আইনস্টাইন যেভাবে হিটলার বাহিনীর হাত থেকে বেঁচেছিলেন

আইনস্টাইন যেকোনো যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন। যুদ্ধকে তিনি মন থেকে ঘৃণা করতেন। কিন্তু কে জানত, এই শান্তিকামী মানুষটির জীবনেই ঘনিয়ে আসছে সবচেয়ে ভয়ংকর ও অশান্ত এক সময়!

১৯২০-এর দশক শেষ হয়ে ১৯৩০-এর দশক শুরু। জার্মানির সাধারণ মানুষের মনে তখন চরম হতাশা ও ক্ষোভ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি হেরে যাওয়ার পর বিজয়ী দেশগুলো তাদের ওপর কিছু ভয়ংকর শর্ত চাপিয়ে দেয়। ১৯১৯ সালের ২৮ জুন ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমেই এই শর্তগুলো ঠিক করা হয়।

শর্তগুলো ছিল জার্মানির জন্য চরম অপমানের। যুদ্ধে যত ক্ষতি হয়েছে, তার প্রায় সব টাকা জার্মানিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে হবে! তাদের সামরিক শক্তির ওপরও দেওয়া হয় কঠিন নিষেধাজ্ঞা। আগের বছরগুলোতে অন্য দেশ থেকে তারা যেসব জায়গা দখল করেছিল, সেগুলোও ফেরত দিতে বাধ্য করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্ববাসীর সামনে তাদের স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়, এই মহাযুদ্ধের জন্য একমাত্র তারাই দায়ী!

ভার্সাই চুক্তির এই নিষ্ঠুর শর্তগুলো জার্মানিকে খাদের কিনারে ঠেলে দেয়। তাদের অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়ে। সাধারণ মানুষ এতই গরিব হয়ে গেল যে দুই বেলা ঠিকমতো খাবার জোটানোই কঠিন হয়ে দাঁড়াল। লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারাল। দেশে অপরাধ বেড়ে গেল। পুরো জার্মানির আকাশ যেন এক নিরাশার কালো মেঘে ঢেকে গেল।

আরও পড়ুন

জার্মানদের মনে তখন শুধু রাগ ও ক্ষোভ। তারা তাদের এই দুর্দশার জন্য দায়ীদের ওপর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আর ঠিক এই সুযোগই কাজে লাগান এক ধূর্ত মানুষ—অ্যাডলফ হিটলার!

হিটলারের অতীতটা বেশ অদ্ভুত। একসময় ভিয়েনার রাস্তায় রাস্তায় তিনি নিজের আঁকা ছবি বিক্রি করতেন। সেই ছন্নছাড়া শিল্পীই একসময় রাজনীতিতে নাম লেখান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির আত্মসমর্পণ ও ভার্সাই চুক্তিতে সই করার ঘটনা হিটলারকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। তিনি দাবি করেন, কিছু মানুষ জার্মানির পিঠে ছুরি মেরেছে! তিনি সেই বিশ্বাসঘাতকদের একটা তালিকা তৈরি করতে শুরু করেন। সেই তালিকার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল ইহুদি সম্প্রদায়, বুদ্ধিজীবী ও রোমানিরা।

শুধু তা-ই নয়, নাৎসিরা আইনস্টাইনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করল এবং কাপুথের সেই সাধের বাড়িটাও দখল করে নিল!

হিটলার যোগ দিলেন ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টিতে। পরে এই পার্টি নাৎসি পার্টি নামে সারা বিশ্বে কুখ্যাতি পায়। মজার ব্যাপার হলো, ১৯২০ সালে যখন হিটলার এই পার্টিতে যোগ দেন, তখন এর সদস্য ছিল মাত্র ৬০ জনের মতো! কিন্তু তাঁর জাদুকরি কথার ফাঁদে পড়ে ১৯৪৫ সাল নাগাদ এই দলের সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮৫ লাখে!

হিটলার অসাধারণ বক্তা ছিলেন। তাঁর জাদুকরি বক্তৃতায় জার্মানদের জমে থাকা ক্ষোভ যেন আগুনে ঘি পড়ার মতো জ্বলে উঠল। তিনি খুব দ্রুত নাৎসি পার্টির প্রধান হয়ে উঠলেন এবং একসময় পুরো জার্মানির ক্ষমতা দখল করে নিলেন। নিজের সব রাজনৈতিক শত্রুকে তিনি হয় জেলে ভরলেন, নয়তো মেরেই ফেললেন!

ক্ষমতা হাতে পেয়েই হিটলার নতুন সব আইন করতে শুরু করলেন। তাঁর মতে যেসব মানুষ জার্মানিকে দুর্বল করে দিচ্ছে, তাদের ওপর শুরু হলো চরম অত্যাচার। এই দলে বেশির ভাগই ইহুদি ও বুদ্ধিজীবীরা। হিটলারের শাসনে জার্মানি হয়ে উঠল এসব মানুষের জন্য এক মৃত্যুপুরী।

আইনস্টাইন পড়লেন মহাবিপদে। একে তো তিনি ইহুদি, তার ওপর আবার বিশ্বখ্যাত বুদ্ধিজীবী! নাৎসিদের চোখে এর চেয়ে বড় শত্রু আর কে হতে পারে?

আরও পড়ুন

আইনস্টাইন জার্মানির নাগরিক হলেও এই দেশে তিনি খুব কম সময়ই কাটাতেন। হিটলারের কারণে জার্মানিতে ইহুদিবিদ্বেষ যেভাবে ছড়াচ্ছিল, তা দেখে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ১৯২৯ সালে তিনি জার্মানির ছোট্ট ও শান্ত গ্রাম কাপুথে একটি বাড়ি বানিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের গবেষণা ও দেশ-বিদেশে ভ্রমণের কারণে সেখানে খুব একটা থাকা হতো না। ১৯৩১ সাল নাগাদ তাঁর কাজের ধরন এমন হয়ে দাঁড়াল যে তাঁকে হয় ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায়, নয়তো ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে থাকতে হতো।

১৯৩৩ সালের অক্টোবরে আইনস্টাইন যখন আমেরিকায় পৌঁছালেন, তত দিনে ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডির কাজ পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে।

১৯৩২ সালে আব্রাহাম ফ্লেক্সনার নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে আইনস্টাইনের পরিচয় হয়। ফ্লেক্সনার তাঁকে জানান, আমেরিকার নিউ জার্সির প্রিন্সটনে ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি নামের একটি নতুন শিক্ষাগবেষণা কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। এটি হবে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিশাল এক কেন্দ্র। ফ্লেক্সনার আইনস্টাইনকে এই রোমাঞ্চকর প্রকল্পের অংশ হওয়ার আমন্ত্রণ জানান। আইনস্টাইন ভাবলেন, তিনি তাঁর সময়টা জার্মানি ও প্রিন্সটনের মধ্যে ভাগ করে নেবেন।

কিন্তু ১৯৩৩ সালের শুরুতে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেল। হিটলার নির্দেশ দিলেন, ইহুদিরা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সরকারি বড় পদে থাকতে পারবে না। শুধু তা-ই নয়, নাৎসিরা আইনস্টাইনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করল এবং কাপুথের সেই সাধের বাড়িটাও দখল করে নিল!

আইনস্টাইনের জন্য এটাই ছিল শেষ পেরেক। তিনি প্রুশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেস থেকে পদত্যাগ করলেন। যদিও এটি ছিল সে সময়কার বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক একাডেমিগুলোর একটি। নাৎসিরা তাঁর প্রতি ঘৃণা দেখাতে প্রকাশ্যে তাঁর লেখা বইগুলো আগুনে পোড়াতে শুরু করল! এমনকি আইনস্টাইনের মাথার দাম ঘোষণা করেছিল হিটলার! যে তাঁকে খুঁজে বের করে মারতে পারবে, তাকে পাঁচ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল!

আরও পড়ুন

প্রাণের ভয়ে আইনস্টাইন বেলজিয়ামে পালিয়ে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো তাঁর জার্মানির নাগরিকত্ব চিরতরে ছেড়ে দিলেন। এরপর তিনি গেলেন ইংল্যান্ডে। সেখানে বন্ধুরা তাঁকে দিনরাত পাহারা দিয়ে রাখত। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে বন্দুক হাতে পাহারাদারেরা সব সময় তাঁর চারপাশ ঘিরে রাখত!

কিন্তু এই চরম বিপদের মুহূর্তেও আইনস্টাইন শুধু নিজের কথা ভাবেননি। হিটলারের জার্মানিতে আটকে পড়া অন্য বিজ্ঞানীদের কথা ভেবে তাঁর ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছিল। জার্মানির নাগরিকত্ব ছাড়ার পরপরই তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে দেখা করলেন। তিনি চার্চিলকে অনুরোধ করলেন, যত দ্রুত সম্ভব আটকে পড়া ইহুদি বিজ্ঞানীদের ইংল্যান্ডে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে। চার্চিল তাঁর কথা রাখলেন এবং একজন বিশ্বস্ত বন্ধুকে জার্মানিতে পাঠালেন। এরপর আইনস্টাইন অন্য দেশের নেতাদের কাছেও একই সাহায্যের আবেদন জানিয়ে চিঠি লিখলেন।

তবে ইংল্যান্ডেও আইনস্টাইন বেশি দিন টিকতে পারলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, এখানে থাকাও তাঁর জন্য নিরাপদ নয়। চারদিকে তখন গুজব ছড়াচ্ছিল, হিটলার শুধু জার্মানি নয়, পুরো ইউরোপ থেকেই ইহুদিদের তাড়ানোর ছক কষছেন! হয়তো একদিন তিনি পুরো ইউরোপটাই দখল করে নেবেন।

এই ভয়ংকর আশঙ্কার কথা ভেবেই আইনস্টাইন শেষ পর্যন্ত আব্রাহাম ফ্লেক্সনারের সেই প্রস্তাব মেনে নিলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন প্রিন্সটনেই চলে যাবেন।

আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রে আসার পরের কয়েক বছরে পৃথিবীর নামীদামি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনস্টাইনকে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়।

১৯৩৩ সালের অক্টোবরে আইনস্টাইন যখন আমেরিকায় পৌঁছালেন, তত দিনে ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডির কাজ পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। সেখানে গিয়ে তিনি হয়তো হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। কারণ, নাৎসিদের হাত থেকে পালিয়ে আসা আরও অনেক ইহুদি বিজ্ঞানীকে ইনস্টিটিউটটি তত দিনে চাকরি দিয়ে আশ্রয় দিয়েছিল।

অনেকেই হয়তো জানো না, এই বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন আসলে একজন রিফিউজি ছিলেন! এমনকি আমেরিকায় স্থায়ী হওয়ার পরও তিনি অন্য রিফিউজিদের কথা কখনো ভোলেননি। তিনি ও তাঁর স্ত্রী এলসা মিলে জার্মানি থেকে পালাতে চাওয়া অসংখ্য ইহুদির ভিসার আবেদনপত্র পূরণ করে দিতেন। নিজের এই বিশাল পরিচিতি ও স্টারডমকে তিনি সব সময় বিপন্ন মানুষের সাহায্যে কাজে লাগাতেন।

যুক্তরাষ্ট্রে আসার পরের কয়েক বছরে পৃথিবীর নামীদামি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনস্টাইনকে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সবিনয়ে সব ফিরিয়ে দেন। তিনি ১৯৩৫ সালে প্রিন্সটনেই চিরস্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ১৯৩৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন। শেষ পর্যন্ত তা পেয়েও যান। এভাবেই এক ঠিকানাহীন মানুষ খুঁজে পান তাঁর নতুন ঠিকানা।

সূত্র: ডি কে প্রকাশনীর লাইফ স্টোরিস সিরিজের আলবার্ট আইনস্টাইন বই

আরও পড়ুন