বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কেন যুক্তরাষ্ট্রের পথে পথে ১০০ দিন ধরে হাঁটছেন
ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটার আগেই তাঁরা হাঁটা শুরু করেন। হাইওয়ের শব্দ, দূরে ট্রাকের হর্ন, কনকনে ঠান্ডা বাতাস—সবকিছু পেরিয়ে তাঁরা হাটেন। সবার গায়ে গেরুয়া বসন। একদল বৌদ্ধ ভিক্ষু। এক সারিতে মানুষগুলো নীরবে এগিয়ে চলেন। কারও হাতে প্ল্যাকার্ড নেই। কারও মুখে স্লোগান নেই। শুধু ধীর পায়ের শব্দ, নিঃশ্বাসের ওঠানামা আর অদ্ভুত শান্ত উপস্থিতি। টেক্সাস থেকে ওয়াশিংটন ডিসির দূরত্ব প্রায় ২ হাজার ৩০০ মাইল। এই দীর্ঘ পথ তাঁরা হেঁটে পার করবেন। যাত্রার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়াক ফর পিস’। শান্তির জন্য হাঁটাহাঁটি। এটি কোনো প্রতিবাদ মিছিল না। কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনও নয়। এটি একধরনের চলমান ধ্যান, শান্তিকে দৃশ্যমান করে তোলার চেষ্টা বলতে পারো।
২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট ওর্থ শহরের একটি ভিয়েতনামি বৌদ্ধমন্দির থেকে যাত্রা শুরু করেন এই ভিক্ষুরা। শুরুতে ছিলেন প্রায় দুই ডজন ভিক্ষু। পরে দুর্ঘটনা ও চোটের কারণে সংখ্যা কমে এসেছে। তবু লক্ষ্য অটুট আছে। পরিকল্পনার কোনো পরিবর্তন হয়নি। যাত্রাপথটা হলো ফোর্ট ওর্থ থেকে লুইজিয়ানা, মিসিসিপি, আলাবামা পেরিয়ে নর্থ ক্যারোলাইনা, এরপর ভার্জিনিয়া। প্রতিটি রাজ্যের কেন্দ্রে থামেন তাঁরা। কোথাও রাজ্য সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব প্রার্থনা করেন। কোথাও ছোট শহরের চার্চে শান্তির কথা বলেন। কখনো হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে। কখনো মাত্র কয়েকজন দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার ধারে; কিন্তু সংখ্যা আসল কথা না। শান্তির বার্তাটাই আসল।
এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে শান্তির জন্য হাঁটার শততম দিন। হাঁটার নেতৃত্বে আছেন বৌদ্ধ ভিক্ষু পান্নাকারা। তিনি খালি পায়ে হাঁটেন। ভারতের মাটিতে হাঁটার অভিজ্ঞতা তাঁর আছে। আমেরিকার রাস্তায় হাঁটা তাঁর জন্য নতুন। পিচঢালা সড়কে ছড়িয়ে থাকে কাচ, পেরেক ও ভাঙা পাথর। সবই তাঁর পায়ের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন হাঁটা শেষে পা ব্যান্ডেজে মোড়া হয়। তবু পরদিন ভোরে আবার হাঁটা শুরু করেন।
ভিক্ষু পান্নাকারার মতে, শরীরের কষ্ট মনে করিয়ে দেয়, শান্তি কোনো আরামদায়ক বিলাস না, এটা সাধনার বিষয়।
এই দলে আছেন দুজন ভিক্ষু, যাঁরা পালন করছেন ধুতাঙ্গ। ধুতাঙ্গ হলো বৌদ্ধধর্মের কঠোর সাধনাপদ্ধতি। এই তিন মাসে এই দুই ভিক্ষু কখনো শুয়ে পড়বেন না। হাঁটা, দাঁড়ানো আর বসা—এই তিন ভঙ্গিতেই তাঁদের দিন-রাত কাটে। রাতে বসে ধ্যান করেন। নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে থাকেন। ঘুম আসে ধ্যানের ভেতর দিয়ে। সাধারণ মানুষের কাছে এটা এক অসম্ভব সাধনে; কিন্তু বৌদ্ধ ঐতিহ্যে এটি আত্মসংযমের পুরোনো পদ্ধতি।
হাঁটা শুরুর পর থেকে এই ভিক্ষুদের জন্য পথে বেশ কিছু বিপদই এসেছে। যাত্রার প্রায় তিন সপ্তাহ পর একটি ট্রাক ধাক্কা দেয় ভিক্ষুদের এসকর্ট গাড়িতে। সেই গাড়ি ছিটকে পড়ে দুই ভিক্ষুর ওপর। একজনের পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পা কেটে ফেলতে হয়। এমন দুর্ঘটনায় যাত্রা থামিয়ে দেওয়া যেত; কিন্তু এই ভিক্ষুরা থামেননি। আহত ভিক্ষুকে রেখে বাকিরা এগিয়ে গেছেন। কারণ, তাঁদের কাছে এই হাঁটা কোনো ব্যক্তিগত অর্জন না। তাঁরা একটি বার্তা বহন করছেন। সেটি হলো শান্তি। শান্তির পথ সব সময় নিরাপদ হবে না।
এ যাত্রায় মানুষের পাশাপাশি আছে একটি কুকুর। নাম আলোকা। কুকুরটি এখন বেশ জনপ্রিয়। রিলসে এই কুকুরকে দেখা যায়। এটি একটি রেসকিউ বা উদ্ধার করা কুকুর, যার নামের অর্থ ‘দিব্য আলো’। ভারতে ভিক্ষু পঞ্চাকার এটিকে পেয়েছিলেন। সে হয়ে উঠেছে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের যাত্রাসঙ্গী। আমেরিকায় হাঁটা শুরু করার পর আলোকার পায়ের পুরোনো ক্ষত আবার বেড়ে গেছে। অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে হয়েছিল। পরে কুকুরটি আবার দলের কাছে ফিরে এসেছে। দিনে কয়েক দফায় অল্প অল্প হাঁটে আলোকা। তুষার, বৃষ্টি ও কাদা পেরিয়ে চার পায়ে আলোকা চলে শান্তির সঙ্গী হয়ে।
তোমার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, শান্তির জন্য হাঁটছে বুঝলাম; কিন্তু হাঁটতে হবে কেন? ভিক্ষুরা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ওয়াশিংটন ডিসি আমেরিকার রাজধানী। সেখানে পৌঁছে তারা কংগ্রেসকে অনুরোধ করবেন, বুদ্ধের জন্ম ও বোধিলাভের দিন ভেসাককে ফেডারেল ছুটি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে; কিন্তু এই আনুষ্ঠানিক দাবি ছাড়াও এই হাঁটার গভীর উদ্দেশ্য আছে। তাঁরা মনে করেন, মানুষ ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন, ক্লান্ত ও উত্তেজিত হয়ে পড়ছে। খবরের শিরোনাম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসীম স্ক্রল করা—সব মিলিয়ে মন যেন কোথাও থামতে পারছে না। এই হাঁটা সেই থামার আমন্ত্রণ।
বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে হাঁটা নতুন কিছু না। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বেরিয়ে পড়েছিলেন সিদ্ধার্থ। যাকে আমরা গৌতম বুদ্ধ হিসেবে জানি। একদিন তিনি গৃহত্যাগ করেছিলেন। রাজপ্রাসাদের নিরাপত্তা, ভোগ, ভবিষ্যৎ ছেড়ে তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন অজানার পথে। অরণ্যে, গ্রামে, পথে পথে হাঁটতে হাঁটতেই তিনি মানুষের দুঃখ দেখেছেন। প্রশ্ন করেছেন, উত্তর খুঁজেছেন। পথে চলার মধ্য দিয়ে বুদ্ধের দর্শন জন্ম নিয়েছে। আজকের ভিক্ষুদের হাঁটা সেই ঐতিহ্যেরই আরেক রূপ।
হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ফরেস্ট গাম্প–এর কথা মনে আছে? হঠাৎ একদিন ফরেস্ট দৌড়াতে শুরু করেছিল। কেন দৌড়াচ্ছে, সে নিজেও জানত না; কিন্তু তার দৌড় মানুষকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। কেউ তার সঙ্গে দৌড়েছে। কেউ তাকে অনুসরণ করেছে। কেউ আবার নিজের জীবনের মানে খুঁজেছে। এই বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও তেমনই হাঁটছেন। পথে পথে লোকে তাঁদের দেখতে আসছেন। তাঁদের কথা শুনতে আসছেন। তাঁদের পাত্রে খাবার দান করছেন। এই হাঁটার পেছনে কোনো জটিল ব্যাখ্যা নেই। কেবল শান্তির বার্তা আছে।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হাঁটার পথে মানুষের বেশ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কেউ হাত জোড় করে রাস্তার পাশে তাঁদের দেখতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ চোখ মুছতে মুছতে আশীর্বাদ চায়। কেউ খাবার এনে দেয়। কেউ রাতের আশ্রয় দেয়। গির্জা, কমিউনিটি সেন্টার, ছোট শহরের হল, সব জায়গায় দরজা তাঁদের জন্য আশ্রয় ও সহায়তা দিচ্ছে মানুষ। ভালোবাসা থেকে। তাঁদের হাঁটার পথে অনেক ধর্মের মানুষই আসেন। অনেকেই বলেন, এই হাঁটার মধ্যে তাঁরা নিজেদের বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখছেন। কেউ বলেন, এটি তাদের ‘ডুমস্ক্রলিং’-এর বিকল্প। ডুমস্ক্রলিং মানে যে স্ক্রলিংয়ের কোনো শেষ নেই। অনেকে এত এত খারাপ খবরের বদলে শান্তির হাঁটা দেখছেন।
ভিক্ষুদের শিক্ষায় খুব সাধারণ একটি কথা আছে। ক্ষমা মানে ভুলে যাওয়া না; বরং ঘৃণা বহন না করা। ঘুম শুধু শরীরের বিশ্রাম না, মনের চর্চা। এখন রাতে আমাদের হাত থেকে ফোন নামিয়ে রাখার মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে আসক্তির বিপরীত চর্চা। বৌদ্ধরা মনে করে, খাবার, হাঁটা, শ্বাস নেওয়া—সবই ধ্যান হতে পারে। তাই এই ভিক্ষুদের মধ্যে কোনো তর্ক নেই। কোনো মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া নেই। এরা কেবল হাঁটছেন।
বরফ, বৃষ্টি, শীত—কিছুই এদের থামাতে পারেনি। ভার্জিনিয়ার পথে এখন বরফের আস্তরণ। বরফের ওপর দিয়ে হাঁটছেন গেরুয়া পোশাক পরা ভিক্ষুর দল। এক সারিতে হাঁটেন তাঁরা। ধীরে ধীরে তাঁরা এগিয়ে চলেছেন ওয়াশিংটনের দিকে। আশা করা যায়, ১২০তম দিনে, ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে তাঁরা পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। শান্তির বার্তা নিয়ে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান