আইনস্টাইন যেভাবে নোবেল পেলেন

আলবার্ট আইনস্টাইন

আইনস্টাইনের জীবনের সবচেয়ে রঙিন, ব্যস্ত ও ঘটনাবহুল সময় কেটেছে ১৯২০-এর দশকে। ১৯১৯ সালে তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি আর শুধু বিজ্ঞানী রইলেন না, হয়ে উঠলেন পৃথিবীর সায়েন্স সুপারস্টার। বিজ্ঞানের কঠিন সব সমীকরণ দিয়েও যে মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া যায়, তা আইনস্টাইনই প্রথম দেখালেন।

দেশ-বিদেশ থেকে তাঁর ডাক আসতে লাগল। সবাই এই এলোমেলো চুলের, মোজা না পরা মানুষটিকে একনজর দেখতে চায়। তাঁর কথা শুনতে চায়। যদিও তাঁর তত্ত্বের মাথামুণ্ডু খুব কম মানুষই বুঝত, তবু তাঁর প্রতি মানুষের আগ্রহের কমতি ছিল না। সাংবাদিকেরা তাঁকে ঘিরে ধরত মুভির নায়কদের মতো। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ও অটোগ্রাফশিকারিদের ভিড় তখন তাঁর নিত্যসঙ্গী।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র কিছুদিন আগে। যুদ্ধের দগদগে ঘা তখনো শুকায়নি। একদিকে জার্মানি, অন্যদিকে ব্রিটেন। দুই দেশের মানুষ একে অপরকে ঘৃণা করে। ঠিক সেই সময়েই ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। মানুষ অবাক হয়ে দেখল, একজন জার্মান বিজ্ঞানীর তত্ত্ব প্রমাণ করার জন্য অভিযানে নেমেছিলেন দুই ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন ও ফ্রাঙ্ক ডাইসন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানের খাতিরে একসময়ের শত্রুপক্ষের এই মিলন মানুষকে মুগ্ধ করল। মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে এই যে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ, এটা সবার কাছে যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে এক দারুণ অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠল। আইনস্টাইন হয়ে উঠলেন শান্তির প্রতীক।

১৯২১ সালের বসন্তে আইনস্টাইন প্রথমবারের মতো আমেরিকা সফরে গেলেন। উদ্দেশ্য ছিল হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রসায়নবিদ চেইম ওয়াইজম্যান। মার্চ মাসে নেদারল্যান্ডস থেকে জাহাজে চড়ে তিনি নিউইয়র্ক বন্দরে পৌঁছালেন।

জাহাজ থেকে নামার দৃশ্যটা ছিল দেখার মতো। প্রায় ২০ হাজার ভক্ত তাঁকে স্বাগত জানাতে বন্দরে জড়ো হয়েছিলেন! গাড়ির হর্ন, মানুষের চিৎকার ও ব্যান্ড পার্টির আওয়াজে কান পাতা দায়। তাঁকে নিয়ে নিউইয়র্কের রাস্তায় রাজকীয় শোভাযাত্রা বের হলো। সাধারণত যুদ্ধজয়ী বীর বা রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্যই এমন আয়োজন করা হয়।

সময়টা আইনস্টাইনের জন্য খুব আনন্দের ছিল। শুধু ভক্তদের ভালোবাসার জন্য নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি তখন নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছেন। ১৯১৯ সালে তিনি এলসা লোয়েনথালকে বিয়ে করেন। এলসা ছিলেন আইনস্টাইনের চাচাতো বোন। তিনি আইনস্টাইনকে খুব ভালো বুঝতেন। আইনস্টাইন ছিলেন ভুলোমনা। তাঁকে নিয়ে এ বিষয়ে অনেক গালগল্প চালু আছে। সেগুলোর কতটা সঠিক আর কতটা বানানো, তা আর এখন নিশ্চিত করা বলা যায় না। তবে আইনস্টাইনের আসলেই ভুলে যাওয়ার স্বভাব ছিল। কিন্তু এলসা ছিলেন তাঁর ঠিক উল্টো চরিত্রের। তিনি সবকিছু দেখেশুনে রাখতেন। অনেকটা আইনস্টাইনের ম্যানেজারের মতো ছিলেন এলসা। আইনস্টাইনের পকেটে হাতখরচ দেওয়া থেকে শুরু করে সুটকেস গোছানো পর্যন্ত সবই তিনি করতেন। এলসা ১৯৩৬ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত ছায়ার মতো আইনস্টাইনের পাশে ছিলেন।

আমেরিকায় দুই মাস ছিলেন আইনস্টাইন। কলাম্বিয়া ও প্রিন্সটনের মতো সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেকচার দিলেন। মজার ব্যাপার হলো, তিনি লেকচার দিতেন জার্মান ভাষায়। দর্শকেরা সব বুঝত না, তবু হাততালিতে ফেটে পড়ত হলরুম। আইনস্টাইন মজা করে বলতেন, ‘আমার মনে হয় ওরা আমার কথা বুঝছে না বলেই এত খুশি!’ তিনি হোয়াইট হাউসে গিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন জি হার্ডিংয়ের সঙ্গেও দেখা করেন। এরপর ফ্রান্স, স্পেন, জাপানসহ আরও অনেক দেশ ভ্রমণ করেন তিনি।

১৯২১ সাল। পদার্থবিজ্ঞানের জন্য নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। সবাই ধরেই নিয়েছিল, এবার আইনস্টাইনই নোবেল পাবেন। কিন্তু নোবেল কমিটি পড়ল মহাবিপদে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব তখনো অনেক বিজ্ঞানীর কাছে হজম হচ্ছে না। কেউ কেউ এটাকে আজগুবি বা প্রমাণহীন মনে করতেন। কমিটি ভাবল, এই তত্ত্বে পুরস্কার দিলে যদি পরে ভুল প্রমাণিত হয়? তখন তো নোবেল কমিটির মানসম্মান থাকবে না!

আরও পড়ুন

তাই তারা একটি নিরাপদ পথ বেছে নিল। ১৯২২ সালে ঘোষণা করা হলো, ১৯২১ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পাচ্ছেন আলবার্ট আইনস্টাইন। কিন্তু আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জন্য নয়! তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হলো ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট বা আলোকতড়িৎ ক্রিয়া ব্যাখ্যার জন্য। ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট হলো, আলো কোনো ধাতুর ওপর পড়লে সেখান থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়। আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে তাঁর প্রথম পেপারে এটি নিয়ে লিখেছিলেন। আগের অধ্যায়ে আমরা এ ব্যাপারে সামান্য আলোচনা করেছি।

আইনস্টাইন নোবেল জয়ের খবরটা পেলেন জাপানে যাওয়ার পথে। তখন তিনি জাহাজে। তিনি এতে খুব একটা খুশি বা অবাক হলেন না। নোবেল কমিটি শর্ত জুড়ে দিয়েছিল, পুরস্কারের বক্তৃতায় তিনি যেন আপেক্ষিকতা নিয়ে কথা না বলেন। কিন্তু আইনস্টাইন কি আর শোনার পাত্র? তিনি যখন পুরস্কার নিতে গেলেন, তখন আবারও নিজের বিদ্রোহী সত্তার প্রমাণ দিলেন। প্রথা ভেঙে তিনি ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট নিয়ে একটা কথাও বললেন না! সবার চোখ কপালে তুলে দিয়ে তিনি অনর্গল কথা বলে গেলেন তাঁর প্রিয় আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়েই!

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে যে বিশাল অঙ্কের অর্থ তিনি পেয়েছিলেন, তার পুরোটাই দিয়েছিলেন প্রথম স্ত্রী মিলেইভাকে। বিচ্ছেদের সময় তিনি মিলেইভাকে কথা দিয়েছিলেন, নোবেল পেলে তিনি সব টাকা তাঁকে দিয়ে দেবেন। আইনস্টাইন তাঁর কথা রেখেছিলেন।

১৯২০-এর দশকে আইনস্টাইন কসমোলজি নিয়ে গভীরভাবে কাজ শুরু করেন। ১৯১৭ সালেই তিনি ‘কসমোলজিক্যাল কনসিডারেশনস অব দ্য জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি’ নামে একটি পেপার লিখেছিলেন। তখন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মহাবিশ্ব স্থির। এটি বাড়েও না, কমেও না।

কিন্তু আইনস্টাইনের নিজের সমীকরণই বলছিল, মহাবিশ্ব হয় প্রসারিত হচ্ছে, নয়তো সংকুচিত। মহাবিশ্ব কোনোভাবে স্থির থাকতে পারে না। এই অস্থিরতা ঠেকাতে আইনস্টাইন তাঁর সমীকরণে জোর করে একটি ধ্রুবক বসিয়ে দিলেন। এর নাম কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট। এটির কাজ ছিল মহাকর্ষের বিপরীতে ধাক্কা দিয়ে মহাবিশ্বকে স্থির রাখা।

আরও পড়ুন

কিন্তু বিজ্ঞান তো আর জোর করে মেলানো যায় না। ১৯২৯ সালে বিখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবল প্রমাণ করলেন, মহাবিশ্ব স্থির নয়, এটি প্রতিনিয়ত বেলুনের মতো বাড়ছে! গ্যালাক্সিগুলোও একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

আইনস্টাইন তাঁর ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি নিজে মাউন্ট উইলসনে গিয়ে হাবলের টেলিস্কোপ দিয়ে দেখলেন। এরপর তিনি তাঁর সমীকরণ থেকে ওই কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট বাদ দিয়ে দিলেন। পরে তিনি বলেছিলেন, সমীকরণে ওই ধ্রুবক বসানোটা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। তবে মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক বিজ্ঞানীরা এখন আবার মনে করছেন, আইনস্টাইনের ওই ভুলটাই হয়তো ঠিক ছিল! কারণ, মহাবিশ্বের প্রসারণের পেছনে ডার্ক এনার্জির যে ভূমিকা, তা ওই কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্টের মতোই কাজ করে। ডার্ক এনার্জি বা ডার্ক ম্যাটারের মতো বিষয়গুলো তোমরা আরেকটু বড় হলে বিস্তারিত জানতে পারবে।

আরও পড়ুন

যাহোক, খ্যাতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনস্টাইন বিজ্ঞানের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠলেন বিশ্বনাগরিক। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে শিউরে উঠেছিলেন। যুদ্ধের পক্ষে থাকা সহকর্মীদের ওপর তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিলেন। ১৯১৫ সালেই তিনি ‘মাই অপিনিয়ন অব দ্য ওয়ার’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, পুরুষদের সহিংসতার প্রবণতাই যুদ্ধের মূল কারণ।

এখন যেহেতু হাজার হাজার মানুষ তাঁর কথা শুনছে, তিনি সব দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা বলতে শুরু করলেন। লিগ অব নেশনসের কমিটি অন ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশনে যোগ দিলেন। জাতিসংঘের আগে গঠিত হয়েছিল এই লিগ অব নেশনস। এ সময় তিনি বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সঙ্গে ‘যুদ্ধ কেন?’ শিরোনামে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করেন, যা পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, রাজনীতিতে নাক গলানো ছাড়াই বিজ্ঞানীরা যেন একে অপরের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময় করতে পারেন।

খ্যাতির শিখরে বসে আইনস্টাইন যখন বেহালায় সুর তুলতেন, তখন হয়তো তিনি জানতেন না, তাঁর নিজের দেশেই ঘনিয়ে আসছে এক ভয়ংকর অন্ধকার। হিটলারের নাৎসি বাহিনী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আইনস্টাইনের জন্য অপেক্ষা করছে এক কঠিন সময়। অচিরেই তাঁকে ছাড়তে হবে নিজের জন্মভূমি!

সূত্র: ডি কে প্রকাশনীর লাইফ স্টোরিস সিরিজের আলবার্ট আইনস্টাইন বই অবলম্বনে

আরও পড়ুন