নুডলসের চার হাজার বছরের ইতিহাস

নুডলস এখন প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে

নাশতার চটপটে সমাধান নুডলস। তোমরা অনেকেই রাতে পড়ার ফাঁকে একটু নুডলস বানিয়ে খাও। খেতে বসে কখনো কি মনে হয়েছে, এ খাবারটা প্রথম কে বানিয়েছিল? হয়তো মনে হয়েছে, এটা এসেছে চায়না থেকে। এর বেশি কিছু নয়। চায়না থেকে এলেও নুডলস নিয়ে আছে চমৎকার সব গল্প। চায়নার কোনো রাজকীয় রাঁধুনি এটি আবিষ্কার করেনি। কোনো বিখ্যাত শেফের হাত ধরেও আসেনি। ছোটদের জন্য নুডলস নিয়ে লেখা এক বইয়ে বলা হয়েছে, তিন দুষ্টু শিশু বানিয়েছিল নুডলস। সেটা অবশ্য চায়নিজ উপন্যাসের কথা। মজার ব্যাপার হলো, নুডলসের ইতিহাসে রাজকীয় রাঁধুনি, শেফ আর দুষ্টু শিশুদের কথা এসেছে বারবার। কোথাও আছে কিংবদন্তি, কোথাও গল্প, আবার কোথাও আছে প্রত্নতত্ত্বের প্রমাণ।

শিশুতোষ বইয়ের গল্পটাই আগে বলি। বইটির নাম দ্য স্টোরি অব নুডলস। সেখানে তিন খুদে ভাই রান্নাঘরে দুষ্টুমি করতে গিয়ে এমন এক কাণ্ড ঘটায়, যেখান থেকে নাকি জন্ম নেয় নুডলস! অবশ্য এটা নিছক কল্পকাহিনি। কিন্তু গল্পটা এত মজার, পড়তে পড়তে মনে হয়, এমনটা তো হতেও পারে!

বাস্তব ইতিহাস অবশ্য অন্য কথা বলে।

আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে চীনে নুডলসের প্রচলন হয়। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, হান রাজবংশের সময় নুডলস সাধারণ মানুষের খাবারে পরিণত হয়। তখন গমের আটা মেখে লম্বা লম্বা সুতার মতো বানিয়ে সেদ্ধ করা হতো। কখনো স্যুপে, কখনো ঝোলে, আবার কখনো শুধু সবজি বা মাংসের সঙ্গে খাওয়া হতো।

আরও পড়ুন

২০০৫ সালে চীনের লাজিয়া নামের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে গবেষকেরা অবাক করা একটি জিনিস খুঁজে পান। মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা একটি বাটিতে পাওয়া যায় প্রায় চার হাজার বছরের পুরোনো নুডলসের চিহ্ন। দেখতে অনেকটা আজকের লামিয়ান নুডলসের মতো। এটি হলো চীনের ঐতিহ্যবাহী হাতে টানা বা তৈরি করা সুস্বাদু নুডলস। যদিও এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো কিছু বিতর্ক আছে; তবু এটিই এখন পর্যন্ত নুডলসের সবচেয়ে আলোচিত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ।

নুডলস নিয়ে লম্বা ইতিহাস আছে। সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রচুর গল্প। সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি মার্কো পোলোর। অনেকেই মনে করেন, চীন ভ্রমণ শেষে তিনি ইতালিতে পাস্তা নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদেরা এই গল্পে বিশ্বাস করেন না। তাঁদের মতে, মার্কো পোলোর জন্মেরও আগে ইতালিতে পাস্তার মতো খাবার ছিল। আরব ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সেই খাবার ইউরোপে পৌঁছেছিল বলেই তাঁদের ধারণা।

আসলে নুডলসের ইতিহাস এক দেশের বা শুধু চীনের নয়। এটি এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে ঘুরে বদলেছে। বদলেছে এর স্বাদ, রং আর চেহারা।

চীনে গেলে দেখবে, নুডলস মানেই এক রকম খাবার নয়। বলা হয়, চীনে এক হাজারের বেশি ধরনের নুডলস আছে। কোথাও চিকন, কোথাও মোটা। কোথাও গোল, কোথাও চ্যাপটা। কোনোটি হাতে টেনে বানানো, কোনোটি ছুরি দিয়ে কাটা হয়। কোথাও আবার চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয় রাইস নুডলস, কোথাও মুগডালের স্টার্চ দিয়ে তৈরি হয় স্বচ্ছ গ্লাস নুডলস।

জাপানে গিয়ে সেই নুডলসই হয়ে যায় উডন, সোবা কিংবা রামেন। কোরিয়ায় তৈরি হয় নেংমিয়ন। ইতালিতে সেটিই পাস্তা। আবার মধ্যপ্রাচ্যে নুডলস ঢুকে পড়ে ঘন স্যুপের মধ্যে। একই খাবার, কিন্তু কত রূপ!

আরও পড়ুন
নুডলস আবিস্কারের কাল্পনিক গল্প আছে দ্য স্টোরি অব নুডলস–এ

মজার ব্যাপার হলো, নুডলস শুধু খাবার নয়। অনেক জায়গায় এটি সংস্কৃতির অংশ। চীনে জন্মদিনে লম্বা নুডলস খাওয়ার একটি প্রচলন আছে। বিশ্বাস করা হয়, লম্বা নুডলস দীর্ঘ জীবনের প্রতীক। তাই খাওয়ার সময় সেটি যতটা সম্ভব, না ভেঙে খাওয়ার চেষ্টা করেন অনেকে।

নুডলস তৈরির পদ্ধতিও বেশ মজার। আটা বা অন্য শস্যের মণ্ড তৈরি করা হয়। তারপর সেটি বেলে কাটা হয়, কখনো টেনে লম্বা করা হয়, কখনো ছাঁচে ফেলে তৈরি করা হয় নানা আকৃতি। এরপর ফুটন্ত পানিতে সেদ্ধ করা। ব্যস, নুডলস প্রস্তুত। চাইলে পছন্দমতো নানা উপায়ে খেতে পারো নুডলস। কেউ স্যুপে খায়, কেউ ভেজে খায়, কেউ আবার মাংস, ডিম, সবজি কিংবা নানা রকম সস মিশিয়ে খেতে ভালোবাসে। আমাদের দেশে সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি ডিম বা মুরগি দিয়ে ভেজে খাওয়া। রাতে পড়ার সময় তুমি কোনটা করো? ইনস্ট্যান্ট নুডলসের প্রতি কি তোমার ঝোঁক বেশি?

আজ আমরা যে ইনস্ট্যান্ট নুডলস খাই, এর বয়স কিন্তু খুব বেশি নয়। শিল্পবিপ্লবের পর যন্ত্রে নুডলস তৈরি শুরু হয়। এরপর আসে ইনস্ট্যান্ট নুডলস। কয়েক মিনিটেই রান্না হয়ে যায় বলে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ব্যস্ত জীবনে এই খাবার এক নতুন যুগের সূচনা করে। এখন পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কোনো না কোনো ধরনের ইনস্ট্যান্ট নুডলস পাওয়া যায়।

নুডলসের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম ইনস্ট্যান্ট নুডলস। এটি তৈরি করেন জাপানি উদ্যোক্তা মোমোফুকু আন্দো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে খাদ্যসংকট চলছিল। আন্দো এমন একটি খাবার বানাতে চেয়েছিলেন, যা হবে সুস্বাদু, দ্রুত রান্না করা যায় এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৯৫৮ সালে তিনি বাজারে আনেন বিশ্বের প্রথম ইনস্ট্যান্ট নুডলস, যার নাম ছিল চিকেন রামেন। পরে ১৯৭১ সালে তিনি কাপে পরিবেশনযোগ্য কাপ নুডলসও তৈরি করেন। তাঁর এই উদ্ভাবনের ফলে নুডলস শুধু ঘরেই নয়, ভ্রমণ, ছাত্রদের মেস আর ব্যস্ত মানুষের প্রতিদিনের খাবারের তালিকায়ও স্থায়ী জায়গা করে নেয়।

আরও পড়ুন
মাংস, ডিম, সবজি কিংবা নানা রকম সস মিশিয়ে অনেকে নুডলস খেতে ভালোবাসে

তবে এত জনপ্রিয় হওয়ার পরও চীনে হাতে তৈরি নুডলসের কদর কমেনি। এখনো অনেক শহরে এমন দোকান আছে, যেখানে রাঁধুনি চোখের সামনে আটা টেনে টেনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লম্বা নুডলস বানিয়ে ফেলেন। সেই দৃশ্য দেখাও একধরনের আনন্দ।

ভাবতে অবাক লাগে, চার হাজার বছর আগে শুরু হওয়া একটি খাবার আজ পৃথিবীর প্রায় সব দেশে পৌঁছে গেছে। স্কুল শেষে বন্ধুর সঙ্গে, বাসার ডাইনিং টেবিলে কিংবা পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে, সবখানেই নুডলস নিজের জায়গা করে নিয়েছে।

পড়ার ফাঁকে নুডলস বানাতে গেলে এর গল্পটা মনে রাখতে পারো। হতে পারে, এই গল্প তোমার পাতের নুডলসের স্বাদ আরও বাড়িয়ে দেবে।

আরও পড়ুন