ক্ষমতাসীনদের মস্তিষ্ক বদলে যায়, বৈজ্ঞানিক গবেষণা
ধরা যাক, একটি অফিসে দুজন মানুষ কাজ করেন। একজন সিইও, আরেকজন নতুন যোগ দেওয়া কর্মী। দুজনই একই অফিসে থাকেন, একই ভবনে কাজ করেন। কিন্তু তাঁদের জগৎ কি একই রকম? নতুন এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, দুজনের জীবন সব সময় একই রকম হয় না। অনেক সময় ক্ষমতা, সামাজিক অবস্থান বা অর্থনৈতিক শক্তি মানুষের মস্তিষ্কের কাজ করার ধরনকেও প্রভাবিত করতে পারে।
মস্তিষ্কে কী পরিবর্তন হয়
২০২৫ সালে প্রকাশিত বড় একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মস্তিষ্কের গঠনের সম্পর্ক আছে। এই গবেষণায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের মস্তিষ্ক স্ক্যান করা হয়েছে। প্রায় ১০ লাখ মানুষের জেনেটিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি ব্রিটেনের বিশালাকার স্বাস্থ্য ডেটাবেজ ইউকে বায়োব্যাংক ব্যবহার করে করা হয়। এটি প্রকাশিত হয়েছে মলিকুলার সাইকিয়াট্রি জার্নালে।
গবেষকেরা দেখতে পান, যাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান বেশি শক্তিশালী, তাঁদের মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটার নেটওয়ার্কে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। হোয়াইট ম্যাটার নেটওয়ার্ক মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশকে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে।
এই পার্থক্য মানে এই নয় যে তাঁরা খারাপ মানুষ। কিন্তু গবেষকেরা মনে করেন, মানুষের পরিবেশ ও সামাজিক অবস্থান দীর্ঘ সময় ধরে মস্তিষ্কের কাজের ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে।
কেন এমন হতে পারে
মস্তিষ্ক আসলে একটি ‘পূর্বাভাস দেওয়া যন্ত্র’। মানে আমাদের চারপাশের কোন বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, কোন বিষয় বিপজ্জনক আর কোন বিষয় উপেক্ষা করা যায়, মস্তিষ্ক সব সময় সেটি হিসাব করার চেষ্টা করে।
যদি কেউ এমন অবস্থানে থাকেন, যেখানে তাঁর সিদ্ধান্তের কারণে খুব বেশি সামাজিক সমস্যা বা ক্যাওস তৈরি হয়, তাহলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে অন্য মানুষের সূক্ষ্ম আবেগ বা সংকেতের দিকে কম মনোযোগ দিতে পারে। অন্যভাবে বললে, মস্তিষ্কের ‘মানুষের অনুভূতি বোঝার রাডার’ একটু কম সক্রিয় হতে পারে।
ক্ষমতা বাড়লে কি সহমর্মিতা কমে যায়
অনেকে ভাবতে পারে, তাহলে কি ক্ষমতাবান মানুষদের সহানুভূতি নেই? বিজ্ঞানীরা বলেন, ব্যাপারটা তা নয়। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের নিউরোসাইকোলজি গবেষক এলিজাবেথ ম্যাটি বলেন, ক্ষমতাবান মানুষের সহমর্মিতা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। তবে তাঁরা হয়তো অন্যদের অনুভূতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবে যতটা ভাবার কথা, ততটা ঘন ঘন ভাবেন না। মানে বিষয়টি নৈতিকতার কিছু নয়; বরং মস্তিষ্কের অভ্যাস।
মস্তিষ্কের প্রতিফলন
মানুষের মস্তিষ্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা আছে, যাকে বলা হয় মিরর নিউরোন সিস্টেম। এটি আমাদের অন্য মানুষের কাজ বা অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করে। কেউ হাসলে আমরা হাসি, কেউ কষ্ট পেলে আমাদেরও খারাপ লাগে এ ব্যবস্থার কারণেই। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন নিজেকে খুব ক্ষমতাবান মনে করে, তখন এই ‘মিরর প্রতিক্রিয়া’ কিছুটা কম সক্রিয় হতে পারে।
এ ধরনের একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের এমনভাবে ভাবানো হয় যে তাঁরা বেশ ক্ষমতাবান অবস্থানে আছেন। পরে দেখা যায়, অন্য মানুষের কাজ বা আবেগ দেখলে তাঁদের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া আগের তুলনায় কম হয়।
আচরণেও দেখা যায় পার্থক্য
আচরণগত গবেষণাতেও কিছু মিল পাওয়া গেছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী পল পিফ কয়েকটি পরীক্ষায় দেখেছেন, দামি গাড়ির চালকেরা অনেক সময় রাস্তার ক্রসওয়াকে পথচারীদের জন্য কম থামে। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল অংশগ্রহণকারীরা পরীক্ষায় কখনো কখনো অন্যদের জন্য রাখা সম্পদ বেশি নিয়ে নেয়।
এগুলো সব মানুষের ক্ষেত্রে সত্যি নয়। তবে গবেষকেরা বলেন, ক্ষমতা ও সম্পদের পরিবেশ মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
একই প্রতিষ্ঠানে দুই রকম বাস্তবতা
সংগঠনবিষয়ক মনোবিজ্ঞানী শন ওয়াটারস এ ঘটনাকে বলেন ‘লিডারশিপ আলটিচ্যুড সিকনেস’। এর মানে নেতৃত্বের উচ্চতায় ওঠার একধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
শন ওয়াটারসের গবেষণায় দেখা গেছে, একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং সাধারণ কর্মীরা অনেক সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা অনুভব করেন। যেমন কর্মকর্তারা মনে করতে পারেন, সবকিছু ভালো চলছে। কিন্তু নিচের স্তরের কর্মীরা হয়তো উদ্বেগ বা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এর একটি কারণ হলো তথ্যের প্রবাহ। অনেক সময় খারাপ খবর বা সমস্যা শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ফিল্টার হয়ে যায়।
এটি নতুন কিছু নয়
ক্ষমতা মানুষের বিচারবুদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে, এ ধারণা নতুন নয়। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য রিপাবলিক’–এ লিখেছিলেন, ক্ষমতা মানুষকে সহজেই বিপথে নিতে পারে, যদি শক্তিশালী নৈতিক নিয়ন্ত্রণ না থাকে। আজকের স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধারণার পেছনে কিছু জৈবিক ব্যাখ্যাও থাকতে পারে।
এ গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ক্ষমতা বা সাফল্য যতই আসুক, মানুষের উচিত সচেতনভাবে অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করা। কারণ, মস্তিষ্ক পরিবেশের সঙ্গে বদলে যেতে পারে। কিন্তু সচেতনতা, শিক্ষা ও আত্মসমালোচনা সেই পরিবর্তনকে সঠিক পথে রাখতে সাহায্য করে। মানে ক্ষমতা যতই বাড়ুক, মানবিকতার চর্চা কখনো বন্ধ করা উচিত নয়।