বন্য প্রাণী পোষ মানে না কেন
বাঘ বা সিংহ পোষ মানানোর কথা হয়তো কেউ ভাবে না। নাম শুনলেই ভয়ে লোম দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু বিড়াল দিব্যি আমাদের কোলে শুয়ে থাকে। বনের জেব্রা দেখতে ঘোড়ার মতো, কিন্তু কেউ কি কখনো জেব্রার পিঠে ঘুরে বেড়ায়? না। সার্কাসে হয়তো বাঘকে আগুনের রিংয়ের ভেতর দিয়ে লাফাতে দেখেছ, কিন্তু সেটা ভয় দেখিয়ে করানো হয়, ভালোবাসা দিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কুকুর বা বিড়ালকে সহজেই পোষ মানাতে পারি, কিন্তু বাঘ, ভালুক বা জেব্রাকে পারি না। কেন পারি না?
জঙ্গল থেকে কোনো প্রাণী ধরে এনে ঘরে আটকে রাখার নাম কিন্তু গৃহপালিত করা নয়। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি পারস্পরিক সম্পর্ক। দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হয় এবং লাভবান হতে হয়।
হাজার বছর আগে নেকড়েরা মানুষের কাছাকাছি এসেছিল খাবারের লোভে, আর মানুষ তাদের আশ্রয় দিয়েছিল নিরাপত্তার প্রয়োজনে। এভাবেই হিংস্র নেকড়ে ধীরে ধীরে মানুষের বন্ধু হয়েছে। কুকুরও এখন আমাদের বন্ধু। বুনো বিড়াল মানুষের শস্যভান্ডারের ইঁদুর শিকার করতে করতে একসময় মানুষের ঘরের সদস্য হয়ে গেল। কিন্তু এ তালিকায় আরও একটা প্রাণী থাকতে পারত, তাকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি!
কুকুর বা বিড়ালের আগেও মানুষ হয়তো শিয়াল পুষত! ২০২৪ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। আর্জেন্টিনার পাতাগোনিয়ায় ১ হাজার ৫০০ বছরের পুরোনো এক কবরস্থানে মানুষের কঙ্কালের পাশে একটি শিয়ালের কঙ্কাল পাওয়া গেছে। আইসোটোপ ও ডিএনএ টেস্ট করে দেখা গেছে, ওই শিয়াল বনের খাবার খেত না, বরং মানুষের মতোই খাবার খেত। তার মানে, ওই শিয়াল ছিল ওই মৃত ব্যক্তির পোষা সঙ্গী। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওটা ছিল ডুসিকিওন আভুস প্রজাতির শিয়াল। ৫০০ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এই প্রজাতি। অর্থাৎ কুকুর আসার আগেই দক্ষিণ আমেরিকার মানুষ শিয়ালকে পোষ মানানোর চেষ্টা করেছিল।
বনের শিয়ালকে কি আসলেই কুকুরের মতো বানানো সম্ভব? ১৯৫৯ সালে রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় বিজ্ঞানী দিমিত্রি বেলিয়ায়েভ এক অদ্ভুত পরীক্ষা শুরু করেন। তিনি একদল রুপালি শিয়াল নেন। এদের মধ্যে যেগুলো একটু শান্ত, সেগুলোকে আলাদা করে প্রজনন করান। সেগুলো থেকে যেসব বাচ্চা বেশি শান্ত ও ভদ্র, সেগুলোকে বেছে নেন তিনি।
মাত্র ছয় বছরের মধ্যেই দেখা গেল এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন! বুনো হিংস্র শিয়ালগুলো মানুষের হাত চাটছে, কোলে ওঠার জন্য লেজ নাড়ছে। মানুষ দেখলে কুকুরের মতো কুঁই কুঁই করছে! এমনকি তাদের কান কুকুরের মতো ঝুলে পড়েছে, লেজ গোল হয়ে গেছে, গায়ের রঙে ছোপ ছোপ দাগ এসেছে। মাত্র কয়েক বছরেই বন্য শিয়াল গৃহপালিত আচরণ করতে শুরু করেছে।
শিয়াল বা কুকুরের জিনগত মিল থাকায় তাদের পোষ মানানো গেছে। কিন্তু জেব্রা, চিতা বা গন্ডার কেন পোষ মানে না? বিখ্যাত লেখক এবং ইউসিএলএয়ের অধ্যাপক জ্যারেড ডায়মন্ড তাঁর বিখ্যাত ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিল’ বইয়ে এর পেছনের ছয়টি কারণ উল্লেখ করেছেন। কোনো প্রাণীকে পুরোপুরি পোষ মানাতে হলে এই ছয়টি গুণ বা বৈশিষ্ট্য তাদের থাকতেই হবে।
১. খাবারের বাছবিচার থাকা যাবে না
যে প্রাণী যা পায়, তা–ই খায়, তাদের পোষা সহজ। কিন্তু যারা শুধু বিশেষ খাবার খায়, তাদের পোষা অসম্ভব। কারণ, তাদের খাবারের জোগান দিতেই তুমি ফতুর হয়ে যাবে।
২. দ্রুত বড় হতে হবে
হাতিকে পোষ মানানো যায়, কিন্তু গৃহপালিত করা যায় না। কারণ, একটা হাতির বাচ্চা বড় হতে ১৫ বছর সময় নেয়। তুমি যদি হাতির খামার করতে চাও, লাভের মুখ দেখার আগেই হয়তো বুড়ো হয়ে যাবে! যে প্রাণী দ্রুত বড় হয়, তাদেরই মানুষ পোষে।
৩. বন্দী থাকতে আপত্তি করা যাবে না
চিতাবাঘ অনেক দ্রুত দৌড়ায়, শিকারি হিসেবেও সেরা। কিন্তু খাঁচায় বন্দি থাকলে এরা প্রজনন করতে চায় না, স্ট্রেসড হয়ে যায়। তাই চিতাকে কখনো গৃহপালিত করা যায়নি।
৪. মেজাজ হতে হবে শান্ত
জেব্রাকে দেখতে ঘোড়ার মতো লাগলেও এদের মেজাজ খুবই খারাপ। এরা কামড় দিলে মাংস ছিঁড়ে না নেওয়া পর্যন্ত ছাড়ে না। অনেক প্রাণী দেখতে সুন্দর হলেও স্বভাবের কারণে পোষ মানে না। গ্রিজলি ভালুক বা আফ্রিকান মহিষকে পোষ মানানো মানে সুইসাইড করতে যাওয়া।
৫. আতঙ্কিত হওয়া যাবে না
হরিণ বা গ্যাজেল–জাতীয় প্রাণীরা একটু শব্দ হলেই ভোঁ দৌড় দেয়। খাঁচায় রাখলে ভয়ে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে এরা নিজেরাই মরে যায়। যারা সহজে ভয় পায় না, তারাই মানুষের সঙ্গে থাকতে পারে।
৬. নেতাকে মানতে হবে
যেসব প্রাণী দলে বা পালের মধ্যে থাকে এবং একজন নেতাকে মেনে চলে, তাদের পোষ মানানো সহজ। যেমন গরু বা ঘোড়া। মানুষ তখন ওই নেতার জায়গা দখল করে। কিন্তু যারা একা থাকতে পছন্দ করে, তারা মানুষের হুকুম মানতে চায় না। এর মধ্যে বিড়াল শুধু ব্যতিক্রম।
অর্থাৎ কোনো প্রাণী দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেন, জ্যারেড ডায়মন্ডের এই ছয়টি শর্তে না টিকলে তাকে ঘরে তোলা অসম্ভব। বনের প্রাণী বনে থাকাই সুন্দর। আর আমাদের জন্য কুকুর-বিড়ালই ভালো!
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স