মাকড়সার জাল কেন ইস্পাতের চেয়ে শক্ত
‘স্পাইডারম্যান’ মুভি নিশ্চয়ই দেখেছ। পিটার পার্কার হাত থেকে মাকড়সার জাল ছুড়ে ছুটন্ত ট্রেন থামিয়ে দিচ্ছে কিংবা বিশাল দালান পড়ে যাওয়া ঠেকাচ্ছে। পর্দায় এসব দেখতে দেখতে অনেকেরই মনে হতে পারে, এসব তো গাঁজাখুরি গল্প। মাকড়সার ওই ফিনফিনে সুতা কি আর এত ভার সইতে পারে? কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, ভিন্ন কথা। মাকড়সার জালের এই সুতা আসলেই প্রকৃতির এক পরম বিস্ময়। ওজনে হালকা হলেও এটি ইস্পাতের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। জেনে হয়তো অবাক হবে, এই সুতা দিয়েই বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট তৈরি হয়!
বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা মাকড়সার জালের এই অদ্ভুত শক্তির রহস্যভেদ করার চেষ্টা করছেন। কীভাবে মাকড়সা তার শরীরের ভেতর থাকা তরল পদার্থকে চোখের পলকে এমন শক্ত সুতায় পরিণত করে? অবশেষে সেই রহস্যের জট খুলেছে। সম্প্রতি ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, এর পেছনে রয়েছে মলিকিউলার ভেলকি! আর এই আবিষ্কার শুধু নতুন শক্তিশালী দড়ি বানাতেই নয়, আলঝেইমারের মতো জটিল মস্তিষ্কের রোগ নিরাময়েও পথ দেখাতে পারে।
মাকড়সার সিল্ক প্রোটিনের মধ্যে থাকে দুটি বিশেষ অ্যামিনো অ্যাসিড—আরজিনিন ও টাইরোসিন। এরা একে অপরের সঙ্গে খুব নির্দিষ্ট উপায়ে মিথস্ক্রিয়া করে।
মাকড়সার পেটের ভেতর এই সুতা তৈরির উপাদানগুলো জমা থাকে। তবে সেখানে কিন্তু এগুলো সুতা আকারে থাকে না। সেখানে এগুলো থাকে সিল্ক ডোপ নামের একধরনের ঘন তরল হিসেবে। মাকড়সা যখন জাল বুনতে চায়, তখন এই তরল পদার্থ শরীর থেকে বের হওয়ার সময় বাতাসের সংস্পর্শে এসে নিমেষেই শক্ত সুতায় পরিণত হয়।
বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন, এই তরল প্রোটিনগুলো প্রথমে ছোট ছোট ফোঁটা আকারে জমা হয় এবং পরে সুতার আকৃতি পায়। কিন্তু ঠিক কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে এই তরল ফোঁটাগুলো এত শক্তিশালী ও নমনীয় সুতায় পরিণত হয়, তা এত দিন অজানা ছিল। যুক্তরাজ্যের কিং’স কলেজ লন্ডন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়াগো স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী মিলে এই হারানো সূত্র খুঁজে পেয়েছেন।
গবেষকদলটি মলিকিউলার ডাইনামিকস সিমুলেশন, আলফাফোল্ড-৩ স্ট্রাকচারাল মডেলিং এবং নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স স্পেকট্রোস্কোপির মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাকড়সার জালের একেবারে আণবিক স্তরে উঁকি দিয়েছেন। সেখানে তাঁরা দেখেছেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। মাকড়সার সিল্ক প্রোটিনের মধ্যে থাকে দুটি বিশেষ অ্যামিনো অ্যাসিড—আরজিনিন ও টাইরোসিন। এরা একে অপরের সঙ্গে খুব নির্দিষ্ট উপায়ে মিথস্ক্রিয়া করে। এই দুটি অ্যামিনো অ্যাসিড অনেকটা আঠালো স্টিকারের মতো কাজ করে।
মাকড়সা এই প্রোটিন জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াটিকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যাতে এটি একটি সুন্দর ও কাজের কাঠামোয় পরিণত হয়। কিন্তু আলঝেইমার রোগে এই নিয়ন্ত্রণ থাকে না, ফলে তা ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
তরল অবস্থায় যখন প্রোটিনগুলো অগোছালো থাকে, তখন এই আরজিনিন ও টাইরোসিন একে অপরকে আকর্ষণ করে প্রোটিনগুলোকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। মজার ব্যাপার হলো, সুতা যখন শক্ত হয়ে যায়, তখনো এই বন্ধন অটুট থাকে। এই ‘আণবিক স্টিকার’গুলোই মাকড়সার জালকে অবিশ্বাস্য শক্তিশালী করে। কিং’স কলেজ লন্ডনের কম্পিউটেশনাল মেটেরিয়ালস সায়েন্সের অধ্যাপক ক্রিস লরেঞ্জ একে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘এই বিশৃঙ্খল প্রোটিনগুলো কীভাবে সুশৃঙ্খল হয়ে একটি হাইপারফরম্যান্স কাঠামো তৈরি করে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এই আণবিক মিথস্ক্রিয়ায়।’
এই গবেষণা কেবল মাকড়সার জাল বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রয়োগ হতে পারে সুদূরপ্রসারী। অধ্যাপক ক্রিস লরেঞ্জ ও তাঁর দলের মতে, এই একই নীতি ব্যবহার করে মানুষ ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব ও হালকা অথচ ইস্পাতের মতো শক্ত উপাদান তৈরি করতে পারবে। এমন উপাদান দিয়ে উড়োজাহাজ বা গাড়ির যন্ত্রাংশ বানানো গেলে তা ওজনে হবে হালকা কিন্তু শক্তিতে হবে অটুট! এ ছাড়া বায়োডিগ্রেডেবল বা পচনশীল মেডিক্যাল ইমপ্ল্যান্ট ও সফট রোবোটিকসের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটাতে পারে।
তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি দিয়েছেন সান দিয়াগো স্টেট ইউনিভার্সিটির রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক গ্রেগরি হল্যান্ড। তিনি জানিয়েছেন, মাকড়সার জালের এই গঠনের সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্কের গভীর মিল রয়েছে!
সম্প্রতি ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, এর পেছনে রয়েছে মলিকিউলার ভেলকি!
মাকড়সার সিল্ক প্রোটিনগুলো তরল থেকে কঠিন হওয়ার সময় যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় এবং বিটা-শিট নামের যে গঠন তৈরি করে, ঠিক একই ধরনের প্রক্রিয়া দেখা যায় আলঝেইমারের মতো মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত রোগের ক্ষেত্রে। আলঝেইমার রোগীদের মস্তিষ্কে প্রোটিনগুলো জমাট বেঁধে অ্যামাইলয়েড প্লাক তৈরি করে। এগুলোই মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস করে দেয়।
পার্থক্য হলো, মাকড়সা এই প্রোটিন জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াটিকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যাতে এটি একটি সুন্দর ও কাজের কাঠামোয় পরিণত হয়। কিন্তু আলঝেইমার রোগে এই নিয়ন্ত্রণ থাকে না, ফলে তা ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মাকড়সার এই নিয়ন্ত্রণকৌশল যদি আমরা বুঝতে পারি এবং নকল করতে পারি, তবে ভবিষ্যতে আলঝেইমারের মতো রোগের চিকিৎসায় নতুন দুয়ার খুলে যেতে পারে।