আইনস্টাইনের জীবনের শেষ দিনগুলো কেমন কেটেছিল
সাধারণত মানুষের বয়স বাড়লে তাঁদের কাজের গতি কমে যায়, তারা বিশ্রাম নিতে পছন্দ করেন। কিন্তু আইনস্টাইন ছিলেন একেবারেই অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ! বয়স বাড়লেও তাঁর মনের ভেতরের সেই কৌতূহল ও উৎসাহের একটুও কমতি হয়নি।
জীবনের শেষ দিনগুলো আইনস্টাইন নিজের সবচেয়ে পছন্দের কাজগুলো করেই কাটিয়েছেন। একদিকে তিনি তাঁর অসমাপ্ত তত্ত্বগুলো নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাথা ঘামাতেন, অন্যদিকে নিজের রাজনৈতিক ও মানবিক বিশ্বাসগুলোর পক্ষে জনসমক্ষে সোচ্চার থাকতেন। আর এই সবকিছুর ফাঁকে সময় বের করতেন নিজের শখের জন্য।
আইনস্টাইনের প্রথম ও প্রধান শখ ছিল গান শোনা ও বেহালা বাজানো। বিখ্যাত সুরকার মোজার্ট ও বাখ ছিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। শেষ বয়স পর্যন্ত বেহালা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। তিনি যে খুব বড় মাপের কোনো বাদক ছিলেন, তা নয়, কিন্তু বেহালা বাজানোর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল খাঁটি। মজার ব্যাপার হলো, এই সুরের মূর্ছনা তাঁর গবেষণায় দারুণ সাহায্য করত! জটিল কোনো সমীকরণে আটকে গেলে তিনি হাতে তুলে নিতেন বেহালা। সুরের ঘোরে তাঁর মন যেন হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে যেত।
শেষ জীবনে আইনস্টাইনের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক সাধনা ছিল ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি বা থিওরি অব এভরিথিং। তিনি শুধু পদার্থবিজ্ঞানের সব বড় বড় নিয়মকে একটি একক ছাতার নিচে আনতেই চাননি; বরং কোয়ান্টাম মেকানিকসের মূল ভিত্তিগুলোকেও চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁর এই বিখ্যাত থিওরি অব এভরিথিং কখনোই শেষ হয়নি। আজও এটি পদার্থবিজ্ঞানের এক অমীমাংসিত রহস্য হয়ে আছে।
ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন চেইম ওয়াইজম্যান। তিনি একসময় রসায়নবিদ ছিলেন, পরে রাজনীতিতে আসেন।
বিজ্ঞানের বাইরে আইনস্টাইনের আরেকটি বড় চিন্তা ছিল বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের অত্যাচারে ঠিক কতজন ইহুদি প্রাণ হারিয়েছিল, তা তখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে আজকের হিসাবে ধারণা করা হয়, এই সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখের কাছাকাছি! যুদ্ধের পর যেসব ইহুদি কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালাতে পেরেছিল, তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়েছিল।
এত অত্যাচার ও ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর ইহুদিরা উপলব্ধি করল, পৃথিবীতে তাদের নিজেদের একটি স্বাধীন মাতৃভূমি থাকা খুব দরকার। ১৯৪৮ সালে তাদের এই স্বপ্ন সত্যি হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। ইসরায়েল নামের এই নতুন দেশটি গড়ে উঠেছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন ভূমিতে। এর চারপাশে রয়েছে লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান, মিসর ও ফিলিস্তিন। আর একপাশে রয়েছে ভূমধ্যসাগর।
ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন চেইম ওয়াইজম্যান। তিনি একসময় রসায়নবিদ ছিলেন, পরে রাজনীতিতে আসেন। ১৯৫২ সালে ওয়াইজম্যান মারা গেলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন–গুরিয়ন এক অভাবনীয় প্রস্তাব নিয়ে আইনস্টাইনের কাছে হাজির হন। তিনি আইনস্টাইনকে ইসরায়েলের নতুন প্রেসিডেন্ট হওয়ার অনুরোধ করেন!
ইসরায়েলের সরকারব্যবস্থা ছিল সংসদীয় পদ্ধতির। মানে, আসল ক্ষমতা থাকত প্রধানমন্ত্রীর হাতে, আর প্রেসিডেন্টের পদটি ছিল অনেকটা আলংকারিক বা সম্মানের। অনেকটা বাংলাদেশের মতো। ইসরায়েল সরকারের ভাবনা ছিল, আইনস্টাইনের মতো বিশ্বখ্যাত একজন বিজ্ঞানী তাদের প্রেসিডেন্ট হলে সারা বিশ্বে নতুন এই দেশটির সম্মান ও পরিচিতি অনেক বেড়ে যাবে। আইনস্টাইনকে এই প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও তিনি তাঁর বিজ্ঞান গবেষণা চালিয়ে যেতে পারবেন।
আইনস্টাইন যতই কর্মচঞ্চল থাকুন না কেন, বয়স তার ছাপ ফেলতে শুরু করেছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর হাতে আর বেশি সময় নেই।
কিন্তু এই প্রস্তাবে একটি বড় সমস্যা ছিল। প্রেসিডেন্ট হতে হলে তাঁকে আমেরিকার প্রিন্সটনের সাজানো জীবন ছেড়ে ইসরায়েলে গিয়ে স্থায়ীভাবে থাকতে হতো। নাগরিকত্ব নিতে হতো ইসরায়েলের।
আইনস্টাইন এই প্রস্তাবে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। কিন্তু বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন, তাঁর মনটা রাজনীতির চেয়ে বিজ্ঞানের দিকেই বেশি ঝোঁকে। তাই তিনি প্রিন্সটনেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
প্রিন্সটনের এই শান্ত জীবনে আইনস্টাইনের আরেকটি বড় শখ ছিল নৌকা চালানো। মজার ব্যাপার হলো, বেহালা বাজানোর মতোই নৌকা চালানোতেও তাঁর কোনো বিশেষ দক্ষতা ছিল না! তাঁর একটি ছোট পালতোলা নৌকা ছিল। তিনি সেটা নিয়ে শান্ত লেকের পানিতে ভেসে বেড়াতেন। যাঁরা তাঁকে চিনতেন, তাঁরা বলতেন, আইনস্টাইন আসলে নৌকা চালাতে যেতেন না, তিনি যেতেন মানুষের ভিড় থেকে একটু দূরে একাকী সময় কাটাতে। ওই নিস্তব্ধ পরিবেশে তিনি তাঁর নতুন তত্ত্বগুলো নিয়ে ভাবতেন এবং নোটবুকে লিখে রাখতেন।
তবে যেহেতু আইনস্টাইনের নৌকা চালানোর কোনো হাতযশ ছিল না, তাই প্রায়ই তিনি বিপদে পড়তেন! কখনো পথ হারিয়ে ফেলতেন, কখনো নৌকা চরে আটকে যেত। আবার কখনো অন্যমনস্ক হয়ে অন্যের নৌকায় সজোর ধাক্কা মেরে বসতেন!
আইনস্টাইন যতই কর্মচঞ্চল থাকুন না কেন, বয়স তার ছাপ ফেলতে শুরু করেছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর হাতে আর বেশি সময় নেই। ১৯৪৮ সালে তাঁর পেটে একটি অস্ত্রোপচার হয়েছিল। তাঁর পেটের একটি ধমনি দুর্বল হয়ে ফুলে গিয়েছিল। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে অ্যানিউরিজম।
বিজ্ঞানী পরিচয়ের বাইরে আইনস্টাইনকে মানুষ মনে রেখেছে তাঁর বিশাল হৃদয়ের কারণে। তিনি মানবতার জন্য গভীরভাবে ভাবতেন।
১৯৫৫ সালের ১৫ এপ্রিল সেই দুর্বল ধমনিটি আর চাপ ধরে রাখতে পারল না, ফেটে গেল! শুরু হলো শরীরের ভেতর ভয়াবহ রক্তক্ষরণ। তাঁকে দ্রুত প্রিন্সটন হাসপাতালে নেওয়া হলো। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর জন্য জরুরি অস্ত্রোপচার করতে চাইলেন।
কিন্তু আইনস্টাইন শান্তভাবে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। কারণ, চিকিৎসা করলে হয় তিনি বেশি দিন বাঁচবেন, নয়তো আরও দ্রুত মারা যাবেন। তিনি কোনো ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। নিশ্চিতে আরও কয়েকটা দিন পৃথিবীতে বাঁচার সিদ্ধান্ত নিলেন। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে দাঁড়িয়ে এই মহান বিজ্ঞানী বলেছিলেন, ‘কৃত্রিমভাবে জীবনকে দীর্ঘায়িত করাটা চরম স্বাদহীন একটি ব্যাপার। আমার যা করার আমি করেছি, এখন যাওয়ার সময় হয়েছে।’
অবশেষে ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল ভোরে, ৭৬ বছর বয়সে চিরনিদ্রায় ঢলে পড়েন এই শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মেধা আলবার্ট আইনস্টাইন।
আলবার্ট আইনস্টাইনকে অনেকেই বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রতিভাবান মানুষ হিসেবে মনে করেন। তিনি আমাদের মহাবিশ্বকে দেখার চোখটাই বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর তত্ত্বগুলোর ওপর দাঁড়িয়েই আজকের আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্ম। পদার্থ, শক্তি, স্থান, কাল ও মহাকর্ষ নিয়ে তাঁর যুগান্তকারী চিন্তাভাবনা বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছে, যারা সবার চেয়ে আলাদাভাবে ভাবতে পারে, তারাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন করে।
আইনস্টাইন কখনো নিজের মনের কথা বলতে ভয় পেতেন না। তাতে অন্য মানুষ বিরক্ত হলেও তিনি বলতেন। হয়তো এটাই ছিল তাঁর আসল প্রতিভা।
বিজ্ঞানী পরিচয়ের বাইরে আইনস্টাইনকে মানুষ মনে রেখেছে তাঁর বিশাল হৃদয়ের কারণে। তিনি মানবতার জন্য গভীরভাবে ভাবতেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, পৃথিবীর সব বর্ণের, সব ধর্মের মানুষ একদিন শান্তিতে একসঙ্গে বসবাস করবে।
আইনস্টাইন কখনো নিজের মনের কথা বলতে ভয় পেতেন না। তাতে অন্য মানুষ বিরক্ত হলেও তিনি বলতেন। হয়তো এটাই ছিল তাঁর আসল প্রতিভা। তিনি যখন বিশ্বাস করতেন কোনো কিছু সঠিক, তখন শত বাধা এলেও তিনি সেই পথেই হাঁটতেন।
আইনস্টাইনকে আমরা যে নামেই ডাকি না কেন, একটি কথা নিশ্চিত—তিনি পৃথিবীতে যত দিন বেঁচে ছিলেন, নিজের মেধা ও মানবতা দিয়ে এই বিশ্বকে আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে গেছেন।