বিড়াল কেন ‘লোফড’ হয়ে বসে থাকে?
কখনো কি দেখেছ, একটা বিড়াল চার পা শরীরের নিচে গুটিয়ে বসে আছে! দেখতে যেন একটুকরো গোল রুটি! বিড়ালপ্রেমীরা এই ভঙ্গিকে বলে ‘লোফ’ বা ‘লোফড হয়ে বসা’। কারণ, দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন টেবিলে রাখা একখানা ছোট রুটি বা পাউরুটি!
ইন্টারনেটে ‘ক্যাট লোফ’ নামের এই ভঙ্গির অসংখ্য ছবি আর ভিডিও ছড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিড়াল কেন এভাবে বসে? এটা কি শুধু আরামের জন্য, নাকি এর পেছনে আরও কিছু কারণ আছে? চলো, এই মজার ভঙ্গির ভেতরের গল্পটা একটু জানি।
আরামের ভঙ্গি
সবচেয়ে সহজ উত্তর হলো, এটা খুব আরামদায়ক। যখন কোনো বিড়াল চার পা শরীরের নিচে গুটিয়ে বসে, তখন তার শরীরের ওজন সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পেশিতে কম চাপ পড়ে এবং সে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে বিশ্রাম নিতে পারে।
অনেক সময় দেখা যায়, বিড়াল এই ভঙ্গিতে বসে চোখ আধা বন্ধ করে থাকে। সে পুরো ঘুমাচ্ছে না, আবার পুরো জেগেও নেই। একে বলা যায় বিশ্রামের মাঝামাঝি অবস্থা। অর্থাৎ সে আরাম করছে, কিন্তু আশপাশে কী হচ্ছে, সেটাও একটু খেয়াল রাখছে।
নিরাপদ মনে করলে
বিড়াল খুব সতর্ক প্রাণী। তারা সাধারণত এমন জায়গায়ই আরাম করে বসে, যেখানে সে নিজেকে নিরাপদ মনে করে।
যখন একটি বিড়াল লোফ হয়ে বসে থাকে, তখন সেটি প্রায়ই বোঝায় যে সে পরিবেশের ওপর ভরসা করছে। আশপাশে কোনো বিপদের গন্ধ নেই বলেই সে শান্তভাবে বসে থাকতে পারছে। যদি বিড়াল ভয় পায় বা বিপদ অনুভব করে, তখন সে সাধারণত দ্রুত দৌড়ানোর মতো ভঙ্গিতে থাকে। কিন্তু লোফ ভঙ্গিতে বসা মানে, সব ঠিক আছে।
শরীরের তাপ ধরে রাখা
এই ভঙ্গির আরেকটি বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। তা হলো, তাপ সংরক্ষণ।
বিড়াল যখন পা গুটিয়ে শরীরের নিচে রাখে, তখন শরীরের উন্মুক্ত অংশ কমে যায়। ফলে শরীরের তাপ কম বের হয়। শীতল পরিবেশে এটি খুব কাজে লাগে।
অনেক সময় ঠান্ডা মেঝেতে বা শীতের দিনে দেখবে, বিড়াল লোফ হয়ে বসে আছে। এটি আসলে শরীর গরম রাখার সহজ উপায়।
দ্রুত ওঠার প্রস্তুতি
লোফ ভঙ্গি আরামদায়ক হলেও এটি গভীর ঘুমের ভঙ্গি নয়। এ অবস্থা থেকে বিড়াল খুব দ্রুত উঠে দাঁড়াতে পারে।
ভাবো, তুমি যদি হঠাৎ দরজা খুলে ঢোকো বা কোনো শব্দ হয়, লোফ হয়ে বসে থাকা বিড়ালটি মুহূর্তেই লাফ দিয়ে উঠে পড়তে পারে।
অর্থাৎ এই ভঙ্গি বিশ্রাম ও সতর্কতার মাঝামাঝি এক অবস্থা।
পায়ের সুরক্ষা
বন্য পরিবেশে বিড়ালের পূর্বপুরুষদের জন্য পা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিকার ধরা, দৌড়ানো, গাছে ওঠাসহ সবকিছুতেই পা দরকার।
পা শরীরের নিচে গুটিয়ে রাখলে সেগুলো ঠান্ডা, আঘাত বা ময়লা থেকে কিছুটা সুরক্ষিত থাকে। যদিও গৃহপালিত বিড়ালদের এত ঝুঁকি নেই, তবু তাদের স্বভাবের মধ্যে এই আচরণ রয়ে গেছে।
লেজ কেন শরীরের চারপাশে পেঁচায়?
লোফ হয়ে বসে থাকা বিড়ালকে দেখলে আরেকটা জিনিস খেয়াল করা যায়; অনেক সময় সে লেজটাকে শরীরের চারপাশে পেঁচিয়ে রাখে।
এরও কয়েকটি কারণ আছে।
প্রথমত, এটি তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। লেজ যেন ছোট একটা কম্বলের মতো কাজ করে।
দ্বিতীয়ত, এতে বসা আরও আরামদায়ক হয়। লেজ শরীরের পাশে থাকলে ভারসাম্যও বজায় থাকে।
আর তৃতীয়ত, এটি অনেক সময় শান্ত মেজাজের সংকেত। লেজ যদি শরীরের চারপাশে শান্তভাবে থাকে, তাহলে বোঝা যায় যে বিড়াল বেশ স্বস্তিতে আছে।
সব লোফ এক রকম নয়!
মজার ব্যাপার হলো, বিড়ালের লোফ ভঙ্গিরও আবার কয়েকটি ধরন আছে।
সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘পারফেক্ট লোফ’। এখানে বিড়ালের চার পা পুরোপুরি শরীরের নিচে লুকানো থাকে। বাইরে থেকে কোনো পা দেখা যায় না। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন একটা গোল রুটি বসে আছে।
আরেকটি হলো ‘হাফ লোফ’। এখানে একটি বা দুটি পা একটু বাইরে থেকে দেখা যায়। সাধারণত তখন বিড়াল একটু বেশি সতর্ক থাকে।
আবার কখনো দেখা যায়, বিড়াল লোফ হয়ে বসে আছে কিন্তু শরীর পাশ দিয়ে একটু ছড়িয়ে পড়েছে। একে অনেকেই মজা করে বলে ‘মেল্টেড লোফ’, অর্থাৎ গলে যাওয়া রুটি!
কখন চিন্তার বিষয়?
বেশির ভাগ সময় লোফ ভঙ্গি একেবারেই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি কোনো বিড়াল দীর্ঘ সময় একইভাবে বসে থাকে, খুব চুপচাপ হয়ে যায়, খাওয়াদাওয়া কমে যায়, তাহলে সেটা কখনো কখনো অসুস্থতার লক্ষণও হতে পারে।
তবে সাধারণভাবে যদি একটি বিড়াল শান্তভাবে লোফ হয়ে বসে থাকে, চোখ আধা বন্ধ করে চারপাশ দেখছে, তাহলে ধরে নিতে পারো যে সে খুব আরামে আছে।
বিড়ালের লোফ হয়ে বসা দেখতে যেমন মজার, তেমনি এর পেছনে আছে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ। যেমন আরাম, নিরাপত্তা, তাপ সংরক্ষণ এবং দ্রুত নড়াচড়ার প্রস্তুতি।
তাই পরেরবার যখন কোনো বিড়ালকে রুটির মতো গুটিয়ে বসে থাকতে দেখবে, তখন হয়তো তুমি একটু হেসে ভাববে, ছোট্ট প্রাণীটা আসলে আরামে বসে পৃথিবীটা দেখছে।
রিডার্স ডাইজেস্ট