বিস্কুট কীভাবে পেলাম
২০১৮ সালের কথা। ১৪তম আঞ্চলিক স্কাউট সমাবেশে অংশ নিতে গাজীপুরের বাহাদুরপুরে রোভার স্কাউট প্রশিক্ষণকেন্দ্রে গিয়েছিলাম। সেখানে ক্যাম্পিং করার সময় একদিন আমাদের একটি বিস্কুট কারখানায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হলো।
কয়েক হাজার স্কাউট লাইন ধরে ঘুরে দেখল কারখানা। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ই ভেসে আসছিল বিস্কুটের মিষ্টি গন্ধ। কারখানার ভেতরে গিয়ে দেখলাম, কীভাবে ধাপে ধাপে মচমচে বিস্কুট তৈরি হচ্ছে। ঘোরাঘুরি শেষে আমাদের সবাইকে খেতে দিল বিস্কুট। সেদিন বিস্কুট সম্পর্কে বেশ কিছু অজানা তথ্যও জানানো হয়েছিল।
ক্যাম্প শেষে বাসায় ফিরে ঘাঁটাঘাঁটি করে জানলাম, বিস্কুটের ইতিহাস বেশ চমৎকার। কোনো এক প্রজন্মের কাছে বিশেষ কিছু বিস্কুট নস্টালজিয়া, আবার কারও কাছে শৈশবের দারুণ স্মৃতি। চলো, আজ সেই বিস্কুটের জন্ম হলো কীভাবে জেনে নিই।
বিস্কুট কী ও এর নানা রকমফের
বিস্কুট মূলত ময়দা দিয়ে তৈরি একধরনের সেঁকা খাবার। সাধারণত এই খাবার শক্ত, চ্যাপটা ও ইস্ট ছাড়া তৈরি করা হয়। বেশির ভাগ বিস্কুটই মিষ্টি স্বাদের। এগুলো তৈরিতে চিনি, চকলেট, আইসিং, জ্যাম কিংবা বিভিন্ন ফলের ফ্লেভার ব্যবহার করা হয়। আবার কিছু বিস্কুট নোনতা স্বাদের থাকে।
বাজারে বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট পাওয়া যায়, যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত বিস্কোটি, স্যান্ডউইচ, ডাইজেস্টিভ, জিঞ্জার, সল্টি, বোরবন, ওটস কুকিজ, বেলা, টোস্ট, শর্টব্রেড, চকলেট চিপ কুকিজ, আনজাক ও স্পেকুলাস বিস্কুট।
‘বিস্কুট’ নামটি এল যেভাবে
ছোট, শক্ত আর ময়দা দিয়ে সেঁকা খাবারকে বেশির ভাগ ইংরেজিভাষী দেশে বিস্কুট বলা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডায় বিস্কুট বলতে বোঝানো হয় একধরনের তুলতুলে নরম পাউরুটিকে। আমরা যেটাকে বিস্কুট বলি, সেটাকে তারা বলে কুকি বা ক্র্যাকার। কানাডায় আবার এই নরম পাউরুটি থেকে আলাদা বোঝাতে একে টি বিস্কুট বলা হয়।
যুক্তরাজ্য আর আয়ারল্যান্ডে কুকি বলতে বোঝায় বিশেষ একধরনের মিষ্টি বিস্কুটকে, যাতে সাধারণত চকলেট চিপস বা কিশমিশ থাকে। অন্যদিকে স্কটল্যান্ড আর গার্নসিতে একসময় নরম পাউরুটিজাতীয় খাবারকেও বিস্কুট বলা হতো।
বিস্কুট (Biscuit) শব্দটি এসেছে পুরোনো ফরাসি শব্দ বেসকুইট (Bescuit) থেকে। এটি মূলত লাতিন দুটি শব্দ—‘bis’ (দুবার) ও ‘coquere’ (সেঁকা বা রান্না করা) থেকে এসেছে। তাই বিস্কুট শব্দের মূল অর্থ হলো দুইবার সেঁকা খাবার।
আগের দিনে বিস্কুট বানানোর সময় সত্যিই দুটি ধাপে সেঁকা হতো। প্রথমে ওভেনে বিস্কুটটি ভালোভাবে বেক বা সেঁকে নেওয়া হতো। এরপর কম আঁচে আবার ওভেনে রেখে শুকানো হতো, যেন এটি দীর্ঘদিন মচমচে ও ভালো থাকে।
ব্রিটিশ শাসনের সময় এই উপমহাদেশে ইংরেজি বিস্কুট শব্দটি চালু হয়। ইংরেজদের চায়ের সঙ্গে বিস্কুট খাওয়ার অভ্যাস এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ভাষায় শক্ত সেঁকা রুটির অন্যান্য নাম থাকলেও ইংরেজি বিস্কুট শব্দটিই সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বিস্কুটের শুরু যেভাবে
আমরা আজ যেসব বিস্কুট খাই, তার ইতিহাস কিন্তু অনেক পুরোনো। একদম শুরুতে, নব্যপ্রস্তর যুগে মানুষ গরম পাথরের ওপর শস্যের মণ্ড ছড়িয়ে সেঁকে নিত। নব্যপ্রস্তর যুগ বা নিওলিথিক যুগ হলো মানব ইতিহাসের সেই প্রাচীন সময়, যখন মানুষ শিকার ছেড়ে প্রথম কৃষিকাজ, পশুপালন ও স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেছিল। তবে মাটির নিচ থেকে পাওয়া পুরোনো নিদর্শন দেখে নিশ্চিত বলা যায় না, সেগুলো আসলেই বিস্কুট ছিল, নাকি কেকজাতীয় কোনো খাবার, নাকি অন্য কোনো খাবার।
পরবর্তীকালে রোমানদের সময়ে একধরনের বিস্কুট তৈরি শুরু হয়, যা দেখতে অনেকটা আজকের রাস্ক বিস্কুটের মতো। সাধারণ রুটিকে দ্বিতীয়বার আগুনে সেঁকে একদম মুচমুচে করে ফেলা হতো। সহজে নষ্ট হতো না বলে রোমান সৈন্য ও ভ্রমণকারীদের কাছে এই খাবার ছিল বেশ জনপ্রিয়।
মধ্যযুগীয় বিস্কুট ও ওয়েফার
চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে ইংরেজি ভাষায় ‘বিস্কুট’ শব্দটির ব্যবহার বাড়তে শুরু করে। এ সময়ে মিষ্টি ও নোনতা দুই ধরনের বিস্কুটই মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর পাশাপাশি প্যানকেকের মতো কিছু নতুন পদও তৈরি হতে থাকে।
মধ্যযুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিস্কুটগুলোর একটি ছিল ওয়েফার। এটি তৈরি করা হতো মিষ্টি খামির দিয়ে আগুনে সেঁকে। ধীরে ধীরে প্রযুক্তি উন্নত হলে লোহার বিশেষ ছাঁচ ব্যবহার করে একে সুন্দর সুন্দর আকৃতি দেওয়া হতে থাকে। সে যুগে পেটের হজম ভালো রাখতে কিংবা স্রেফ আনন্দের ছলে আড্ডা দিতে মানুষ বিস্কুট খেত।
সবচেয়ে বড় ক্রিম বিস্কুট
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিম দেওয়া বিস্কুটটির ওজন ছিল প্রায় ৮৩ দশমিক ৪৫ কেজি। ২০২১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর কোস্টারিকার সান হোসে শহরে মনডেলেজ কোস্টারিকা নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই রেকর্ড গড়ে। বিস্কুটটি বানানোর জন্য আয়োজকেরা ওই দিন সকালেই বিস্কুটের খামির তৈরি শুরু করেন। তারপর খামির সুন্দর ছাঁচে ফেলে সেঁকা ও ঠান্ডা করার কাজ চলে। বিস্কুটের একেকটি পাশ পুরোপুরি সেঁকতে পাঁচ ঘণ্টা করে সময় লেগেছিল। কাজ শেষে রাত ১১টার দিকে বিস্কুটের ভেতরে ক্রিম ভরে ওজন করা হয়। রেকর্ড নিশ্চিত হওয়ার পরপরই বিশাল এই বিস্কুট সেখানে থাকা মানুষের মধ্যে কেটে ভাগ করে দেওয়া হয়।
ভুল থেকে তৈরি চকলেট চিপ বিস্কুট
ঘটনাটি ১৯৩০ সালের। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের এক সরাইখানার মালিক রুথ গ্রেভস ওয়েকফিল্ড একদিন তাঁর রান্নাঘরে বিস্কুট বানাচ্ছিলেন। তিনি ভাবলেন, বিস্কুটের খামিরের মধ্যে নেসলে কোম্পানির চকলেটের ছোট ছোট টুকরা মিশিয়ে দিলে ওভেনের গরমে চকলেট গলে পুরো বিস্কুটটিই চকলেট স্বাদের হয়ে যাবে। কিন্তু বিস্কুট সেঁকা শেষে তিনি দেখলেন, ওভেনের গরমে চকলেট মোটেও পুরোপুরি গলে যায়নি। বরং বিস্কুটের গায়ে ছোট ছোট টুকরা হয়ে জমাট বেঁধে আটকে আছে। এভাবেই ভুল করে তৈরি হয়ে গেল জনপ্রিয় চকলেট চিপ বিস্কুট।
ব্রিটিশদের বিস্কুট ছিল ওষুধ
ব্রিটেনে প্রথম বিস্কুট তৈরির রেসিপি এসেছিল ইতালি থেকে, যা পাওয়া গিয়েছিল রসায়ন ও চিকিৎসার একটি বইতে। মজার ব্যাপার হলো, সেই বইতে প্লেগ রোগের চিকিৎসা, পায়ের আঙুলের দুর্গন্ধ দূর করার উপায় এবং বিস্কুট বানানোর নিয়ম পাশাপাশি লেখা ছিল। তখনকার ব্রিটিশ বিস্কুটগুলো দেখতে আঙুলের মতো লম্বা ও শক্ত স্পঞ্জের মতো। এগুলোতে সুগন্ধি মসলা মেশানো হতো। সেই সময় মানুষ বিস্কুট কোনো সাধারণ নাশতা হিসেবে খেত না। মূল খাবার খাওয়ার পর মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে ও হজমের সমস্যার কারণে ঢেকুর ওঠা বন্ধ করতে ওষুধের মতো এই বিস্কুটগুলো খাওয়া হতো।
মহাকাশে নভোচারীদের তৈরি প্রথম বিস্কুট
ভবিষ্যতের দীর্ঘ মহাকাশযাত্রায় নতুন খাবার তৈরির উপায় খুঁজতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) বিস্কুট বানানোর পরীক্ষা চালানো হয়। নভোচারী লুকা পারমিতানো ও ক্রিস্টিনা কোচ শূন্য মাধ্যাকর্ষণে কাজ করার উপযোগী বিশেষ একটি নলাকার ওভেনে প্রথমবারের মতো চকলেট চিপ বিস্কুট তৈরি করেন। পৃথিবীতে বিস্কুট সেঁকতে ২০ মিনিট লাগলেও মহাকাশে উপযুক্ত তাপমাত্রা ও সময় খুঁজে পেতে লেগে যায় অনেকটা সময়। এর মধ্যে দুটি বিস্কুট ১২০ ও ১৩০ মিনিট ধরে সেঁকার পর সবচেয়ে সফলভাবে তৈরি হয়। পরীক্ষা শেষে বিস্কুটগুলো না খেয়ে নিরাপদে সিল করে স্পেসএক্স ড্রাগন মহাকাশযানে পৃথিবীতে ফেরত পাঠানো হয়, যাতে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন এগুলো খাওয়ার জন্য পুরোপুরি নিরাপদ কি না।