ব্লুটুথ কীভাবে কাজ করে

রেডিও তরঙ্গের বিশেষ ক্ষমতা হলো, এটি তথ্যের বোঝা কাঁধে নিয়ে ছুটতে পারে

কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছ, অথচ হেডফোনের সঙ্গে মুঠোফোনের কোনো তারের সংযোগ নেই। কিংবা ভিডিও গেম খেলছ রিমোট কন্ট্রোলার দিয়ে, কিন্তু কনসোলের সঙ্গে নেই কোনো তার প্যাঁচানো। আবার স্মার্টওয়াচটা হাতে পরেই তুমি জেনে যাচ্ছ—তোমার ফোনে কার মেসেজ এল। এখানেও মুঠোফোনের সঙ্গে স্মার্টফোন তার দিয়ে যুক্ত নয়। ব্যাপারটা কি জাদুর মতো মনে হয় না? কোনো তার নেই, অথচ এক যন্ত্র দিব্যি আরেক যন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তথ্য আদান-প্রদান করছে! এই যে অদৃশ্য সুতার মতো এক যন্ত্রের সঙ্গে আরেক যন্ত্রের যোগাযোগ হয়, এই প্রযুক্তির নামই ব্লুটুথ।

আজকের দিনে ব্লুটুথ চেনে না এমন মানুষ হয়তো একজনও নেই। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, ব্লুটুথ কীভাবে তার ছাড়া কাজ করে? এর নামটাই কেন এমন অদ্ভুত? ওহ, তোমাদের কাছে নামটা উদ্ভুত লাগেনি?

ভালো করে খেয়াল করো, ব্লু মানে নীল, আর টুথ মানে দাঁত। তাহলে ব্লুটুথ মানে দাঁড়াল নীল দাত। এবার কি অদ্ভুত লাগছে? চলো নামের পাশাপাশি ব্লুটুথের কারসাজি নিয়েও সহজভাবে আলোচনা করা যাক।

ব্লুটুথকে তুমি যন্ত্রের কণ্ঠস্বর ভাবতে পারো। আমরা যেমন কথা বলে তথ্য শেয়ার করি, যন্ত্ররাও ব্লুটুথের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করে। কিন্তু ওরা তো আর আমাদের মতো শব্দ করে কথা বলে না। ওরা ব্যবহার করে রেডিও তরঙ্গ।

রেডিও তরঙ্গ হলো একধরনের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ বা তড়িৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গ। নামটা শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আলো, তাপ কিংবা এক্স-রে হলো একধরনের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ। এই অদৃশ্য ঢেউ বা তরঙ্গ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় শক্তি বয়ে নিয়ে যায়। পুকুরে ঢিল মারলে যেমন ঢেউ তৈরি হয়, এটাও ধরো তেমন ঢেউ। একটার পর একটা ঢেউ যেমন সামনে যেতে থাকে, মনে করো এই ঢেউ তেমনি সামনে যায় এবং সঙ্গে নিয়ে যায় শক্তি।

আরও পড়ুন

রেডিও তরঙ্গের বিশেষ ক্ষমতা হলো, এটি তথ্যের বোঝা কাঁধে নিয়ে ছুটতে পারে। তোমার ফোনের মিউজিক প্লেয়ার থেকে গানের সুরগুলো এই অদৃশ্য ঢেউয়ের পিঠে চড়েই তোমার হেডফোনে পৌঁছে যায়। আর প্রতিটি ব্লুটুথ ডিভাইসের ভেতরে ছোট্ট একটা কম্পিউটার চিপ থাকে। সেই চিপই রেডিও ওয়েভ পাঠাতে পারে এবং গ্রহণ করতে পারে।

ব্লুটুথ দিয়ে দুটি যন্ত্র কানেক্ট করাকে বলা হয় পেয়ারিং। ব্লুটুথ কানেক্ট করার সময় নিশ্চয়ই পেয়ার শব্দটা দেখেছ। এটাকে তুমি দুজন অচেনা মানুষের প্রথম পরিচয়ের সঙ্গে তুলনা করতে পারো। ধরো, তোমার ক্লাসে নতুন একজন বন্ধু এল। তুমি তার দিকে হাত বাড়িয়ে হ্যালো বললে, সে-ও হাত মিলিয়ে হাই বলল। ব্যস, বন্ধুত্ব হয়ে গেল!

ব্লুটুথ পেয়ারিংও ঠিক তা–ই। তুমি যখন ফোনের ব্লুটুথ অন করে হেডফোন সার্চ করো, তখন ফোন হেডফোনকে বলে, ‘হ্যালো, আমি কি তোমার সঙ্গে কানেক্ট হতে পারি?’ হেডফোন রাজি হলে দুজনের মধ্যে একটা ডিজিটাল হ্যান্ডশেক হয়। মজার ব্যাপার হলো, একবার পেয়ারিং হয়ে গেলে ওরা একে অপরকে মনে রাখে। পরেরবার আর নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার হয় না। আমরা যেমন বন্ধুদের মনে রাখি, সে রকম।

ব্লুটুথের বন্ধুত্ব তো হলো, এখন আসি নামের রহস্যে। প্রযুক্তির নাম কেন ব্লুটুথ হলো? এর পেছনে আছে এক ভাইকিং রাজার গল্প। দশম শতাব্দীতে স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলে এক রাজা ছিলেন, নাম হ্যারল্ড ব্লুটুথ গর্মসন। তিনি বিচ্ছিন্ন সব গোত্রকে এক করেছিলেন। ভালো কথা, তোমরা কি স্ক্যান্ডিনেভিয়া চেনো? আচ্ছা ডেনমার্ক ও নরওয়ের নাম শুনেছ। হ্যাঁ, এই দুটি দেশের নামকরণের আগে ওই স্থানের নাম ছিল স্ক্যান্ডিনেভিয়া।

আরও পড়ুন

যাহোক, প্রযুক্তিবিদেরা ভাবলেন এই প্রযুক্তিও তো রাজার মতোই! কম্পিউটার, ফোন, হেডফোনের মতো আলাদা আলাদা সব যন্ত্রকে এটি এক সুতায় বেঁধে ফেলছে। তাই রাজার সম্মানে এর নাম রাখা হলো ব্লুটুথ। এমনকি তোমরা ব্লুটুথের যে লোগো বা চিহ্নটা দেখো, সেটাও কিন্তু হ্যারল্ড ব্লুটুথের নামের আদ্যক্ষর H এবং B-এর প্রাচীন নর্ডিক অক্ষর মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

অনেকে আবার ব্লুটুথ ও ওয়াই-ফাই গুলিয়ে ফেলে। দুটি কিন্তু মোটেও এক জিনিস নয়। দুটোই তার ছাড়া কাজ করে ঠিকই, কিন্তু এদের কাজের ধরন আলাদা। চলো কয়েকটি বিষয়ের সাহায্যে সহজ করে বুঝি:

১. গতি: ব্লুটুথ হলো মন্থর গতির বাহন। গান শোনা, ছবি পাঠানো বা স্মার্টওয়াচ কানেক্ট করার জন্য এর গতি যথেষ্ট। কিন্তু তুমি যদি বিশাল কোনো মুভি বা গেম ডাউনলোড করতে চাও, তখন দরকার সুপারফাস্ট স্পিড। সেটার জন্য ওয়াই-ফাই সেরা।

২. দূরত্ব: ব্লুটুথ সাধারণত খুব কাছাকাছি দূরত্বের জন্য তৈরি। ৩০ ফুটের মধ্যে, মানে একই ঘরের মধ্যে এটি ভালো কাজ করে। অন্যদিকে ওয়াই-ফাই সিগন্যাল ৩০০ ফুট পর্যন্ত যেতে পারে। অর্থাৎ পুরো বাড়ি বা স্কুল ভবনে ওয়াই-ফাই পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন

৩. ইন্টারনেট: ব্লুটুথ ব্যবহারের জন্য ইন্টারনেটের কোনো দরকার নেই। এটি সরাসরি এক যন্ত্রের সঙ্গে আরেক যন্ত্রকে জুড়ে দেয়। কিন্তু ওয়াই-ফাই তোমাকে ইন্টারনেটের বিশাল দুনিয়ায় প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।

৪. শক্তি খরচ: ব্লুটুথ খুব কম ব্যাটারি খরচ করে। তাই ছোট ব্যাটারিচালিত হেডফোন বা স্মার্টওয়াচে এটি ব্যবহার করা সহজ। অন্যদিকে ওয়াই-ফাই প্রচুর শক্তি খরচ করে, তাই রাউটারকে সব সময় প্লাগ ঢুকিয়ে রাখতে হয়।

আশা করি দুটির মধ্যে পার্থক্য এখন তোমার কাছে স্পষ্ট। এবার একটু অন্য বিষয়ে কথা বলি। ২০২৫ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে, সারা বিশ্বে ৫০০ কোটির বেশি ব্লুটুথ ডিভাইস বিক্রি হয়েছে! সংখ্যাটা বুঝতে পারছ? এখন বিশ্বে প্রায় ৮০০ কোটি মানুষ আছে। এর মধ্যে ৫০০ কোটির বেশি ব্লুটুথ বিক্রি হওয়া কিন্তু সহজ কথা নয়। পকেটের ফোন থেকে শুরু করে গাড়ির সাউন্ড সিস্টেম—সবখানেই এখন ব্লুটুথের রাজত্ব।

সূত্র: দ্য কনভার্সেশন

আরও পড়ুন