গবেষণাপত্রের সহলেখক হিসেবে এই পদার্থবিজ্ঞানী বিড়ালকে বেছে নিয়েছিলেন

প্রতীকী ছবি

২০১৪ সালের ১ এপ্রিল আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি তাদের নিয়মকানুনে একটি বড় পরিবর্তনের কথা জানায়। তারা ঘোষণা দেয়, এখন থেকে বিড়ালদের লেখা সব বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র সাধারণ মানুষের জন্য বিনা মূল্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ যে কেউ চাইলেই কোনো টাকা খরচ না করে বিড়ালদের লেখা সেই গবেষণাপত্রগুলো পড়তে পারবেন।

ঘোষণাটি আসলে একটি রসিকতা ছিল। কারণ, সেদিন ছিল ১ এপ্রিল বা ‘এপ্রিল ফুল’। তবে যে বিড়ালটিকে নিয়ে এই রসিকতা করা হয়েছিল, তার ঘটনাটি কিন্তু মোটেও মিথ্যা ছিল না। সেই বিড়ালটির নাম ছিল চেস্টার। তবে বিজ্ঞানীদের কাছে সে ‘এফডিসি উইলার্ড’ নামেই পরিচিত। বিখ্যাত বিজ্ঞানী শ্রোডিঙ্গারের বিড়ালের পর চেস্টারকেই পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে পরিচিত বিড়াল হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৯৭৫ সালে ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’ নামের একটি বিজ্ঞান জার্নালে হিলিয়াম-৩ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। হিলিয়াম-৩ হলো হিলিয়ামের বিরল আইসোটোপ। এই গবেষণাপত্র ছিল খুব নিম্ন তাপমাত্রায় হিলিয়ামের আচরণ নিয়ে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই লেখার লেখক হিসেবে মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জ্যাক হেদারিংটনের নামের পাশে চেস্টার বা উইলার্ড নামে আরও একজনের নাম ছিল।

আরও পড়ুন
গবেষণাপত্রটির খসড়া অর্থাৎ প্রাথমিক লেখাটি যখন অধ্যাপক হেদারিংটনের এক সহকর্মী দেখেন, তখন তিনি একটি ভুল ধরিয়ে দেন।

চেস্টার আসলে অধ্যাপক হেদারিংটনেরই পোষা সাত বছর বয়সী একটি সিয়ামিজ বিড়াল। কিন্তু অধ্যাপক কেন তাঁর গবেষণাপত্রে বিড়ালের নাম দিয়েছিলেন? এর পেছনে ছিল একটি সাধারণ ব্যাকরণগত ভুল। তিনি পুরো লেখাটি এমনভাবে লিখেছিলেন যেখানে সব জায়গায় আমির বদলে আমরা শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী, লেখক একজন হলে আমরা লেখা যায় না। পুরো লেখাটি আবার টাইপ করার কষ্ট এড়াতে তিনি চালাকি করে লেখক হিসেবে তাঁর বিড়ালের নাম যোগ করে দেন। এভাবেই বিড়ালটি গবেষণাপত্রের সহলেখক হয়ে যায়।

গবেষণাপত্রটির খসড়া অর্থাৎ প্রাথমিক লেখাটি যখন অধ্যাপক হেদারিংটনের এক সহকর্মী দেখেন, তখন তিনি একটি ভুল ধরিয়ে দেন। হেদারিংটন গবেষণাপত্রটি একাই লিখেছিলেন, কিন্তু পুরো লেখায় তিনি আমির বদলে আমরা শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। সেই সহকর্মী জানান, বিজ্ঞান জার্নালের নিয়ম অনুযায়ী লেখক একজন হলে আমরা লেখা যায় না। এই ভুলটি ঠিক না করলে বা পুরো লেখাটি নতুন করে টাইপ না করলে গবেষণাপত্রটি বাতিল হয়ে যেত।

কিন্তু হেদারিংটন তাঁর এই গবেষণাটি দ্রুত জমা দিতে চেয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘পুরো লেখাটি শেষ করে টাইপ করার পর আবার নতুন করে শব্দগুলো পাল্টানো আমার জন্য খুব কঠিন ছিল।’ তাই এক সন্ধ্যায় চিন্তাভাবনা করার পর, তিনি তাঁর অফিসের সহকারীকে ডাকেন। তিনি তাঁকে নির্দেশ দেন যেন লেখকের নামের পাতায় তাঁর পোষা বিড়ালটির নামও যোগ করে দেওয়া হয়। এভাবেই বিড়ালটি সেই গবেষণার সহলেখক হয়ে যায়।

আরও পড়ুন
এমনকি মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বিষয়টি বেশ আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন।

অধ্যাপক হেদারিংটনের বন্ধু ও সহকর্মীদের কাছে তাঁর বিড়াল চেস্টার খুব পরিচিত ছিল। তাই সরাসরি বিড়ালের নাম ব্যবহার না করে তিনি একটি ছদ্মনাম বেছে নিলেন। তিনি বিড়ালটির নাম দিলেন এফডিসি উইলার্ড (FDC Willard)। এখানে এফডিসি হলো ফেলিস ডোমেস্টিকাস চেস্টার–এর সংক্ষিপ্ত রূপ। আর উইলার্ড ছিল চেস্টারের বাবার নাম।

এই বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৪ নভেম্বর ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’ ম্যাগাজিনে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। সেখানে লেখক হিসেবে অধ্যাপক হেদারিংটনের পাশাপাশি তাঁর বিড়ালের নামটিও ছাপা হয়েছিল। এভাবেই বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অনন্য ও মজার ঘটনার জন্ম হয়।

অধ্যাপক হেদারিংটনের অনেক সহকর্মীই বিড়ালের নাম ব্যবহার করার এই চালাকির কথা জানতেন। তবে তাঁরা এটি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি। এমনকি মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বিষয়টি বেশ আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। হেদারিংটন একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, বিভাগের প্রধান যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তাঁদের প্রকাশনার তালিকা দেখান, তখন তিনি সেখানে বিড়ালটির নামও যোগ করে দিয়েছিলেন। এতে তাঁদের বিভাগের মোট লেখকের সংখ্যা বাস্তবে যা ছিল, তাঁর চেয়ে একটি বেশি দেখানো সম্ভব হয়েছিল। তবে হেদারিংটন নিশ্চিত ছিলেন না যে লেখক হিসেবে বিড়ালের নাম থাকাটা তাঁর গবেষণার জন্য সরকারি অনুদান পেতে সাহায্য করবে নাকি সমস্যা তৈরি করবে।

আরও পড়ুন
কয়েক বছর পর লা রিসার্চ নামের একটি ফরাসি বিজ্ঞান জার্নালে হিলিয়াম-৩ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

শেষ পর্যন্ত চেস্টারের আসল পরিচয় খুব মজার একটি ঘটনার মাধ্যমে সবার সামনে চলে আসে। একজন ছাত্র গবেষণাপত্রের একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য অধ্যাপক হেদারিংটনকে খুঁজতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে খুঁজে না পেয়ে ছাত্রটি সহলেখক উইলার্ড অর্থাৎ বিড়ালটির সঙ্গে কথা বলতে চান। এই কথা শুনে ল্যাবের সবাই হেসে ওঠেন ও তখনই জানাজানি হয়ে যায় যে উইলার্ড আসলে কোনো মানুষ নয়, একটি বিড়াল।

পরবর্তী সময়ে চেস্টার নামের বিড়ালটি বিজ্ঞানচর্চা থেকে অবসর নিলেও ওর ছদ্মনাম এফডিসি উইলার্ড বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কয়েক বছর পর লা রিসার্চ নামের একটি ফরাসি বিজ্ঞান জার্নালে হিলিয়াম-৩ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সেখানেও লেখক হিসেবে এই বিড়ালটির নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। অধ্যাপক হেদারিংটন জানান, ওই গবেষণার আসল গবেষকেরা একটি বিষয়ে একমত হতে পারছিলেন না। তাই তাঁরা নিজেদের মধ্যে ঝামেলা না বাড়িয়ে আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত এই বিড়ালটির নামে লেখাটি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন।

আজ পর্যন্ত চেস্টারের সেই গবেষণাপত্রটি ৫০ বারের বেশি অন্য বিজ্ঞানীরা তাঁদের লেখায় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন। চেস্টারের পথ ধরে পরবর্তী সময়ে আরও অনেক প্রাণী গবেষণাপত্রের লেখক হয়েছে। ১৯৭৮ সালে পলি ম্যাটজিঙ্গার নামের একজন বিজ্ঞানী তাঁর পোষা কুকুর গ্যালাড্রিয়েলকে গবেষণাপত্রের সহলেখক হিসেবে রেখেছিলেন।

এমনকি নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আন্দ্রে গেইমও এমনটি করেছেন। ২০০১ সালে জাইরোস্কোপ নিয়ে তাঁর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সেখানে লেখক হিসেবে তাঁর পোষা হ্যামস্টার তিশার নাম ছিল। আন্দ্রে গেইম পরে ২০১০ সালে গ্রাফিন আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স, সায়েন্স অর্গ

আরও পড়ুন