৈরি হতে পারে।
তাহলে কি মঙ্গলে প্রাণ আছে? এখনই এমন কথা বলার সুযোগ নেই।
মহাকাশে প্রাণের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা একটি একটি করে সূত্র খুঁজে বের করেন। কোনো সূত্র খুব আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু শুধু একটি সূত্রের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আরও পরীক্ষা, আরও তথ্য ও স্বাধীনভাবে ফল যাচাই করা প্রয়োজন।