হাতি কি শুঁড় ছাড়া অন্ধ হয়ে যায়
হাতি নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। তবে এই বিশাল প্রাণীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অঙ্গ শুঁড়। এটি যেমন নাকের কাজ করে, তেমনি হাতের কাজও চালিয়ে নেয়। কিন্তু হাতির শুঁড় কেবল ভারী জিনিস তোলার জন্যই নয়। অনেক বিজ্ঞানী তো মনে করেন, শুঁড় ছাড়া একটি হাতি প্রায় অন্ধ।
শুনে অবাক লাগতেই পারে, চোখ থাকতে শুঁড়ের সঙ্গে দেখার কী সম্পর্ক? কেন শুঁড় ছাড়া হাতি এতটা অসহায় হয়ে পড়ে? এর উত্তরও আছে শুঁড়ের একেবারে মাথায়। একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, সেখানে ছোট ছোট কিছু লোম বা গোঁফ আছে। সাধারণ দৃষ্টিতে এগুলোকে নগণ্য মনে হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন অন্য কথা। হাতির এই গোঁফগুলো নাকি এদের জন্য দ্বিতীয় চোখ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু কেন এই সাধারণ লোমগুলো হাতির জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?
প্রতিটি হাতির শুঁড়ে থাকে প্রায় এক হাজারটি বিশেষ ধরনের লোম বা গোঁফ। হাতির চামড়া যেমন পুরু, তেমনি এদের চোখের দৃষ্টিশক্তিও বেশ কম। আর ঠিক এ কারণেই এদের জীবনে এই গোঁফগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, হাতির শুঁড়ের এই লোমগুলো একবার ঝরে গেলে আর কখনোই গজায় না।
অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মুখের লোমের তুলনায় হাতির এই গোঁফগুলো একেবারেই আলাদা। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের যান্ত্রিক প্রকৌশলী অ্যান্ড্রু শুলজ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, ‘হাতির গোঁফগুলো অনেকটা ভিনগ্রহের প্রাণীর মতো রহস্যময়।’
সম্প্রতি ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় অ্যান্ড্রু শুলজ ও তাঁর দল এই গোঁফগুলোর এক অদ্ভুত ক্ষমতার কথা জানিয়েছেন। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, হাতির এই গোঁফগুলো সাধারণ কোনো লোম নয়। এগুলোর ভেতরে যেন আলাদা একধরনের বুদ্ধিমত্তা বসানো আছে। মাটির ওপরের এই বিশাল প্রাণীকে চারপাশের জগৎ চিনতে ও নিরাপদে চলাফেরা করতে এই গোঁফগুলো সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।
ইঁদুরের মতো অনেক প্রাণী এদের গোঁফ ইচ্ছেমতো নাড়াতে পারে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘হুইস্কারিং’ বা ‘ফিসফিসিং’। কিন্তু হাতির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। হাতির শুঁড়ে এই গোঁফগুলো নাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পেশি নেই। ফলে এদের বিশাল শুঁড়টি নড়াচড়া করলেও গোঁফগুলো মূলত স্থির থাকে।
যদি হাতির গোঁফ নাড়ানোর ক্ষমতা না–ই থাকে, তবে এগুলো কি অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো কাজ করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রকৌশলী, স্নায়ুবিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী ও পদার্থবিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন অ্যান্ড্রু শুলজ। তাঁরা সবাই মিলে ছোট ও বড় এশিয়ান হাতির গোঁফ নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। তবে এই গবেষণার জন্য কোনো হাতির ক্ষতি করা হয়নি। চিড়িয়াখানায় যেসব হাতি স্বাভাবিকভাবে মারা গিয়েছিল, সেসব হাতির গোঁফই পশুচিকিৎসকেরা গবেষণার জন্য দান করেছিলেন।
আগের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সাধারণত লোমের দুই প্রান্ত আটকে রেখে মাঝখানের অংশ পরীক্ষা করতেন। কিন্তু এবার অ্যান্ড্রু শুলজের দল ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ও কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে প্রতিটি গোঁফের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখেন।
হাতির এই গোঁফগুলোর গঠন, কঠোরতা ও ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম ছিদ্র নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করার পর বিজ্ঞানীরা চমকে যান। দেখা গেল, হাতির গোঁফ অন্য যেকোনো প্রাণীর চেয়ে আলাদা। অ্যান্ড্রু শুলজ এগুলোর গঠনকে ঘাসের ডগার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এগুলো গোড়ার দিকে চারকোনা বা বর্গাকার আর চ্যাপটা। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই গোঁফগুলো গোড়ার দিকে খুব শক্ত ও ঘন হলেও ডগার দিকে বেশ নরম।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, এদের ভেতরের গঠন। এগুলো অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্রযুক্ত একটি জালের মতো। অ্যান্ড্রু শুলজ জানান, এই ছিদ্রগুলো কোনো আঘাতের ধাক্কা সামলে নিতে সাহায্য করে, যাতে সারা জীবনেও গোঁফগুলোর কোনো ক্ষতি না হয়।
আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদের এত অবাক করেছিল, তাঁরা থ্রিডি প্রিন্টারের সাহায্যে একটি বড় আকৃতির গোঁফ তৈরি করেন। তাঁরা এর নাম দিয়েছেন হুইস্কার ওয়ান্ড। এই লাঠির ঠিক কোন জায়গায় কোন বস্তু স্পর্শ করছে, তা চোখ বুজেই আলাদাভাবে টের পাওয়া যাচ্ছে।
হাতির গোঁফগুলো গোড়ার দিকে শক্ত আর ডগার দিকে নরম হওয়ার পেছনে একটি বিশেষ কারণ আছে। যখনই কোনো বস্তু এই গোঁফকে স্পর্শ করে, তখন এই গঠনের কারণে স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে খুব দ্রুত সংকেত পৌঁছে যায়। ফলে হাতি সহজেই বুঝতে পারে, বস্তুটি এর গোঁফ বা শুঁড়ের ঠিক কোন জায়গায় ছোঁয়া লেগেছে। দৃষ্টিশক্তি কম হওয়া সত্ত্বেও এই বিশেষ ক্ষমতার কারণেই হাতি অন্ধকার বা অচেনা জায়গায় অনায়াসে চলাফেরা করতে পারে।