বনে ফেরার অপেক্ষায় গরিলা বিলি

বিলির বয়স তখন মাত্র কয়েক মাস। মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে এই ছোট্ট গরিলাকে তুলে দেওয়া হয়েছিল বন্য প্রাণী পাচারকারীদের হাতে। ২০২৩ সালের আগস্টে নাইজেরিয়ার লাগোসে এক অভিযানে উদ্ধার করা হয় পশ্চিমাঞ্চলীয় নিম্নভূমির এ গরিলাশাবককে। এরপর প্রায় তিন বছর কেটেছে উদ্ধারকেন্দ্রে মানুষের তত্ত্বাবধানে। এবার বিলির জীবনে এসেছে নতুন অধ্যায়। নাইজেরিয়া থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে। সেখানে বনের পরিবেশে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছে সে। সবকিছু ঠিকঠাক চললে একদিন সত্যিই বনে ফিরতে পারবে বিলি।

কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের তচিমপুঙ্গা প্রকৃতি সংরক্ষণাগারে পৌঁছে বিলি যেন নতুন পৃথিবী খুঁজে পেল। খাঁচার মতো ঘেরা জায়গা থেকে বেরিয়ে ছুটল খোলা জায়গায়। একজন পরিচর্যাকারী কোলে করে বিলিকে বনের ভেতর নিয়ে গেলেন। মাটিতে নামিয়ে দিতেই ছুটতে শুরু করল বিলি। কখনো গাছে উঠছে, কখনো ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর নিজের স্বাভাবিক আবাসস্থলের কাছাকাছি এমন পরিবেশ পেয়ে যেন হারানো সময় পুষিয়ে নিতে চাইছিল সে।

তবে এটিই এখনো বনে ফেরা নয়। বিলিকে আবার বন্য পরিবেশে বসবাসের উপযোগী করে তোলার জন্য আরও পথ পাড়ি দিতে হবে।

আরও পড়ুন

পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার

বিলির জন্ম কোথায়, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ক্যামেরুন, গ্যাবন কিংবা কঙ্গো প্রজাতন্ত্র—এই তিন দেশের যেকোনো একটিতে জন্ম হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বিলিকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় এর পরিবারের অনেক সদস্য, এমনকি হয়তো সবাইকেই হত্যা করা হয়েছিল। বিদেশি পোষা প্রাণীর অবৈধ বাজারে বিক্রির জন্যই ওকে ধরে আনা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

২০২৩ সালের আগস্টে নাইজেরিয়ার লাগোসে একটি গোপন অভিযানে বিলিকে উদ্ধার করে দেশটির শুল্ক বিভাগের বিশেষ বন্য প্রাণী দপ্তর। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ফোকাসড কনজারভেশনের সঙ্গে যৌথভাবে অভিযানটি পরিচালিত হয়। ক্রেতা সেজে পাচারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন তদন্তকারীরা। ওই অভিযানের পর দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গরিলা পাচারের ষড়যন্ত্র, অবৈধভাবে গরিলা নিজেদের কাছে রাখা এবং বিক্রির চেষ্টা, এসব অভিযোগে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

উদ্ধারের পর বিলিকে নিয়ে যাওয়া হয় নাইজেরিয়ার ক্যালাবার শহরের ড্রিল র‍্যাঞ্চে। এটি বন্য প্রাণী পুনর্বাসনকেন্দ্র, পরিচালনা করে প্রাইমেট সংরক্ষণে কাজ করা সংস্থা প্যান্ড্রিলাস। সেখানে পৌঁছানোর সময় বিলি অসুস্থ ছিল। শরীরে ছত্রাকের সংক্রমণও ছিল।

কেন্দ্রটির সাবেক পরিচর্যাকারী ও প্রাইমেট বিশেষজ্ঞ লিন্ডসে মেসের মতে, বিলির বেঁচে যাওয়াটা অনেকটা অলৌকিক ঘটনা। কারণ, পাচার হওয়া গরিলাশাবকদের ৮০ শতাংশের বেশি বেঁচে থাকতে পারে না।

আরও পড়ুন

মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত শাবকেরা

বন্য প্রাণী পাচারের শিকার ছোট গরিলাদের জীবন শুরু হয় ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এরা মায়ের দুধ পায় না। অথচ দুধে থাকা অ্যান্টিবডি এদের বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক খাবার থেকেও এরা বঞ্চিত হয়। বনের কিছু উদ্ভিদ খাওয়ার মাধ্যমে এরা পরজীবী সংক্রমণ মোকাবিলা করতে পারে। পরিচিত পরিবেশ ও মায়ের সঙ্গ হারিয়ে এদের শরীর ও মনে তীব্র চাপ তৈরি হয়।

অনেক শাবক খাওয়া বন্ধ করে দেয়। কেউ কেউ মানসিক আঘাতে একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। উদ্ধার করার পরও এদের বাঁচিয়ে রাখা কঠিন। মেস জানিয়েছেন, কখনো কখনো শাবককে দেখে মনে হয় সুস্থ হয়ে উঠছে, কিন্তু হঠাৎ করেই অবস্থার অবনতি ঘটে।

বিলিও গভীর মানসিক আঘাত পেয়েছিল। কোনো বাক্স বা খাঁচা দেখলেই চিৎকার করে উঠত। উদ্ধারের পর প্রথম তিন মাস রাতে পিটার জেনকিনসের শরীর আঁকড়ে ধরে ঘুমাত। জেনকিনস প্যান্ড্রিলাসের সহপ্রতিষ্ঠাতা। তাঁর মতে, বিলি তখন খুবই ছোট ছিল। নিরাপত্তা ও ভালোবাসা পাওয়াটা ওর জন্য ভীষণ জরুরি ছিল।

পরে বিলিকে রাখা হয় ব্রেন্ডন ও মিলি নামের দুটি শিম্পাঞ্জির সঙ্গে। এগুলোকেও পাচারকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। শিম্পাঞ্জি দুটি ছিল বেশ চঞ্চল। এদের সঙ্গে থাকতে থাকতে বিলিও ধীরে ধীরে নিজের ভয় কাটিয়ে উঠতে শুরু করে।

আরও পড়ুন

২০ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ ব্যবসা

বিলির গল্প শুধু একটি গরিলাশাবকের বেঁচে যাওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন্য প্রাণী পাচারের বিশাল আন্তর্জাতিক ব্যবসা। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বন্য প্রাণীসংক্রান্ত অপরাধের বার্ষিক আর্থিক মূল্য প্রায় ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি ডলার।

একসময় বন্য প্রাণীর মাংসের জন্য শিকার করতে গিয়ে গরিলার শাবকেরা এতিম হতো। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রে পোষা প্রাণী হিসেবে বিক্রির উদ্দেশ্যে সরাসরি শাবকদেরই লক্ষ্যবস্তু করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশি ও বিরল প্রাণী পোষার ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়াও এ ধরনের ব্যবসার চাহিদা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

পাচারকারীরা অনেক সময় ইন্টারনেটে প্রকাশ্যে প্রাণী কেনাবেচার বিজ্ঞাপন দেয়। তাদের কাছে এটি কম ঝুঁকিতে বেশি লাভের ব্যবসা। আফ্রিকা থেকে পাচার হওয়া প্রাণী ও প্রাণীর দেহাংশ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। নাইজেরিয়া এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। দেশটির মাধ্যমে সাধারণত মৃত প্রাণীর দেহের অংশ জাহাজে এবং জীবিত প্রাণী বিমানে পরিবহন করা হয়।

২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ইন্টারপোল ও বিশ্ব শুল্ক সংস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক অভিযানে প্রায় ৩০ হাজার জীবিত প্রাণীকে জব্দ করা হয়েছিল। এদের মধ্যে দুই শতাধিক ছিল বিভিন্ন প্রজাতির প্রাইমেট বা বানরজাতীয় প্রাণী।

তবে পাচারকারীদের কাছ থেকে প্রাণী উদ্ধার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। উদ্ধার করা প্রাণীদের খাবার, চিকিৎসা, আশ্রয় ও পরিচর্যার জন্য প্রচুর অর্থ প্রয়োজন। ড্রিল র‍্যাঞ্চের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জ্যাক শোয়েনেকারের মতে, একটি গরিলাশাবককে তিন বছর ধরে লালন-পালন করতে শুধু দুধের পেছনেই হাজার হাজার ডলার খরচ হতে পারে।

সমস্যা হলো, পাচারবিরোধী অভিযানের জন্য পাওয়া আন্তর্জাতিক অনুদানের অর্থের মধ্যে উদ্ধার হওয়া প্রাণীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার খরচ অনেক সময় অন্তর্ভুক্ত থাকে না। ফলে উদ্ধারকেন্দ্রগুলোকেই এ ব্যয় বহন করতে হয়। নাইজেরিয়ার উদ্ধারকেন্দ্রগুলোয় এখন প্রাণী রাখার জায়গাও প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

বনে ফেরার দীর্ঘ যাত্রা

নাইজেরিয়ার উদ্ধারকেন্দ্রে বিলির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। তাই ওর জন্য নতুন আবাস খুঁজতে শুরু করেন পরিচর্যাকারীরা। বিলিকে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে স্থানান্তরের উদ্যোগে সাহায্য করে ইউনাইটেড ফর ওয়াইল্ডলাইফ। প্যান্ড্রিলাস ও ফোকাসড কনজারভেশনের পাশাপাশি নাইজেরিয়া ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোও এ কাজে যুক্ত ছিল।

যাত্রার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিলিকে আবার খাঁচা বা পরিবহনযানের ভেতরে থাকার অভ্যাস করানো হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর নাইজেরিয়ার ক্যালাবার থেকে লাগোসের উদ্দেশে রওনা দেয় বিলি। সড়কপথে প্রায় ২০ ঘণ্টার এ যাত্রায় গাড়ি নষ্ট হওয়া ও নানা বিলম্বের মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় দলটিকে। দুই দিন পর বিমানযোগে বিলিকে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে সড়কপথে পৌঁছে দেওয়া হয় তচিমপুঙ্গা প্রকৃতি সংরক্ষণাগারে। এটি জেন গুডঅল ইনস্টিটিউট পরিচালিত একটি প্রাইমেট পুনর্বাসনকেন্দ্র।

কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান পশুচিকিৎসক রেবেকা আতেনসিয়া বিলির সঙ্গে পুরো যাত্রায় ছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পরিবেশে বিলি বেশ ভালোভাবে মানিয়ে নিচ্ছে। কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে, এটি বিলির মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয়।

তচিমপুঙ্গা সংরক্ষণাগারে বন ও তৃণভূমির পরিবেশের পাশাপাশি ঘরের ভেতর ও বাইরে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে প্রথমে বিলিকে ৪০ দিনের জন্য অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা রাখা হবে। এ সময়ে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে, যাতে কোনো রোগ থাকলে তা শনাক্ত করা যায়। এরপর মোজাম্বিক নামের আরেকটি অল্পবয়সী মেয়ে গরিলার সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। ওদের একসঙ্গে থাকার মাধ্যমে বিলি সামাজিক আচরণ ও বনে টিকে থাকার প্রয়োজনীয় দক্ষতা শিখতে পারবে।

সবকিছু ঠিকঠাক চললে পরবর্তী সময়ে বিলি ও মোজাম্বিককে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের লেসিও-লৌনা সংরক্ষিত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হতে পারে। প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার হেক্টর আয়তনের এ সংরক্ষিত এলাকা পরিচালনা করে অ্যাসপিনল ফাউন্ডেশন ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের বন অর্থনীতি মন্ত্রণালয়।

সেখানেও বিলির জন্য অপেক্ষা করছে পুনর্বাসনের নতুন ধাপ। ধীরে ধীরে বিলি যদি বনের পরিবেশে বসবাসের উপযোগী হয়ে ওঠে, তাহলে একসময় ওকে আবার বন্য পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

আরও পড়ুন