চাঁদের ‘অন্ধকার’ পাশ জয় করতে কেন মরিয়া বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আর বড় বড় বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে চাঁদে যাওয়ার এক নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সবারই প্রধান লক্ষ্য এখন চাঁদের রহস্যময় দূরবর্তী অংশের অন্ধকার অঞ্চল।
এরই মধ্যে নাসা তাঁদের ঐতিহাসিক ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে ফেলেছে। যদিও এই মিশনে নভোচারীরা সরাসরি চাঁদের মাটিতে পা রাখবেন না। তবু অভিযানটি বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মিশনের চার নভোচারী হতে যাচ্ছেন ইতিহাসের প্রথম মানুষ, যাঁরা চাঁদের ওই দুর্গম আর অজানা উল্টো পিঠটি খুব কাছ থেকে সরাসরি নিজের চোখে দেখার সুযোগ পাবেন।
কিন্তু চাঁদের এই ‘অন্ধকার’ অঞ্চল আসলে কী? আর এমন কী আছে যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার মতো ক্ষমতাধর দেশগুলো এখন সেখানে পৌঁছাতে মরিয়া?
পৃথিবী থেকে আমরা সব সময় চাঁদের একটি পাশই দেখতে পাই। এর ঠিক উল্টো পাশে এমন এক বিশাল অংশ রয়েছে, যা আমাদের চোখের আড়ালে চিরকাল রহস্য হয়েই রয়ে গেছে। বিজ্ঞানীদের কাছে এটি চাঁদের ‘দূরবর্তী অংশ’ বা ‘অন্ধকার পাশ’ (ফার সাইড অব দ্য মুন) নামে পরিচিত।
মূলত পৃথিবী আর চাঁদের ঘূর্ণন গতির এক অদ্ভুত মিলের কারণেই এই রহস্যময় দিকটি সব সময় আমাদের চোখের আড়ালে থাকে। পৃথিবী থেকে কখনো দেখা যায় না বলে বিজ্ঞানীদের কাছেও এই অংশটি দীর্ঘকাল অজানা ছিল। গবেষকদের ধারণা, চাঁদের এই লুকানো অংশটি আসলে কোটি কোটি বছরের পুরোনো এক ‘টাইম ক্যাপসুল’।
বিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশক ধরেই একটি বিষয়ে একমত, চাঁদের এই আড়ালে থাকা অংশটি পৃথিবী থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ও নির্জন। ঠিক এই কারণেই মহাকাশ গবেষণার জন্য এটি এখন সৌরজগতের সবচেয়ে মূল্যবান জায়গা। মূলত মহাবিশ্বের শুরুর ইতিহাস আর প্রাচীন সব সংকেত খুঁজে পেতেই বিজ্ঞানীরা এখন ওই রহস্যময় অঞ্চলে গবেষণার পরিকল্পনা করছেন।
আর এই দুর্গম অঞ্চলটি যে দেশ সবার আগে জয় করতে পারবে, মহাকাশ গবেষণার কাজে তারাই সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে। আর যে দেশ আগে নিজের ঘাঁটি গাড়তে পারবে, চাঁদের মূল্যবান খনিজ সম্পদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বেশি হবে।
চাঁদের এই অমূল্য সম্পদ আর রহস্যময় অঞ্চলের দখল নিতেই এখন বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে চন্দ্র জয়ের প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা থেকে শুরু করে চীনের সিএনএসএ সবাই এখন চাঁদের ওই আড়ালে থাকা অঞ্চলের নিজেদের আধিপত্য জমাতে চায়। পিছিয়ে নেই রাশিয়ার রসকসমস কিংবা ভারতের ইসরোও। এমনকি ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি ও জাপানের জাক্সার মতো শক্তিশালী সংস্থাগুলোও এখন এই প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছে।
তবে বর্তমানে একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে একের পর এক চন্দ্র অভিযানের মিশন। যেভাবে একের পর এক মিশনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তাতে চাঁদের ওই নির্জন অঞ্চলের শান্ত পরিবেশ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অজানাকে জানার এই তীব্র প্রতিযোগিতার নেশায় চাঁদের সেই অনন্য নীরবতা হয়তো খুব কম সময়ে হারিয়ে যাবে। আর যদি একবার সেই পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়, তবে মহাবিশ্বের সৃষ্টির আদি রহস্য জানার এক বিশাল সুযোগ আমরা চিরতরে হারিয়ে ফেলব।
ইতালির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের মহাকাশবিজ্ঞানী ক্লডিও ম্যাকোন এই বিষয়টি নিয়ে বেশ চিন্তিত। তিনি ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি অব অ্যাস্ট্রোনটিক্সেরও একজন সদস্য। সম্প্রতি এক সভায় তিনি তাঁর উদ্বেগের কথা জানান ও চাঁদের এই এলাকাটি রক্ষার জন্য একটি সমাধানের প্রস্তাব দেন।
ম্যাকোন মনে করেন, চাঁদের এই বিশেষ অংশটি বাঁচাতে সেখানে একটি ‘সুরক্ষিত এলাকা’ তৈরি করা জরুরি। তাঁর পরিকল্পনা হলো প্রায় ১ হাজার ৮২০ কিলোমিটার চওড়া একটি বিশাল এলাকা নির্দিষ্ট করা, যার কেন্দ্রে থাকবে ‘ডেডালাস ক্রেটার’ নামের একটি গভীর গর্ত। এই গর্তের দেয়ালগুলো অনেক উঁচু হওয়ায় তা প্রাকৃতিকভাবেই পৃথিবীর সব রেডিও সিগন্যাল আটকে দেবে। এর ফলে গর্তের ভেতরে তৈরি করা টেলিস্কোপগুলো একদম শান্ত পরিবেশে মহাবিশ্বের জন্মের ইতিহাস নিখুঁতভাবে খুঁজে পাবে। ভবিষ্যতের বড় বড় আবিষ্কারের জন্য চাঁদের এই রেডিও দূষণমুক্ত পরিবেশটি বাঁচিয়ে রাখা খুবই প্রয়োজন।
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান, অ্যাস্ট্রোনমি কাস্ট, সায়েন্স ফোকাস