ইতিহাসে মানুষ প্রথম কবে নৌকা বানিয়েছে

উত্তর অস্ট্রেলিয়ায় মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল প্রায় ৬০ হাজার বছর আগে। আর নৌকা ছাড়া সেখানে পৌঁছানোর কোনো উপায়ই ছিল না।মিডজার্নি

আদিম মানুষের না ছিল কোনো গাড়ি, না ছিল বিমান। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল হাঁটা। কিন্তু সামনে যদি বিশাল নদী বা উত্তাল সমুদ্র পড়ে? তখন উপায়? সাঁতার কেটে তো আর মহাসাগর পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। তখনই মানুষের মাথায় এল নৌকার বুদ্ধি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ আসলে কবে প্রথম নৌকা বানাল? ১০ হাজার বছর আগে নাকি আরও আগে? চলো, ইতিহাসের সেই রোমাঞ্চকর জলপথে একটু ভ্রমণ করে আসা যাক।

আমরা যদি মাটির নিচে পাওয়া প্রমাণের কথা বলি, তবে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো নৌকাটির বয়স খুব বেশি নয়। ১৯৫৫ সালে নেদারল্যান্ডসের পেসে গ্রামের কাছে রাস্তা তৈরির কাজ চলছিল। মাটি খুঁড়তে গিয়ে শ্রমিকেরা ১০ ফুট লম্বা একটা অদ্ভুত জিনিস পেলেন। পাইন গাছের গুঁড়ি খোদাই করে বানানো ওই জিনিস ছিল একটা ক্যানু বা ডোঙা নৌকা।

বিজ্ঞানীরা কার্বন ডেটিং করে দেখলেন যে নৌকাটি প্রায় আট হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দের। মানে আজ থেকে প্রায় ১০ হাজার বছর আগের। এটাই এখন পর্যন্ত পাওয়া বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো আস্ত নৌকা। একে বলা হয় পেসে ক্যানু।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১০ হাজার বছর তো কিছুই নয়! মানুষ এর বহু আগে থেকেই জলপথ চষে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, সেসব নৌকার কোনো হদিস আমরা পাইনি। কাঠ পচে যায় বলে হয়তো আদিম নৌকাগুলো হারিয়ে গেছে মাটির বুকে। কিন্তু নৌকা যে ছিল, তার প্রমাণ আছে অন্য জায়গায়।

আরও পড়ুন

সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটির প্রত্নতত্ত্ববিদ মিকায়েল ফভেল একটি ভালো যুক্তি দেখিয়েছেন। আজ থেকে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার বছর আগে মানুষ অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে পৌঁছেছিল। কিন্তু কীভাবে?

সে সময় এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মাঝখানে ছিল বিশাল সমুদ্র। সাঁতার কেটে সেই সমুদ্র পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। তার মানে, অন্তত ৫০ হাজার বছর আগেও মানুষের কাছে এমন কোনো জলযান বা নৌকা ছিল, যা দিয়ে তারা সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল।

সম্প্রতি প্রায় আড়াই হাজার প্রাচীন এবং বর্তমান আদিবাসীর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উত্তর অস্ট্রেলিয়ায় মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল প্রায় ৬০ হাজার বছর আগে। আর নৌকা ছাড়া সেখানে পৌঁছানোর কোনো উপায়ই ছিল না। অর্থাৎ আমাদের হাতে নৌকা নেই ঠিকই, কিন্তু ডিএনএর প্রমাণ বলছে যে নৌকা ছিল! তা নাহলে তারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গেল কীভাবে?

তবে গল্পটা এখানেই শেষ নয়। গ্রিসের ‘ক্রিট’ নামের একটি দ্বীপ মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। প্রায় ৫০ লাখ বছর ধরে এটি একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। অথচ সেখানে ১ লাখ ৩০ হাজার বছর আগের পাথরের হাতিয়ার পাওয়া গেছে! তার মানে, ১ লাখ ৩০ হাজার বছর আগেও কেউ না কেউ সাগর পাড়ি দিয়ে সেখানে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন

আরও পেছনে যাবে? ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপের কথা বলা যায়। ১৯৯৮ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ মাইকেল মরউড সেখানে প্রায় আট লাখ বছরের পুরোনো পাথরের হাতিয়ার খুঁজে পান। পরে ১০ লাখ বছরের পুরোনো হাতিয়ারও পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওই সময় আধুনিক মানুষ পৃথিবীতেই আসেনি। তখন ছিল আমাদের পূর্বপুরুষেরা। তার মানে কি হোমো ইরেক্টাসরা ১০ লাখ বছর আগে নৌকা বানাতে জানত?

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জন চেরি অবশ্য একটু দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, হোমো ইরেক্টাসদের পক্ষে নৌকা বানানোর মতো বুদ্ধি বা প্রযুক্তি থাকাটা একটু সন্দেহজনক। তাহলে তারা দ্বীপে গেল কীভাবে? চেরির ধারণা, এটা ছিল অ্যাক্সিডেন্টাল রাফটিং। হয়তো ঝড়ে বা বন্যায় বিশাল কোনো মাটির খণ্ড বা গাছের জটলা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সাগরে ভেসে গিয়েছিল। আর তার ওপর চড়েই অনিচ্ছাকৃতভাবে আদিম মানুষেরা পৌঁছে গিয়েছিল নতুন দ্বীপে। কয়েক বছর আগে যেমন ইগুয়ানা বা বানররা সাগরে ভেসে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছেছিল, ঠিক তেমন।

কিন্তু প্রশ্ন আসে, মানুষ কেন নৌকা বানাতে গেল? শুধুই কি অজানাকে জানার নেশায়? নাকি শখ করে? হয়তো এর পেছনে বড় কারণ ছিল খাবার।

আরও পড়ুন

নদী বা সাগরের পানিতে প্রচুর মাছ ও খাবার পাওয়া যায়। মাছ ধরতে বা শামুক-ঝিনুক কুড়াতেই হয়তো মানুষ প্রথম ভেলা বা নৌকা ভাসিয়েছিল। তা ছাড়া শিকার করা বিশাল কোনো প্রাণীর মৃতদেহ বা ভারী পাথর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিতে নৌকার চেয়ে ভালো বাহন আর কী হতে পারে?

তবে মানুষের রক্তে মিশে আছে অন্বেষণের নেশা। নতুন কোনো দিগন্ত দেখার লোভেই হয়তো একদিন আদিম মানুষ পরিবার নিয়ে নৌকায় ভেসেছিল, পাড়ি দিয়েছিল অচেনা সমুদ্র। সেই সাহস ও বুদ্ধির জোরেই আজ আমরা পুরো পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছি।

মাটির নিচে পাওয়া সেই ১০ হাজার বছরের পুরোনো পেসে ক্যানু হয়তো আমাদের হাতে থাকা একমাত্র প্রমাণ, কিন্তু মানুষের নৌযাত্রার ইতিহাস তার চেয়ে লাখ লাখ বছরের পুরোনো। কাঠ পচে গেছে, কিন্তু মানুষের সেই দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প আজও ডিএনএ ও পাথরের হাতিয়ারে অমর হয়ে আছে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স ও নেচার জার্নাল

আরও পড়ুন