গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে যেভাবে নাম লেখানো যায়

নভেম্বর মাসের এক শীতের সকাল। আকাশে উড়ছে একঝাঁক পাখি। আয়ারল্যান্ডের ওয়েক্সফোর্ড কাউন্টিতে স্ল্যানি নদীর ধারে বন্ধুদের নিয়ে শিকারে এসেছেন স্যার হিউ বিভার।

একটি পাখি শিকারের উদ্দেশ্যে গুলি ছুড়লেন তিনি। কিন্তু নিশানা ফসকে গেল। পাখিটি ছিল গোল্ডেন প্লোভার। তবে ওই মুহূর্তে তাঁর মাথায় এল অন্য একটি প্রশ্ন। ইউরোপে শিকার করা যায়, এমন পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ওড়ে কোনটি? গোল্ডেন প্লোভার, নাকি রেড গ্রাউস?

শুরু হলো তুমুল তর্ক। কেউ বলেন প্লোভার, কেউ বলেন গ্রাউস। কিন্তু এই তর্কের মীমাংসা করবে কে? শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই তর্ক শেষ হলো। বিভার বাড়ি ফিরে এলেন, কিন্তু প্রশ্নটি মাথা থেকে গেল না।

স্যার হিউ বিভার ছিলেন বিখ্যাত গিনেস ব্রুয়ারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর মাথায় এল দারুণ এক বুদ্ধি। এমন একটি বই তৈরি করা যায় না, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়, দ্রুত, দীর্ঘ কিংবা অদ্ভুত সব বিষয়ের তথ্য থাকবে? পাবে এমন একটি বই থাকলে তর্কের মীমাংসা করা সহজ হবে। মানুষ আরও বেশি সময় বসে গল্প করবে, পান করবে আরও বেশি বিয়ার। গিনেসের ব্যবসাও জমজমাট হবে!

এভাবেই ১৯৫১ সালের নভেম্বরের এক শীতের সকালে ফসকে যাওয়া একটি গুলি থেকে জন্ম নিল পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত একটি বইয়ের ভাবনা।

মজার বিষয় হলো, গিনেস নামটি আসলে একটি পারিবারিক নাম। ১৭৫৯ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে আর্থার গিনেস নামের এক ব্যবসায়ী একটি পুরোনো ব্রুয়ারি ইজারা নেন। ইজারা চুক্তির মেয়াদ ছিল টানা ৯ হাজার বছর! পরে সেই ব্রুয়ারিই হয়ে ওঠে বিখ্যাত গিনেস বিয়ার কোম্পানি। রেকর্ডবিষয়ক বইটির নাম এসেছে এই কোম্পানি থেকেই। তবে গিনেস বিয়ারের সঙ্গে বইটির সরাসরি সম্পর্ক বলতে এইটুকুই।

আরও পড়ুন

বই থেকে বিশ্ব রেকর্ড

ভাবনা তো এল, কিন্তু বইটি লিখবে কে? এবার এগিয়ে এলেন গিনেসের আরেক কর্মী ক্রিস্টোফার চ্যাটাওয়ে। তিনি বিভারকে দুই যমজ ভাইয়ের কথা বললেন। তাঁদের নাম নরিস ম্যাকওয়ার্টার ও রস ম্যাকওয়ার্টার। লন্ডনে তাঁদের একটি ছোট তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৯৫৪ সালে দুই ভাইয়ের হাতে বই তৈরির দায়িত্ব তুলে দেওয়া হলো।

লন্ডনের ফ্লিট স্ট্রিটের একটি ছোট ঘরে বসে কাজে নেমে পড়লেন তাঁরা। পুরোনো বই, বিশ্বকোষ, গবেষণাপত্র, বিশেষজ্ঞদের চিঠি—কিছুই বাদ দিলেন না। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য যাচাই করলেন। সব মিলিয়ে কয়েক মাসের হাড়ভাঙা খাটুনির পর তৈরি হলো বইটি।

১৯৫৫ সালের ২৭ আগস্ট প্রকাশিত হলো দ্য গিনেস বুক অব রেকর্ডস–এর প্রথম সংস্করণ। বইটিতে ছিল ১৯৮টি পৃষ্ঠা।

এরপর যা ঘটল, তা কেউ ভাবেনি। বইটি বাজারে আসার পর পাঠকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। বড়দিনের আগেই গিনেস বুক ব্রিটেনের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ের তালিকার শীর্ষে চলে এল। পরের বছর প্রকাশিত হলো যুক্তরাষ্ট্রেও। যে বইয়ের শুরু হয়েছিল পাবে বসে তর্ক মেটানোর জন্য, সেটি পৌঁছে গেল ঘরে ঘরে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বড়রা, এমনকি বয়স্করাও পড়তে শুরু করলেন বইটি। সবারই জানতে ইচ্ছা করে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কেক কত বড়? সবচেয়ে লম্বা নখ কার?

রেকর্ড মানে আসলে কী?

ধরো, তুমি বন্ধুদের বললে, ‘আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ছবি আঁকতে পারি!’ বন্ধুরা হয়তো হাততালি দেবে। কিন্তু গিনেস কর্তৃপক্ষ কি এটিকে রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেবে? মোটেই না! কারণ, ‘সুন্দর’ বা ‘মজার’ বিষয়গুলোকে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। একজনের কাছে যা মজার, আরেকজনের কাছে তা বিরক্তিকরও হতে পারে।

গিনেসের কাছে রেকর্ড মানে এমন কিছু, যা মাপা যায়, যার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা করা যায় এবং যা অন্য কেউ ভাঙার চেষ্টা করতে পারে। গিনেসের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী, একটি রেকর্ডকে সাধারণত পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে হয়।

শর্ত ১: মাপা যাবে

রেকর্ডের পেছনে একটি সংখ্যা বা পরিমাপ থাকতেই হবে। কত সেকেন্ডে? কত মিটার? কতজন? কয়টি? সংখ্যা ছাড়া তুলনা করা সম্ভব নয়। তাই ‘সবচেয়ে সুন্দর’ বা ‘সবচেয়ে ভালো’ ধরনের রেকর্ড গিনেস গ্রহণ করে না। তবে ‘এক মিনিটে সবচেয়ে বেশি স্কিপিং’ গ্রহণ করে। কারণ, এটি গুনে দেখা সম্ভব।

শর্ত ২: রেকর্ড ভাঙা যাবে

রেকর্ড এমন হতে হবে, যাতে আজ একজন রেকর্ড গড়লে কাল অন্য কেউ সেটি ভাঙার চেষ্টা করতে পারে। ‘আমার দাদুর জন্মদিনে সবচেয়ে বেশি মানুষ এসেছিল’—এ ধরনের একবারই ঘটে যাওয়া ঘটনা তাই রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। রেকর্ডের আসল মজা হলো প্রতিযোগিতায়। যে রেকর্ড কেউ ভাঙার চেষ্টা করতে পারবে না, তা নিয়ে গিনেসের আগ্রহ নেই।

আরও পড়ুন

শর্ত ৩: নিয়মের মধ্যে বাঁধা যাবে

এটিকে বলে স্ট্যান্ডার্ডাইজড। কথাটি কঠিন শোনালেও ধারণাটি সহজ। ধরো, তুমি সবচেয়ে বেশি ডিগবাজি দেওয়ার রেকর্ড গড়তে চাও। কিন্তু ডিগবাজি কেমন হবে? মাটিতে, নাকি তোশকের ওপর? একটার পর একটা, নাকি মাঝে থেমে থেমে? প্রতিবার ডিগবাজি শেষে দুই পায়ে দাঁড়াতে হবে, নাকি না দাঁড়ালেও চলবে? এসব বিষয় ঠিক না করলে একজনের ডিগবাজির সঙ্গে আরেকজনের ডিগবাজির তুলনা করা যাবে না। তাই প্রতিটি রেকর্ডের জন্য গিনেস আলাদা নির্দেশিকা তৈরি করে রেখেছে। সব প্রতিযোগীকে সেই নিয়ম মেনেই চেষ্টা করতে হয়।

শর্ত ৪: প্রমাণ করা যাবে

তুমি যা-ই করো, তার প্রমাণ থাকতে হবে। ছবি, ভিডিও, সাক্ষীদের স্বাক্ষর, মাপার যন্ত্রের হিসাব—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। ‘আমি করেছি, বিশ্বাস করুন’—এ কথায় গিনেস রেকর্ডের স্বীকৃতি দেয় না। প্রমাণের বিষয়টি নিয়ে আমরা একটু পরে বিস্তারিত কথা বলব। কারণ, আবেদনকারীরা সবচেয়ে বেশি ভুল করেন এই জায়গাতেই।

শর্ত ৫: একটি নির্দিষ্ট বিষয় মাপা হবে

একটি রেকর্ডে একবারে একটি বিষয়ই মাপা হয়। একসঙ্গে ‘সবচেয়ে দ্রুত’ আর ‘সবচেয়ে নিখুঁত’—এমন দুটি বিষয় জুড়ে দিলে ফলাফল নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই ‘এক মিনিটে সবচেয়ে বেশি’ কিংবা ‘সবচেয়ে কম সময়ে’—এভাবে একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠি ঠিক করে নিতে হয়।

তুমি যদি রেকর্ড গড়ার কথা ভাবো, তাহলে সামনে আসলে দুটি পথ। পুরোনো কোনো রেকর্ড ভাঙতে পারো, অথবা একেবারে নতুন রেকর্ডের প্রস্তাব দিতে পারো।

গিনেসের ওয়েবসাইটে হাজার হাজার রেকর্ডের তালিকা আছে। সেখানে খুঁজলে পেয়ে যাবে ‘এক মিনিটে সবচেয়ে বেশি সিট-আপ’, ‘সবচেয়ে লম্বা কেক’, ‘সবচেয়ে বেশি মানুষ নিয়ে একসঙ্গে গান গাওয়া’—এমন নানা রেকর্ড। তুমি যে রেকর্ডটি ভাঙতে চাও, সেটি বেছে নিয়ে তার নিয়ম মেনে বর্তমান রেকর্ডধারীর চেয়ে ভালো কিছু করে দেখাতে হবে।

অন্যদিকে, চাইলে একেবারে নতুন কোনো রেকর্ডের প্রস্তাবও দিতে পারো। এমন কিছু করতে পারো, যা আগে কেউ ভাবেনি। এ জন্য গিনেসকে জানাতে হবে, তুমি ওই কাজের জন্য একটি নতুন রেকর্ডের বিভাগ চালু করতে চাও। গিনেসের দল যাচাই করে দেখবে, প্রস্তাবটি তাদের পাঁচটি শর্ত পূরণ করে কি না। প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হলে তারা নতুন একটি রেকর্ডের শিরোনাম তৈরি করবে এবং এর নিয়মকানুন ঠিক করে দেবে।

নতুন রেকর্ডের ক্ষেত্রে মজার একটি বিষয় আছে। যে প্রথম রেকর্ডটি গড়ে, সে-ই হয় ওই রেকর্ডের প্রতিষ্ঠাতা।

এবার প্রশ্ন, আবেদন করবে কীভাবে?

ধাপ ১: আগে ঠিক করো, কী করবে

গিনেসের ওয়েবসাইট (guinnessworldrecords.com) গিয়ে সার্চ করে দেখো, তোমার পছন্দের বিষয়ে কী কী রেকর্ড আছে। বর্তমান রেকর্ডধারীর সংখ্যা বা স্কোর কত এবং রেকর্ডটির নিয়মকানুন কী, তা মন দিয়ে পড়ে নাও।

ধাপ ২: অ্যাকাউন্ট খুলে আবেদন করো

ওয়েবসাইটে প্রথমে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। এরপর ‘রেকর্ড ভাঙতে চাই’ অথবা ‘নতুন রেকর্ড প্রস্তাব করতে চাই’—এ ধরনের বিকল্প বেছে নিয়ে একটি ফরম পূরণ করতে হবে। সেখানে নিজের নাম, বয়স, ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য দিতে হবে। পাশাপাশি জানাতে হবে, কোন রেকর্ডটি ভাঙতে চাও অথবা নতুন রেকর্ডের ধারণাটি কী। কোথায় এবং কবে রেকর্ড গড়ার চেষ্টা করবে, তোমার লক্ষ্যমাত্রা কত, অর্থাৎ বর্তমান রেকর্ডের চেয়ে কতটা ভালো করতে চাও, এসব তথ্যও উল্লেখ করতে হবে।

কম বয়সীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন হয়। কিছু রেকর্ডের জন্য নির্দিষ্ট বয়সসীমাও রয়েছে। তাই আবেদন করার আগে রেকর্ডটির নিয়মে বয়স–সংক্রান্ত শর্তগুলো দেখে নিতে হবে।

আরও পড়ুন

ধাপ ৩: গিনেসের উত্তরের অপেক্ষা

আবেদন জমা দেওয়ার পর গিনেসের দল সেটি যাচাই করবে। সাধারণ আবেদন বিনা মূল্যে করা যায়। তবে উত্তর পেতে বেশ কিছুদিন, কখনো কয়েক সপ্তাহও লেগে যেতে পারে। কারণ, প্রতিদিন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে গিনেসের কাছে অসংখ্য আবেদন জমা পড়ে।

যাঁরা দ্রুত উত্তর পেতে চান, তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট ফি দিয়ে ‘প্রায়োরিটি’ সেবা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আবেদনটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখা হয় এবং কয়েক কার্যদিবসের মধ্যে উত্তর পাওয়ার সুযোগ থাকে।

গিনেস আবেদন গ্রহণও করতে পারে, আবার প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। কখনো তারা প্রস্তাবিত রেকর্ডের ধরন পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়। আবেদন গ্রহণ করা হলে তারা পাঠায় ওই রেকর্ডের বিস্তারিত নির্দেশিকা। সেখানে লেখা থাকে কী কী করতে হবে এবং কীভাবে প্রমাণ জমা দিতে হবে।

ধাপ ৪: নির্দেশিকা মেনে প্রস্তুতি নাও ও সাক্ষী ঠিক করো

গিনেসে নাম লেখাতে চাইলে নির্দেশিকার প্রতিটি নিয়ম হুবহু মানতে হবে। তাই প্রস্তুতির জন্য দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এ সময় হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। বারবার অনুশীলন করে নিজের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, সাক্ষী ঠিক করা। গিনেসের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, রেকর্ড গড়ার চেষ্টার সময় অন্তত দুজন স্বাধীন সাক্ষী থাকতে হয়। স্বাধীন সাক্ষী মানে এমন কেউ, যিনি তোমার পরিবারের সদস্য নন এবং রেকর্ড গড়ার ঘটনায় যাঁর কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। যেমন স্কুলের শিক্ষক, কোচ, চিকিৎসক কিংবা স্থানীয় কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তি।

সাক্ষীদের কাজ হলো—

নিজের চোখে পুরো চেষ্টাটি দেখা।

নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা খেয়াল রাখা।

ফলাফলের নির্ভুলতা যাচাই করা।

শেষে একটি সাক্ষ্য-বিবৃতিতে সই করা, যেখানে তাঁরা কী দেখেছেন, তা লেখা থাকবে।

ধাপ ৫: প্রমাণ রেকর্ড করো

গিনেসের নিয়ম অনুযায়ী, ভিডিওতে কোনো ধরনের সম্পাদনা করা যাবে না, যাতে পুরো ঘটনাটি নিয়ে কোনো সন্দেহ তৈরি না হয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটানা ভিডিও করতে হবে। মাঝখানে কোনো কাটাছেঁড়া চলবে না। ক্যামেরা এমন জায়গায় রাখতে হবে, যেন পুরো চেষ্টা এবং গণনা পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।

বড় কোনো রেকর্ডের ক্ষেত্রে, যেমন হাজারো মানুষকে নিয়ে একসঙ্গে কিছু করা, গিনেসের একজন অফিশিয়াল বিচারক সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারেন। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা সাধারণত বড় আয়োজনের জন্য। বিচারক পাঠানোর খরচ আয়োজকদেরই বহন করতে হয়।

ধাপ ৬: প্রমাণ জমা দাও এবং সার্টিফিকেট পাও

ভিডিও, ছবি ও সাক্ষীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গিনেসের ওয়েবসাইটে জমা দেওয়ার পর শুরু হবে আরেক দফা অপেক্ষা। গিনেসের রেকর্ড ব্যবস্থাপনা দল পুরো প্রমাণ ভালোভাবে যাচাই করবে। তারা ভিডিও দেখে হিসাব মিলিয়ে নেবে, সাক্ষীদের বিবৃতি পড়বে এবং প্রয়োজনে আরও তথ্য চাইবে। এই পর্যায়ে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। প্রমাণ অসম্পূর্ণ হলে তারা অতিরিক্ত তথ্য চেয়ে পাঠাবে।

রেকর্ডটি অনুমোদিত হলে অনলাইনে একটি ডিজিটাল সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। কাগজের সার্টিফিকেট বা স্মারক চাইলে আলাদাভাবে কিনতে হতে পারে।

আর যদি রেকর্ড অনুমোদিত না হয়? সে ক্ষেত্রে গিনেস কারণ জানিয়ে দেয়। কখনো ভিডিওর ক্যামেরার কোণ ঠিক থাকে না, কখনো সাক্ষীদের একজন পরিবারের সদস্য হন, আবার কখনো গণনায় ভুল থাকে। এসব ভুল শুধরে নিয়ে আবার চেষ্টা করা যায়।

গিনেসের নিয়ম, ফি ও অপেক্ষার সময় মাঝেমধ্যে পরিবর্তিত হয়। তাই আবেদন করার আগে অবশ্যই তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (guinnessworldrecords.com) থেকে সর্বশেষ নিয়মগুলো দেখে নিতে হবে।

আরও পড়ুন

গিনেস এসব করে কেন?

একটি প্রতিষ্ঠান মানুষকে রেকর্ড গড়তে উৎসাহ দেয়, সার্টিফিকেট দেয়, আবার এত পরিশ্রম করে সবকিছু যাচাইও করে। এর পেছনে লাভটা কী?

শুরুর দিকে উত্তরটা ছিল বেশ সহজ। হিউ বিভার চেয়েছিলেন, পাবে আড্ডা জমুক আর গিনেসের নাম ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে। বইয়ের গায়ে কোনো বিজ্ঞাপন ছিল না, কিন্তু এর মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল গিনেসের নাম। একে বলে ব্র্যান্ড বিল্ডিং। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ও পরিচিতি মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া।

তবে এখন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস নিজেই একটি বড় ব্যবসা। প্রতিবছর বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ছবিতে ঠাসা এই বই শিশু-কিশোরদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এখন পর্যন্ত গিনেস বুক অব রেকর্ডসের বিভিন্ন সংস্করণ ১০০টির বেশি দেশে প্রায় ৪০টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। গিনেসের নিজের দাবি অনুযায়ী, বইটির বিক্রি ১৫ কোটি কপি ছাড়িয়েছে। কপিরাইটযুক্ত বইয়ের মধ্যে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইগুলোর একটি।

এ ছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রেকর্ড নিয়ে অনুষ্ঠান তৈরি করা হয়। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দেওয়া হয় এসব রেকর্ডের ভিডিও। ফলে টেলিভিশন ও ডিজিটাল কনটেন্ট থেকেও আয় হয়।

অনেক ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের পরিচিতি বাড়াতে গিনেসের রেকর্ড গড়তে চায়। গিনেস তাদের এ বিষয়ে পরামর্শ দেয়। বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে নিজেদের বিচারকও পাঠায়। এসব সেবার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি ফি নেয়।

রেকর্ড অনুমোদিত হলে সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। কেউ চাইলে বাঁধাই করা সার্টিফিকেট বা স্মারকও কিনতে পারেন। পাশাপাশি জাদুঘর ও প্রদর্শনীর মাধ্যমেও আয় করে প্রতিষ্ঠানটি।

গিনেস ব্রুয়ারির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর বইটির মালিকানা বেশ কয়েকবার হাতবদল হয়েছে। বর্তমানে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের মালিক কানাডার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান জিম প্যাটিসন গ্রুপ। ২০০৮ সালে তারা এটি কিনে নেয়। এর আগে ১৯৯৯ সালে বইটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস। নামেই বোঝা যায়, এখন এর পরিধি পুরো বিশ্বজুড়ে।

মোটকথা, মানুষের কৌতূহলকে একটি বিশাল বাণিজ্যিক শিল্পে পরিণত করেছে গিনেস। আর মানুষের কৌতূহল এমন এক জিনিস, যা কখনো ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।

প্রতিবছর নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার পালিত হয় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ডে। সে হিসাবে এবার ১২ নভেম্বর গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ডে।

রেকর্ড গড়ে কী লাভ?

এখন তোমার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এত কষ্ট করে রেকর্ড গড়ে লাভ কী?

মাসের পর মাস কঠোর অনুশীলন করলে নিজের মধ্যে তৈরি হয় দৃঢ় মনোবল। এই মনোবল ও আত্মবিশ্বাস পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা জীবনের অন্য যেকোনো কাজে কাজে লাগতে পারে। রেকর্ডধারীদের অনেককেই সংবাদমাধ্যমে ডাকা হয়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কারও কারও জন্য এই অর্জন ভবিষ্যতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

তবে সবচেয়ে বড় কথা, রেকর্ড গড়া দারুণ এক শখের বিষয়। অনেকের কাছে এটি নিজেকে প্রমাণ করার একটি উপায়। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বারবার দেখিয়েছে, মানুষের কৌতূহল আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। নিজের ভেতরের শক্তি ও সামর্থ্যকে নতুন করে আবিষ্কার করার জন্য গিনেস রেকর্ড গড়ার অভিজ্ঞতা হতে পারে অসাধারণ। আর সেই সঙ্গে বিশ্বদরবারে নিজের দেশের নাম উজ্জ্বল করার আনন্দ তো আছেই!

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন