পোকেমন কী, কীভাবে এটি এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল
ছোটবেলায় স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে স্টেশনারি দোকানে দাঁড়িয়ে দেখতাম নতুন কোনো পোকেমন কার্ড এসেছে কি না। নতুন কালেকশন এসেছে শুনলেই টিফিনের জমানো টাকা দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই নতুন প্যাকেট কিনতাম। নতুন প্যাকেট খোলার পরে খুঁজে দেখতাম কী কী কার্ড পেলাম। কারণ, বন্ধুদের সঙ্গে চলত তুমুল প্রতিযোগিতা। কার কাছে কত বেশি পাওয়ারের কার্ড আছে মিলিয়ে দেখা হতো।
মূলত অ্যানিমে সিরিজের মাধ্যমেই পোকেমনের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। তবে এর প্রতি আগ্রহ ও উন্মাদনা তৈরি হয় ট্রেডিং কার্ড গেমের কারণে। পরে যখন জানতে পারলাম পোকেমনের শুরু হয়েছিল নিন্টেন্ডোর ভিডিও গেম থেকে, তখন বুঝলাম আসলে পোকেমনের জগৎটা অনেক বড় ও চমৎকার। কিন্তু কী এমন আছে এই কাল্পনিক ফ্র্যাঞ্চাইজিতে? কিভাবে পোকেমন শুধু গেম বা কার্টুন না হয়ে গোটা বিশ্বের কয়েক প্রজন্মের আইকন হয়ে উঠল?
পোকেমন ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্ম জাপানের সাতোশি তাজিরির কল্পনা থেকে। তিনি ছিলেন একজন ভিডিও গেম ডিজাইনার ও পরিচালক। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি তাঁর বন্ধু ইলাস্ট্রেটর কেন সুজিমোরিকে সঙ্গে নিয়ে গেম ফ্রিক নামে একটি গেম ম্যাগাজিন বের করতেন। সাতোশি তাজিরি দেখলেন, তখনকার বেশির ভাগ আর্কেড গেম খুবই একঘেয়ে। তাই তাঁরা ম্যাগাজিন প্রকাশ ছেড়ে দিয়ে নিজেরাই গেম বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। এভাবেই তাঁরা একই নামে ১৯৮৯ সালে জাপানি ভিডিও গেম ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ‘গেম ফ্রিক’ শুরু করেন।
শুরু থেকেই গেম ফ্রিক কোম্পানি মারিও অ্যান্ড ওয়ারিওর মতো বেশ কিছু ভালো গেম তৈরি করে। তবে তাদের আসল সাফল্য আসে যখন তাঁরা ১৯৯৬ সালে নিন্টেন্ডোর পোর্টেবল কনসোল গেম বয়ের জন্য পোকেমন রেড ও গ্রিন গেম দুটি বাজারে আনেন। এই গেম প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই রাতারাতি ভিডিও গেমের জগতে ইতিহাস তৈরি করেন তাঁরা। কারণ, গেমবয়ে লিংক কেবলের মাধ্যমে দুজনে মিলে একসঙ্গে পোকেমন খেলা যেত, এখনকার ভিডিও গেমের মতো। ২০১৬ সালে অগমেন্টেড রিয়েলিটি মোবাইল গেম ‘পোকেমন গো’ (Pokemon Go) এনে আরেকটি নতুন ইতিহাস তৈরি করে গেমফ্রিক।
পোকেমনের মূল ভাবনাটি এসেছিল সাতোশি তাজিমার ছেলেবেলার প্রিয় শখ থেকে। ছোটবেলায় তিনি পোকামাকড় ধরে সংগ্রহ করতে ভালোবাসতেন। সেই শখকে তিনি এমন এক জগতে রূপ দেন, যেখানে মানুষ কাল্পনিক প্রাণীদের ধরবে এবং এদের প্রশিক্ষণ দেবে। সেখান থেকেই পোকেমনের জন্ম। পোকেমন ফ্র্যাঞ্চাইজিটি শুরু হয়েছিল ১৫১টি কাল্পনিক প্রাণী নিয়ে। যাদের বলা হয় প্রথম প্রজন্ম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বর্তমানে নবম জেনারেশন পর্যন্ত পোকেমন প্রজাতির মোট প্রাণীর সংখ্যা ১ হাজার ২৫টির বেশি।
পোকেমন নামটি এসেছে ‘পকেট মনস্টারস’ (Pocket Monsters) এই দুটি শব্দকে ছোট করে। এর কারণ, জাপানের নতুন প্রজন্ম সবকিছু সংক্ষিপ্ত করে বলতে পছন্দ করে। মূলত খেলোয়াড়েরা যেন ছোট ছোট দানবদের তাদের পকেটে বহন করে বিভিন্ন অভিযানে যেতে পারে এই ভাবনা থেকেই পোকেমন (Pokemon) নাম দেওয়া।
পোকেমন সিরিজের মূল গল্পটি খুব সাধারণ, কিন্তু দারুণ। এখানে মূল চরিত্র বা ট্রেইনাররা তাদের পোকেমনদের সঙ্গে নিয়ে এক অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে পড়ে। তাদের লক্ষ্য থাকে, পথে বন্য পোকেমনদের ধরে নিজেদের সংগ্রহ বাড়ানো, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং অন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। এভাবেই গেমে সবাই সব পোকেমনকে ধরে ও প্রতিটি চ্যালেঞ্জ জিতে ‘পোকেমন মাস্টার’ হওয়ার চেষ্টা করে।
পোকেমন রেড ও গ্রিন গেম দুটির জনপ্রিয়তা জাপানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফ্র্যাঞ্চাইজিটি সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়। খেলোয়াড় ও ভক্তদের আগ্রহ ধরে রাখতে গেম রিলিজের কিছুদিন পরই পোকেমনদের গল্প নিয়ে ‘পোকেমন অ্যাডভেঞ্চারস’ নামে মাঙ্গা প্রকাশ করা হয়। এই মাঙ্গা সিরিজ কিন্তু এখনও চলছে। এখন পর্যন্ত ৬৪টির বেশি ভলিউম প্রকাশিত হয়েছে।
গেম ও মাঙ্গা জনপ্রিয়তা পাওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় পোকেমন অ্যাডভেঞ্চার, ফ্যান্টাসি ও কমেডি ঘরানার টিভি সিরিজ নিয়ে আসে। এখন পর্যন্ত এই অ্যানিমে সিরিজের ২৮টি সিজন এসেছে, যাতে ১ হাজার ৩০০টির বেশি পর্ব আছে। এর পরবর্তী সিজন সামনের বছর নেটফ্লিক্সে আসবে। এই সিরিজ থেকে পিকাচু, অ্যাশের মতো চরিত্ররাও বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। সঙ্গে পোকেমনের বেশ কিছু মুভিও আছে।
পোকেমন ফ্র্যাঞ্চাইজির জনপ্রিয়তাকে নতুন মাত্রা দেয় পোকেমন ট্রেডিং কার্ড গেম। গেমবয়ে কেবল যুক্ত করে দুজন মিলে খেলার যে ধারণা শুরু হয়েছিল, সেই আনন্দকে আরও বাস্তবে নিয়ে আসে এই কার্ড গেম। এটি বাজারে আসার পরই দ্রুত বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সংগ্রহযোগ্য কার্ড গেম হয়ে ওঠে। এই কার্ডগুলোর মাধ্যমে ভক্তরা কেবল নিজেদের প্রিয় পোকেমনকে সংগ্রহই করত না, বরং বন্ধুদের সঙ্গে বাস্তবে কার্ড ট্রেডিং ও ব্যাটল করার সুযোগ পেত। এই আসল ট্রেডিং কার্ড গেমের মূল্য এখন আকাশছোঁয়া। এখন পর্যন্ত পোকেমন কার্ডের সবচেয়ে দামি কার্ড ‘পিকাচু ইলাস্ট্রেটর কার্ড’। আমেরিকার জনপ্রিয় বক্সার লোগান পল প্রায় ৫ দশমিক ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে কিনেছিলেন, যা প্রায় ৬৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
গেম, মাঙ্গা, অ্যানিমে, কার্ড ছাড়াও পোকেমনের আছে বিশেষ খেলনা ও মারচেন্ডাইজ। সারা বিশ্বে পিকাচু ও অন্য পোকেমনদের দেখা যায় পোশাক থেকে শুরু করে খাবার, স্টেশনারি ও খেলনা পর্যন্ত সবকিছুতেই। এমনকি জাপানের বিভিন্ন থিম পার্ক বা ইভেন্টেও এদের দেখা যায়।
আসলে পোকেমন ফ্র্যাঞ্চাইজির এই বিশাল সাফল্য এসেছে মূলত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারার কারণে। তারা সব সময় নতুন প্রজন্মের দর্শকের কথা মাথায় রেখে নতুন গেম, মুভি ও পণ্য বাজারে এনেছে, যা এখনো তরুণদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় ও প্রাসঙ্গিক। পুরোনো দর্শকদের নস্টালজিয়া এবং নতুন প্রজন্মের আগ্রহ—এ দুইয়ের কারণেই পোকেমন একটি আইকন হিসেবে আজও টিকে আছে।